লিবিয়া অন্তহীন সংকটে

বহিঃশক্তির দ্বারা এভাবে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশের করুণ অবস্থায় চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে লিবিয়া যেন একটি উদাহরণ। নিজ দেশের মানুষ যদি অর্থ এবং ক্ষমতার লালসায় অন্য দেশের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়, সে ক্ষেত্রে সেই দেশ ধ্বংসের পথে চলে যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না

তিউনিসে আরব বসন্তের উৎপত্তির পর ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ‘লিবীয় গণতান্ত্রিক বিল্পব’ এর ফলে গাদ্দাফি যুগের অবসান হয়। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় মানুষ দ্রুত পরিবর্তনের যে আশা করেছিলেন, বাস্তবিক অর্থে তেমন পরিবর্তনের ছোঁয়া সেখানে আসেনি কিংবা এলেও তা খুবই সামান্য। লিবীয়রা বলছেন, এখনকার এই পরিবর্তন তাদের আন্দোলনের কাক্সিক্ষত ফসল নয়। আন্দোলনে বিজয়ের মাধ্যমে কল্পনার যে ছবি তারা এঁকেছিলেন, তার সঙ্গে বর্তমান লিবিয়ার কোনো মিল নেই। তাদের বক্তব্য, গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলনের পর পাঁচ বছর কেটে গেলেও আজও তাদের বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। বিবিসির প্রতিবেদক রানা জাওয়াদ সম্প্রতি তার এক লেখনীতে বলেছেন, অনেক লিবীয় মনে করেন, নতুন সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর সে অর্থে কোনো অগ্রগতি তারা দেখতে পাননি। আগামীতেও তা কতটা দেখা যাবে তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়।
১৯৫১ সালে দখলদার ইটালিয়ানদের তাড়িয়ে স্বাধীনতা এনেছিল লিবিয়া।
‘মরুভূমির সিংহ’ নামে খ্যাত ওমর মুখতারের দেশ বলে কথা, সবুজ বিপ্লবের ছোঁয়ায় তা আমূল বদলে গেল। ইতালীয় ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে মুখতারের প্রায় ২০ বছরব্যাপী লড়াই ১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার গ্রেফতারের মাধ্যমে সমাপ্তি লাভ করে। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই মুখতারের বিচার সম্পন্ন হয়। বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর রায়ে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়া হয়। শেষ কথা জানতে চাওয়া হলে মুখতার কোরআনের আয়াত ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব) পাঠ করেন। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সুলুকের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তার অনুসারীদের সামনে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
ওমর মুখতার এর দিকে তাকিয়ে মুসোলিনির ইটালিয়ান সেনা আদালতের বিচারক বললেন, তোমার মতো লোকের এমন পরিণতি দেখে আমি দুঃখিত। ওমর বললেন, কিন্তু এটাই তো জীবন শেষ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। এরপর বিচারক অনেক চেষ্টা করল ওমরকে ক্ষান্ত করতে এবং প্রস্তাব দিল তাকে মুক্ত করে দেয়া হবে যদি সে মুজাহিদিনদের কাছে চিঠি লেখে, যাতে মুজাহিদিনরা ইটালিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করে। ওমর মুখতার বিচারকের দিকে তাকালেন এবং তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি বললেন, ‘যেই শাহাদাত আঙুল দিয়ে আমি প্রতিদিন সাক্ষ্য দিই যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। সেই আঙুল মিথ্যার কোনো কথা লিখতে পারবে না। আমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আত্মসমর্পণ করি না। আমরা হয় জিতি, না হয়  মরি।’
ওমর মুখতারÑ দ্য লায়ন অব দ্য ডেজার্ট বা মরুর সিংহÑ লিবিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রখ্যাত সেই ইমাম, সেই শিক্ষক-আলেম, সেই শহিদ, সেই বিখ্যাত নেতা, যিনি আজও আমাদের জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণার অংশ।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মুয়াম্মার গাদ্দাফি যখন লিবিয়ার শাসনক্ষমতা দখল করেন, তখন লিবীয়রা ছিল পুরোদস্তুর যাযাবর জাতি, তাদের আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে তেমন ধারণাই ছিল না। দেশের সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নানাভাবে ছিল পশ্চিমাদের দখলে। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জনগণ ছিল দরিদ্র। আর পৃথিবীর তেল রিজার্ভে দশম স্থানের অধিকারী। এর পরেও গাদ্দাফির ক্ষমতা নেয়ার প্রাক্কালে দেশটি কেন এত গরিব ছিল, সে ইতিহাসের বিস্তারিত পাঠে যাচ্ছি না। লিবিয়ার ‘পারক্যাপিটা জিডিপি’ ছিল $২৯৩ (১৯৬০), $৪৭২ (১৯৬৯), $১২,৮১২ (১৯৭৯), $৫,৮৮২ (১৯৮৯), $৭,০৬৪ (১৯৯৯), $১০,৫৭৪ (২০০৯)Ñ এসবই বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত ছিল কর্নেল গাদ্দাফির শাসনকাল, যিনি কিনা পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে লৌহমানব, উরপঃধঃড়ৎ এবং আরো অনেক কিছু। ২০১৪ সালে ‘পার ক্যাপিটা জিডিপি’ এসে দাঁড়িয়েছে $৭,৯৪২-তে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৮০’র দশকে লিবিয়া পৃথিবীর একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ ছিল, এমনকি  ছিল অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও উন্নত।
স্বৈরশাসক হওয়া সত্ত্বেও এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে সম্পদের পাহাড় গড়লেও গত চার দশকের বেশি শাসনামলে গাদ্দাফি তার দেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। দেশের মানুষের জন্য এনেছেন বিপুল সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়ন। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা অন্য কারও কাছে লিবিয়ার এক পয়সাও দেনা ছিল না।
প্রতিটি লিবীয়র জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা। এছাড়া তেল জাতীয়করণের সুফল পেয়েছিল লিবীয় আমজনতা। আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতোই লিবীয় জনগণের জীবনধারা পাল্টে দেন গাদ্দাফি। কিন্তু ২০১১ সালে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের পর থেকেই লিবিয়ার অর্থনীতির সেই সমৃদ্ধিশালী অবস্থায় ভাটা পড়ে। লিবিয়া হয়ে যায় একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পর্যায়ে। তেলের উৎপাদন ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে পড়ে। ছাত্রদের বৃত্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। (গ্লোবাল রিসার্চ, ১৯ অক্টোবর ২০১৪)।
ক্ষমতা মানুষকে দুর্বিনীত, দুর্নীতিগ্রস্ত, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতান্ধ করে দেয়। শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষ তার বিশ্বাসকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে কোরবানি করতে পারে গাদ্দাফি হয়তো-বা তার একটা বড় উদাহরণ হতে পারেন। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এভাবে ‘বিপ্লবী’ গাদ্দাফির নৈতিক মৃত্যু ঘটে। বেদুইন পরিবারের সন্তান গাদ্দাফি ৪২ বছর কঠোর হাতে লিবিয়া শাসন করেছেন। তিনি নিজেকে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গেও তুলনা করতেন। গাদ্দাফি আফ্রিকার ওপর একটা কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তিনি আফ্রিকানদের পশ্চিমাবিরোধী করে তুলতে বিশেষ প্রচেষ্টাও চালিয়ে গেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তিনি লিবিয়াকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গিয়ে অত্যাচার ও অন্যায়ের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
লিবিয়ার মানুষ বিশ্বাস করত, দক্ষ এবং উদার নেতৃত্ব পেলে তাদের দেশ অল্প ক’দিনেই দুবাইকে পেছনে ফেলে দেবে। অবশেষে পার্শ্ববর্তী দেশ তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্ত’ তাদের সে সুযোগ করে দেয়। গাদ্দাফির কবল থেকে মুক্ত হতে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। ২০১১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বদলে যায় দৃশ্যপট। শুরু হয় সংঘাত এবং বিদ্রোহ। বেনগাজি, বায়জা শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরেও। গাদ্দাফির নির্দেশে সেনাবাহিনী জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং আক্রমণ শুরু করে। বছরব্যাপী ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর অক্টোবরের ২০ তারিখ ধরা পড়েন গাদ্দাফি। তাকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। ২৩ অক্টোবর থেকে লিবিয়া নতুন করে স্বাধীন ঘোষিত হয়। পতাকা বদলে ফেলা হয় এবং এক নতুন পথে যাত্রা শুরু করে দেশটি।
ন্যাটোর চোখে গাদ্দাফির হয়তো বড় অপরাধ ছিলÑ তিনি বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় স্বার্থটা বেশি দেখতেন এবং একটি সত্যিকারের শক্তিশালী ইউনাইটেড আফ্রিকার স্বপ্ন দেখতেন। আর সেজন্যই হয়তো ২০১১ সালে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থ জব্দ করেছিলেন বারাক ওবামা প্রশাসন। লিবিয়ার বর্তমান এ অবস্থার জন্য কী কী কারণ এবং কারা দায়ী, তা নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। এ গবেষণায় চমকপ্রদ অনেক তথ্য বের হয়ে আসবে; যা অনেক দেশের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে; বহিঃশক্তির দ্বারা এভাবে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশের করুণ অবস্থায় চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে লিবিয়া যেন একটি উদাহরণ। নিজ দেশের মানুষ যদি অর্থের লালসায় এবং ক্ষমতার লালসায় অন্য দেশের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়, দেশকে বিক্রি করে দেয়, সে ক্ষেত্রে সেই দেশ ধ্বংসের পথে চলে যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না, ঠেকাতে পারবে না দেশের মানুষের দুর্বিষহ অবস্থানে পৌঁছে যাওয়াকে।


পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত
আবু বাকরা (রা.)
নোফায় বিন হারেস বিন কালাদা সাকাফি (রা.)। তার উপনাম আবু
বিস্তারিত