দানিউস ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ডিলান ইংরেজি বাচন রীতির ‘এক মহান কবি’ হিসেবে নোবেল পুরস্কার তার ‘প্রাপ্য’। ৫৪ বছর ধরে চলছে তার এ অভিযাত্রা, প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে চলেছেন, সৃষ্টি করছেন নতুন পরিচয়

ব্যতিক্রম কিন্তু অনভিপ্রেত নয়

বব ডিলান নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় যারা হা-হা-হা, হি-হি-হি করছেন এবং হা-হা-হা, হি-হি-হিতে যারা ব্যথিত হয়েছেন তাদের একটু পেছন ফিরে তাকাতে অনুরোধ করছি। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও এরকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ আমাদের ঘরের মানুষ হওয়ায় সেসব অভিমত ছিল আরও তীব্র, ভয়ঙ্কর ও কুশ্রী। নোবেল পুরস্কারের মান কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে নাকি সেটাই স্পষ্ট হয়েছে এসব কথা শুধু আড়ালে আবডালে, চায়ের দোকানে আর ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনেও বলা হয়েছে। সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে সমাসীন ব্যক্তিরাও রবীন্দ্র বিরোধিতার তুবড়ি ছুটিয়ে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়েছিলেন নোবেল যারা দেয়, তারা সাহিত্যের আগপাশতলা সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান রাখেন না বলেই রবীন্দ্রনাথের মতো কবিকে নোবেল দিয়েছেন। অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, তখন ফেসবুক না থাকলেও ফেসবুকারদের পূর্ব পুরুষরা আক্রমণবিদ্যায় কম পারদর্শী ছিল না মোটেই। আজকের বঙ্গ সন্তানরা তো শুধু রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার নয়, সেসব মহান(!) আক্রমণকারীদেরও উত্তরাধিকার। সুতরাং হা-হা-হা, হি-হি-হি আছে এবং থাকবে।
বব ডিলান নোবেল পাওয়ায় প্রতিক্রিয়ার বাণটা একেবারেই অন্যরকম। সেটা কি শুধু একজন সঙ্গীতকারকে (ডিলান এ পরিচয়ে খ্যাতিমান ও পরিচিত হলেও এটিই তার একমাত্র ও প্রধান পরিচয় নয়) প্রথমবারের মতো নোবেল দেয়া হয়েছে বলে? গতবছরও তো সাহিত্যে নোবেল দেয়া হয়েছে একজন সাংবাদিককে। মনে আছে কি সে সময় নোবেল কমিটি তাকে দেয়ার কৈফিয়তে কোন যুক্তি হাজির করেছিল? উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পান বেলারুশের লেখক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচ, যার ‘বহুস্বর’র গদ্যকে সুইডিশ একাডেমি অভিহিত করে ‘সমকালীন যাতনা আর সাহসিকতার সৌধ’ হিসেবে। সেই যুক্তি তো আমরা ঠিকই কুইনাইন খাওয়ার মতো খেয়েছি। তাহলে বব ডিলানের বেলায় প্রদেয় যুক্তিতে বাধাটা কোথায়? সুইডিশ একাডেমি এবার সাহিত্যের নোবেল দেয়ার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ঘটেনি নোবেলের শতাব্দীকালেরও অধিক সময়ে। সাহিত্য বলতে কি আমরা শুধু গল্প-উপন্যাস-কবিতা বুঝব? আর কখনও কখনও নাটক? সাহিত্যের অংশীদার তো আরও অনেকে। তাহলে এখানে কেন আশরাফ-আতরাফের চর্চা। সংগীত কি সাহিত্যের অংশ নয়? চিত্রকলা কি সাহিত্য থেকে ভিন্নতর কিছু? দর্শনও তো সাহিত্যের শক্তিশালী প্রশাখাবিশেষ। তা না হলে প্রবন্ধককে আমরা কেন বলি মননশীল সাহিত্য? সাহিত্যে নোবেলজয়ী বার্টান্ড রাসেল তো দার্শনিকই ছিলেন, নাকি? বব ডিলানের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে আরও একটি দিক। যা হয়তো ছিলই, এবার দৃষ্টিগোচর হলো এবং সেটা দৃষ্টিকটুভাবেই। সাহিত্যেও নিম্নবর্গ বিরাজমান। সংগীত কি তবে তারই প্রতিনিধি? যারা কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখেন তারা নিজেদের উচ্চবর্গস্থানীয় মনে করেন বলেই কি এমন শ্লেষ ছড়াচ্ছেন, শ্লাঘা প্রদর্শন করছেন?
সংগীত যদি নিম্নবর্গীয় হয়, তাহলে লালনের গানও কি তাই? অথচ কে না জানে, লালনের গান শুধু গান নয়, তাতে রয়েছে কবিতা ও দর্শনের উচ্চকিত সহাবস্থান। লালনের গান পাঠ করলে মেলে মননশীল প্রবন্ধের বৌদ্ধিক ঋদ্ধতা। সংগীতকে যদি আমরা সাহিত্যের অংশীজনের স্বীকৃতি দিতে গররাজি হই, তাহলে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের অবস্থান দাঁড়ায় কোথায়? চর্যাপদ যে মূলত সংগীত তা-কি আমরা ভুলে যাব? হয়তো বৌদ্ধদের সাধন সংগীত, তবে সংগীতই তো। বব ডিলানকে স্বীকৃতি দিতি গিয়ে যে প্রসঙ্গের অবতারণা করেছে সুইডিশ একাডেমি, তাতে চর্যাপদের উত্তর প্রজন্ম হিসেবে আমাদেরই তো সবচেয়ে বেশি খুশি ও গর্বিত হওয়া বাঞ্ছনীয়-যুক্তিযুক্তও।
