‘পেছন ফিরে তাকালে আমার মনে হয় আমি কত খারাপ লিখতাম’

ঢাকা লিট ফেস্টে সাহিত্যের নানা বিষয়ে একাধিক সভা-সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাহিত্যে নোবেল জয়ী ভি এস নাইপল ও তার স্ত্রী নাদিরা নাইপল ছিলেন। এ ফেস্টের একটি সভায় নাইপলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহসান আকবর

নাইপল ত্রিনিদাদের অধিবাসী। তার দাদা ও দাদিমা আখ চাষের জন্য ত্রিনিদাদে যান। তার বাবা ত্রিনিদাদেও একটি পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। আঠারো বছর বয়সে স্কলারশিপ পেয়ে তিনি ইংরেজিতে পড়াশোনা করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ভাবতেন অক্সফোর্ডে স্কলারশিপ পাওয়া হয়তো জীবনটা চাকরিবাকরি ও লেখক হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই তিনি বিবিসিতে ক্যারিবিয়ান ভয়েস নামে একটি প্রোগ্রামে চাকরি নেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি চারটি উপন্যাস লেখেন। তার মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস। তার নাম নোবেল তালিকায় ১৯৭৩ সাল থেকে আলোচনায় ছিল। কিন্তু ২০০১ সালে তিনি নোবেল পান। আর তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ১৮ নভেম্বর আহসান আকবর।
আহসান আকবর : শুরু করার আগেই নাদিরা নাইপলকে অনুরোধ করছি তার সহায়তা ছাড়া আজকের সাক্ষাৎকার নেয়া সম্ভব হতো না। শুভ সন্ধ্যা। আপনি কেমন আছেন?।
ভি এস নাইপল : আমার এখানে কিছুটা আসতে দেরি হয়েছে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে রাস্তায় আটকে ছিলাম। তারপরও আপনাদের ধন্যবাদ।
আহসান আকবর : লন্ডনে থাকতেই আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনি কীভাবে লেখা শুরু করেন। আপনি লেখক হওয়া ছাড়া অন্য কিছু হতে চাননি। একজন বিবিসির টাইপ রাইটার বিবিসির কম্পাউন্ডে বসে স্ক্রিপ্ট লেখার বদল তার জীবনের প্রথম বইয়ের, প্রথম লাইন লেখে। আপনি কি আমাদের সেই সময়কার গল্পটা বলবেন ঐ গল্পটা কি বলবেন যে কী করে আপনি এ উপন্যাসটা লেখা শুরু করলেন?
ভি এস নাইপল : আমার বাবাও লেখক হতে চেয়েছেন, তিনি নিজে সাংবাদিক ছিলেন। তিনি বলতেন, লেখার জন্য জীবনের প্রাথমিক বয়স থেকেই লেখা শুরু করতে হবে। কিন্তু যখন আমি লেখার জন্য মনস্থির করলাম, তখন দেখলাম লেখার মতো আমার কাছে কোনো বিষয়ই নেই। তাই লেখক হওয়ার ক্ষেত্রে আমার শুরুটা ছিল ভীতিকর। বিষয়টা ছিল কোন ব্যাপারে আমি লিখব আসলে তাই খুঁজে বের করা। আমি যা করতে চাইতাম আর আমার সঙ্গে যা ঘটছিল এ দুইটি বিষয় আমাকে অনেক উদ্বিগ্ন করে তোলে। আমি লেখক হওয়ার এ ভয়ানক অভিজ্ঞতা ও নতুন কিছু লেখার উদ্বিগ্নতা সবসময় ভুলে থাকতে চাইতাম। আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা অনেকে লেখক হতে চেয়েছেন। আর তাদের মাঝেও আমার মতো উদ্বিগ্ন মানসিকতা ছিল। অধিকাংশ লেখককে লিখতে হয়। কিন্তু লেখার পূর্বে তার কাছে কোনো সম্পূর্ণ ধারণা থাকে না যে, সে কী লিখবে। এটা আমার ক্ষেত্রেও সত্য হয়েছে।
আহসান আকবর : আপনার প্রথম প্রকাশিত বই মাইগুয়াল স্ট্রিট?
ভি এস নাইপল : না এরও আগে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। আমি যখন অক্সফোর্ড থেকে পাস করে বের হই, তখন মনে হতো আমাকে কিছু লিখতে হবে। আমি নিজের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত ছিলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে লিখতে হবে। তখন বিবিসির অফিস ছিল লন্ডনের একটি হোটেলের দ্বিতীয় তলার লাউঞ্জে। সেখানে বসে হঠাৎ আমার মনে হলো, আমাকে কিছু লিখতে হবে। মনে হচ্ছিল আমি কিছু করতে পারব। আর তখন কিছু একটা লেখা শুরু করলাম। বিষয়টা খুবই অস্বাভাবিকভাবে আমার কাছে ধরা দিল। বলতে পার, এটা কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক বিষয়। এটা আমার কাছে ম্যাজিকের মতো মনে হয়েছে। আমি ওইদিন আমার রুমে ততক্ষণ পর্যন্ত বসেছিলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি না বুঝলাম যে, লেখার সময়টায় লেখা আমাকে নিজেই মোহগ্রস্ত করে লিখতে বাধ্য করছিল। এসবই সত্য। এ সময়টাতে জীবনের বোঝা আমাকে যেন পেছনে টেনে ধরছিল। অন্যদিকে আমি তখন আমার মাঝে লেখার ক্ষমতা আবিষ্কার করছিলাম। আমি বলতে পারব না, কীভাবে লেখা শুরু করলাম। আর কোনো লেখক তা বলতেও পারবে না। তারপর দুপুরে আমি লেখা বন্ধ করার পর বুঝতে পারলাম আমি কিছু একটা লিখছিলাম।

