পৃথিবী যাকে গায়ক বলে জানে, সেই বব ডিলান কিন্তু নিজেকে একজন প্রকৃত গীতিকবি হিসেবে পরিচয় দিতে সানন্দ বোধ করেন। তিনি একজন ভালো গীতিকবিতা রচয়িতা অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। অথচ তিনি কিন্তু পুরো দশক ধরে শর্টলিস্টের মাঝেও ছিলেন। এত দিন ধরে জাপানি জনপ্রিয় লেখক হ

শত বছরের ইতিহাস ভাঙা নোবেল বিজয়ী

এবারই প্রথম কোনো গায়ককে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো। নোবেলের শত বছরের ইতিহাসে এ পুরস্কারজয়ী প্রথম সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলান। গার্ডিয়ান লিখেছে, এর আগে বহুবার নোবেলের মনোনয়নের তালিকায় নাম এলেও সাহিত্যের সবচেয়ে সম্মানজনক এ পুরস্কারের ঘোষণায় ডিলানের নাম যে বিস্ময় হয়েই এসেছে। পুরস্কার ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে সারা দানিউস বলেন, তাদের এবারের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হবে না বলেই তিনি আশা করছেন।
পৃথিবী যাকে গায়ক বলে জানে, সেই বব ডিলান কিন্তু নিজেকে একজন প্রকৃত গীতিকবি হিসেবে পরিচয় দিতে সানন্দ বোধ করেন। তিনি একজন ভালো গীতিকবিতা রচয়িতা অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে। অথচ তিনি কিন্তু পুরো দশক ধরে শর্টলিস্টের মাঝেও ছিলেন। এত দিন ধরে জাপানি জনপ্রিয় লেখক হারুকিমুরাকামি, নগুইগো ওয়া থিয়াঙ্গু, ফিলিপ রথ ও মিলান কুন্ডারো আলোচিত তালিকায় ছিলেন। তবে ওয়াল স্ট্রিটের সমালোচকরা তাকে নোবেলের যোগ্য দাবিদার বলে বিবেচনা করে থাকেন। নোবেল পুরস্কার বিবেচনায় প্রধান বিবেচ্য বিষয় আদর্শ সাহিত্যকর্মকে ভিত্তি করে এ সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। কিন্তু গেল বছর রাজনৈতিক কারণেই একজন ইউক্রেনীয় রিপোর্টারকে বিখ্যাত করার পর জুরি বোর্ডের নির্ধারিত এ আদর্শ সাহিত্যকর্মের মানদন্ডে এখন আর পুরো দুনিয়ার তেমন আস্থা নেই।
তার পুরো নাম রবার্ট অ্যালেন জিমার হলেও বিশ্ববাসী চিনে বব ডিলান নামে। বাংলাদেশ তাকে চেনে এক অকৃত্তিম বন্ধু হিসেবে। বৃহস্পতিবার (১৩ অক্টোবর) সাহিত্যে ১১৩তম নোবেল বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করেন রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস। সুইডিশ একাডেমি বলছে, ‘আমেরিকার সংগীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টির’ জন্য ৭৫ বছর বয়সী এ রক, ফোক, ফোক-রক, আরবান ফোকের এ কিংবদন্তিকে নোবেল পুরস্কারের জন্য বেছে নিয়েছেন তারা। তিনি আমাদের ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিউইয়র্কে আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশে জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে গেয়েছিলেন বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে জনমত ও অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি ‘এ হার্ড রেইনস এগনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক এ ওমেন’ ও ‘ইট টেকস এ লট টু লাফ’ নিউইয়র্ক শহরে গেয়েছেন।
১৯৯৫ সালে নোবেল বিজেতা সিমাস হিনিও বব ডিলানের মতো তার অনেক কবিতায় গানে রূপান্তর করে নিজেই গাইতেন। এ কারণে বব ডিলান অনেক আগেই বলেছেন, ‘আমি নিজেকে প্রথমত কবি মনে করি, তারপর ভাবি একজন গায়ক।’ তিনি এ ব্যাপারেও এলেন গিন্সবার্গ ও অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ক্রিস্টোপার রিকস দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক দার্শনিক মন্তব্যও করেছেন। তার সাহিত্য অনুভূতি প্রকাশ করতে বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমি যেন একটি শূন্য বগি বহন করে চলছি। কিন্তু এখন মনে হয়, সেই শূন্য বগিটি ভরাট করা শুরু করেছি। আর তাই একে জোর করে ধরতে হবে।’
