জীবন ও বই যেন একই সুতোয় বাঁধা

এই পৃথিবীতে মানুষ একাকী থাকতে পারে না। পারে না জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। তাই মানুষ তার একাকিত্ব কাটাতে, জীবনের চলন্ত পথের সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে, একজন সঙ্গী বা বন্ধু খুঁজে বেড়ায়। আর এ খুঁজে বেড়ানোর প্রবৃত্তি শুধু মানুষকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুগ-যুগান্তরে মানুষের বন্ধুত্বের তালিকায় মানুষ ছাড়াও জড়ো হয়েছে পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী, বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখি আর মহা মূল্যবান বই। বই মানুষের অবসরের সঙ্গী। বই মানুষের চিত্তবিনোদনের নির্মল উপাদান। অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনার অনন্য উপায় হচ্ছে বই। কেননা বই হচ্ছে জ্ঞানের প্রতীক। বইয়ের সঙ্গে যার যত বেশি সম্পর্ক, তার জ্ঞানের গভীরতা ততোই প্রখর। আর জ্ঞান হলো আল্লাহ প্রদত্ত এক অফুরন্ত নিয়ামাত, যা জ্ঞানী ও মূর্খদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণায়ক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ (সূরা জুমার : ০৯)। না, সমান নয়। সমাজে জ্ঞানীদের আলাদা একটা মর্যাদা আছে। আর আছে বলেই সমাজ ব্যবস্থা এখনও অতটা অধঃপতিত হয়নি।
মানবজীবনে বইয়ের রয়েছে ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা। কেননা, বই হচ্ছে মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মাধ্যম। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ তার চিন্তা-চেতনা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ লিখনীর মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোর অভিপ্রায়ে বিভিন্ন চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আর সেই চেষ্টা-প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় সফলতার জোয়ার এনে দেন জোহানেস গুটেনবার্গের অক্ষরযন্ত্র। যখন থেকে (১৪৪০-৫০) এ অক্ষরযন্ত্রের আবির্ভাব হয়েছে, তখন থেকেই শুরু হলো বইয়ের এ দুরন্ত পথচলা। অতীত-বর্তমান, দূর-দূরান্তের দেশ আর কালের গ-ির দুস্তর ব্যবধান দূর হয়ে গেল এ বইয়ের মাধ্যমেই।
বই মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। একশত মানুষ বন্ধুর চেয়ে একটি ভালো বই অতুলনীয় ভালো বন্ধু। কেননা, মানুষ বন্ধুর দ্বারা ক্ষতীর সম্ভাবনা থাকলেও বইয়ের দ্বারা তার সম্ভাবনা নেই। নেই প্রতারণার ছলচাতুরী। মনুষ্য বন্ধুত্ব ততক্ষণই অটুট থাকে যতক্ষণ দু’জনের মাঝে বিনিময়ের আদান-প্রদান অব্যাহত থাকে। কিন্তু বই তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বই শুধু দিয়েই যায়, বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করে না। তাই সে বিখ্যাত আরবি প্রবাদটি বলাই যেতে পারে, ‘অখাইরো জালিদিন ফিজ জামানুল কিতাব।’ অর্থাৎ, সময়ের সর্বশেষ্ঠ বন্ধু হলো বই। তাই বইকে শুধু সইয়ের উপমাই নয়, বরং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার আসনে সমাসীন করাই হবে যুক্তিসঙ্গত।
মানবজীবনে বইপাঠের উপকারিতার শেষ নেই। বিজ্ঞান বলে, বেশি বেশি বই পড়লে মানসিক বিকারগ্রস্ততা দূর হয় এবং নৈতিক চেতনায় মানসিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। বই মানুষের ঘুমন্ত মনুষত্বকে জাগিয়ে তোলে। জাগিয়ে তোলে সুপ্ত প্রতিভা এবং নৈতিকতাকে করে উজ্জীবিত। বইয়ের অপর নাম হলো আলোর ভুবন। তাই বই মানুষের মন-মননকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে পৌঁছে দেয় জীবনের কাক্সিক্ষত মাঞ্জিলে। পৃথিবীর জগদ্বিখ্যাত বরেণ্য ব্যক্তিদের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলোকিত করতে যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সে মাধ্যমটির নামই হচ্ছে বই। তাই তো রুশ ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক তলস্তয় মানবজীবনে বইয়ের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজনÑ বই, বই এবং বই।’ সুতরাং এ কথা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মানবজীবনের পরতে পরতে বইয়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
আর এই প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব অনুধাবন করার লক্ষ্যেই কল্যাণময় ইসলাম বইপাঠকে দিয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। শুধু সমর্থনই দেয়নি, দিয়েছে অতীব গুরুত্বও। বলা বাহুল্য, ইসলামের প্রথম বাণীই ছিল পাঠ প্রসঙ্গে। সেই শাশ্বত বাণীর প্রথম শব্দটিই ছিল ‘ইকরা’। যার বাংলা অর্থ ‘পড়ুন’। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামের সঙ্গে বইয়ের রয়েছে ঐশী সুতোর টান। ইসলামী গবেষকদের দাবি, আরবি ‘ওহি’ থেকেই বই শব্দটির জন্ম। কেননা আরবি বর্ণ ‘ওয়াও’ এর বাংলা উচ্চারণ ‘ব’ এবং ‘হা’ এর উচ্চারণ ‘হ’। সুতরাং ‘ওহি’ এর বাংলা উচ্চারণ হলো ‘বহি’। আর বহি থেকেই কালক্রমে শব্দটি ‘বই’-এ রূপান্তরিত। এ ছাড়াও ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি অর্থ হলো ‘পঠন’। সে হিসেবে দেখা যায়, ইসলামই বই পাঠের গুরুত্বকে অতীব গুরুত্ব দিয়েছে। দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা। কেননা বই হলো জ্ঞানার্জনের অন্যতম মাধ্যম। আর ইসলামের পরিভাষায় জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর আবশ্যক। (সুনান ইবনে মাজাহ)। জ্ঞানার্জনের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা). বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি ওহি করেছেন, যে ব্যক্তি ইলম (জ্ঞান) অর্জনে কোনো রাস্তা অবলম্বন করে, আমি তার জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেই।’ (বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান : ৫৩৬৭)।
অপর হাদিসে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘ইলমের (জ্ঞানের) অধিকারী ব্যক্তির জন্য সব কিছুই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্তও।’ (কানজুল উম্মাল : ২৮৭৩৭)।
একটা সময় ছিল যখন লাইব্রেরিগুলোতে লেগে থাকত পাঠকের উপচেপড়া ভিড়। অথচ এখন অধিকাংশ লাইব্রেরিই পাঠকশূন্য। এর অন্যতম কারণ, প্রযুক্তির প্রভাব। এতে দিন দিন কমছে বইয়ের পাঠক। হাতেগোনা যে ক’জন ছাত্রছাত্রী পাঠ্যপুস্তকে মগ্ন, তাদের অধিকাংশই শ্রেণী-পাঠের পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো বইয়ে হাত দিতে চায় না। আর যারা চায়, তাদের অধিকাংশই শুধু নিম্নশ্রেণীর গল্প-উপন্যাসের পাঠক। অথচ এসব বটতলার কুরুচিপূর্ণ বইয়ে নিজেকে গড়ার মতো শেখার কোনো কিছুই নেই। বরং এসব অশ্লীলতার সহজলভ্যতায় নষ্ট হচ্ছে সভ্যতা ও সামাজিক মূল্যবোধ। অধিকতর এসব বইয়ের দ্বারা আলোর ভুবনের পরিবর্তে তরুণ প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের অতল গহ্বরে।
বই মানুষের জ্ঞানভা-ার সমৃদ্ধ করে। করে ন্যায়-নিষ্ঠা ও নীতিবান। তাই মানবজীবনে বইয়ের গুরুত্ব অবশ্যই অপরিসীম। বলা যায়, ‘জীবন ও বই যেন একই সুতোয় বাঁধা।’ অতএব, এই ধসে পড়া সমাজ ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধির পর্বতারোহণ আর ম্রিয়মাণ তারুণ্যকে শান্তির সবুজ অরণ্যে পৌঁছাতে চাই ভালোর অধ্যয়ন।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বাইতুল মামুর জামে মসজিদ, মনিয়ন্দ আখাউড়া


খবরটি পঠিত হয়েছে ৮২০ বার

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ৭ আলেম
২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে। মায়ের ভাষায় কথা বলার
বিস্তারিত
পশ্চিমে ‘আন্তঃবিশ^াসে’র বিস্তৃতি জরুরি
সম্প্রতি নবনিযুক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকটি নির্বাহী আদেশ
বিস্তারিত
সিরিয়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণীa'
বর্তমান সিরিয়ার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নাম হলো শাম। বিভিন্ন হাদিসে
বিস্তারিত
উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরানোর নতুন কর্মসূচি
জার্মানিতে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, তারা যাতে স্বেচ্ছায় দেশে
বিস্তারিত
বাংলা ভাষার নেতৃত্ব গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা
সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৩-১৯৯৯)। বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন
বিস্তারিত
ঘুম আল্লাহর নেয়ামত
ঘুম আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ নেয়ামত। পানি ছাড়া যেমন কোনো
বিস্তারিত