রংপুর টাউন হল: একাত্তরের গণ নির্যাতন কেন্দ্র

রংপুরের সকল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী রংপুর টাউন হল। প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হলের শরীর জুড়ে। এটি শুধু একটি অডিটোরিয়াম বা হল নয়, বরং সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার। একদা মুখরিত হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিকের পদচারনায়। 
এখান থেকেই অনেক ক্ষণজন্মা পুরোধা ব্যক্তিত্ব বাঙালী সংস্কৃতির মুক্ত চিন্তার পথ দেখিয়েছেন। বহু সামাজিক, রাজনৈতিক সংস্কারের সাক্ষী হয়ে অনেক আনন্দ বেদনার কাব্য ধারণ করে রংপুর শহরের ঠিক মধ্যস্থানে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল। যার প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘রংপুর নাট্য সমাজ গৃহ’।
রংপুরের অনেক স্থাপনার সঙ্গে মিশে রয়েছে কাকিনার রাজা মহিমা মহিমা রঞ্জন রায়ের নাম। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালবাসা থেকে অনগ্রসর বাঙালিকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরীর জন্য জমি দান করেন তিনি। 
এখনও রংপুর টাউন হল, কৈলাশরঞ্জন স্কুল, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী তারি মহিমার গৌরব গাথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই অঞ্চলের নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের জন্য ১৮৮৫ সালে তৎকালীন রঙ্গপুর নাট্য সমাজ (রংপুর ড্রামাটিক এ্যাসোসিয়েশন বা আর.ডি.এ) একটি রঙ্গমঞ্চ বানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রেও এগিয়ে আসেন কাকিনার রাজা মহিমা রঞ্জন রায়। 
১৮৯১ সালে রংপুরের উৎসাহিত নাট্য সমাজকে একটি রঙ্গশালা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ১০ বিঘা ৩ কাঠা জমি দান করেন। নির্মিত হয় রংপুর টাউন হল। নিশ্চয়ই তিনি কখনও ভাবেননি নট-নটিদের শিল্পকলা প্রদর্শনের রঙ্গমঞ্চটিতে এক দিন মানব সভ্যতার বর্বরোতম গণ নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হবে। 
১৯৭১ এ যুদ্ধের বিভীষিকায় অসংখ্য মানুষকে এখানে এনে হত্যা করা হয়েছে। আর সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি ধারণ করে এখনও দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল, যেন জীবন্ত ইতিহাস।
একদিন যে রঙ্গমঞ্চে দর্শক নন্দিত হয়েছিল দত্তা, শর্মিষ্ঠা, কুলীনকুল সর্বস্ব, নীল দর্পণ, সীতা, ছেড়া তার, সিরাজুদ্দৌলা, ইডিপাস, মানময়ী গার্লস স্কুল এর মতো নাটক, আলো ঝলমল এই রঙ্গমঞ্চে নূপুরের ঝংকারে মানুষের হৃদয়ে জাগিয়েছিল সুরের ঢেউ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই রঙ্গমঞ্চে রচিত হলো পৈশাচিকতা, নৃশংসতা আর বর্বরতার এক নির্মম ইতিহাস। রংপুর নাট্য সমাজ গৃহ’র রঙ্গমঞ্চ রঞ্জিত হলো অজস্র জানা অজানা শহীদের রক্তে। 
অনেক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের জীবন্ত সাক্ষী রংপুর টাউন হলের সঙ্গে মিশে আছে অনেক বেদনা ও কষ্টের ইতিহাস। হলের ইট পাথরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে ৭১ এর স্মৃতি গাথা, বীরাঙ্গনাদের আর্ত চিৎকার, গুমোট চাপা কান্না।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এই টাউন হলকে পাক হানাদার বাহিনী বানিয়েছিল ‘গণ নির্যাতন কেন্দ্র’। 
বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনা হতো নিরপরাধ মুক্তিকামী বাঙ্গালী মানুষজনকে। যাদের একটি বড় অংশ ছিল কম বয়সী নারী। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধরে আনা সেই সব নারীদের উপরে দিনের পর দিন চলতো পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস এই টাউন হলে চলেছে মানুষ রুপি হায়েনাদের নজিরবিহীন গণ ধর্ষণ, গণ নির্যাতন আর গণ হত্যা। যে হলে একদা মানুষ ছুটে আসতো সুরের মূর্ছনায় সেই হলের গ্রীন রুম, রিহার্সাল রুম আর মঞ্চে ধর্ষিতার ক্রন্দন আর বুকফাটা আর্তনাদে আতঙ্কিত হয়ে পড়লো পুরো শহরের মানুষ। 
একাত্তরের ঐ নয় মাসে পাক হানাদারেরা তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটির সহায়তায় এই গণ নির্যাতন কেন্দ্রে ঠিক কতো জন মুক্তিকামী নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কত জন নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে, সে ইতিহাস এখনও লেখা হলো না। 
নির্মিত হলো না রংপুর অঞ্চলের অন্যতম বধ্যভূমিতে শত সহস্র শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। অথচ, হাটি হাটি পা পা করে পার হয়ে গেলো চল্লিশ বছর। এই লজ্জায় আরও কতো দিন লজ্জিত হবে মাওলানা কেরামত আলী, নুরুলদিন, শহীদ প্রফুল্ল চাকী, হেয়াত মাহমুদ, শহীদ জররেজ ভাই, শহীদ মুখতার ইলাহির স্মৃতি ধন্য রংপুর, কবে রচিত হবে একাত্তরের শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস, এই প্রশ্ন বর্তমান প্রজন্মের।
অথচ, প্রতিটি জাতীয় দিবসে এই টাউন হল ক্যাম্পাসেই অবস্থিত রংপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদী ভরে ওঠে ফুলে ফুলে। আজ ৪২ তম বিজয় বার্ষিকতেও অনেকে এসেছেন শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেছেন আমাদের জন্য একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মাহুতি দেয়া অজস্র শহীদের। কিন্তু শহীদ মিনারের ২০০ গজের মধ্যে যে বধ্যভূমি, যেখানে এখনও শোনা যায় জাতীর জন্য উৎসর্গীকৃত শত শহীদের আহাজারি, আমরা কেউ তাঁদের মনে স্মরণ করি না।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে নিজ শহরে আসা মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন এগিয়ে যান হলের পিছনের দিকের ইঁদারার কাছে। বাতাসে লাশের গন্ধে তাঁর শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তার মধ্যেই তিনি এগিয়ে উকি দিলেন ইঁদারার ভিতরে। কিন্তু যা দেখলেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। স্বপ্নেও ভাবেননি মানুষ এতোটা নৃশংস হতে পারে। ইঁদারার ভিতরে পড়ে ছিল অগণিত মানুষের মৃত দেহ। সরে আসলেন তিনি, এগিয়ে গেলেন কৃষি ফার্মের (বর্তমান শিল্প কলা একাডেমী হলের পিছনে চিড়িয়াখানায়) ঝোপ জঙ্গলের দিকে। সেখানে তখন ৩০ লক্ষ শহীদদের মধ্যে অজ্ঞাত পরিচয়ের বেশ কয়েক জনের দেহাবশেষ নিয়ে টানা হেঁচড়া করছিল কুকুর-শেয়াল। 
পুরো কৃষি ফার্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নাম না জানা শহীদদের মাথার খুলী। এতো টুকু দেখার পর আর পারেননি তিনি। সরে এসেছেন ঐ ক্যাম্পাস থেকে।
পরদিন আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আবারও যান টাউন হলে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গলিত-অর্ধ গলিত-ছিন্ন ভিন্ন দেহাবশেষ গুলো মাটি চাপা দিলেন তাঁরা। ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন ১৬৭টি মাথার খুলি। পরে মাথার খুলীগুলো টাউন হলের পাশে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরীর ভবনে ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ’র একটি কক্ষে স্থাপিত ‘মুক্তি সেনানী সংস্থা’র অফিসে। অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একদিন সে সব চুরি হয়ে গেলো। যা হতে পারতো মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।
পরবর্তীতে বন্ধ করে দেয়া হয় সেই ঐতিহাসিক ইঁদারা। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জায়গা দেয়া হলো ব্যবহারের জন্য। এখনও সেখানে সংস্কৃতির চর্চা হয়, মহড়া হয় নাটকের। কিন্তু এ প্রজন্মের ঐ সব তরুণরা জানে না তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানেনা তাদের বিচরণ ক্ষেত্রের মাটির নীচে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা শহীদের দেহাবশেষ। ভরাট করা ইঁদারায় রয়েছে নিরপরাধ মানুষের নর কঙ্কাল। উৎসাহী সাংস্কৃতিক কর্মীরা টাউন হলের পিছনে অনেক বৃক্ষের চারা রোপণ করেছে। হয়তো একদিন সেখানে ফুলও ফুটবে। কিন্তু সেই ফুলের সুবাস কি আমাদের অন্তরে নাড়া দিতে পারবে? নর কঙ্কালের উপরে বেড়ে ফুল গাছের ফুল কি তার সুবাস ছড়াতে পারবে?
দীর্ঘ ৪৭ বছরেও টাউন হল হত্যাযজ্ঞের কোন অনুসন্ধান হয়নি। হয়নি শহীদদের স্মরণে কোন স্মৃতিস্তম্ভ। যদিও বছর খানেক আগে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম বন্ধ হয়ে যাওয়া ইঁদারাটির জায়গায় একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। শুধু টাউন হলই নয় রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অনেক বধ্যভূমি। সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে এই বধ্যভূমিগুলো। সরকারীভাবে এখনই উদ্যোগ না নেয়া হলে হয়তো আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না এসব স্থানে কেমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিলেন নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। 
বিজয়ের ৪৭ বছর পূর্তিতে রংপুর অঞ্চলের মানুষের সামান্যই চাওয়া, টাউন হল বধ্যভূমিসহ অন্যান্য বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা হোক আগামী প্রজন্মের জন্য। যে সব বধ্যভূমিতে এখনও যেন কান পাতলে শোনা যায় অজস্র শহীদী আত্মার করুণ আকুতি - ‘আমরা বাঁচতে চাই! আমরা বাঁচতে চাই’।


খবরটি পঠিত হয়েছে ৬৭০০ বার

নলছিটিতে ২৫ একর জমিতে সূর্যমুখীর
নলছিটি উপজেলার কুশংগল ইউনিয়নের শেওতা গ্রামের প্রতিদিন বিকেলে মানুষের ঢল
বিস্তারিত
ঝালকাঠির কলার কদর দেশে-বিদেশে
কলা ছোট-বড় সবারই প্রিয় একটি পুষ্টিকর খাদ্য। রোগীর বিশেষ পথ্য
বিস্তারিত
সখীপুরে কবুতরে সফলতা
টাঙ্গাইলের সখীপুর পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড়ের দুলাল প্লাজা নামের একটি বাড়ির
বিস্তারিত
ফরিদগঞ্জে সেতু আছে, নেই রাস্তা
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১০নম্বর গোবিন্দপুর (দক্ষিণ) ইউনিয়নের নলডগী গ্রামে ৩০
বিস্তারিত
গাজনার বিল বহুমূখী প্রকল্পের কাজ
বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের তত্বাবধানে সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ
বিস্তারিত
১৬ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি
ঝালকাঠির গাবখান-ধানসিঁড়ি-সুগন্ধা-বিষখালী-বাসন্ডা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চরে ‘ধানসিঁড়ি ন্যাশনাল ইকো
বিস্তারিত