শীতের সওগাত

শীতকাল সমাগত। শীতকালকে ঘিরে আবহমানকাল থেকে চলে আসা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ইসলামী সম্মেলন তথা দ্বীনি মাহফিল। ব্যাপক হারে দিন দিন বেড়েই চলছে তার পরিধি। কী শহর কী গ্রাম প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় আয়োজন করা হয় দ্বীনি মাহফিল। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার মাহফিলের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে বাংলার আকাশে-বাতাসে। দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ নয়, মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের কাছে উপস্থাপন করে তদনুযায়ী চলতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। মানুষকে বিশুদ্ধ ঈমান-আকিদা, ধর্ম-কর্ম, লেনদেন, সামাজিকতা, চরিত্র ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া। 
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী আপনি মানুষকে উপদেশ প্রদান করুন, ফলে উপদেশ উপকারে আসবে।’ (সূরা আলা : ৯)। ‘যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কোরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন।’ (সূরা কফ : ৪৫)। ‘আপনি নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করুন।’ (সূরা শুআরা : ২১৪)। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সঙ্গে ব্যবহার করি। সে যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তার সঙ্গে থাকি। সে যদি মনে মনে আমাকে স্মরণ করে আমি মনে মনে তাকে স্মরণ করি। সে যদি কোনো মাহফিলে আমাকে স্মরণ করে আমি তার থেকে উত্তম মাহফিলে (তথা ফেরেশতাদের মাহফিলে) তাদের কথা স্মরণ করি।’ (মুসলিম : ২৬৭৯)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোন গোত্রের লোক একত্রে বসে আল্লাহর স্মরণ করলে ফেরেশতারা সেই মাহফিলকে ঘিরে ধরে। তাদের ওপর রহমত ও সকিনা বর্ষিত হয়। আল্লাহ ফেরেশতাদের কাছে তাদের নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন।’ (মুসলিম : ২৭)।  
বোখারিতে এসেছে, রাসুল (সা.) একদিন ওয়াজ করছিলেন,  এমন সময় তিন ব্যক্তির আগমন ঘটল। প্রথম ব্যক্তি মজলিশের একটি ফাঁকা জায়গায় বসে গেল। দ্বিতীয় ব্যক্তি পেছনে বসে গেল। তৃতীয় ব্যক্তি চলে গেল। মজলিশ শেষে রাসুল (সা.) বললেন, তিন ব্যক্তির ব্যাপারে কি তোমাদের বলব? প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছে, আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি চলে যেতে লজ্জা করেছে, আল্লাহও তাকে রহমত থেকে দূরে রাখতে লজ্জাবোধ করলেন, তাদের ক্ষমা করে দেয়া হলো। তৃতীয় ব্যক্তি বিমুখ হয়েছে আল্লাহও তার থেকে বিমুখ হয়েছেন। (বোখারি : ৬৭)।

ওয়াজকারী যেমন হওয়া কাম্য 
যিনি ওয়াজ করেন তাকে ওয়েজ বা বক্তা বলে। তার জন্য কিছু অপরিহার্য গুণ নিম্নে তুলে ধরা হলোÑ
(ক) সঠিক কথা বলা : কোরআন ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে নসিহত করা এবং তার আলোকেই কুফর, শিরক ও বেদআতসহ সমসাময়িক বিষয়ের সমাধান বিষয়ে জোরালো নির্দেশ প্রদান করতে হবে। যেমন- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার করুণ পরিণতি, মানুষে মানুষে হানাহানি ও রক্তপাত বন্ধ, বর্ণবৈষম্যের ভয়াবহতা, স্বজনপ্রীতির বিরূপ প্রভাব, সুদ-ঘুষের কুফল, পর্দাহীনতার ক্ষতি এবং যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদি বিষয়। কথা বলতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষায়। এ ক্ষেত্রে কোনো আঞ্চলিকতা বা ভাষার দুর্বলতা কাম্য নয়। কেননা রাসুল (সা.) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নসিহত পেশ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলের ভাষা ছিল স্পষ্ট। (তোমাদের মতো তাড়াহুড়া করে অস্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন না)। তাঁর শব্দমালা ছিল আলাদা আলাদা। যে কেউ তাঁর মাহফিলে বসতো অনায়াসেই। সে তাঁর বাণীগুলো মুখস্থ করতে পারত। (শামায়েলে তিরমিজি : ২২৪)। 
(খ) গুরুত্বর্পূণ কথার পুনরাবৃত্তি করা : বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা হলে তিনবার বলা সুন্নত। যাতে কথাটি সবার বোধগম্য হয় এবং সবাই তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) গুরুত্বপূর্ণ কথা পুনরাবৃত্তি করতেন এবং দুইবার বা তিনবার করে বলতেন। 
(গ) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কথা বলা : অনেক বক্তা লৌকিকতা করে সুর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আজগুবি গল্প-কৌতুক বলে মানুষের সস্তা মনোতুষ্টি পাওয়ার চেষ্টা করেন। তারা কোরআন-সুন্নাহর  চেয়ে এগুলোর প্রতিই বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এটা নিন্দনীয় প্রবণতা। এক্ষেত্রে মুফতিয়ে আজম মুফতি ফয়জুল্লাহ (রহ.) এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘যে ওয়াজে কোরআন-সুন্নাহর আলোচনা যত বেশি হবে তাতে ফায়দাও তত বেশি হবে। এর যত বিপরীত হবে ফায়দাও ততো কম হবে।’ 
(ঘ) ওয়াজের উদ্দেশ্য উপার্জন নয় : ওয়াজ করতে হবে পার্থিব কোনো লোভ-লালসা বা কামনা-বাসনার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে আল্লাহর খালেস সন্তুষ্টির নিমিত্তে। টাকা বা হাদিয়ার জন্য ওয়াজ করা যাবে না। অন্যথায় তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো ফায়দা হয় না। আর এটা সরাসরি নবীদের কর্মপন্থারও বিরুদ্ধে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী, আপনি বলে দিন) আমি তোমাদের কাছে ওয়াজের কোনো বিনিময় কামনা করি না।’ (সূরা ইউসুফ : ১০৪)। ‘তোমরা তাদের অনুসরণ কর যারা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান কামনা করে না, অথচ তারা সঠিক পথপ্রাপ্ত।’ (সূরা ইয়াসিন : ২১)। 

