সৈয়দ শামসুল হক

বিপুল বিস্ময়

সৈয়দ শামসুল হক ষ জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ ষ মৃত্যু ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

আমার কাছে সৈয়দ শামসুল হক এক বিস্ময়। মৃত্যুশয্যায় থেকে হ্যামলেটের অনুবাদ করেছেন, ১৫০টির অধিক কবিতা লিখেছেন, ৪-৫টি গল্প লিখেছেন। এন্ড্রু কিশোর আফসোস করেছিলেন, তিনি যদি তার জন্য আরও কিছু লিখে যেতেন। কারণও আছে ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ফুস’ এ গানটির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন, সুরকার আলম খান সুরকার হিসেবে পুরস্কার পেয়েছিলেন আর গীতিকার হিসেবে সৈয়দ হক। ভাবা যায়? তিনি এ সময় আরও চারটি গানের বাণী লিখেছিলেন তার জন্য। হ্যামলেট নাটকের নির্দেশক নাট্যকার আতাউর রহমান আমাকে বলেছেন, লন্ডনের ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে এ নাটক নিয়ে যত এসএমএস করেছেন, তা একটি বই হতে পারেÑ নির্দেশনা, অনুরোধ করেছেন ওই নাটকের ব্যাপারেই।
একবার ভাবুন তো, আমার মতো লোক তার প্রয়াণের পর তাকে নিয়ে একদিনে পাঁচটি টিভি চ্যানেলে সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। তার জানাজায়, আমি তো শুধু চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জানাজায় শরিক হয়েছিলাম অন্য সময় তো শুধু স্টুডিওতেই কাটাতে হয়েছে, টিভির পর্দায় দেখেছি বাংলা একাডেমিতে, শহীদ মিনারে ভক্ত-অনুরাগীদের ঢল। এমনকি তার লাশ কুড়িগ্রামে সেদিনই হেলিকপ্টারে পাঠানো হয়েছিলÑ সেই কলেজ প্রাঙ্গণেও জনতার ঢল নেমেছিল।
লেখালেখি সম্পর্কে পরেই না হয় বলি, তিনি ছাত্রাবস্থায় ভারতের বোম্বাই চলে গিয়ে প্রখ্যাত এক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। প্রথম একটি বিনোদন পত্রিকা ‘সিনেমা’য়, যার সম্পাদক ছিলেন চিত্রপরিচালক ফজলুল হক। বিশিষ্ট কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের স্বামী ফজলুল হক সাহেব, সে কারণে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর তাকে হক চাচা বলেন। তার দেখাদেখি শাইখ সিরাজও। লন্ডনে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার আগে তিনি চ্যানেল আই হয়েই গিয়েছিলেন, জানাজাও সেখানেই। ওই দুজনেরই নয় সেদিন অনেক নামি-দামি আর সব মানুষের চোখেও আমি জল দেখেছি।
কী বলতে কী বলছি। বলছিলাম সৈয়দ হকের কথাই, এদেশের মানুষ যাকে ভালোবেসে শ্রদ্ধায় সব্যসাচী বলে থাকেন। অসংখ্য ছায়াছবির জন্য তিনি গল্প/কাহিনী লিখেছেন, তিনি চিত্রনাট্য রচনা করেছেন, সংলাপ লিখেছেন, এমনকি গানের বাণীও রচনা করেছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে তার চলচ্চিত্র তার ইতিহাস-চেতনার স্বাক্ষর বলে আমি মনে করি। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিভাগে কাজের জন্য তিনি যেমন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, তেমনি কলাকুশলী কী সেলিব্রেটিদের প্রীতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। গল্পের বই ‘তাস’ দিয়ে যাত্রা শুরু, তারপর উপন্যাস, নাটক, কবিতা, ছোটগল্পÑ কতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিস্ময় হলো শিখরস্পর্শী সাফল্য।
একনজরে তার প্রকাশিত সাহিত্যসৃষ্টির দিকে চোখ বোলানো যাক :

কবিতা
একদা এক রাজ্যে (১৯৬১), বিরতিহীন উৎসব (১৯৬৯), বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা (১৯৭০), প্রতিধ্বনিগণ (১৯৭৩), অপর পুরুষ (১৯৭৮), পরাণের গহীন ভিতর (১৯৮০), নিজস্ব বিষয় (১৯৮২), রজ্জুপথে চলেছি (১৯৮৮), বেজান শহরের জন্য কোরাস (১৯৮৯), এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি (১৯৮৯), অগ্নি ও জলের কবিতা (১৯৮৯), কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে (১৯৯০), আমি জন্মগ্রহণ করিনি (১৯৯০), তোরাপের ভাই (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯০), রাজনৈতিক কবিতা (১৯৯১), নাভিমূলে ভস্মাধার, কবিতা সংগ্রহ, প্রেমের কবিতা, ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর (২০০৯)।

ছোটগল্প
তাস (১৯৫৪), শীত বিকেল (১৯৫৯), রক্তগোলাপ (১৯৬৪), আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭), প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮২), সৈয়দ শামসুল হকের প্রেমের গল্প (১৯৯০), জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০) ও শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০)।

উপন্যাস
দেয়ালের দেশ, এক মহিলার ছবি (১৯৫৯), অনুপম দিন (১৯৬২), সীমানা ছাড়িয়ে (১৯৬৪), নীল দংশন (১৯৮১), স্মৃতিমেধ (১৯৮৬), মৃগয়ায় কালক্ষেপ (১৯৮৬), স্তব্ধতার অনুবাদ (১৯৮৭), এক যুবকের ছায়াপথ (১৯৮৭), স্বপ্ন সংক্রান্ত (১৯৮৯), বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ (১ম খ- ১৯৮৯, ২য় খ- ১৯৯০), বারো দিনের শিশু (১৯৮৯), বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল (১৯৮৯), ত্রাহি (১৯৮৯), তুমি সেই তরবারী (১৯৮৯), কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন (১৯৮৯), শ্রেষ্ঠ উপন্যাস (১৯৯০), নির্বাসিতা (১৯৯০), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০), খেলারাম খেলে যা (১৯৭৩), মেঘ ও মেশিন (১৯৯১), ইহা মানুষ (১৯৯১), মহাশূন্যে পরাণ মাস্টার, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, বালিকার চন্দ্রযান, আয়না বিবির পালা, কালঘর্ম, দূরত্ব, না যেয়ো না, অন্য এক আলিঙ্গন, এক মুঠো জন্মভূমি, বুকঝিম ভালোবাসা, অচেনা, আলোর জন্য, রাজার সুন্দরী।

কাব্যনাট্য
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬), গণনায়ক (১৯৭৬), নূরুলদীনের সারাজীবন (১৯৮২), এখানে এখন (১৯৮৮), কাব্যনাট্য সমগ্র (১৯৯১), ঈর্ষা, বাংলার মাটি বাংলার জল, নারীগণ।

প্রবন্ধ
হৃৎ কলমের টানে (১ম খ- ১৯৯১, ২য় খ- ১৯৯৫), মার্জিনে মন্তব্য।
কথাকাব্য
অন্তর্গত।
আত্মজীবনী
প্রণীত জীবন।
অনুবাদ
ম্যাকবেথ, টেম্পেস্ট, শ্রাবণ রাজা (১৯৬৯)

শিশুসাহিত্য
সীমান্তের সিংহাসন (১৯৮৮), আনু বড় হয়, হড়সনের বন্দুক।

অন্যান্য
শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, শ্রেষ্ঠ কবিতা।

তার কবিতা নিয়ে কথা বলার আগে, তার আরেকটি বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। তিনি ছবি আঁকতেন, কাঠ, ভাঙা যন্ত্রপাতি, নানা জিনিসপত্র দিয়ে অবন ঠাকুরের মতো কাটুস-কুটুস করতেন। বলা যেত ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ধরনের নয়, তার নিজের মতোই। তিনি বলতেন, তার বন্ধু কাইয়ূম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম এবং বুজর্গ দোস্ত পটুয়া কামরুল হাসান।
থাক এসব কথা, আগে প্রেমের কবিতার একটা টুকরো পয়ার শোনাই

‘ভেতরে কেউ কাঁদছিল  তখন থেকে কাঁদছিল
সেই তখন থেকে
যখন আমার সাজানো এক ঘর ছিলো
যখন তার দরোজা থেকে বিরাট তালা ঝুলছিল
ভেতরে কেউ কাঁদছিল
তখন থেকে         যখন থেকে
তোমার মতো কারোর দিকে দেখার দুটো চোখ ছিল।’

কী পরিমাণ আঙ্গিক সচেতন হলে ছাড়ার আঙ্গিনাতে এ-রকম মর্মঘাতী- প্রাণ দোলানো প্রেমের পদাবলী রচনা সম্ভব।
সদ্য-প্রয়াত আমার বন্ধু কবি ও শিক্ষাবিদ ডক্টর উত্তম দাশ তার সম্পর্কে লিখেছিলেন :

সৈয়দ শামসুল হক...। কবিতার বিচিত্র আঙ্গিকে তিনি আজীবন পরীক্ষারত। মনে-প্রাণে বাঙালি এই কবি নিজের পরিচয়ে লেখেনÑ ‘পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের।’

কখনোই ভয় করি নাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস,
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ,
একই হাসিমুখে বাজিয়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস,
আপস করি নি কখনোই আমি এই হলো ইতিহাস।

এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান,
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।

কবিভাষায় বক্তৃতার ঢঙ্ আছে; কিন্তু বাঙালির ইতিহাস চেতনায় তার মধ্যে ধৃত হয় এক সংস্কৃতিচেতনা। নিজ হৃদয় খুঁড়ে বাঙালির উৎসের সন্ধান সেখানে। ছন্দনিপুণ আঙ্গিক সচেতন তিনি। তার সংস্কৃতি চেতনাই তাকে নিজ অঞ্চলের ভাষায় কবিতা রচনায় প্ররোচিত করেছে। তার এই আঞ্চলিক ভাষা প্রবণতা এক জাদুবাস্তব সৃষ্টি করে।

পরাণের গহীন ভিতর : ১
জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেকুব চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখার তার দ্যাখানোর ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়া থাকে পথের ধূলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরাণের গহীন ভিতর।


তিনি নিজেকে একুশের সন্তান বলে দাবি করতেন। তার (সর্বশেষ কী) কবিতার বই, একুশ একাত্তর দু’হাজার তেরো’ বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। তিনি অনায়াসে যারা বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এসবে উস্কানি দিচ্ছে, তাদেরকে কঠোর ভাষায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চ তাকে নতুন করে প্রাণিত করেছিল সন্দেহ নেই। তার কবিতা তখন থেকে হাতে উঠলো প্রত্যক্ষ এবং সরাসরি। ভাষার ব্যাপারে তিনি তার অন্তিম ইচ্ছাটি জানিয়েছিলেন এভাবেই


কিন্তু রেখে যাবো ওষ্ঠ্য
শব্দের অমৃত আমি পান করে উঠি সেই কবে,
এখনো জিহ্বায় স্বাদ, চেতনায় অমরত্ব ধরি,
না, আমার নয় সেটি, আমাদেরই ভাষারÑ আ মরি!
ভাষাতেই জননীর দুগ্ধধারা পেয়েছি শৈশবে।

যখন সে জননীর বুকে পড়ে শেলের আঘাত,
দুধ নয় রক্তধারা ঝরে পড়ে যখন ভাষার,
তখনই উত্থান ঘটে মানুষের ভাষা প্রতিভার,
রক্তের প্রবাহ পায় প্রতিবাদী ভাষার সম্পাত।

আমিও ভাষারই এক কবিকর্মী একটি জীবন,
লোকের হৃদয় কথা, জীবন যে কৃষিকথা তার,
ভাষায় প্রকাশ করি; চেতনার গূঢ় সারাৎসার
ছেনে উঠে কবিতায় করি তার সত্য উচ্চারণ।

এই সত্যে স্থিত আছি এখনো তো প্রায় আট যুগ।
চলে যাবো, কিন্তু রেখে যাবো ওষ্ঠ্য দুগ্ধে যে উন্মুখ ॥

আমি তার এই বইটি থেকে উজ্জ্বল হীরের মতো পঙ্ক্তি তুলে দিতে পারতাম, কৃপণের মতো মাত্র কয়েকটি পঙ্ক্তি তুলে দিচ্ছি। গণজাগরণ মঞ্চের পূর্বে আমাদের বর্ণমালা হাল কী, তিনি লিখলেন, ‘স্তব্ধতাও নেমেছিল বাংলার অক্ষরে অক্ষরে আর সেই প্রবল অভ্যুত্থানের ফল ‘আজকাল দেশকাল গেছে। ভোর হয় আবার বাংলায়। আকস্মিকভাবে নজরুলের একটি শিশুতোষ কবিতার একটি পঙ্ক্তি নতুন অর্থ আর দীপ্তি নিয়ে হাজির, ‘আমি যদি না জাগি মা,
কেমনে সকাল হবে?
আর ভাষা তার কাছে ইতিহাসবোধেরই
কল্লোলধ্বনি
ভাষা কি কেবল ভাষা? শব্দধ্বনি মাত্র কতিপয় সে তো নয়। ইতিহাস বোধে ভাষা কল্লোলিত হয়।


আরব ছোটগল্পের রাজকুমারী
সামিরা আজ্জম ১৯২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনের আর্কে একটি গোঁড়া
বিস্তারিত
অমায়ার আনবেশে
সাদা মুখোশে থাকতে গেলে ছুড়ে দেওয়া কালি  হয়ে যায় সার্কাসের রংমুখ, 
বিস্তারিত
শারদীয় বিকেল
ঝিরিঝিরি বাতাসের অবিরাম দোলায় মননের মুকুরে ফুটে ওঠে মুঠো মুঠো শেফালিকা
বিস্তারিত
গল্পের পটভূমি ইতিহাস ও বর্তমানের
গল্পের বই ‘দশজন দিগম্বর একজন সাধক’। লেখক শাহাব আহমেদ। বইয়ে
বিস্তারিত
ধোঁয়াশার তামাটে রঙ
দীর্ঘ অবহেলায় যদি ক্লান্ত হয়ে উঠি বিষণœ সন্ধ্যায়Ñ মনে রেখো
বিস্তারিত
নজরুলকে দেখা
আমাদের পরম সৌভাগ্য, এই উন্নত-মস্তকটি অনেক দেরিতে হলেও পৃথিবীর নজরে
বিস্তারিত