মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

বিরোধ ও বিভক্তি নয়

শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মাদ

আল্লাহ আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে নিজের ইবাদতের জন্য পৃথিবীতে পাঠান। যুগের পর যুগ তারা আল্লাহর তৌহিদ ও তাঁর ভালোবাসার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। তারপর শয়তান তাদের প্ররোচিত করে। আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে বলেন, ‘আমি আমার সব বান্দাকে একনিষ্ঠ ধার্মিক হিসেবে সৃষ্টি করেছি। তারপর শয়তানরা এসে তাদের দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়।’ (মুসলিম)। আল্লাহ বনি ইসরাইলকে নির্বাচন করেন। তাদের মাঝে নবী-রাসুল পাঠানোর পর তারা তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়ায়। নবীরা মারা গেলে আসমানি কিতাব ছুড়ে মারে। তারা বিভিন্ন দলে ও উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইহুদিরা ৭১টি দলে বিভক্ত হয়েছিল। খ্রিস্টানরা হয়েছিল ৭২টি দলে। আর আমার উম্মত বিভক্ত হবে ৭৩টি দলে।’ (ইবনে হিব্বান)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ উম্মতের মাঝে বিভক্তি থেকে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা বিভক্তি থেকে বেঁচে থাক।’ (তিরমিজি)। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের বিরোধ করতে নিষেধ করে বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিভক্ত হয়ে পড়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)।
আল্লাহর পথ এক, যা কিছু কোরআন ও সুন্নাহর বিরোধী, সেগুলোই শয়তানের পথ। সেগুলো মানুষকে বিভক্ত করে। তাদের আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ নবীদেরসহ সব জাতিকে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা ও বিরোধ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো আর তাতে বিরোধ করে বিভক্ত হয়ে পড়ো না।’ (সূরা শূরা : ১৩)। পার্থিব লোভ-লালসার প্রতিযোগিতা শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় করি না, বরং ভয় করি তোমাদের কাছে দুনিয়া প্রসারিত হয়ে যাওয়ার। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য করা হয়েছিল। তারা দুনিয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেছিল, যেমন তোমরাও করবে। তা তোমাদের ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।’ (বোখারি ও মুসলিম)। লোকেরা বিরোধে জড়িয়ে বিভক্ত হয়ে গেলে শয়তান তাদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জামাতকে আঁকড়ে ধর। বিভক্তি থেকে সাবধান থাক। কেননা শয়তান থাকে একজনের সঙ্গে। সে দুইজন থেকে দূরে অবস্থান করে।’ (তিরমিজি)।
দ্বীনের ক্ষেত্রে বিরোধ ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে তা আল্লাহর পথ ও তাঁর দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর দ্বারা নবীদের পথ ও পন্থা থেকে বিচ্যুত হতে হয়। সব নবীই দ্বীন প্রতিষ্ঠা, সত্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তাতে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন না করার নির্দেশ পেয়েছেন। বিরোধে দ্বীন বিনষ্ট হয়। অন্তরের বিরোধ আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হয় বিভক্তির ফলেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিরোধ করো না, তাহলে তোমাদের অন্তরগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে।’ (মুসলিম)। 
কোনো জাতি বিরোধে লিপ্ত হলে তারা দুর্বল হয়ে যায়। তারা অপদস্থ হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা পরস্পর বিরোধে জড়িও না, তাহলে তোমরা হেরে যাবে আর তোমাদের শক্তি খর্ব হবে।’ (সূরা আনফাল : ৪৬)। বিরোধের সবচেয়ে দ্রুত শাস্তি হলো শত্রুদের আধিপত্য বিস্তার করা। বিরোধ, বিবাদ ও বিভক্তির ফলে সত্য ধ্বংস হয়, দ্বীনের মৌলিক দিকগুলোর ধস নামে। ভ্রষ্টতা ও জ্ঞানহীন কথাবার্তা ছড়িয়ে পড়ে। দ্বীনের শিক্ষা ও প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের বাধা দ্বীনের এরকম প্রধান প্রবণতাগুলো নিষ্ক্রিয় হয়। বিরোধের কারণে অনেক নেয়ামত ওঠিয়ে নেয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের লাইলাতুল কদর কোন রাতে তা জানাতে বের হয়েছিলাম। তবে অমুক আর অমুক বিবাদে জড়ানোর ফলে তা রহিত হয়ে গেছে।’ (বোখারি)।
বিরোধ ও বিভক্তি ভয়াবহ অপরাধের বার্তা বহন করে। হত্যাকা- ও রক্তপাতের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের কাছে স্পষ্ট সত্য আসার পর তারা লড়াই করত না; কিন্তু তারা তো বিরোধ করেছে।’ (সূরা বাকারা : ২৫৩)। বিরোধ মহামারী আকারে ধ্বংস ডেকে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বিরোধ করে ধ্বংস হয়েছে।’ (বোখারি)। বিভক্তি লাঞ্ছনা ও অপমানের নাম। বিবাদ অনিষ্ট ও সংকটের নাম। বিরোধ হলো দুর্বলতা ও দুশ্চিন্তার নাম। বিচ্ছিন্নতার ফলে দ্বীন ও দুনিয়া দুইটিতেই বিপর্যয় নামে। শত্রুপক্ষ উল্লসিত হয়। উম্মাহর শক্তি হ্রাস পায়। আল্লাহর দিকে দাওয়াতের পথকে বিলম্বিত করে। জ্ঞানের প্রচার বাধাপ্রাপ্ত হয়। অন্তরগুলোকে বিদ্বেষে ভরে দেয়। হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে। জীবনকে করে কলুষিত। সময় ছিনিয়ে নেয়। মানুষকে সৎকর্ম থেকে দূরে সরায়। জ্ঞানী লোক সেই, যে বিবাদ থেকে বিমুখ থাকে।  

১১ সফর ১৪৩৮ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


আল্লাহর মাস মহররমের মর্যাদা
মহররমের রোজা শ্রেষ্ঠ নেকি ও সেরা আমল। ইমাম মুসলিম তার
বিস্তারিত
আশুরায় করণীয় বর্জনীয়
‘রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে
বিস্তারিত
আলেম বিদ্বেষের ভয়াবহ পরিণাম
উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে ঝড়ের রাতে মাঝ নদীতে একজন দক্ষ নাবিকের ভূমিকা
বিস্তারিত
সর্বদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণের কথা মনে
পূর্বসূরি এক বুজুর্গকে বলা হয়েছিল, দৃষ্টি অবনত রাখতে আমি কীসের
বিস্তারিত
কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের দোয়া
কোরআন ও হাদিসে অনেক নবির দোয়া বর্ণিত হয়েছে। দোয়াগুলো অত্যন্ত
বিস্তারিত
আশুরা ও কারবালা
মহরম মাসের দশ তারিখ আশুরা দিবস হিসেবে সুপরিচিত। এ দিনে
বিস্তারিত