একুশের চেতনা জাগুক প্রাণে

একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি, এত প্রাণ যায়নি অন্য কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্যও। মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রতিটি বাঙালি সত্তায় মিশে আছে। বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক এই অমর একুশে

চলছে ফাল্গুন। পলাশের লালিমায়, কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল পাপড়ি মেলে দিয়েছে এ মাসে। বছরের চাকা ঘুরে যখন এ মাস আসে, বাঙালি হৃদয়ের নিভৃতে কী এক অব্যক্ত অনুভব-অনুভূতি ভিড় করে। কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, পলাশের লালিমায় কিংবা ন্যায়-সত্য-সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় বাঙালি চেতনায় জাগ্রত হয় নতুন উদ্যম। আগুন লাগা এ ফাল্গুন বাঙালির শোক, শক্তি আর গর্বের মাসও। এ মাসটির সঙ্গে মিশে গেছে বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য আর বীরত্বগাথা। এ মাসেই দেখা মেলবে একুশে ফেব্রুয়ারি রাতের বৃন্ত থেকে ছিনিয়ে আনা এক আলোঝলমল সকালের। যার স্পর্শে বাঙালির চেতনা শানিত ও বিকশিত হয়ে জাতি আজ স্বাধিকারের স্বাদ লাভ করেছে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের মুখের ভাষার জন্য এ দেশের দামাল ছেলেরা বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে সেদিন এদেশের দামাল ছেলেরা ঢাকার রাজপথে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করেছিলেন নিজের জীবন দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষা করে। তাই সেদিন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার্থে জীবন উৎসর্গ করা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার কোন দলের লোক ছিলেনÑ সেটা এদেশের গণমানুষ বিবেচনা করেনি। গণমানুষের মনে এরা দেশপ্রেমিক সূর্যসন্তান। সেদিনের সেই আত্মদানই পরবর্তীকালে রূপ নিয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে। পাকিস্তানি শাসক এবং তাদের দোসরদের সব চক্রান্ত, সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালি জাতি এগিয়ে গেল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। তাই এ ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে আমাদের এত অহংকার, এত গর্ব। মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত দেয়ার এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর সেই বিরল আত্মদানের স্বীকৃতিও মিলেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে আজ একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে সেই অমর শহীদদের, যারা ভাষার জন্য তাদের জীবন দিয়ে গেছেন। সত্যি আজও ভাই হারানোর কষ্ট বাঙালি ভুলতে পারেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি এক দিনে আসেনি। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই গৌরবের মাস। ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ফিরে তাকাই আমাদের শিকড়ের দিকে। আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নতুন করে আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা জোগায়। সংগত কারণেই ভাষার মাস নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি অন্যরকম আবেগ কাজ করে। সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ থাকে মাসজুড়েই। একুশের শহীদের স্মরণে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় গ্রন্থমেলা, যা বাঙালির প্রাণের মেলা হিসেবেই পরিচিত। মাতৃভাষা আজ অপমানিত হচ্ছে। দেশের বিদেশি ভাষার প্রতিযোগিতায় তারুণ্যশক্তির কাছেই অপমানিত হচ্ছে ভাষা। তাই সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি সে বায়ান্নর সংগ্রামে থাকলেও এখনও প্রতি বছরই এ দাবি উত্থাপন করতে হয়। কী লজ্জা! বায়ান্নর শহীদের রক্তের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের খুন এসে মিশেছে যে দেশের মাটিতে, সেই মাটিতে কী করে বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলার জন্ম হয়? এছাড়াও ক্রমাগতভাবে মাতৃভাষা বাংলাকে বিদেশি ভাষার কাছে নতজানু করার পাঁয়তারা করে চলেছে একশ্রেণীর মানুষ। এ মাসটির সঙ্গে মিশে রয়েছে বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর বীরত্বগাথা। এ মাসের একুশে ফেব্রুয়ারি রাতের বৃন্ত থেকে ছিনিয়ে আনা এক আলোঝলমলে সকাল। যার স্পর্শে বাঙালির চেতনা শানিত ও বিকশিত হয়েছে। মাতৃভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির একটি গৌরবময় অধ্যায়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধও বাঙালি জাতিসত্তার মূলমন্ত্র। একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি, এত প্রাণ যায়নি অন্য কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্যও। মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রতিটি বাঙালি সত্তায় মিশে আছে। বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক এই অমর একুশে। বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মানুসন্ধানের প্রধান মাস এটি। মাতৃভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির একটি গৌরবময় অধ্যায়। বাংলা ভাষা যদি সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যেত, পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত, তাহলে ছয় দশক পর এ নিয়ে আক্ষেপ করতে হতো না। প্রথমত, দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও উচ্চ আদালতে বাংলা উপেক্ষিত। নাটক সিনেমায়ও এখন বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমনও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে বাংলা একেবারেই উপেক্ষিত। গাড়ির নেমপ্লেট থেকে শুরু করে সাইনবোর্ড, ব্যানার-ফ্যাস্টুন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম বেশিরভাগই ইংরেজিতে। ইংরেজির আধিপত্য ও আগ্রাসন আজ সর্বত্র। অবস্থাদৃষ্টে এমন মনে হচ্ছে যে, বাংলা নয়, ইংরেজিই যেন বাংলাদেশের প্রধান ভাষা। ফলে তরুণ প্রজন্মও ভাষা প্রেম থেকে সরে পড়ছে। ফেব্রুয়ারিকে তারা ভাষার মাস নয়, ভালোবাসা দিবসের মাস মনে করছেন। এই সঙ্গে এ মাসে যুক্ত চকলেট ডে, রোজ ডে’র মতো দিবসগুলো। ফলে ভাষা দিবসের চেয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে এ দিবসগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে আজকের দিনে এগিয়ে নেয়ার কথা ছিল এ তরুণ সমাজকেই। কিন্তু তার কিছুই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারও কোনো ইচ্ছা ও উদ্যোগ নেই যেন। অথচ ভাষা হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে ভাষা বিকৃতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে টেলিভিশনে। এই মাধ্যমে প্রচারিত সিরিয়ালগুলোর ব্যবহৃত ভাষা প্রায়ই না প্রমিত, না কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট উপভাষা। এসব সিরিয়ালের রচয়িতা ও তাদের ‘ভাইবেরাদাররা’ যে খিচুড়ি ভাষা ব্যবহার করছেন তা দর্শকদের বোধগম্য নয়। এসব সিরিয়ালের মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশের মাতৃভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা এবং নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, বাংলা ভাষার লালিত্য, মাধুর্য ও সৌন্দর্য প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। বাংলাদেশে এখন ভাষা বিকৃতি ও ভাষিক নৈরাজ্য চলছে।


খবরটি পঠিত হয়েছে ৪৫৬০ বার

পড়ালেখার পাশাপাশি পার্টটাইম জব
উচ্চমাধ্যমিক পাস কারার পর পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের দেশেও রয়েছে পার্টটাইম
বিস্তারিত
ফ্যাশন ডিজাইনে পড়াশোনা
বাংলাদেশের মোট জাতীয় রফতানি আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসে পোশাক শিল্প
বিস্তারিত
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ক্যারিয়ার
বছরজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। সেসব আয়োজন সুন্দর
বিস্তারিত
খ-কালীন চাকরি কিছুটা স্বস্তি
নিজের ব্যক্তিগত কাজের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য যে ধরনের কাজ
বিস্তারিত
জাপানে পড়ালেখা ও কাজের খুঁটিনাটি
জাপানের শিক্ষার মানও অত্যন্ত উন্নত এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। পড়ালেখা চলাকালীন
বিস্তারিত
বিমান প্রকৌশলী হতে চাইলে
বর্তমান প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে পেশাভিত্তিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এইচএসসি পাস
বিস্তারিত