দুর্ভাগ্যের ইতিকথা যার জীবন ঘিরে ব্যাপ্ত

৩ অক্টোবর ২০১৬ লেখক অধ্যাপক রতনতনু ঘোষ তার জীবন ঘিরে দুর্ভাগ্যের জাল কাটাতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাকে নিয়ে ভাগ্যের গুলি খেলায় আমাদের মাততে হয়েছে। ৪ অক্টোবর বাংলা একাডেমির বটতলায় তার মরদেহ নিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। একাডেমি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় গেটে দাঁড়িয়ে আমরা যারা তাকে পছন্দ করি সবাই অসহায় হয়ে চেয়ে থেকেছি মৃত লেখকের পরিবারের মুখের দিকে। ৫ অক্টোবর ওই ঘটনার প্রতিবাদে শাহবাগে আমরা যে ক’জন মানববন্ধনে (ঢাকা শহরের) ব্যস্ত শহরের ভিড়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছি সে আলোড়নেরও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিছু দিন পর হয়তো সবাই ভুলে যাব; তাকে নিয়ে ভাবনার সময়ও কমে আসবে। কিন্তু কিছু মানুষের স্মৃতি বেঁচে থাকা মানুষের মস্তিষ্ককোষে থেকে যায়, কখনও কখনও প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গ মুহূর্তে জেগে ওঠে তাদের আকাক্সক্ষার কথা, অপ্রাপ্তির ইতিবৃত্ত। অনুপস্থিত রতন দা’কে তেমনি মনে থাকবে। বেঁচে থাকা তার পরিচিত লেখক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে তিনি আলো ছড়াবেন।  
প্রথমে অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে মনে করেছিলাম সেটা তত গুরুতর হবে না। কারণ তাকে দেখেছি সুস্থ শরীরে। আড্ডা দেয়ার সময় কিংবা রাজপথে হেঁটে বেড়ানোর সময়গুলো তার হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি এখনও ভাসছে। মাত্র ৫২ বছরের সীমারেখা ছুঁয়ে রতনদা সবাইকে বিমর্ষ করে চলে যাবেন এটা ধারণা করতে কষ্ট হচ্ছে আমাদের। একুশে গ্রন্থমেলার সঙ্গে রতনতনু ঘোষের প্রাণের যোগ ছিল অবারিত। তার অন্তরাত্মা নেচে উঠত মেলা শুরু হলে। সারা বছর তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। একসঙ্গে ১০-১২টা বই প্রকাশের সেই পরিশ্রম আমরা কাছ থেকে দেখেছি। তিনি সঙ্গে নিয়ে হাঁটছেন তার প্রিয় অমৃত কথার পা-ুলিপি। তিনি চলে যাচ্ছেন প্রকাশকের অফিসে নিজের নতুন কবিতার বই ছাপানোর জন্য। তিনি বিশিষ্টজনের দ্বারে উপস্থিত হচ্ছেন সাক্ষাৎকার নেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে; দৈনিক পত্রিকার অফিসে সালাম সালেহ উদ্দীন কিংবা সৌরভ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে দেখা করে লেখা দিয়ে আসছেন। তিনি কম্পিউটার নয় কলম ব্যবহার করতেন। লেখার সঙ্গে তার আত্মিক যোগটি যন্ত্রের কাছে কখনও আত্মসমর্পণ করেনি। এমনও দেখা গেছে, তাকে তাৎক্ষণিক একটি লেখা দিতে অনুরোধ করেছেন কেউ, তখনই তিনি বসে গেছেন লিখতে। ১৫-২০ মিনিটে একটি কলাম লিখে প্রকাশের জন্য দিয়ে এসেছেন পত্রিকায়। সাংবাদিক ও লেখক কাজল রশীদ শাহীন কিংবা কবি অচিন্ত্য চয়ন কিংবা আরও অনেকের সঙ্গে তার আন্তরিকতা ছিল সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে। লেখাকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে পেরেছিলেন রতনতনু। তিনি একনাগাড়ে ৩০ বছর লিখেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০-এর অধিক।
