বাংলা একাডেমিতে ১৭ থেকে ১৯ নভেম্বর হয়ে গেল ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ নামে সাহিত্য উৎসব। উৎসবে যোগ দিয়েছেন সাহিত্যে নোবেল জয়ী ভি এস নাইপল। এছাড়া ছিলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষক

বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্য মাধ্যম ঢাকা লিট ফেস্ট

আমি মনে করি, শিল্প-সাহিত্যে সবসময় একজন লেখক বা কবি নিজেকে আড়াল করতে চায়। কিন্তু কখনও সে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস রচনায় লুকাতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে তার বিশ্বাসে ও আদর্শেও প্রতিফলন দেখা যায় কবিতা বা গল্পে। ঠিক তেমনি রাজনীতিও এমন একটি বিষয়, যা আমরা হাজ

সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজবদ্ধ মানুষের সৃষ্টিশীল নান্দনিক চেতনার আরেক নাম। মানুষ যেমন সাহিত্য-সংস্কৃতির উপাদান সৃজন করে, তেমনই সেটি তার জীবনযাপনের অংশ, জীবন উপভোগের সূত্র করে তোলে। সাহিত্য রচিত হয় ব্যক্তির হাতে; কিন্তু সেটি হয়ে উঠে সমষ্টির সম্পদ। আর সেই সম্পদ সমষ্টিকে আপ্লুুত করে, তাকে শক্তি জোগায়, অনির্বচনীয় আনন্দ প্রদান করে। ঢাকা লিট ফেস্টের তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশসহ ১৮টি দেশের ৬৬ জন কবি-সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক ও প্রকাশক।
উৎসব উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল। এ সাহিত্য উৎসব একই সঙ্গে আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে এবং আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে বিশ^ সাহিত্যকে। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে যদি সমৃদ্ধ হয় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদÑ তবে শিগগিরই বাংলা বিশ্বের শক্তিশালী শিল্প-সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। বিশ^ দরবারে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাহিত্য পাবে এক অনন্য স্বীকৃতি। এ উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিলÑ দ্বিতীয় দিন। যাতে ছিল সাহিত্য কি সবসময় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখার দাবি রাখে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা। সেই আলোচনার সঞ্চালক, অতিথি ও দর্শকদের কিছু প্রশ্ন-উত্তর তুলে দেয়া হলো এখানে।

সাহিত্য কি সবসময় রাজনৈতিক বিষয়?
বর্তমানে সাহিত্য নিরপেক্ষ বিষয়বস্তু হিসেবে অনেকে প্রমাণের চেষ্টা করেন। সাহিত্যের মাধ্যমে কি রাজনীতি প্রতিফলিত হয় না রাজনীতি প্রতিফলিত হয় না, তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। আর এ বিতর্কের আগুনে ঘি দিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নিকোলাস লেজার্ড ছিলেন এ সেশনের পরিচালক।

নিকোলাস লেজার্ড : সাহিত্য কি সবসময় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত, না রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যে ততটা প্রতিফলিত হয় না। তাই এ সেশনের আলোচ্য বিষয়। আমার সঙ্গে উপস্থিত আছে আমেরিকা থেকে আগত বেন জুডাহ, মিসরের এভি ওয়াইল্ড ও অস্ট্রেলিয়ার নায়েল এল্টকি এবং বাংলাদেশের কাজী আনিস আহমেদ। প্রথমেই আমরা কাজী আনিস আহমেদকে প্রশ্ন করি বাংলাদেশের উত্থান, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাত্র পাঁচ দশক। আপনি কি মনে করেন, এ দেশের বিবর্তনে সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেছে?

কাজী আনিস আহমেদ : সাহিত্য সবসময় রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে। বিশেষত বাংলাদেশে আমরা এর ব্যত্যয় দেখি না। আমাদের ৫২’র ভাষা অন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে আশির দশকে স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলন এসব কিছুতে সাহিত্যে ও শিল্প একজন সচেতন রাজনীতিবিদের মতোই ভূমিকা নিয়েছে। আমি এক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম দেখি না।
এ ভি ওয়াইল্ড : আমি মনে করি, আমাদের দেশের সাহিত্যে রাজনীতি ততটা প্রতিফলিত হয় না। হ্যাঁ তবে আরব বা মিসরে মানুষ দুই ধরনের প্রচলিত আরবি ব্যবহার করে। একটি হচ্ছে সø্যাং আর অন্যটি প্রমিত আরবি। বর্তমানে এ সø্যাং আরবি ফেসবুক থেকে শুরু করে সব যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি আমি নিজেও ফেসবুক বা টুইটারে পোস্ট দিতে অভ্যস্ত আরবিতে। আমাদের এখানকার লেখকরা মূলত কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী। আমি যদিও কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী; কিন্তু চিন্তাচেতনার দিক থেকে আমি লিবারেল। আর আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের নিয়ে খুব কমই লেখা হয়। তাই আমি মনে করি, সাহিত্য সবসময় রাজনীতিকে রিফ্লেক্ট করে না।
বেন জুডাহ : আমি মনে করি, সাহিত্য সবসময় রাজনীতিকে কেন্দ্র করে রচনা হয়। কারণ গল্প-কবিতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বপ্নরাজ্য গড়ে তুলতে চাই। আর তা কীভাবে সম্ভব হবে যদি আমরা সমাজ গঠনের মৌলিক উপাদান শিক্ষা, চিকিৎসা অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদির ভালো পরিবর্তন দেখতে না পাই। কারণ এসবের ওপরই নির্ভর করে আমাদের সমাজের আর্থসামাজিক বাস্তবতা। আর সাহিত্য এসবকিছুর পুনর্গঠন করে নতুন বিনির্মাণের ব্যাপারে না বললে কীভাবে শান্তিপূর্ণ দেশ বা সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