এইভাবে আপনি মাইগুয়াল স্ট্রিট লেখা শুরু করলেন। আর এভাবেই আপনি আপনার সাহিত্যের প্রথম সন্তান জন্ম দিলেন?
ভি এস নাইপল : আহ্ সন্তান জন্ম দেয়া কি তোমার জন্য এতটাই সহজ? এটা আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল। আর জীবনটা ছিল তখন উদ্বিগ্নতায় ভরপুর। এটা অনেকটা পাগলামির মতো। কারণ আপনি যখন লেখক হতে চাইবেন, তখন দেখবেন আপনার লেখার মতো তেমন কিছুই নেই। কেউ যদি তখন জিজ্ঞেস করত আমায়, তুমি কি লিখতে চাও? অথচ কোন বিষয় তুমি লিখবে, সেটাই জানো না।

আপনার লিখিত প্রথম দিককার অধিকাংশ বইয়ে কমেডিতে ভরপুর। এসবই আপনার ত্রিনিদাদা বাল্যকাল থেকে নেয়া। এরপর আপনি ‘হাউস অব মি. বিশ্বাস’র মতো বিখ্যাত দীর্ঘ উপন্যাস লেখা শুরু করেন। আপনি কোথা থেকে এ বই লেখার উৎসাহ পান। কারণ আপনার ওই সময়ে অনেক পরিশ্রমমুখর ও চাপের মুখে কাজ করতে হয়েছে?
ভি এস নাইপল : আমি যখন রাস্তায় বেরোতাম, তখন রাস্তা আলোকিত দেখতাম। একদিন দুপুরে রাস্তায় বেরিয়ে মনে হলো আমাকে লিখতে হবে এমনকিছুু, যা আমার বাবার পছন্দের জীবন। আমি বলতে চাই, এটা আসলে আমার মাঝে ঘটে যাচ্ছিল। অনেক সময় দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে কাটানোর পর আপনার ভালো একটা বই লেখা হয়। আমি তখন একটা বই লেখা শুরু করলাম এভাবে।

আপনার চারটি ফিকশন লেখার পর ননফিকশন লেখা শুরু করেন। আর ত্রিনিদাদের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিক উইলিয়ামস নাকি আপনাকে এ ননফিকশন লেখার জন্য অনুরোধ করেছিল?
নাইপল : এটা লিখতে গিয়ে আমাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।
নাদিরা : ভিদিয়া খুবই এলোমেলো ছিল। সেই ঘটনাটা আপনাদের শোনা হয়েছে কি, একবার রান্নার ঘরে টেবিলের ওপর ‘অ্যা হাউস ফর মি. বিশ্বাস’র পান্ডুলিপি রেখে ভেনিসে একটা সাদামাটা ভ্রমণে তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাইলে বুঝুন যদি পান্ডুলিপিটি পুড়ে যেত, তাহলে কী হতে পারত! সেটা তখন সংরক্ষণের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
নাইপল : এখন খুবই মজার হলেও তখন ব্যাপারটা এমন হালকা ছিল না। জীবনের সবকিছুই সাজানোভাবে ঘটে না। এটা আসলেই এক দারুণ লেজেগোবরে পরিস্থিতি। পেছন ফিরে তাকালে আমার মনে হয় আমি কত খারাপ লিখতাম। কারণ আমার প্রথম লেখাটি নিয়ে প্রকাশকের কাছে গেলে তিনি আমাকে সেটা ফেলে দিতে বলেছিলেন। এ কারণে আমি বেশ আহত হয়েছিলাম।

সারাজীবন আপনি একটু স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আপনি কোনো ইডিওলজি দ্বারা প্রভাবিত হননি। বিশেষ করে ‘এ বেন্ট অন দ্য রিভার’ বইয়ে সেই পরিচয় মেলে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন?
নাইপল : সবাই বলেন এটা আসলে একটি প্রফেটিক বই। আর কীভাবে আমি এ বই লিখলাম, তা যদি বলতে পারতাম তবে তো আমি নতুন আরও একটা বই লিখতে পারতাম। এমন হতে পারে সমালোচকরা একদিন আমার পান্ডুলিপিগুলো বুঝতে পারবেন। দেখতে পারবেন এই লেখার পুরো বিষয়টি কতখানি জটিল।
নাদিরা : তখন নাইপল আফ্রিকার সুদানে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। আর কিছুকাল সে ওখানে থেকে যায় এবং তারপর সে ইউরোপে ফিরে বইটা লেখে।

আমরাও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছি, আপনার এতগুলো বই পেয়ে। আপনি কী এবার আপনার আফ্রিকার ওপরে লেখা বইগুলো নিয়ে কিছু বলবেন? ‘এ বেন্ড অন দ্য রিভার’ উত্তর-উপনিবেশ নিয়ে আমাদের দেখার ভঙ্গিটাই পাল্টে দিল।
নাইপল : এই বইটা লিখতে গিয়ে প্রথমদিকে আমি কোথায় যাচ্ছিলাম; নিশ্চিত ছিলাম না। আপনি জানেন মডার্ন ফিকশন লেখা এবং এর ঘটনাগুলোর মাঝে সমন্বয় ও ক্লাইমেক্স বজায় রাখা অনেক কঠিন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাকে লিখতে উৎসাহ দিয়েছে।


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত