পা মোজায় মাসেহর বিধান

হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘আমি ৭০ জনের মতো এমন সাহাবিকে পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকেই মোজার ওপর মাসেহর পক্ষে হাদিস বর্ণনা করেছেন।’

শীত মৌসুমে সাধারণত আমরা শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পায়ে মোজা পরি। এতে অজুর সময় মোজা খোলা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকেই অজুর সময় পা ধোয়ার পরিবর্তে মোজা না খুলে মোজার ওপর মাসেহ করে থাকেন। এটি শরিয়তসম্মত একটি বিধান। বস্তুত মোজার ওপর মাসেহর বিধান মহান আল্লাহর একটি বড় অনুগ্রহ, যা কোনো উম্মতের ভাগ্যে মেলেনি। কেননা পবিত্র কোরআনে বিধৃত হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের পছন্দ করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।’ (সূরা হজ : ৭৮)।
মোজার ওপর মাসেহর বৈধতা : মোজার ওপর মাসেহর অনুমোদন যদিও কোরআনে সুস্পষ্ট নেই; তবে এটি রাসুল (সা.) এর উক্তি ও আমল দ্বারা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত। এ প্রসঙ্গে আবু বকর, ওমর ও আলী (রা.)সহ বহু সাহাবায়ে কেরাম বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুকিম ব্যক্তি একদিন এক রাত এবং মুসাফির তিন দিন তিন রাত মোজার ওপর মাসেহ করবে।’ (বোখারি : ১/৫৮)।
অন্যত্র জারির ইবনে বাজালি (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে অজু করতে দেখেছি এবং তিনি মোজার ওপর মাসেহ করেছেন।’ (মুসনাদ আহমদ : ৪/৩৫৮)। অপর এক হাদিসে মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মোজাদ্বয়ের ওপর মাসেহ করলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি পা ধৌত করতে বিস্মৃত? রাসুল (সা.) বললেন, বরং তুমিই এ বিষয়ে ভুল করছ, কেননা আমাকে এরূপ করতে আমার মহীয়ান ও গরীয়ান প্রতিপালক আদেশ করেছেন।’ (আবু দাউদ : ১/২১)। 
এ প্রসঙ্গে হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘আমি ৭০ জনের মতো এমন সাহাবিকে পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকেই মোজার ওপর মাসেহর পক্ষে হাদিস বর্ণনা করেছেন।’ (বাদায়িউস সানায়ে : ১/৭৭)। একদা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পরিচয় হচ্ছে, শায়খাইন তথা আবু বকর এবং ওমর (রা.) কে সব সাহাবির তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করা, খাতানাইন তথা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দুই জামাতাকে ভালোবাসা আর মোজার ওপর মাসাহকে বৈধ মনে করা।’ (মাআরিফুস সুনান : ১/৩৩)।
উপর্যুক্ত বর্ণনাগুলো থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মোজার ওপর মাসেহর বিধান নিঃসন্দেহে বৈধ।
কেমন মোজার ওপর মাসেহ বৈধ : মোজা কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। কিছু রয়েছে সম্পূর্ণই চামড়ায় প্রস্তুত। আবার কিছু সুতা বা পশমের তৈরি। যদি এ ধরনের মোজার ওপরে ও নিচের অংশে অথবা শুধু নিচের অংশে চামড়া লাগানো থাকে, তাহলে এ জাতীয় সব মোজার ওপরে মাসেহ করা জায়েজ। এতে সব ফুকাহায়ে কেরাম একমত। 
যদি সুতি বা পশমের তৈরি মোজা এমন হয়, এর ওপর বা নিচ কোনো অংশেই চামড়া লাগানো নেই, এ জাতীয় মোজা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের মোজা আছে, যা অত্যন্ত পাতলা। এ ধরনের পরিহিত মোজার ওপরে পানি প্রবাহিত করা হলে, পানি চরণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আবার এগুলো বাঁধাই ব্যতিরেকে চরণে লেগে থাকে না। এছাড়া এমন মোজা পরিধান করে এক মাইল দূরত্ব পর্যন্ত চলাচল সম্ভব হয় না; বরং চলাচলে মোজা ফেটে যায়। সর্বসম্মতিক্রমে এরূপ মোজার ওপর মাসেহ বৈধ নয়।