একজন লেখকের অবদান মহাকালই বিচার করবে। বর্তমান সময় হয়তো তাকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হতে পারে। কেউবা তার অবদানকে ছোট করে দেখতে পারেন। কিন্তু ‘তার রচিত এবং সম্পাদিত গন্থ’ যে ইতিমধ্যে রেফারেন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা মনে রাখতে হবে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের। তার বিশ্বায়ন অথবা উত্তরাধুনিকতাবিষয়ক গ্রন্থগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় রেফারেন্সে পরিণত হয়েছে। তার ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক সম্পাদিত গন্থটি এদেশের উচ্চশিক্ষা চিন্তার প্রথম সংকলন। এরকম ব্যতিক্রমী কাজে তার ছিল উৎসাহ। মৃত্যুর আগে তিনি কবিতার রসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। লিখছিলেন কবিতা। এমনকি তার শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানত প্রাবন্ধিক-গবেষক সত্তা থেকে নিজের কবি পরিচিতিকে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাকে দেখতাম চায়ের দোকানদার, রিকশাচালকদের পাশে; তিনি তাদের কাছে তার কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেছন। আজকের নাগরিক রুচির কবিদের কাছে হাস্যকর মনে হলেও তিনি দূরে থাকতে চেয়েছেন অহঙ্কারী মানুষের কাছ থেকে। নিজের অনুভূতির গুরুত্ব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর এ প্রচেষ্টা তিনি জীবিত থাকলে ভবিষ্যতে কবিতার নতুন পাঠক সৃষ্টি হতে পারত।
রতনতনু ঘোষের মৃত্যু আমাদের প্রগতিপন্থী চিন্তার ধারার জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়েছে। কারণ তিনি সরদার ফজলুল করিমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনি আহমদ শরীফের কাছের মানুষ ছিলেন। তিনি বেড়ে উঠেছেন প্রগতির কোলে, তিনি চিন্তা করতে শিখেছেন আধুনিক মানুষের সান্নিধ্যে থেকে। আজকাল প্রগতিমনস্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে গেছে। তার পরিবর্তে সেখানে প্রযুক্তি প্রাধান্য বিশ্বের জঙ্গিবাদী চিন্তাধারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এজন্য তার অকাল প্রয়াণ আমাদের কাতর করে। তিনি আরও দশজনকে প্রগতির ঢেউ দিয়ে আলোড়িত করতে পারবেন। তিনি আরও বিশজন মানুষকে মৌলবাদী চিন্তা থেকে রক্ষা করতে পারতেন। তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্তারে সহায়তা করতে পারতেন। এসব আর হবে না। হয়তো নতুন কেউ হাল ধরবেন। কিন্তু রতন দা’র মতো পরিশ্রমী মানুষ খুব কমই আছে এ সমাজে। রতনতনু ঘোষের প্রয়াণ কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না।


রুদ্রর শুভদৃষ্টি
শুরুতেই বলেছি, রুদ্রর মধ্যে যেটুকু প্রশংসা, তাকে খুঁজে দেখাই আমার
বিস্তারিত
আসন্নপ্রসবা কুকুর এবং...
আসন্নপ্রসবা কুকুরটি কঁকিয়ে ওঠলেÑ আমাদের মহল্লায় রাত নামে নির্জীব তাকিয়ে
বিস্তারিত
নতুন গোয়েন্দা আখ্যান
অলোকেশ রয় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। চৌকস, সাহসী ও মেধাবী এ গোয়েন্দা
বিস্তারিত
সংরক্ষিত বনের কাঠমৌর, কুচকুচি ও
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বন বলে প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফোকলা
বিস্তারিত
প্রকাশ পেয়েছে ‘জীবনানন্দ’
জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে চর্চার পত্রিকা ‘জীবনানন্দ’ প্রকাশিত হয়েছে। এর সম্পাদক
বিস্তারিত
স্ট্যাটাস
ধর্মও উঠে এসেছে ফেসবুকের নীল পর্দায় হায় সেলুকাস! এতে সওয়াব
বিস্তারিত