পুটুর গল্প

মা ডান পাশে, আর বাঁ পাশে গোল বালিশটা। মাঝখানে পুটু ঘুমায়। মায়ের হাতে মাথা না রাখলে তার ঘুম আসে না।
ঘুম এমনি আসে না। একটা গল্পই মা শোনায় রোজ। সেই আধহাত মানুষ আর বারো হাত মানুষের গল্প। রোজ রাতেই গল্পটা শোনে পুটু। তারপরও মনে হয় গল্পটা নতুন। অদ্ভুত লোকটা, নামটাও অদ্ভুত। টোটে মোটে টন্টু। এক বিঘেত, মানে আধহাত মানুষ সে। আর লম্বা বারো হাত তার দাড়ি। আর দাড়িসমেত সাড়ে বারো হাত মানুষটা। দাড়ি তো নয়, যেন বেণিবাঁধা চুলের বাহার। টোটে মোটে টন্টু হেঁটে গেলে দাড়িটা সারা পথ লুটিয়ে লুটিয়ে যায়।
পরীর রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি। পরীরা তাকে টন্টুদাদু বলে ডাকে।
একদিন হলো কি, টন্টুদাদু সাগরের পাড়ে গেল। তা সাগরতলের নীলচোখের মৎস্যকন্যাÑ যার নাম আকাশি। মৎস্যকন্যাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী, তাকে সবাই আদর করে জলকুমারী বলে ডাকে। তা জলকুমারী ভুশ করে সাগরের তল থেকে মাথা তুলেই টন্টুদাদুকে দেখতে পেল। দেখে তো সে অবাক, সে মানুষ দেখেছে অনেক, কিন্তু এমন ছোট্টখাটো অথচ এত্ত বড় দাড়িওয়ালা লোক সে কখনও দেখেনি।
তবে ভয় পেল না। ডাকল, ও মানুষ, আজব মানুষÑ নাম কিগো তোমার?
টন্টুদাদু তার দিকে তাকিয়ে ফ্যাক করে হেসে দিল।
হাসল কেন গো?
টন্টুদাদু আবার হাসল। বলল, তোমার সাহস দেখে হাসছি। আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করছ, যেন আমি তোমার কাছে অতিসামান্য কিছু। বুঝলে হে মীনমেয়ে আমি হচ্ছি টোটে মোটে টন্টু। পরীরাজ্যের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি। আমার বয়স কত জানো হে! ১০ হাজার ১৯০ বছর। আর ইচ্ছে করলে আমি এ জাদুই দাড়ি দিয়ে পুরো সাগরের পানি শুষে নিতে পারি!...
মৎস্যকন্যা আকাশি ভয় পেয়ে ভুশ করে ডুব দিয়ে সাগররাজ্যে তলিয়ে গেল।
তারপর...?
এ পর্যন্তই। গল্পটা এটুকু বলতেই পুটু রোজ ঘুমিয়ে পড়ে। পুটুর আর কখনোই গল্পের বাকি অংশ শোনা হয় না।

পুটুর বয়স এখন সারে চার বছরও হয়নি। একটু বুদ্ধিজ্ঞান হয়েছে, তাই সে ক’দিন ধরে রোজ বায়না ধরছেÑ এবার পহেলা বৈশাখে মামার সঙ্গে দৈদির মেলায় যাবে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ওদের বাড়িতে আসে প্রায়ই। তারা গল্প করে, দৈদির বৈশাখী মেলায় অনেক মজা আছে। প্যাঁপু বাঁশি, নাগরদোলা, আরও কতকিছু! ওরা দৈদির মেলায় যাবে এবার। পুটুও মায়ের আঁচল চিবাতে চিবাতে মেলায় যাওয়ার আবদার করে।

দুই দিন, তিন দিন, চার দিন। একইরকম আবদার। মা শেষমেশ কথা দিয়েছেÑ ঠিক আছে যাবে। তবে মামার অঙুল ছাড়বে না কিন্তু! মেলায় খুব ভিড় হয়। বাচ্চারা হারিয়ে যায়। ভীষণ ভয় হয় আমার। মামাকে মা বুম্বা বলে ডাকে। নাম হলো মোবাশ্বের, মোবাশ্বের কি করে যে বু¤া^া হয়ে গেল, তা পুটুও জানে না। তবে মামার শরীর মোটাগোটা ধরনের। আর ভারি অলস। একটু কোথাও বসলেই চোখজুড়ে ঘুম নামে। ঘুমালেই বুমবুম করে নাক ডাকা শুরু হয়। এজন্য বোধহয় মা মামাকে বুম্বা বলে ডাকে। হয়তো তাই হবে।

তা পুটুর মনে ভারি আনন্দ। রাত পোহালেই কাল দৈদির মেলায় যাবে মামার সঙ্গে। মনের আনন্দে তাই রাতে মায়ের হাতে মাথা রাখল না। মাকে গল্প বলারও আবদার করল না। সারা দিন খাটাখাটি করায় মায়ের চোখে ঘুম নেমে এলো। পুটু না ঘুমিয়ে মাথার কাছের জানালার ফাঁক দিয়ে রাত দেখতে লাগল। ঝুমঝুম রাত। সুনসান চারদিক। ঝিনঝিন ঝিঁঝির গান। ঝিকিমিকি জোনাকজ্বলা। হঠাৎ হুমহুম করে ভুতুমপ্যাঁচা ডাকল। পুটু ভয় পেল না। মনে আনন্দ থাকলে কোনো কিছুতেই ভয় থাকে না। রাত এক প্রহর চলে গেল। দুই প্রহর গেল। তারপরও পুটুর ঘুম এলো না। দেখল আকাশটা কেমন সাদা সাদা। ভোর ভোর হয়ে আসছে। গোল ঝলমলে চাঁদের পাশে একটা জ্বলজ্বলে তারা। পুটু জানে, মা তাকে বলেছেÑ ওটা হলো গিয়ে শুকতারা। তা শুকতারা দেখতে দেখতে একসময় চাঁদটাকে, তারাটাকেÑ দুটোকেই হারিয়ে ফেলল পুটু। মানে ভোর হয়ে গেছে। তাদের লাল মোরগটা গলা টেনে টেনে বাক দিল। মায়ের ঘুম ভাঙল মোরগের ডাকে। মা চোখ মেলে দেখে পুটু জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে আছে।
‘কি হচ্ছে পুটু, ঘুমোসনি বুঝি?’
‘আমাল ঘুম পাচ্ছে না।’
‘তার মানে?’
‘বুম্বা মামাল ছঙ্গে মেলায় যাব তাই।’
সে তো দুপুরের পরে যাবি। তা রাতে ঘুমোসনি কেন?
পুটু মায়ের গলা জড়িয়ে বলল, ‘খুছিতে।’
মা হেসে বলল, দস্যি কোথাকার!
পুটু গেল মেলায়। মা বলেছে মামার হাত ছাড়বি না। পুটু মাথা নেড়ে হেসেছে। তা মেলা কি চাট্টিখানি ব্যাপার। ভিড়ে ভিড়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা।
বুম্বা মামার আঙুল চেপে ধরে রাখে পুটু। মামা বলে, এই পুটুরি এত চাপিস না।
পুটু তাও চেপে রাখে গায়ের জোরে। তা মেলার ভেতরে যেখানে নাগরদোলা আর পুতুল নাচের প্যান্ডেল, সেখানে আসতেই পুটুর হাতের মুঠো থেকে মামার আঙুল ফসকে গেল। কি করে ফসকালো পুটু ভেবেই পায় না। মামা হারিয়ে গেছে।
এখন উপায়? চার বছর চার মাস আঠারো দিনের পুটু এখন কী করবে? সে তো এই প্রথমবার ঘরের বাইরে কোথায়ও ঘুরতে এসেছে। আর দৈদির মেলা বলে কথা। তাদের গ্রামের নাম কাঞ্চনপুর। দৈদি থেকে কাঞ্চনপুর কত মাইল হবে?
ছোট্ট পুটু কাঁদছে না। সে গ্রামের ছেলে হলেও তাদের সাদাকালো টেলিভিশনে আভতার কার্টুন ছবি দেখে। এই ছবি দেখে দেখে সে ভয়কে জয় করেছে।
সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, তার কাছেই দেখে একটা লোক মাইকে পুতুলনাচের ঘোষণা দিচ্ছে। পুটু সাহস করে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটা তাকাতেই পুটু বলল, মামা, আমার বুম্বা মামা হারিয়ে গেছে, আপনি একটু মাইকে বলে দেবেন?
এত হইচইয়ের মধ্যেও ছোট্ট পুটুর মিষ্টি মামাডাক শুনে সে হেসে বলল, তোমার নাম কি?
পুটু বলল, ‘পুটু।’
তো তোমাদের বাড়ি কোন গ্রামে?
পুটু বলল, ‘কাচ্ছনপুল।’
‘কাচ্ছনপুল’ মানে, কাঞ্চনপুর তো?
‘হ্যাঁ, কাচ্ছনপুল।’
‘বাবার নাম?’
‘বাবা চাকলি কলে, শহলে। মায়েল লাম কুলসুম।’
‘আচ্ছা তুমি এখানে বসো। আমি তোমার মামাকে ডাকছি।’ এই বলে লোকটা মাইকে বলতে থাকেÑ ‘গ্রাম কঞ্চনপুর। মায়ের নাম কুলসুম। তার নাম পুটু। বয়স চার বছরের মতো। তার মামার নাম বুম্বা।
বুম্বা মামা হারিয়ে গেছে...। বুম্বা মামা তুমি যেখানেই হারিয়ে যাওনা কেন, যেখানেই থাক, তাড়াতাড়ি পুতুলনাচের প্যান্ডেলের কাছে চলে আসো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তোমার ভাগ্না পুটু মিয়া...’

বারদশেক এভাবে হাঁকডাক দিলেও লোকটা বুম্বা মামার কোনো খবর পেল না।
শেষমেশ আর কি করা। লোকটা পুটুকে বিনে টিকেটে পুতুলনাচ দেখালো নিজের কাছে রেখে। নিজের পয়সা দিয়ে বেলুন-বাঁশি কিনে দিল। এক ঠোঙা গুড়ের জিলাপি কিনে খেতে দিল। এমনি করে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো।
‘এখন কি করা যায় পুটু। তোমার মামাকে তো পাওয়া গেল না!’
পুটু বলল, ‘একটু এদিক-ওদিক খুঁজলে বুম্বা মামাকে পাওয়া যেতে পালে। মামা শুধু ঘুমায়। কোথাও ঘুমায়ে পললো কিনা।’
পুটুকে কাঁধে করে মেলার এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে লোকটা। হঠাৎ দেখে অনেক লোকজনের ভিড়। তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। আর কার হাউমাউ কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। ভিড় ঠেলে যেতেই দেখেÑ গোলগাল গোছের একটা লোক। সে কাঁদছে আর বলছে, আমার ভাগ্নে পুটু হারিয়ে গেছে গো! এখন কী হবে গো! কোথায় পাব গো!
পুটু তো তাকে দেখেই পুতুলনাচ-মামার ঘাড়েচড়া অবস্থাতেই চিৎকার করে ওঠে, ‘ওই তো আমাল বুম্বা মামা।’
সে ঘাড় থেকে এক লাফে নেমেই মামাকে জড়িয়ে ধরে। বুম্বা মামা ভাগ্নেকে পাওয়ার খুশিতে তাকে চেপে ধরে আরও জোরে কেঁদে ওঠে।
‘মামা তুমি হালালে কী করে বলো তো?’
পুটুর কথায় বুম্বা মামা বলে, ভাগ্নেরে আমি যে কখন হাঁটতে হাঁটতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। যখন ঘুম ভাঙলো দেখি আমি ঘাটপাড়ের বটতলায় পড়ে আছি।
‘তাই! চলো এবাল বালি যাই।’
‘বাবা পুটু, বাড়িতে গিয়ে কিন্তু তোর মাকে ব্যাপারটা বলিস না। তাহলে খুব লজ্জা পাব।’
‘তাই হবে চলো বালি যাই।’
বুম্বার ঘাড়ে ছোট্ট পুটু। মামাকে বলল, ‘মামা গান গাও। তাহলে তোমাল ঘুম পাবে না।’

মামা গান গায়

পুটু পুটু পুটুরে,
চল আমরা বাড়ি যাই,
বাড়ি গিয়ে ভাত খাই,
খিদেয় পরাণ যায় যায়...
পুটু আমার পুটুরে
বাসায় গিয়ে খানা খাই

পুটু হাসে খিক্ খিক্ করে। তাকায় পুটপুট করে। বুম্বা মামার ঘাড়ের ওপর চেপে বাড়ি ফিরছে পুটু। সন্ধ্যা হয়-হয় তখন। পুটুর মনে আনন্দ। মা বুঝি দরজায় দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায় আছে...।


মশা ও লেখক
লেখার টেবিলে বসে আছি দুই ঘণ্টা হয়। ছোট্ট টেবিলবাতি সেই
বিস্তারিত
বনপাখিটার মনটা খারাপ
  বনপাখিটার মনটা খারাপÑ ভাঙবে কীসে তাহার মান? বীথি তিথি ভেবেই
বিস্তারিত
বন্ধু
আবুল বলল, ‘আমাগো ভুল বুইঝ না ভাই। আমরা আসলে...’, ‘তোরা
বিস্তারিত
হেমন্ত দিন
হেমন্ত দিন হরেক রঙিন হরেক রঙের খেলা বনে বনে ফুল-পাখিদের
বিস্তারিত
এলিয়েন এসেছিল
হামীম বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বললÑ কে তুমি? -হ্যাঁ আমি
বিস্তারিত
হেমন্ত এসেছে
মাঠে মাঠে সোনা ধানে প্রাণটা ফিরে পেল সেদ্ধ চালের গন্ধ
বিস্তারিত