দ্বিতীয় ধরনের মোজা, যা মজবুত ও মোটা। যদি এ ধরনের মোজায় নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে, এ ধরনের মোজার ওপর মাসেহ বৈধ। শর্তগুলোÑ ১. মোজার ওপরে পানি প্রবাহিত করলে পায়ের চামড়ায় পানি পৌঁছে না। ২. উভয় মোজা কোনো মাধ্যম ব্যতীত পায়ে লেগে থাকে। ৩. শুধু এ ধরনের মোজা পরিধান করে এক মাইল পর্যন্ত চলাচল সম্ভব হয়। (বাদায়েউস সানায়ে : ১/৮৩)।
মাসেহ বৈধ হওয়ার শর্তগুলো : ১. পানি দ্বারা অজু অর্জনপূর্বক মোজাদ্বয় পরিধান করা। ২. উভয় মোজা দুই পায়ের গোড়ালি অবধি আবৃত করে রাখা। ৩. মোজা এমন মজবুত হওয়া, যা পায়ে দিয়ে কমপক্ষে তিন মাইল চলাচল সম্ভব হয়। ৪. মোজাদ্বয়ের প্রতিটি পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলের সমপরিমাণ তিন আঙুল পরিমাণ ফাটা থেকে মুক্ত থাকা। ৫. বাঁধানো ব্যতীত পায়ে মোজাদ্বয় আবদ্ধ থাকা। ৬. মোজাদ্বয় এমন হওয়া, যেন ভেতরে পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়। ৭. হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের সমপরিমাণ তিন আঙুল পায়ের তালুর সম্মুখের অংশ বিদ্যমান থাকা। ৮. মোজাদ্বয় পবিত্র হওয়া।
মাসেহর পদ্ধতি : উভয় মোজার উপরাংশে ডান হস্তকে ডান পায়ে এবং বাম হস্তকে বাম পায়ের মাথায় রেখে উভয় হস্তের অঙ্গুলিকে প্রশস্তরূপে খোলা অবস্থায় পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে গোড়ালি অবধি টেনে নিয়ে যাবে। (শরহে বেকায়া : ১/৯৯)। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) থেকে মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রস্রাব করতে দেখেছি। অতঃপর এসে তিনি অজু করেছেন এবং মোজার ওপরে মাসেহ করেছেন। এ সময় তিনি ডান হাতকে ডান মোজা এবং বাম হাতকে বাম মোজার ওপর রেখেছেন। অতঃপর মোজাদ্বয়ের ওপরের অংশে একবার মাসেহ করেছেন। এমনকি আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মোজার ওপরে অঙ্গুলির রেখা অবলোকন করেছি।’ (মুসান্নাফে ইবনে শায়বা)।
মাসেহর সময়কাল : হদস বা নাপাক হওয়ার পর থেকে নিয়ে মুকিমের জন্য একদিন এক রাত এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত শরিয়ত মোজার ওপর মাসেহর অনুমোদন করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘মুকিম ব্যক্তি একদিন এক রাত এবং মুসাফির তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত মাসেহ করবে।’ (শরহে বেকায়া : ১/১০১)। 

লেখক : দেওপুরা সমনগর আনওয়ারুল উলুম মাদরাসা, পোরশা, নওগাঁ 


প্রাচীন মসজিদে ঘেরা বারোবাজার শহর
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার বারোবাজার ইউনিয়ন। পূর্বনাম শহর মোহাম্মদাবাদ। প্রায়
বিস্তারিত
পিতামাতার প্রতি করণীয়
সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন স্বীয় ‘রহমত’ গুণটির ছায়া-প্রভাব
বিস্তারিত
নবীজির পোশাক কেমন ছিল
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর কথাই কি শুধু তাঁর
বিস্তারিত
ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার
ইসলামের আগমনের আগে গোটা পৃথিবী নারী জাতিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে
বিস্তারিত
বাইয়ে ঈনা ও প্রচলিত সমিতি
‘বাইয়ে ঈনা’ শব্দটির অর্থ হলো বাকি। বাইয়ে ঈনা মূলত দুই
বিস্তারিত
দেনমোহর নারীর অধিকার
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনকাল। বিয়ের দেনমোহর নিয়ে
বিস্তারিত