সাঁতার

আমাদের বাড়ির সামনে অনেক বড় একটি পুকুর আছে। পুকুরের দুই পাড়ে নানা রকম গাছ। নারকেল, সুপারি, আম-জামসহ নানা রকম গাছে ভরপুর আমাদের পুকুর পাড়। পকুরে টলটলে পানি। সে পানিতে নানা রকম মাছ। মাছ ঘাই মারে। উপরে ভাসে। আবার ডুবে যায়। আমি মনে মনে ভাবিÑ মাছের কত সুখ। কত আনন্দ। দিনরাত পানির নিচে থাকে। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছেমতো খেলে। ইচ্ছেমতো ঘুমায়। ইচ্ছেমতো খায়। ইশ। আমি যদি মাছ হতে পারতাম।
মাছ হওয়ার লোভে, নাকি অন্য কারণ ঠিক জানি না, পানিকে আমি কখনোই ভয় পাইনি। ভয় পেলে তো আর সাঁতার শেখা হবে না। তাই ভয় পাওয়াও যাবে না। পানি আমাকে খুব টানে। আমি প্রায়ই একা নেমে যাই পুকুরে। আম্মা বকা দিয়ে আমাকে পানি থেকে টেনে তুলে আনে। বলে, দুপুরে গোসল করার সময় আমি তোমাকে পুকুরে নিয়ে যাব। সাঁতার শেখাব। সাঁতার না জানলে একা পনিতে নামা ঠিক না।
আম্মার কথা মতো আমিও আর একা পানিতে নামি না। কারণ আমি সাঁতার জানি না। অপেক্ষায় থাকি, কখন দুপুর হবে। কিন্তু আমার সকাল যেন আর দুপুর হতেই চায় না। ক্লাস ওয়ানে পড়ি। ওয়ানের ক্লাস আগেই ছুটি হয়। স্কুল থেকে দৌড়ে বাড়ি আসি। দেখি আম্মার হাতের কাজ শেষ হয়নি। অপেক্ষা করতে থাকি আম্মা কখন ফ্রি হবে। আমাকে নিয়ে যাবে পুকুরে।
আমি ছটফট করি। একবার বাইরে যাই। একবার ঘরে আসি। একবার পুকুর পাড়ে যাই। আবার ঘরে আসি। আম্মাকে তাড়া দিই।
আম্মা আমার অস্থিরতা দেখে মিটিমিটি হাসে।
আম্মা চলো।
এই তো দাঁড়া, তরকারিটা নামিয়ে ঘরটা ঝাড়– দেব। তারপর মা ছেলে একসঙ্গে পুকুরে যাব।
উফ! তাড়াতাড়ি কর।
তাড়াতাড়িই তো করছি বাবা।
আম্মা হাতের কাজ শেষ করে। জামাকাপড় আর সাবান হাতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে আমার সারা শরীর নেচে উঠে খুশিতে। মনে দুনিয়ার আনন্দ এসে ধরা দেয়। একবার আম্মার সামনে আরেকবার আম্মার পেছনে নেচে নেচে চলি। পুকুর পাড়ে জামাকাপড় রেখে ঘাটে নামি মা ও আমি। ঘাটে তখন আমার অন্য চাচিরা কিংবা চাচাতো ভাইবোনরাও থাকে। সবাই একসঙ্গে গোসল করি। মিলেমিশে এক ঘাটে গোসল করার মজাটাই আলাদা।

আম্মা নিজে কোমর পানিতে নামে। আমাকে টেনে নেয়। আমাকে উপুড় করে পেটে দুই হাত দিয়ে ধরে। পানিতে ভাসিয়ে রাখে। হাত-পা ছুড়তে বলে। আমি পুরো শক্তি দিয়ে পানিতে হাত-পা ছুড়ি। চারদিকে ছিটিয়ে পড়ে পানি। পানির ফোঁটাও আমার মতো খুশি হয়। অস্থির হয়ে ফোঁটাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় খুশিমতো। পানির ছিঁটা আমার ওপরও এসে পড়ে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এভাবে চলে কয়েকবার। আম্মা একসময় আমাকে সোজা করে ধরে। তারপর ঘাটের দিকে ঠেলে দেয়। আমি সাহস করে দুই হাত দুই পা ছুড়তে থাকি অনবরত। একসময় ঘাটের পাতায় পা ঠেকাই। অনেক খুশি লাগে। এ যেন অনেক বড় কিছু জিতে নেয়ার খুশি। তারপর ঘুরে আবার আম্মার দিকে সাঁতার দিই। আম্মা দুই হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরে। আবার ঘুরিয়ে দেয় ঘাটের দিকে। এভাবে অনেক্ষণ সাঁতার শেখা চলে।
সাঁতার শেখা শেষ হলে আম্মা সাবান মাখিয়ে আমাকে গোসল করায়। তারপর ঘাটের ওপর বসিয়ে রাখে। নিজের গোসল শেষ করে। একসাথে মা ছেলে ঘরে ফিরি।

এভাবে প্রতিদিন চলে আমার সাঁতার শেখা। সাঁতার শেখার সময় কোনো কোনো দিন আম্মা আমাকে ঘাট থেকে একটু দূরে নিয়ে যায়। হুট করে ছেড়ে দেয়। আমি সাহস করে হাত-পা ছুড়ে কোনোমতে ঘাটে উঠে আসি। সাঁতার শিখতে গেলে নাকে-মুখে পানি ঢুকবেই। মুখে পানি ঢুকলে পেটে যায়। সাঁতার শিখতে গিয়ে কত যে পানি খেয়েছি, তার হিসাব নেই। নাকে পানি ঢুকলে খুব খারাপ লাগে। কারণ নাক দিয়ে পানি ঢুকলে মাথার ভেতর কেমন জানি ঝিনঝিন করে। কেমন জানি লাগে। একদিন দুই দিন তিন দিন করে পুরোপুরি সাঁতার শিখে ফেলি আমি। আমার খুশি দেখে কে! তখন দুনিয়ার সবচেয়ে খুশি আর সুখী মানুষ আমি।

এখন আমি পুরো পুকুর সাঁতরে বেড়াই। মাঝে মাঝে কিছু সময় পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকি। নিজেকে মাছ মনে হয়। অনেক খুশি লাগে। পুকুরে সাঁতরে লাই খেলি। লাই হচ্ছে পানির একটি মজার খেলা। সাঁতার জানা কমপক্ষে দুইজন মিলে এ খেলাটি খেলতে হয়। কয়েকজন মিলেও খেলা যায়। ঘাট থেকে একজন ডাক নিয়ে একটু দূরে গিয়ে হাঁক দেয়। তখন বাকিরা তাকে ছুঁয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে ডাক নিয়ে গেছে, সে চেষ্টা করবে কেউ যেন তাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু তাকে যে প্রথমে ছুঁবে, ডাক চলে যাবে তার কাছে। বাকিরা এবার ওকে ফলো করবে। আবার ওকে অন্য কেউ ছুঁয়ে পালিয়ে গেলে সবাই আবার পালানোকে ফলো করবে। ডাক যার কাছে থাকে, সে না ছুঁয়া অবস্থায় ঘাটে পৌঁছুতে পারলে জয়ী হয়। বাকিরা হয় পরাজিত। এ বড়ই মজার খেলা। লাই খেলতে গিয়েও নাকে, মুখে, কানে পানি ঢুকে। কানে পানি ঢুকলে কান তালি লেগে যায়। কানে ঢোকা পানি সহজে বেরও করা যায়। যে কানে পানি ঢুকেছে, সেই কানে আরও পানি দিয়ে ভরে নিতে হয়। সেই পানি কয়েক সেকেন্ড রেখে কান কাত করলে সব পানি বের হয়ে যায়। এ আরেক মজার অভিজ্ঞতা। তবে লাই খেলার মজার কাছে এসব কিছুই না। সাঁতার না শেখা হলে জীবনের আসল মজাটাই পাওয়া হতো না।


ভাইয়ের ভালোবাসা
রুহানকে ভাইয়ের ভালোবাসা বোঝানোর জন্যই মামার এই কৌশল। এ কথা
বিস্তারিত
শরৎ সাজ
শরৎ সাজ পাই খুঁজে আজ শিউলি ফোটা ভোরে পল্লী গাঁয়ের মাঠে
বিস্তারিত
মশারাজ্যে
প্যাঁপো লাফাতে লাফাতে বলল, ‘আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, আপনি বিদেশি
বিস্তারিত
আবার শরৎ এলো
নদীর ধারে শাদা ফুলের দোলা,
বিস্তারিত
জাতীয় কবি
ছোট্টবেলায় বাবা মারা যান অসহায় হন ‘দুখু’ সংসারে তার হাল ধরা
বিস্তারিত
বিদ্রোহী নজরুল
চুরুলিয়ার সেই ছেলে তুমি  কবিতার নজরুল, রণাঙ্গনের বীর সৈনিক প্রাণেরই বুলবুল। কেঁদেছো তুমি দুখীর
বিস্তারিত