তাই স্বভাবতই সমালোচকরা প্রশ্ন করেন, এ শূন্য বগিতে কি লর্ড বেরন, কোলরিজ, চার্লস ডিকেন্স ও অন্য ইংরেজ কবিদের মাধ্যমে পূর্ণ। তার নান্দনিক চিত্রকল্প কি ইংরেজ কবিতা থেকে শুরু করে মার্লোন ব্রান্ডো পর্যন্ত বিস্তৃত? নোবেল পদককে শুভেচ্ছা জানিয়ে অনেকে বলেছেন, যারা মনে করেন শুধু কাগজে লিখিত শব্দই সাহিত্য হতে পারে, তারা আসলে অনেকটা পুরনো ধ্যানধারণা দ্বারা আক্রান্ত। এটা এমন সময়, যেখানে গতানুগতিক কবিতা লেখা হ্রাস পেয়েছে। যেখানে মৌখিক চটকদার লেখা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ কবিতা কানে শোনা ও চোখে দেখার জন্য লেখা হচ্ছে, যা আবার গলার সুর হয়ে কবিতায় রূপ পাচ্ছে এবং প্রচুর পরিমাণে তরুণ প্রজন্ম তা শুনছে ও গাচ্ছে তাদের গানে। আর এ গানকে বর্তমানে র‌্যাপ সংগীত বলা হয়। বব ডিলানের কৃতিত্ব এক্ষেত্রে অপরিসীম। কারণ কোনো গীতিকার-কবি ও গায়ক গেল অর্ধশতাব্দী ধরে তার গানের মাধ্যমে এত বড় প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেননি। বিশেষ করে যখন ৬০’র দশকের প্রত্যেক জনপ্রিয় গায়কই প্রায় অচল হয়ে পড়েছেন; কিন্তু বব ডিলান এখনও অমলিন। সাহিত্যে বর্তমান সময়ে মৌলিক অবস্থান সম্পর্কে কোনো কবিই তেমন সচেতন নন এবং নিজের সাহিত্যকর্ম জনপ্রিয় করতে আগ্রহীও নন। অথচ শুধু জনপ্রিয়তার কারণে বব ডিলানের ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত রেকর্ডিং দ্য কমপ্লিট বেসমেন্ট ট্যাপ ৩০টি গান নিয়ে নভেম্বরে আবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, বব ডিলান কি স্টকহোমের নোবেল প্রাপ্তির জন্য আদর্শ সাহিত্যকর্ম রচনা করতে পেরেছেন? কারণ গেল বছর তো আমরা নোবেল দেয়ার বদলে এক ধরনের ভূরাজনৈতিক শক্তির মহড়া দেখলাম। কিন্তু বব ডিলান তার ব্যতিক্রমই বলা যায়। কারণ তিনি আমেরিকার লোকসংগীত, রক, গসেপল ও গ্রামীণ লোকগাঁথা নিয়ে তার জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজেকে নৈরাশ্যবাদী গানের প্রতিবিম্ব বলে দাবি করেন, যাতে সব সময় প্রবহমানতা থাকে, থাকে যাযাবর জীবনের অনন্ত চলাচলের হাতছানি।
তারপরও নোবেল পুরস্কার তেমন বিখ্যাত কাউকে না দিয়ে গেল কয়েক দশকের রেকর্ড ভাঙার বিষয়টি অবাক করার মতো। কারণ এখানকার একাডেমিক বিচারকরা ব্যতিক্রমী কাউকে পুরস্কার দিতে অনিচ্ছুক, যেখানে ইউরোপিয়ান লেখকরা অতিমাত্রায় বিখ্যাত হওয়ার সুযোগ রাখেন। শুধু জনপ্রিয়তাকে বিবেচনা করে একজন প্রকৃত প্রতিযোগীকে বাদ দেয়া উচিত নয়। শুধু পপ সেলিব্রেটি হয়ে বিখ্যাত হতে চাইলে নিশ্চয় বব ডিলান সবার মতো গান করতেন র‌্যাপ সং। আমেরিকার লোকসংগীত পুনরুজ্জীবনে এত বড় ভূমিকা রাখতেন। অথবা অন্য লেখকদের মতো বাজার আকৃষ্ট করার জন্য লিখে যেতেন। আর তাই বব ডিলান শুধু নিজের জন্যই লেখেন। এ কারণেই ডিলান আমেরিকান একজন প্রখ্যাত কবি ও গায়ক হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি হলেন আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লিটারেচারের একমাত্র রকস্টার গায়ক। এ কারণেই তিনি প্রকৃত গীতিকবিতাই গাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন সব সময়। তার সহুজে নরম গানগুলো আসলেই মুগ্ধকর। গানগুলোর লিরিক্সও সহজেই বোঝা যায়। তিনি তো মূলত কবিতাই লিখেছেন, পরে সেটাকে সুর দিয়ে পরিবেশন করা হলে তাকে গান বলে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। লিরিক্সও একটা শিল্প এবং সেটা অবশ্যই সাহিত্যের অংশ। লিরিক্সকে নিয়ে সেভাবে ভাবিনা বলে আমরা এত কথা বলছি। এটা অবশ্যই আমাদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করলেও ডিলান যদি প্রথমত একজন লেখক হতেন, তবে এ প্রশ্নগুলো আসত না। তিনি ৫০’র দশক থেকেই ইংরেজি গানে নতুন স্টাইলের জন্য বহুল পরিচিত এবং বিশ্বব্যাপী প্রচুর জনপ্রিয়। তার বয়স এখন ৭৫ আর সুইডিশ একাডেমির হাতে হয়তো এত বেশিও সময় ছিল না যে, তারা এ কবিকে স্বীকৃতি দিতে আরও একটু সময় নেবে। আর তারা যদি আরও বিলম্ব করত, তবে এ সাংস্কৃতিক বিপ্লবী হয়তো আর পৃথিবীতে থাকতেনও না।
১৯৪১ সালের ২৪ মে মিনেসোটার ডুলুথে এক ইহুদি পরিবারে রবার্ট অ্যালেন জিমারের জন্ম। পরে ইংরেজ কবি ডিলেন টমাসের নাম থেকে বব ডিলান নাম নেন। তার সংগীত ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে মিনেসোটার এক কফি হাউসে। এ শিল্পী গীতিকার খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছান গেল শতকের ৬০’র দশকে। হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা হয়ে ওঠে তার ট্রেডমার্ক। সে সময় তার ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ আর ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চ্যাঞ্জিং’ এর মতো গানগুলো পরিণত হয়েছিল যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের গণসংগীতে।
কিন্তু অ্যানা নর্থ নিউইর্য়ক টাইমসে তিক্ত সত্য বলেন, রক অ্যান্ড রোল সংগীতকে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি আরও পুরস্কার পেতে পারেন। কিন্তু সাহিত্যে নোবেল পেতে পারেন না। কারণ গেল বছর একজন রিপোর্টার ও এ বছর একজন গায়ককে দিয়ে নোবেল জুরি বোর্ড প্রমাণ করল তারা আর কোনো কবি বা লেখককে নোবেল দিতে চান না। এতে সন্দেহ নেই, ডিলান একজন মেধাবী গীতিকার। হ্যাঁ তিনি কবিতার বই ও আত্মজীবনীও লিখেছেন। তিনি মহৎ, কারণ একজন গায়ক হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য। যার হাত দিয়ে গড়ে উঠেছে বিটলসের মতো ব্যান্ড দল। কিন্তু তাকে পুরস্কার দিয়ে সত্যিকারার্থে একজন লেখককে অপমান করা হলো। যেহেতু বর্তমান সময়ে পঠন ও পাঠন হ্রাস পাচ্ছে, তাই নোবেল পুরস্কার সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ পুরস্কারটি ঘোষিত হওয়ার পরপরই লেখকের পাঠক ও বই বিক্রি বেড়ে যায়। এতে কবি ও লেখক পান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আর এ প্রেক্ষাপটে একজন গানের আইকনকে পছন্দ করে একটি সাংস্কৃতিক বাণিজ্যের পথ খুলল নোবেল জুরি বোর্ড, যাতে তরুণ প্রজন্মকে সহজেই আকৃষ্ট করা যায়। এসব না করে তারা প্রকৃত জনপ্রিয় ও ভিন্নধর্মী সৃজনশীল একজন লেখককে পুরস্কার দিতে পারত। ডিলানকে নির্বাচিত করে সাহিত্যের আদর্শ মান ও স্তরকে দুর্বল করে ফেলল নোবেল জুরি বোর্ড। প্রতি বছর কোনো জনপ্রিয় লেখক তা পান না। আর নোবেল বর্তমানে এমন একটা ব্রান্ড হিসেবে পরিণত হয়েছে, যাকে সহজে সমালোচনা করা যায়, করা যায় হাস্যরসাত্মক বিষয়। একজন লেখককে না নির্বাচন করে, একজন স্টেজ পারফরমারকে পছন্দ করে জুরি বোর্ড প্রমাণ করল নোবেল সত্যি এখন বিতর্কিত বিষয়। তাই প্রশ্ন দাঁড়ায় বর্তমান নোবেল পুরস্কারের অর্থ কী? নিশ্চয় সাহিত্যে তা আমাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু তা আমাদের কোথায় ছেড়ে দিচ্ছে বা আমরা তার কাছ থেকে এখন কী পাচ্ছি? তাদের উচ্চ ও প্রতাপশালী অবস্থান কি কোথাও স্থায়ী মূল্য পাবে? না প্রতি বছর এ ধরনের হাস্যরসাত্মক বিষয়ে পরিণত হবে?
নোবেল জুরি বোর্ড পারত উন্নয়শীল দেশের কোনো সাহিত্যিক বা কবিকে পুরস্কার দিতে। কারণ বহু বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রতিনিধিত্বকারী কোনো নোবেল বিজেতাকে আমরা পাচ্ছি না, বরং তারা সাহিত্য ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে যে জনপ্রিয়, তাকেই পুরস্কার দিল। বব ডিলানের নোবেল পুরস্কারের প্রয়োজন নেই সাহিত্যে, বরং এ ক্রান্তিলগ্নে সাহিত্যকর্মের নিজেরই সাহিত্য পুরস্কার দরকার। আর এ বছর তা হয়নি নিশ্চিত। তবু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী একজন কেউ নোবেল পেলÑ এতেই আমরা আনন্দিত। হ


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত