আলোকিত মানুষ গড়তে প্রয়োজন ‘সুশিক্ষা’

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে রাসুল!) পড়–ন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক : ১)। শিক্ষা হলো একটি উৎকৃষ্টমানের  জাতি গঠনের মৌলিক উপাদান। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘Education is the backbone of a nation’, অর্থাৎ শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। মেরুদ- যেমন কোনো প্রাণীকে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে, তেমনি শিক্ষার আলো একটি জাতিকে অন্ধকারে পথ দেখিয়ে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রাখে। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিতে এবং পারে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে।
শিক্ষা সবার জন্যই অপরিহার্য। উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে কথা হলো, কেবল শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজ থেকে সব পাপ-পঙ্কিলতা বিদূরিত হয় না, গঠিতও হয় না একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। যদি তার মাঝে না থাকে সুশিক্ষার আলো। তাই পরিপূর্ণ আলোকিত মানুষ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, জঙ্গিমুক্ত শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র ও নৈতিক আদর্শবান জাতি গড়তে কেবল শিক্ষাই নয়, প্রয়োজন সুশিক্ষা অর্জন। এ জন্য সুশিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তা সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে আলোচনা, অর্জন এবং সে অনুযায়ী সব কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্ববহ বলে আমরা মনে করি।
সুশিক্ষা কী? সুশিক্ষা হলো অর্জিত জ্ঞানকে যথাযথ আদর্শায়ন করা। অর্থাৎ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্জিত শিক্ষার প্রয়োগগত আদর্শ দিকই হলো সুশিক্ষা। যে শিক্ষার আলোয় হৃদয়লোককে করে উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত ও জ্ঞানসমৃদ্ধ। সে শিক্ষা সমাজ ও জাতি গঠনে সুপরিকল্পিতভাবে সব মঙ্গলময় চেতনায় উদ্ভাসিত জগৎ সৃষ্টি করে। আর এটাই হলো শিক্ষার প্রয়োগগত দিক। আর প্রয়োগগত দিকগুলোর ভিত্তিতেই শিক্ষা ‘সুশিক্ষা’ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।
কারণ, শিক্ষা আর সুশিক্ষা সম্পূর্ণ আলাদা মান ও ধ্যান-ধারণার। পুষ্পকুঞ্জের মৌসমৃদ্ধ রাশি রাশি একই ফুল থেকে মৌমাছি শোষণ করে মধু, আর ভ্রমর গ্রহণ করে বিষ। আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, এটিই মহান আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব সৃষ্টিশীলতা। এক্ষেত্রে শিক্ষাকে যদি আমরা ফুল মনে করি, তবে ভ্রমর ও মৌমাছি হলো এর দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতা। ফুল থেকে বিষ কিংবা মধু গ্রহণ করার দৃশ্যত পার্থক্যই আমাদের শিক্ষা আর সুশিক্ষার ভিন্নতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়।
আল্লাহপাক পবিত্র কোরআন নাজিল শুরু করেন সূরা আলাকের শিক্ষাবিষয়ক প্রথম পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমে। মহান আল্লাহপাক এরশাদ করেন, ‘যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’ (সূরা আলাক : ৪-৫)। তাই বলা যায়, কোরআনের শিক্ষাই হলো প্রকৃত শিক্ষা তথা সুশিক্ষা। সুশিক্ষা আলোর সমতুল্য। সূর্য যেমন পৃথিবীকে আলোকিত করে, উপযুক্ত শিক্ষাও তেমনি মানুষের মনোজগতের অন্ধকার বিদূরিত করে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে আমরণ। সূর্যের যেমন কোনো বিকল্প নেই, সুশিক্ষা ছাড়া অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কোনো ব্যক্তি সামনে এসে দাঁড়ালে ত্রাসে হৃদয় প্রকম্পিত হয়, তার হুংকারে সব ল-ভ- হয়ে যায়, কিন্তু সুশিক্ষায় আলোকিত কোনো ব্যক্তির সামনে আপনাতেই বিমুগ্ধ শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।
সভ্যতার এই উৎকর্ষণ মানবজাতির বিশুদ্ধ ভাবনার উন্মুক্ত ফসল। জীবনযাত্রার ধাপ পরিক্রমায় এই উন্নতি বা অগ্রগতি; জীবন জিজ্ঞাসার কাছে অত্যাবশ্যকীয়, যা যুগ যুগ ধরে সমাজ-সভ্যতাকে প্রভাবিত করছে। মান, সময় ও নিরাপত্তা এ তিনটি শব্দই জীবনচক্রকে আবর্তিত করছে বিধায়, পরিশোধিত চিন্তার অধিকারী মানুষকে এ ‘চক্রাকার আবর্তন, ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। জীবনচক্রের এ অন্তহীন পথে, সুশিক্ষাই মানবমুক্তির একমাত্র পাথেয়; যা দেশ, কাল, জাতি ও মহাকালের সাক্ষী।
একজন মানুষ যদি কেবল শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা গ্রহণ করে; তাহলে তার মেধার পরিপূর্ণ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হবে তার মানসিক শক্তির। গড়ে উঠবে একজন নৈতিক চরিত্রবান, আদর্শিক, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে। মৌলিক অধিকারের প্রতি সচেতন থেকে মানবাধিকারের প্রতি হবে শ্রদ্ধাশীল। পিতা-মাতা, গুণীজন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হবে। নিজস্ব মূল্যবোধের পাশাপাশি মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি জন্মাবে গভীর প্রেম এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা। শান্তি, সমৃদ্ধি, সমঝোতা, সহিষ্ণুতায় হবে অনন্য। জীব-প্রকৃতির প্রতি হবে দয়াশীল। অপরাপর সভ্যতার প্রতিও হবে শ্রদ্ধাশীল।
সুশিক্ষা অর্জনের ফলে তা মানুষের মনকে সব ধরনের কলুষ থেকে মুক্ত করবে, মানসিক রোগের জীবাণু বিনষ্ট করে দেবে এবং মানবতার সব দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনা ও লুণ্ঠন বন্ধ করে দেবে; সেই সঙ্গে তা মানবীয় প্রয়োজন পূরণার্থে প্রাকৃতিক উপায়-উপকরণ পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করার, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খোরাক-পোশাক ও বাসস্থানের ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের ব্যবস্থা করার, সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ঝড়-তুফান ও বন্যা-প্লাবনের মাত্রা ক্রমাগত হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ-ফুর্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করার যোগ্য হবে।
মোদ্দাকথা হলো, শুধু জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে শিক্ষিত ভেবে উন্নত শিরে দাঁড়াবার কোনো উপায় নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সভ্য জাতি গঠনে স্বীয় মেধার সঠিক ব্যবহারে শিক্ষাকে সুশিক্ষায় পরিণত করার প্রয়াসে উদ্বুদ্ধ না হবে, ততক্ষণ তো জাতির জন্য মহা অমাবস্যা অপেক্ষমাণ।
তাই আসুন, কেবল শিক্ষা নয় সুশিক্ষা অর্জন করি। আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মানবাত্মাকে পরিশোধিত করি। আলোকবর্তিকা হয়ে দূর করি অমানিশার সব ঘোর অন্ধকার। আলোকোজ্জ্বল করে গড়ে তুলি পরিবার, সমাজ ও দেশ। এতে আলোকময় হোক সারা জগৎ।
লেখক : গবেষক
আল্লামা রুমি সোসাইটি, ঢাকা


পরস্পর দয়া প্রদর্শনে উপদেশ দিন
উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজির মেয়ে
বিস্তারিত
যিনি ধনীদের মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে
আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এর স্মৃতি জর্দানের রাজধানী আম্মানের উত্তরের
বিস্তারিত
কীভাবে বুঝবেন আল্লাহ আপনার প্রতি
আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ের একান্ত চাওয়া। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন
বিস্তারিত
আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত মাছ
প্রকৃতিজুড়ে এখন চলছে হেমন্তের রাজত্ব। নতুন ধানের নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি
বিস্তারিত
রূপে ভরা হেমন্ত
প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে হেমন্ত। শিশির বিন্দু
বিস্তারিত
প্রাণীবন্ধু গাসসান রিফায়ি
টানা ৩০ বছর বাইতুল মুকাদ্দাস চত্বরের বিড়াল ও পাখিদের খাবার
বিস্তারিত