সুইডিশ একাডেমির সংবাদ সম্মেলনে সারা দানিউস বলেন, তাদের এবারের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হবে না বলেই তিনি আশা করছেন। যদিও তার বিপরীতটাই হয়েছে। বব ডিলানকে, একজন গীতিকারকে পুরস্কার দেয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের পৃথিবী পুরো দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সালমান রুশদীর মতো লেখকরাও যুক্ত হয়েছে বিতর্কের এ প্রপঞ্চে। তিনি অবশ্য নোবেল কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কারণ এর মধ্য দিয়ে সাহিত্যের শাখাটা আরও প্রসারিত হলো বলে।
দানিউস ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ডিলান ইংরেজি বাচন রীতির ‘এক মহান কবি’ হিসেবে নোবেল পুরস্কার তার ‘প্রাপ্য’। ৫৪ বছর ধরে চলছে তার এ অভিযাত্রা, প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে চলেছেন, সৃষ্টি করছেন নতুন পরিচয়। ডিলানের ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেইঞ্জিং’ গানটিকে দানিউস তুলনা করেছেন গ্রিক কবি হোমার আর শ্যাফোর সঙ্গে। আমরা যদি ৫ হাজার বছর পেছনে ফিরে যাই, আমরা হোমার আর শ্যাফোকে পাব। তাদের গীতিকবিতা লেখাই হতো গেয়ে শোনানোর জন্য। বব ডিলান একই কাজ করেছেন।
বব ডিলানের নোবেল প্রাপ্তিতে যারা বিস্মিত-ঈর্ষান্বিত ও কৌতূহলপ্রবণ, তাদের এসবের পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ তালাশ করা যাচ্ছে না। একটি কারণই ঘুরে-ফিরে আসে, সেটি হলো, তিনি আমাদের চেনা-জানা বলে। হ্যাঁ, তিনি আমাদের চেনা-জানা এক স্বজন-আত্মার আত্মীয়। কেননা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম-মুহূর্তের সঙ্গে তিনি শামিল ছিলেন, একাত্ম হয়েছিলেন। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু-সুহৃদ-শুভানুধ্যায়ী। রাষ্ট্র আমেরিকা যখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে, তখন দেশটির জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জনগণের এ যূথবদ্ধতায় যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলো,  জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান। ১৯৭১ সালে নিউইয়র্কে কনসার্ট ফর বাংলাদেশে গান গেয়েছেন তিনি। ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’র বিখ্যাত গায়ক সেই থেকে আমাদের আত্মার আত্মীয়- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি  বন্ধু।
ডিলানকে শুধু একজন সংগীতকার হিসেবে দেখলে ভুল হবে না, তার প্রতি অন্যায়ও করা হবে। হ্যাঁ, একথা সত্যি, তিনি যা কিছু বলার গানে গানেই বলেছেন। গানের পৃথিবীর উচ্চমানসম্পন্ন সব পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। অস্কার-গ্রামি থেকে কোনোটাই অধরা নয়। তারপরও তাকে যদি আমরা শুধু গানের লোক বলে সাহিত্য থেকে পৃথক করতে চাই তাহলে তাতে আমাদের কূপম-ূকতাই প্রকাশিত হবে। বব ডিলানের গানÑ শুধু সুর আর ছন্দের কারুকাজ খচিত নয়। যদিও তিনি সুর নিয়ে করেছেন ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমেরিকান সংগীতের যে ট্র্যাডিশন তাতে যুক্ত করেছেন বহুবিধ মাত্রা। তার প্রচেষ্টায় সৃজিত হয়েছে মার্কিন সংগীতের অজস্র অভিমুখ। এসবের পাশাপাশি সংগীতে ডিলান যুক্ত করেছেন, সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যঞ্জনা। যাতে রয়েছে বিপ্লব ও মানবতাবাদের মৌল সুর। যে সুরে নিনাদিত হয়েছে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সাংগীতিক প্রতিবাদ।  আই হ্যাভ এ ড্রিম এর মার্টিন লুথার কিংয়ের যে লড়াই সে লড়াইয়ে এ কারণে সামনের কাতারেই ছিলেন ডিলান। গানের কথায় তীব্র প্রতিবাদ-ধিক্কার ব্যক্ত করা ডিলান শুধু আমেরিকা নয়, পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধবিরোধী মানুষের কাছে ছিলেন প্রিয় এক নাম। তার গানকে যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়। ষাটের দশকে তার উত্থান, নানা ঘটন-অঘটনের তিনি সাক্ষী। বিবিধ অভিজ্ঞতায় ভরা তার ঝুলি। তারপরও কোনো ইজম বা মতাদর্শে তিনি বৃত্তবন্দি  হননি। নিজের মতো করেই চলেছেন-লিখেছেন-গেয়েছেন-এঁকেছেন, এখানেই তিনি ব্যতিক্রম। সৃজনশীলতায় তিনি সর্বদায় অক্ষণœ রেখেছেন ঐতিহ্যের পরম্পরা। এ কারণে সুইডিশ একাডেমি তার গানকে কবিতা বলে অভিহিত করে বলেছে, ‘বব ডিলানকে পড়াও যায় এবং পড়াই উচিত। ইংলিশ ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি এক মহান কবি।’ যেভাবে পাঠ করা যায় রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিকে, লালনের গানকে, চর্যাপদের কবিতাকে। এ কারণে বব ডিলানকে, একজন গীতিকারকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার ঘটনা বিস্ময়কর, ব্যতিক্রম হলেও অনভিপ্রেত বা অযৌক্তিক নয়। সুতরাং তাকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-কুতর্ক সবই তাফালিং আর জাহিরি প্রবণতার প্রপঞ্চ।


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত