এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই

আ ব দু ল্লা হ বা খি ত ভাষান্তর : রা য় হা ন রা ই ন

আসলে তার কাছে আমি যেতে চাইনি। হতাশা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে এমনও নয়। বন্ধুদের পীড়াপীড়ি একটা ব্যাপার, তাছাড়া খানিকটা হয়তো কৌতূহলীও হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম আলাদা রকমের কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতি সে হয়তো আমার শরীরে প্রয়োগ করবে; সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কিছু তার গ্রহণ করব আর বাদবাকি সব বর্জন করব। যেমন পবিত্র কোরআন থেকে পাঠ নির্বাচন বা হয়তো জাফরান কালিতে আয়াত লেখা, সেটা আমি মেনে নেব। যাহোক, যদি কোনো রকম তরল সে পান করতে দেয় আগে নিশ্চিত হয়ে নেব সেটা কী। কিন্তু যদি সে গরম করা লালাভ লোহার ছ্যাঁকা, জাদুমন্ত্র বা সেরকম কুসংস্কারধর্মী কোনো প্রতিষেধক দেয় আমি কোনো ইতস্তত ছাড়াই তা প্রত্যাখ্যান করব। 
আমি আমার সিদ্ধান্তটাকে সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম, যদিও গোটা অভিযানটাই ছিল যুক্তিরহিত একটা ঘটনা। মোটকথা, এটা অসম্ভব যে, বছরের পর বছর গবেষণা করে চিকিৎসকরা যা ভালো করতে পারেনি তা একজন হাতুড়ে ডাক্তার বা কোনো ভিষক মুহূর্তে ঠিক করে দেবে। সাত বছরের বিরতিহীন মাথাব্যথা আর মানসিক অবসাদ আমার জীবনীশক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে আর বাস্তবতার ওপর আমার নিয়ন্ত্রণকেও দিয়েছে আলগা করে এবং সেটা এতটাই যে, চূড়ান্ত পর্যায়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ নতুন উপায়ে একবার চেষ্টা করে দেখব। তবু আমি ভেবে নিয়েছিলাম গোটা ব্যাপারটাকেই রাখতে হবে যুক্তির সীমার মধ্যেই।
ইবনে তরবাখের বাড়ি চিনতে কেউই ভুল করবে না। জায়গাটা ইবনে নাসর জেলায়, আল-উদ কবরস্থানের উত্তর পাশেÑ খুব সোজাসাপ্টা ঠিকানা। একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এলো। ইবনে তরবাখের ক্লিনিকে যারা গেছে তারা কবরবাসী প্রতিবেশীদের মতো নিশ্চয়ই তারা অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকার চৌকাঠে প্রথম পা-টি ফেলেছে। তার বাড়ির মুখোমুখি কবরস্থানের দেয়ালে ত্রিভুজাকার একটি দরজা, যা দিয়ে ভেতরটা দেখা যায় আর সেটা এমন একটা অনুভূতি তৈরি করে যেন সমাধিক্ষেত্রটা হাত বাড়িয়ে তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। খোলা মুখটা দিয়ে আমি দেখতে পেলাম অস্তসূর্যের ক্ষীণ আলো নগ্ন নেজদি কবরস্থানটাকে আলিঙ্গন করছে।
কড়া নাড়লাম একবার। এক বৃদ্ধা এসে দরজা খুলে দিলেন, যেন তিনি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। বাদামি চামড়ার ছোটখাটো এক মহিলা, ঘোমটা দেয়া এবং চশমা পরা। ‘ভেতরে আসেন, আবদুল্লাহ,’ কর্কশ স্বরে তিনি ডাকলেন তার আঞ্চলিক টানে, যেমনটা ইদানীং আর শোনা যায় না। তিনি তড়িঘড়ি করে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন, ততক্ষণে আমি বুঝে ওঠার চেষ্টা করছিলাম কীভাবে তিনি আমার নাম জানলেন। বাড়িটা পরিচিত অনেক বাড়ির মতোই: ভাঙাচোরা ছাদ-অলা দীর্ঘ প্রবেশঘর, সিঁড়িপথের নিচে লাগোয়া ছোট্ট অন্ধকার বাথরুম। প্রবেশপথের বাঁদিকে একটি দরজা, যা নিঃসন্দেহে চলে গেছে দেওয়ানিয়া ঘরের দিকে। কিন্তু স্ত্রীলোকটি আমাকে সেদিকে নিলেন না; তিনি এগোলেন মাঝের প্রধান উঠানটার দিকে।