নিকোলাস লেজার্ড : তবে কি সবসময় সাহিত্যে রাজনীতি প্রতিফলিত হয় বলে মনে করেন?

বেন জুডাহ : আমি মনে করি, সাহিত্যে সবসময় রাজনীতি প্রতিফলিত হয়। আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রচিত সাহিত্যগুলোর দিকে চোখ ফেরাই, সেখানে দেখতে পাব মাত্র দুই ঘরানার লেখা হয়েছে। প্রথম ঘরানা মার্কিস্ট বা মার্কসপন্থী, যারা সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। আর দ্বিতীয় ধারা, ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রতিনিধি, যারা মার্কসবিরোধী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে মার্কসবাদীদের একটি উগ্রবাদী রাজনীতি প্রমাণে ব্যস্ত ছিল। আপনি বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো লোকজনকে ক্ষমতায় আসার ব্যবস্থা করতে পারেনÑ যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার সাহিত্যে না থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী একজন রাশিয়ান। আর রাশিয়ান প্রভাবেই মূলত তার মতো লোকজন ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। এক্ষেত্রে সাহিত্য কি এর বিরুদ্ধে সরব না চুপ থাকবে?

কাজী আহসান কবির : আমি মনে করি, শিল্প-সাহিত্যে সবসময় একজন লেখক বা কবি নিজেকে আড়াল করতে চায়। কিন্তু কখনও সে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস রচনায় লুকাতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে তার বিশ্বাসে ও আদর্শেও প্রতিফলন দেখা যায় কবিতা বা গল্পে। ঠিক তেমনি রাজনীতিও এমন একটি বিষয়, যা আমরা হাজারবার এড়াতে চেষ্টা করলেও এড়াতে পারি না। আমাদের সাহিত্য রচনায় তা বারবারই প্রকাশ প্রায়।
দর্শক : তাহলে আমরা বলব সাহিত্য রাজনৈতিক মুক্তচিন্তা বা বামকেন্দ্রিক হয় না, রক্ষণশীল রাজনীতি বা ডানপন্থীদের মতো হয়ে থাকে।
বেন জুডাহ : আমি মনে করি, শিল্প-সাহিত্যে সবসময় মুক্তচিন্তার রাজনীতিই প্রতিফলিত হয়। সাধারণত রক্ষণশীল বা ডানপন্থীদের সঙ্গে যায় না। যেমন ধরুন, ট্রাম্পের মতো উগ্রবাদী রক্ষণশীলের ক্ষেত্রে তা কী রকম হতে পারে?
এ ভি ওয়াইল্ড : আমি মনে করি, ব্যক্তি হিসেবে মিসরে মার্কিস্ট ঘরানার হলেও চিন্তাচেতনায় আমি লিবারেল। তাই সাহিত্য মূলত মুক্তচিন্তা বা লিবারেল রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে।
কাজী আনিস আহমেদ : আমি মনে করি, প্রত্যেক দেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুযায়ী সাহিত্যের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ডান বা বামপন্থী হয়ে থাকে। যে দেশের শাসক বামপন্থী, সে দেশের প্রকৃত সাহিত্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ডানপন্থী হয়ে থাকে। আর যে দেশের শাসক হয়ে থাকে ডানপন্থী, সে দেশে সাহিত্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থী হয়ে থাকে। তাই সাহিত্যে রাজনীতি থাকলেই যে তা ডানপন্থী বা বামপন্থী হতে হবে সবসময়Ñ তা নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। কারণ সাহিত্য সমাজের শোষক শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোগাতে উৎসাহ দেয়। আর এ শোষক শ্রেণী যে মতবাদে বিশ্বাসীÑ সাহিত্যের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ তার বিপরীত হয়ে থাকে।


পাঠক কমছে; কিন্তু সেটা কোনো
দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক
বিস্তারিত
মনীষা কৈরালা আমি ক্যান্সারের প্রতি কৃতজ্ঞ,
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ৯ নভেম্বরের বিশেষ চমক ছিল
বিস্তারিত
এনহেদুয়ান্নার কবিতা ভাষান্তর :
  যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২২৮৫ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার
বিস্তারিত
উপহার
  হেমন্তের আওলা বাতাস করেছে উতলা। জোয়ার এসেছে বাউলা নদীতে, সোনালি
বিস্তারিত
সাহিত্যের বর্ণিল উৎসব
প্রথম দিন দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় মিতালি বোসের
বিস্তারিত
নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র মান্টোর মতো সাবলীলভাবে
এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক নন্দিতা দাস
বিস্তারিত