কোরআনে মৃত্যু ও পুনরুত্থান

প্রতিটি মানুষ মরণশীল। ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে স্থায়ী নয় কেউ-ই। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য এবং দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম, যা তোমরা করতে।’ (সূরা আল জুমা : ৮)। 
এ আয়াতের মতো পবিত্র কোরআনের প্রায় আয়াতেই মৃত্যুর পাশাপাশি পরকালের কথা আলোচনা করা হয়েছে । শুধু তাই নয়, বেশ ক’টি স্থানে মৃত্যু ও পরকালের সত্যতা ও অবশ্যম্ভাব্যতার প্রমাণ দিতে গিয়ে খুবই চমৎকার উপমা ও উৎপ্রেক্ষা পেশ করা হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের সৃষ্টিকৌশল এবং আশপাশের পরিবেশ পরিস্থিতির বিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে বারবার মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে । যেমন সূরা হজে আল্লাহ বলেন, ‘হে লোকসকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও, তবে (ভেবে দেখ) আমি তোমাদের মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংসপি- থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য। আর আমি এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর আমি তোমাদের শিশু অবস্থায় বের করি; তারপর যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পণ করো। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌঁছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান থাকে না।’ (সূরা হজ : আয়াত ৫)।
এ ধারাবাহিকতায় সূরা মুমিনুনেও একই আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপি-ে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপি- থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে নতুনরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়। এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে।’ (সূরা মুমিনুন :১২-১৬)। 
এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা পরকালের সত্যতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মানুষের জন্ম ও পরবর্তী জীবনের উপমা টেনে বুঝিয়ে দিলেন, যেভাবে আমি মানুষকে নিকৃষ্ট বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি এরপর বিভিন্ন ধাপে ধাপে পরিণত বয়সে পৌঁছিয়েছি এভাবেই আমি মানুষের মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করব। এ বিষয়টি পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন, ‘এগুলো ( এ উদাহরণ ) এ কারণে যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনি মৃতকে জীবিত করেন এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান এবং এ কারণে যে, কেয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে সন্দেহ নেই এবং এ কারণে যে, কবরে যারা আছে, আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন।’ (সূরা হজ : ৬)।
আল্লাহ অন্যত্র বিশুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করার উপমা উপস্থাপন করে বলেন, ‘আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর সে বায়ু মেঘমালা সঞ্চারিত করে। অতঃপর আমি তা মৃত ভূখ-ের দিকে পরিচালিত করি, অতঃপর তৎদ্বারা সে ভূখ-কে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করে দেই। এমনিভাবে হবে পুনরুত্থান।’ (সূরা ফাতির : ৯)। সূরা আরাফেও একই উদাহরণ এনে বলেন, ‘তিনিই বৃষ্টির আগে সুসংবাদবাহী বায়ু পাঠিয়ে দেন। এমনকি যখন বায়ুরাশি পানিপূর্ণ মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমি এ মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হাঁকিয়ে দেই। অতঃপর এ মেঘ থেকে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করি। অতঃপর পানি দ্বারা সব রকমের ফল উৎপন্ন করি। এমনিভাবে মৃতদের বের করবÑ যাতে তোমরা চিন্তা করো।’ (আরাফ : ৫৭)।
এখানেও রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করার সঙ্গে মৃত্যু ও পরকালের উপমা দিয়ে মানবজাতির চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, মহান সত্তা এ পরিবর্তন করতে সক্ষম, তিনি মৃত্যু ও পুনরুত্থানেও সক্ষম। 
এভাবে বৃষ্টি ও খেজুর বৃক্ষের উপমা টেনে বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তৎদ্বারা বাগান ও শস্য উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর, বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এমনিভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সূরা কাফ : আয়াত ৯-১১)। 
এমনিভাবে প্রথমবার সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, অতঃপর তিনি পুনরায় সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য সহজ। আকাশ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ ( সূরা রুম : আয়াত ২৭)। 
এ আয়াতে আল্লাহ প্রথম সৃষ্টির সঙ্গে পুনরুত্থানের চমৎকার দৃষ্টান্ত দিয়ে বললেন, হে মানবম-লী! আমি যেভাবে প্রথমবার সৃষ্টি করেছি সেভাবে দ্বিতীয়বারও সৃষ্টি করব এবং এটা আমার জন্য কঠিন কিছু নয়। একজন সাধারণ মানুষের জন্যও এটা বুঝে আসে যে, যে কোনো বস্তু প্রথমবার নমুনাবিহীন আবিষ্কার করা কঠিন; কিন্তু একবার অস্তিত্বে এলে এরপর আবার সৃষ্টি করা কঠিন নয়।
মৃত থেকে জীবিতকে অস্তিত্ব দেয়ার উদাহরণ টেনে রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তিনি মৃত থেকে জীবিতকে বহির্গত করেন জীবিত থেকে মৃতকে বহির্গত করেন এবং ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এভাবে তোমরা উত্থিত হবে।’ (সূরা রুম : ১৯)। তাফসিরে জালালাইনের লেখক আল্লামা জালালুদ্দিন মহল্লি (রহ.) বলেন, ‘এখানে মৃত থেকে জীবিতকে সৃষ্টি করার অর্থ হলো, মানুষকে নিষ্প্রাণ বীর্য থেকে এবং পাখিকে নিষ্প্রাণ ডিম থেকে জন্ম দেয়া।’ (সূরা রুম, তাফসিরে জালালাইন)। 
এভাবেই আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন স্থানে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়ে মানুষকে বারবার সতর্ক করেছেন। যেন তারা মরণ ও পরকালকে ভুলে পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে ডুবে পাপে লিপ্ত না হয়।


খবরটি পঠিত হয়েছে ৫৬০০ বার

কোরবানির ইতিহাস ও পুরস্কার
কোরবানি আল্লাহ তায়ালার একটি বিধান। আদম (আ.) থেকে সব নবীর
বিস্তারিত
ইসলামী জীবন দর্শনে শিশু
ইসলাম শিশুসন্তানের প্রতি কত বেশি গুরুত্বারোপ করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া
বিস্তারিত
যৌবনের শক্তিকে কোন কাজে লাগিয়েছ
মানুষ আল্লাহর একটি দুর্বল সৃষ্টি। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে
বিস্তারিত
কোরবানির ফাজায়েল ও মাসায়েল
কোরবানির ফজিলতের ব্যাপারে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত যায়দ ইবনে
বিস্তারিত
ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তির বিধান
ভিক্ষাবৃত্তি একটি অসম্মান ও ঘৃণিত কাজ। যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে সমাজে
বিস্তারিত
মদিনা জিয়ারতের আদব
অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে মদিনায় প্রবেশ করবেন। মদিনায় প্রবেশ
বিস্তারিত