খোলা উঠানটাতে প্রবেশ করা মাত্র এক বিশালদেহী কৃষ্ণাঙ্গ আমাকে সম্ভাষণ জানাল। সে ইবনে তরবাখের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। অত্যন্ত শিষ্টভাবে অভ্যর্থনা জানিয়ে আমাকে সে একটা সমতল বেঞ্চের কাছে নিয়ে গেল এবং সেটার বিপরীত দিকে সিমেন্টের উনুনের পাশে বসতে বলল, যেখানে ছাইয়ের মধ্যে আরক্ত চারকোল আলো ছড়াচ্ছিল। জলন্ত কয়লার কাছে একটা কপারের কেটলি বসানো, যেখানে লাগোয়া তাকিয়াটার উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হরেক কিছিমের পুরনো রান্নার পাত্র, কিছু বাক্স এবং একটা ময়লা কফিপাত্র। ইবনে তরবাখ যখন জ্বলন্ত উনুনের ছাই উস্কে দিলেন আমি তার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকালাম, তার আধবোজা চোখ দুটোকে মনে হলো যেন প্রাচীন বয়সের ছাইয়ের নিচেকার দুই টুকরা কয়লা।
যদিও প্রথম তাকানোর এই সময়টা ছাড়া তার চোখ দুইটি আমি আগে আর কখনও দেখিনি, তারা আমাকে ভাবাতে শুরু করল আমার জীবন সম্পর্কে, বিগত বছরগুলো এবং বহুকাল আগের বিস্মৃত ঘটনাগুলো ভেসে উঠল আমার মানসপটে। হ্যাঁ, বাড়িটা ছিল সেইসব বাড়ির মতো শৈশবে যেখানে আমি থেকেছি। আমার দুচোখ ইতস্তত ঘুরে বেড়ালো বারান্দার কড়িকাঠে আর বিচিত্র রঙে আঁকা কাঠের দরজায়। যখন আমি দরজাটার দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হলো, হঠাৎ সেটা খুলে গেল। বিভ্রম কাটাতে সেখানে দৃষ্টি স্থির করলাম। চোখ নামিয়ে নিলাম ভদ্রতাবশত, বাইরে তাকালাম কিন্তু দরজার বাইরে থেকে আসা শব্দে সেখানে দৃষ্টি চলে গেল আবার, খোলা দরজার ভেতর দিয়ে আমি দেখলাম তরুণ দেখতে এক নারী, মনে হলো হাসছেন।
আমি পুনর্বার দৃষ্টি বিনিময় এড়াতে চোখ ফিরিয়ে নিলাম এবং বৃদ্ধ লোকটার দিকে তাকালাম।
‘এশেইখ, বোধ হয় আপনার পরিবারের কেউ আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’
   ‘পরিবার মানে?’ 
   ‘ওই যে দরজার ওদিকটায়, ঘরের মধ্যে।’
   ‘ওখানে কেউ নেই,’ সে বিস্ময় নিয়ে বলল।
আমি হতভম্ব, তবু ব্যাখ্যা করার জন্যই জোর দিয়ে বললাম,
   ‘কিন্তু খোলা দরজাটা দিয়ে আমি তাকে দেখলাম।’
   ‘এখানে আমরাই কেবল।’
তার একথার মানে আমি বুঝলাম না, তাই আবারও চেষ্টা করলাম। সামনের দরজা এবং ঘরের ভেতরটা দেখিয়ে আমি বললাম, 
   ‘ওখানে ঘরের ভেতরে একজন মহিলার কথা আমি বলছিলাম।’
তিনি তার গলার স্বর উঁচিয়ে পুনরুক্তি করলেন,
    ‘এখানে আমরাই কেবল।’
তার একই কথার পুনরুক্তি আমাকে বিস্মিত করল।
    ‘আপনি কেন বারবার বলছেন যে এখানে আমরাই কেবল? দরজায় একজন বৃদ্ধা মহিলা ছিলেন যখন আমি আসি। তিনিই আমাকে ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন।’
    ‘আসলেই কি তোমাকে কেউ দরজা খুলে দিয়েছে? দরজা তো সব সময় খোলাই থাকে। আমার সব দর্শনার্থীই সেটা জানে।’
    ‘এশেইখ, আমি নিশ্চিত। গায়ের রঙ বাদামি, চোখে চশমা পরা এক নারী।’
তিনি পাল্টা জবাব দিলেন এই বলে,
    ‘তুমি ভুল করছো, বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে আমি একাই আছি।’
শুরু থেকেই আমি অনুভব করছিলাম তিনি এমন একটা আবহ তৈরি করতে চাইছেন যাতে আমার মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা হয়। তার অপাপ রহস্যময় আচরণ আমাকে অবাক করল। যাতে তার খপ্পরে পড়তে না হয় সে জন্য আমি বললাম,
     ‘ঠিক আছে, সে যাই হোক, আমি এখানে এসেছি কারণ আপনার সাহায্য আমার দরকার।’
আমি আমার সমস্যা ব্যাখ্যা করা শুরু করলাম; কিন্তু তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 
     ‘তুমি কি নিশ্চিত যে তোমাকে কেউ দরজা খুলে দিয়েছে?’
     ‘এশেইখ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি যে এখানে আছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
     ‘অনুগ্রহ করে সেই মহিলার বর্ণনা দাও তো যে তোমাকে দরজা খুলে দিয়েছিল। হতে পারে সে আমাদের প্রতিবেশী। আল্লাহ তাদের নাজাত দিন, মাঝেমধ্যে আমাকে সাহায্য করার জন্য আসে।’
সম্ভবত তিনি তার নির্মম খেলাটা থামালেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন আমি তার অন্য মুরিদদের থেকে আলাদা। নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাসের জায়গাটাকে ফিরিয়ে এনে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই মহিলার বর্ণনা দিলাম যিনি আমাকে দরজা খুলে দিয়েছিলেন। আমি শেষ করতে না করতেই তিনি বললেন,
     ‘এটা অবিশ্বাস্য।’
     ‘কেন?’
     ‘কারণ তুমি যার বর্ণনা দিলে সে আমার স্ত্রী; মারা গেছেন বিশ বছরেরও বেশি আগে।’
আমি এতটাই বিমূঢ় বোধ করলাম যে মুখে কোনো কথা জোগালো না।
     ‘তুমি কি নিশ্চিত যে ওই দরজার পেছনে একজন স্ত্রীলোককে দেখেছ?’ তিনি বললেন ঘরটার দিকে আঙুল উঁচিয়ে।
     ‘হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে।’
     ‘ঠিকই যদি তুমি দেখে থাকো তাহলে উঠে গিয়ে কেন ব্যাপারটা যাচাই করে দেখছ না?’
আমি তার ধাপ্পাবাজির একটা সুরাহা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এমনকি যদি ওখানে কেউ নাও থাকে, তাহলেও আমি তার উদ্দেশ্য সফল হতে দেব না। আমি দরজা ঠেললাম, একই রকম আওয়াজটা হলো আগে যেমন শুনেছিলাম। ঘরটা খালি, আছে শুধু কিছু পুরনো আসবাব, আমি ইবনে তরবাখের ডাক শুনলাম, ‘চলে এসো, এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।’
রাত এসে তাড়িয়ে দিচ্ছিল দিনটাকে আর উনুনের জ্বলন্ত কয়লা নিস্তেজ হয়ে এসেছিল। বুড়ো লোকটার মুখ অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। অবশিষ্ট থাকল শুধু তার কপালের উপরের একটা মৃদু আভা, কাঁপা কাঁপা আলোর একটা প্রতিবিম্ব, যা এসেছিল আমার পেছনের জানালা দিয়ে। বুঝলাম তিনি তার চেতনার ভেতর থেকে পিছলে পড়েছেন বাইরে শৈশবের স্মৃতির ভেতরে আমাকে একা ফেলেÑ দিনের একই সময়ে সেই একই ঘর, যখন ছেলেমেয়েরা ফিরবে, ঠোঁটে ঠোঁটে চিৎকার, তুচ্ছ বিষয়ের ঝগড়ায় ঘর ফেটে পড়বে, তাদের বেদনার আর্তধ্বনি, ছোটখাটো কেলেঙ্কারি, তাদের মায়েদের প্রতিজ্ঞা। দেয়ালে কিছু গ্রাফিত্থি নজরে পড়ল আমার। একটা চিহ্ন, এমন যে শোরগোল করা ছেলেমেয়েরা এই ঘর ছেড়ে চলে গেছে বহুকাল আগেÑ আমি অনুভব করলাম এটা নিশ্চিত যে, বৃদ্ধ লোকটার একসময় একটা পরিবার ছিল; কিন্তু এখন সে পরিত্যক্ত, একা।
আমি কি তাহলে বিশ্বাস করা শুরু করেছি যে, এখানে কেউ ছিল না? যা কিছু আমি দেখেছি সবই আমার কল্পনা, ইবনে তরবাখের দরজার পাশে ওৎপেতে থাকা পরিবেশেরই কারসাজি সব? অবশ্যই কোনো ধরনের পদ্ধতি আছে আমাদের দুই ধরনের বাস্তবতাকে আলাদা রাখার। সময়ের ভেতরে আলাদা রকম মুহূর্ত, যা বিশৃঙ্খলভাবে মিশ্রিত হয়ে আছে, সংগতিপূর্ণভাবে নিজেদের যুক্ত রাখার জন্য উভয়কেই যৌক্তিকভাবে ধারণ করা প্রয়োজন।
জানি না কতক্ষণ ধরে আমি এসব ভাবছিলাম, শুনলাম, বৃদ্ধ লোকটি বলছেন, ‘আবদুল্লাহ, যদি আমার ওপর তোমার বিশ্বাসই না থাকে তাহলে এখানে তুমি কেন এসেছ?’
 তার প্রশ্নে আমি বিস্মিত হলাম আর প্রস্তুত কোনো জবাবও ছিল না আমার কাছে। কিন্তু আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম, আমার বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দিয়ে বা তার বিশ্বাসকে আক্রমণ না করে এবং এরকম একটা পরস্পরবিরোধী বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার চেষ্টা করে বললাম,  
     ‘আপনি কি করে জানলেন যে আপনার ওপর আমার বিশ্বাস নেই? আপনার জ্ঞান এবং দীর্ঘ বয়সের অভিজ্ঞতায় আমার আস্থা আছে।’
     ‘আল্লাহ তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। চলো, ওঠা যাক, অন্ধকার হয়ে এসেছেÑ উঠানে সামান্য আলোও নেই। তুমি নিচে গিয়ে দেওয়ানিয়া ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করো।’
আমি উঠে গিয়ে ঘরটাতে ঢুকলাম। আগের মতোই নিষ্প্রভ আলো আর আলোর উৎসটাও স্পষ্ট বোঝা যায় না। ভেতরে ঢুকবার মুহূর্তে আমি সেই মহিলাকে দেখলাম যিনি আমাকে দরজায় অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। মনবিক্ষেপের সুযোগ না দিয়েই তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন এবং বসবার আমন্ত্রণ জানালেন। দেওয়ানিয়া ঘরটা খুব সাদাসিধা, শুধু একটা রঙচটা কার্পেট, কিছু জীর্ণ কুশন এবং একটা সুতায় বোনা বালিশ। এক কোণায় একটা উনুন, উঠোনেরটার মতোই। আমি নিজেকে ধাতস্ত করার আগেই আকস্মিকভাবে তিনি ক্ষমা চাইলেন খানিকটা দৃষ্টিকটুভাবেই, ‘ক্ষমা করবেন, আমি আপনাকে ওখানে একা ফেলে গিয়েছিলাম।’ 
    ‘শেখ আমাকে আপ্যায়ন করেছেন।’ 
    ‘কে?’
    ‘ইবনে তরবাখ।’
    ‘ইবনে তরবাখ মানে?’
    ‘ওই যে বাইরে যিনি ছিলেন, উনি কি ইবনে তরবাখ নন?’
    ‘গত কুড়ি বছরে আপনিই প্রথম পুরুষ মানুষ যাকে আমি এই বাড়িতে দেখলাম। আমি আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছি কারণ ওখানে আমার কাছে কিছু নারী দর্শনার্থী ছিলেন।’
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নির্বোধের খেলাটার তখনই ইতি টানব, বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন, তাকে দেখাচ্ছিল এমন যেন তিনি তার কুড়ি বছর বয়সে ফিরে গেছেন, নিঃশব্দ পায়ে তিনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি বিচলিত বোধ করছিলাম, কারণ তিনি যে সত্যিই সেখানে ছিলেন নিজের কাছে সে-সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে ছুঁয়ে দেখাটা হলো না। ঘরটাকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য আমি তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিলাম। উনুনটায় কয়েক দশক ধরে কারও স্পর্শ পড়েনি আর মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত পুরো অংশটা মাকড়সার জালে ঢাকা। তাকিয়ার ওপরে রাখা পাত্রটায় জং ধরেছে এবং তার প্রান্তে কালো দাগ পড়ে গেছে। কার্পেটটা ধরতেই সেটা টুকরা টুকরা হয়ে গেল। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না এবং আবারও আমি উঠানে ফিরে গেলাম। 
সেখানে আমি একা। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই, চাঁদের আলো ছাড়া অন্য আলো নেই কোনো, উঠানে চাঁদটা আলো ছড়াচ্ছে যেন স্বর্গলোক থেকে একটা প্রদীপকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত এক বাড়ি। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যাদের আমি দেখলাম, তারা কারা? কোনো স্বপ্ন ছিল না সেটা। সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। যা যা ঘটেছে আমি ভাবার চেষ্টা করলাম সেসব। অন্য কোনো ব্যাখ্যাই খুঁজে পেলাম নাÑ সবটাই বাস্তব। আমি পৌঁছেছি সূর্যাস্তের সময়। এক নারী আমাকে দরজা খুলে দিয়েছেন। আমি বাড়িটাতে ঢুকেছি। এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে যাকে আমি ভেবেছি ইবনে তরবাখ। আমি তার দিকে হাত বাড়ালেও তিনি করমর্দন করেননি, ঠায় বসে থেকেছেন নিজের জায়গায়। এতে কী বুঝব আমি? এ কি অতিলৌকিক কিছু? আমি আবারও উঠানের উনুনটার কাছে গেলাম এবং একই দৃশ্য দেখলামÑ অনেককাল আগে ফেলে যাওয়া হয়েছে উনুনটাকে, সবকিছু মাকড়সার জালে ঢাকা, পাত্রগুলোর গায়ে সময়ের আঁচড়ের দাগ, ছাইগুলোকে এমন দেখাচ্ছে যেন কোনো কালে তাতে উত্তাপ ছিল নাÑ চিরকালীন অনুপস্থিতির একটা স্থান। আমি বিভ্রান্ত বোধ করলাম। হঠাৎ তখন দরজার পেছন থেকে আসা একটা শব্দ শুনলাম। ফিরে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল আবার। জানি না কেন আমি সেদিকে দৌড়ে গেলামÑ হয়তো জীবনের কোনো চিহ্ন ধরে ফেলার জন্য যা প্রাচীন ওই বাড়িটা থেকে বহুকাল আগে লুপ্ত হয়ে গেছে।
দরজাটা স্পর্শ করামাত্র খুলে গেলÑ ভেতরে প্রবেশ করলাম, পা ফেলতেই ধুলো উড়ল। যে ঘরটাতে আমি ঢুকলাম তাতে ছিল ছেঁড়া কাপড়-চোপড় এবং একটা ইস্পাতের খাটিয়া, যে রকম একটা বিছানায় আমি প্রথম ঘুমিয়েছিলাম, একটা পুরনো তোশক যার ভেতরটা ফাঁপা এবং স্থূল ফ্যাশনের ক্ষুদে আয়না বসানো একটা দীর্ঘ বাক্স। একটা বিশাল শূন্যস্থানের বোধ আমাকে আঘাত করল, যদিও ঘরটা আসলে ছিল খুবই ছোট। পরত ওঠা মাদুর মেঝেটাকে অসমান করে ফেলেছে আর সেটাকে ঢেকে দিয়েছে অবদমনের আবহে। পায়ের চিহ্নগুলো এলোমেলোভাবে যত্রতত্র ছড়ানো, যেন যাদের পায়ের এই ছাপ তারা অনিশ্চিত ছিল যে, কোন পথে তাদের যেতে হবে আর সে কারণে তারা উড়ে গেছে বাতাসের ভেতর। 
জীর্ণ পরিচ্ছদ সমেত একটা কাপড় শুকানোর দড়িতে ঝাড়া দিতেই ধুলো উড়ল মাথার ওপর। ঘন ধুলার ঝাপটা আমার চোখ বন্ধ করে দিল এবং সবকিছুতে অন্ধকার ছড়াল। কিন্তু ক্রমেই অন্ধকার সয়ে এলো আমার চোখে আর কল্পনার মাধ্যমে একটু পরেই আমি দেখতে পারলাম। ধুলো, যার গন্ধ এখন আলাদা, আমার নাকে সুড়সুড়ি দেয়া বন্ধ করল আর আমার মধ্যে এ অনুভবটা একেবারেই থাকল না যে, ধুলাপড়া চশমার ভেতর দিয়ে দেখছি। কানে একটা শব্দ এলো যাকে হাসির শব্দ বলে মনে হলো। যদিও সেটা যে কোনো মানুষের মুখ থেকে আসা এমন মনে হলো না। এক নিরপেক্ষ ধ্বনিÑ উপহাস বা আনন্দ কোনোটাই যা প্রকাশ করে না। কাছে আসায় শব্দটাকে কান্নার মতো লাগল কিংবা তাতে ছিল এমন একটা মনস্তাপ যার জন্ম অন্য কোনো জগতে বা সেটা কোনো আকস্মিক আবেগের এক ঝাপটা, জীবনের বিপরীত সীমা থেকে আসা। সামনে কারা দাঁড়ানো তা দেখার জন্য আমি চোখ খুললাম; কিন্তু আবারও সবকিছু নীরব হয়ে গেল এবং ঘরটা ফিরে গেল তার মৃত্যুময় নিঃসঙ্গতায়। বিষাদ, আনন্দ, ভয় এসব অনুভূতির প্লাবনের মাঝখানে আমি একটা ভারসাম্য অবস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলাম; কিন্তু এসব বিরোধপূর্ণ আবেগের ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠল আতঙ্ক। দরজার দিকে যতটা দ্রুত সম্ভব দৌড়ে গিয়ে সেটা খুললাম এবং ভয়ঙ্করভাবে হতচকিত হলাম। রাস্তাটা সেখানে নেই আর। দরজাটা খুলে গেছে সরাসরি কবরস্থানের মুখে। আমি নিশ্চল হয়ে গেলামÑ কারণ একটা পা আমার ভুল গন্তব্যের দিকে চলে গেছে, অনন্তের দিকে চলে যাচ্ছিলাম আমি। একই মুহূর্তে ইবনে তরবাখের কণ্ঠস্বর শুনলামÑ ‘ফিরে এসো, এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।’

[সৌদি কথাসাহিত্যিক আবদুল্লাহ বাখিতের জন্ম রিয়াদে, ১৯৫২ সালে। কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৭৮ সালে। সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন ‘আল-ইয়ামামা’ পত্রিকায় এবং সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন ‘আল-রিয়াদ’ সংবাদপত্রে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি টেলিভিশনের জন্য লেখেন এবং অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় একজন সক্রিয় কর্মী। ‘স্ট্রিট অব এফেকশনস’ তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে বিখ্যাত।]


খবরটি পঠিত হয়েছে ৪৬৮০ বার

আবদুল কাদির বিমূর্ত এক বিস্মরণ
  আবদুল কাদির জীবনভর সাহিত্য সংলগ্ন থেকেছেন, প্রগতিপন্থার পথে থেকেছেন। তার
বিস্তারিত
গ্রন্থ আলোচনা
গল্পগুলো আমাদেরই এবারেরর একুশে গ্রন্থমেলায় দেশ পাবলিকেশন্স থেকে বের হয়েছে কাদের
বিস্তারিত
কবিতা
আদ্যনাথ ঘোষ প্রত্যাশা গরমিলে হিজিবিজি লিখি আসে না শব্দ- আসে না সুর,
বিস্তারিত
ভিন্ন ধরনের কবিতা প্রসঙ্গে
‘কবিতা’র বইয়ের চেহারা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। সাধারণত নিউজপ্রিন্টে ছাপা
বিস্তারিত
ধ্রুবতারার নতুন সংখ্যা
সাহিত্য বিবর্তন এবং বিনির্মাণে ছোটকাগজের গুরুত্ব অপরিহার্য। ছোটকাগজ ৩০’র দশক
বিস্তারিত
বসন্ত হে
মুখ ফিরিয়ে আরোগ্য ছিলে। চেয়েছিলে গীতবেদনা ফুটুক; রঙিন রক্তে, ফলে। যুবকেরা
বিস্তারিত