শ্রোতাদের কাছে কাম্য 
যারা ওয়াজ শোনেন তাদের শ্রোতা বা দর্শক বলে। তাদেরও কিছু বিষয় লক্ষ রাখা একান্ত কর্তব্য। যেমনÑ 
(ক) মনোযোগের সঙ্গে ওয়াজ শোনা : বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে এবং অন্যের কাছে পৌঁছাতে হবে সেই নিয়তে ওয়াজ শুনতে হবে। চোখ বন্ধ রাখা বা এদিক-সেদিক উকিঝুঁকি মারা আদবের পরিপন্থী। শ্রোতাদের অমনোযোগিতার ফলে বক্তারও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে এবং অন্যমনস্কভাব চলে আসে। 
(খ) একদম চুপ না থাকা : মুখ বন্ধ করে একদম চুপ থেকে ওয়াজ শোনা ঠিক নয়। বরং আশ্চর্যের বিষয় শুনলে সুবহানাল্লাহ, খুশির সংবাদ শুনলে আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর বড়ত্বের বাণী উচ্চারিত হলে আল্লাহু আকবার বলা উচিত। এতে করে শ্রোতা যেমন মনে প্রশান্তি পায় তেমনি বক্তাও বয়ানের প্রতি আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। 
(গ) ফাঁকা না রাখা : মজলিশের কোনো খানে ফাঁকা রাখা ঠিক নয়। এতে করে শয়তান সেখানে বসে উৎপাত শুরু করে এবং মানুষকে বিভিন্ন ধরনের ওয়াসওসা দিতে থাকে, ফলে সামান্য একটি বাহানার কথা স্মরণ করিয়ে মজলিশ থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এজন্য যতটা সম্ভব গায়ের সঙ্গে গা মিলিয়ে বসতে হবে। 
আয়োজক কমিটির কাছে কাম্য  
আয়োজক কমিটির সদস্যদের দ্বীনদার হওয়া জরুরি। তাদের পাক্কা নামাজি, পরহেজগার ও সুন্নতের পাবন্দ হতে হবে। তাদের মধ্যে সুন্নতি জিন্দেগির অনুশীলন না থাকলে মানুষ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে চায় না। সাহায্য-সহযোগিতা করতেও অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। তাই আয়োজক বা এন্তেজামিয়া কমিটির সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। ওয়াজ মাহফিলের দায়িত্ব যারা পালন করেন নিঃসন্দেহে তারা অনেক কল্যাণের অধিকারী হন। আল্লাহর রহমতের ছায়ায় তারা আশ্রয় নেন। করুণাময়ের বিশেষ করুণায় সিক্ত হন।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্মে ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা প্রশ্রয় দিও না।’ (সূরা মায়েদা : ২)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় সৎকর্মের আহ্বানকারী তা সম্পাদনকারীর ন্যায় (সওয়াবের অধিকারী হয়)।’ (তিরমিজি : ২৬৭০)। 

মাহফিল সফল করতে কমিটিকে যা করতে হবে 
(ক) আল্লাহওয়ালা বক্তা নির্বাচন : বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হবে। যে ব্যক্তি লৌকিকতা করে কণ্ঠ ও সুর দেয় এবং কোরআন-হাদিসের চেয়ে অলীক ও অবাস্তব গল্প-গুজবে মত্ত থাকেÑ এরূপ বক্তা কখনোই নির্বাচন করা যাবে না। এক্ষেত্রে সহিহ ঈমান ও আমলের অধিকারী অধিক খোদাভীরু এবং আল্লাহর এশক ও মহব্বতে বিগলিত আত্মার অধিকারী ব্যক্তিকে দাওয়াত দিতে হবে। কারণ বক্তা যদি নিজেই উপরোক্ত যোগ্যতার অধিকারী না হন তবে শ্রোতাকে কীভাবে কোরআন সুন্নাহর আলোকে চলতে উদ্বুদ্ধ করবেন। 
(খ) ব্যাপক হারে দাওয়াত প্রদান : এলাকার মধ্যে যেন একটি দ্বীনি পরিবেশ কায়েম হয়, দ্বীনি মাহফিলের ফয়েজ ও বরকত সবাই হাসিল করতে পারে তার জন্য সম্ভব সব মাধ্যম কাজে লাগিয়ে বাড়ি বাড়ি ও দোকানপাটে গিয়ে ব্যাপক হারে মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। মানুষকে দ্বীনি মাহফিলের ফজিলত, মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝাতে হবে। এক্ষেত্রে কোরআনের আয়াত ও রাসুলের মুখ নিসৃত বাণী (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে) আমাদের উত্তম পাথেয় হবে। 
(গ) উত্তম স্থান নির্ধারণ : মাহফিলের মাঠ যেন সুন্দর ও মনোরম হয় এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মসজিদ সংলগ্ন মাঠ বা ঈদগাহ মাঠ সর্বোত্তম স্থান হবে। যেসব মাঠে অনৈসলামিক কর্মকা- হয় সেগুলো মাঠে না করাই উচিত। 

আয়োজক কমিটিকে যা থেকে বিরত থাকতে হবে  
(ক) স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান সংগ্রহ : মাহফিল আয়োজনের জন্য টাকা সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে চেষ্টা করতে হবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের প্রদত্ত হালাল অনুদান ও সহযোগিতা গ্রহণ করতে। 
(খ) প্রয়োজনের বেশি সজ্জা ও মাইক ব্যবহার না করা : কিছু মাহফিলে দেখা যায়, প্রচুর পরিমাণে আলোকসজ্জা ও উন্নত গেট তৈরি করা হয় যে, তা ওয়াজ নাকি বিয়ের আয়োজন বোঝা যায় না। এটা অপচয়ের শামিল আর অপচয়কারীদের আল্লাহ তিরস্কার করেছেন। বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৭)। এলাকার মধ্যে অনেক অসুস্থ, রুগ্্ণ ও বৃদ্ধ লোক থাকেন তাদের দিকে লক্ষ রেখে অধিক পরিমাণে মাইক ব্যবহার ও দীর্ঘ রাত পর্যন্ত বয়ান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। 
(গ) অতিথি ও সভাপতি নির্ধারণ : অধিক সম্মান পাওয়ার আশায় যাকে তাকে অতিথি ও সভাপতি নির্ধারণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে করে মাহফিলে আগত অনেকে বিব্রত বোধ করেন। 

লেখক : ইমাম, মাস্টারপাড়া জামে মসজিদ, গাইবান্ধা


ইরাকিদের তাড়িয়ে ফিরছে দারিদ্র্য
  ইরাকের জনগণের একটি বড় অংশ সুস্পষ্ট জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির অভাবে
বিস্তারিত
কী হতে পারে সৌদি যুবরাজের
‘মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ মনে করে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন
বিস্তারিত
উগান্ডায় কোরআন শিক্ষা সেন্টার
  উগান্ডায় অবস্থিত কোরআনিক সেন্টার ইমাম সাদিক কমপ্লেক্সে ৩০০ খ- ধর্মীয়
বিস্তারিত
তুরস্কের মসজিদে বেহেশতের আবহ!
তুরস্কের কিরশেহির প্রদেশে হামিদিয়ে কামি মসজিদ নামে একটি মসজিদ তৈরি
বিস্তারিত
ট্রাম্প ও শরণার্থীরা
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক আরবি-ইংরেজি গণমাধ্যম অ্যারাব নিউজে সম্প্রতি প্রকাশিত ক্যারিকেচারটি  অঙ্কন
বিস্তারিত
মহান আদর্শের মহানায়ক
  মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ছিলেন সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য এক
বিস্তারিত