ইসলামের ইতিহাসে হাসপাতাল

রাসুল (সা.) এর যুগে 
এক ব্যক্তির শরীরে জখমের কারণে তার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নবীজি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে দক্ষ চিকিৎসক? তারা জিজ্ঞেস করল, নবীজি! চিকিৎসায়ও কি কল্যাণ আছে? প্রত্যুত্তরে নবীজি বললেন, যেই সত্তা রোগ দিয়েছেন, সেই সত্তা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাও রেখেছেন।
(মুয়াত্তা মালিক : ১৭৬০)
 

হাসপাতাল বা বিমারিস্তান। বিমারিস্তান মূলত ফারসি ভাষার দুইটি শব্দের সমষ্টি। বিমারি মানে রোগী আর স্তান বাংলায় স্থান। সহজ কথায় হাসপাতাল। বিমারিস্তানের সূচনাকাল থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তা ছিল পাবলিক হাসপাতালের মতো। সব ধরনের রোগের চিকিৎসা সেখানে করা হতো। 

ইসলামের সূচনালগ্নে চিকিৎসাবিজ্ঞান
আরবরা ইসলামের সূচনাকালে মূলত আরবি ভাষা এবং শরিয়তের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি বেশি যতœবান ছিল। তবে তখনকার সমাজেও সমাদৃত কিছু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ছিলেন; লোকজন তাদের শরণাপন্ন হতো। উরওয়া হজরত আয়েশা (রা.) কে বললেন, আম্মাজান! আপনার ফিকহ জ্ঞানে আমি আশ্চর্য নই। কেননা আপনি তো নবীজির (সা.) স্ত্রী এবং আবু বকর (রা.) এর মেয়ে। তবে চিকিৎসা বিষয়ে আপনার জ্ঞানে আমি আশ্চর্য! আয়েশা বললেন, দেখ উরওয়া! নবীজির শেষ বয়সে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন দেখা করতে আসত। তাঁকে রকমারি নুসখা বাতলিয়ে দিত। আমি ওগুলো প্রয়োগ করতাম। এভাবে শিখতে থাকি। 
হজরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বর্ণনা করেন, একবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। নবীজি (সা.) আমাকে দেখতে এলেন। তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে বললেন, তুমি তো হৃদরোগে আক্রান্ত। হারিস ইবনে কালদার কাছে যাও; সে চিকিৎসা করে। সাঈদ বলেন, নবীজির হাতের স্পর্শে আমার দিল ঠা-া হয়ে যায়। (সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৭৫)। 
জায়দ ইবনে আসলাম বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) এর যুগে এক ব্যক্তির শরীরে জখম হলো। জখমের কারণে তার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লোকটি আনমার গোত্রের দুইজন ব্যক্তিকে ডেকে আনল। নবীজি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে দক্ষ চিকিৎসক? তারা জিজ্ঞেস করল, নবীজি! চিকিৎসায়ও কি কল্যাণ আছে? প্রত্যুত্তরে নবীজি বললেন, যেই সত্তা রোগ দিয়েছেন, সেই সত্তা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাও রেখেছেন। (মুয়াত্তা মালিক : ১৭৬০)। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) আমার আব্বার কাছে একজন চিকিৎসক পাঠিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৬৪)। 

বিমারিস্তানের সূচনা 
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত সা’দ ইবনে মুয়াজ (রা.) খন্দক যুদ্ধে কোরাইশের ইবনুল আরাকা নামক ব্যক্তির তীর দ্বারা আক্রান্ত হন। নবী (সা.) মসজিদের পাশে একটি তাঁবু নির্মাণ করেন; যাতে সা’দকে কাছে থেকে দেখাশোনা করতে পারেন। (বোখারি : ১৭৭)। ইবনে ইসহাক বলেন, নবী (সা.) সা’দকে মসজিদের পার্শ্ববর্তী রুফাইদার ক্যাম্পে রাখেন। রুফাইদা আসলাম গোত্রীয় একজন মহিলা; যিনি আহতদের চিকিৎসা করতেন এবং তিনি স্বেচ্ছায় আহত মুসলমানদের সেবা করতেন। তো খন্দকে সা’দ ইবনে মুয়াজ আক্রান্ত হলে নবীজি বলেন, তোমরা সা’দকে রুফাইদার ক্যাম্পে নিয়ে রাখো, যাতে আমি কাছে থেকে দেখাশোনা করতে পারি। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৮৮)। এ থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) প্রথম ব্যক্তি, যিনি যুদ্ধকালীন অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প বা হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তাকি উদ্দিন আল মুকরিজি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নিয়মতান্ত্রিক বিমারিস্তান নির্মাণ করেন খলিফা ওলিদ ইবনে আবদুল মালিক ৮৮ হিজরি মোতাবেক ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে। বিমারিস্তানে তিনি চিকিৎসক নিয়োগ দেন এবং তাদের বেতন নির্ধারিত করেন। কুষ্ঠরোগীদের আটকে রাখতে তথা সেখান থেকে বের না হতে দিতে আদেশ করেন। কুষ্ঠরোগী ও দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশেষ ভাতা জারি করেন। 

বিমারিস্তানের প্রকারভেদ
বিমারিস্তানের দুইটি প্রকার আছেÑ স্থির ও চলন্ত। স্থির মানে যেসব বিমারিস্তান নির্ধারিত কোনো জায়গায় ছিল। স্থানান্তরিত হতো না। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত প্রধান শহরগুলো যেমনÑ কায়রো, বাগদাদ, দামেস্ক প্রভৃতি অঞ্চলে এ ধরনের বিমারিস্তানই ছিল বেশি। আর চলন্ত বিমারিস্তান বলতে বোঝানো হচ্ছে, যা রোগ ও রোগীর অবস্থা, পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানান্তরিত হয়। বর্তমান সময়ে এর রূপ হলো, উন্নত বিশ্বের অ্যাম্বুলেন্স। এই প্রকারের বিমারিস্তান মুসলিম খলিফা ও শাসকদের কাছে ব্যাপক প্রচলিত ছিল। বরং বলা যেতেই পারে, তারাই এ জাতীয় বিমারিস্তানের আবিষ্কার করেছেন। এসব বিমারিস্তানে রোগীর প্রয়োজনীয় সব ওষুধ, খাবার, পানীয়, পোশাক, চিকিৎসক, ভেষজ এককথায় রোগীর জন্য আরামদায়ক যাবতীয় বস্তু সরবরাহ করা হতো। 
এরকম বিমারিস্তানের একটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আবুল হিকাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুজাফফার ইবনে আবদুল্লাহ আল মাগরিবি ছিলেন একটি চলন্ত বিমারিস্তানের ডাক্তার। ৪০টি বাহনজন্তু ওই বিমারিস্তানটি বহন করত। সুলতান মাহমুদ সুলজুকির সেনাবাহিনী যেখানে তাঁবু ফেলত, সেখানে ওই বিমারিস্তান স্থানান্তর করা হতো। বিমারিস্তানের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন ইবনুল মুরাখখাম নামে পরিচিত কাজী আবুল ওয়াফা ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, পরে তিনি বাগদাদের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। আর আবুল হিকাম ছিলেন সেখানে তার সহযোগী। (ওফায়াতুল আ’য়ান, ১/৩৪৪)। 

নারী চিকিৎসক
নবীযুগে রুফাইদার কথা আগে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সব যুগে পুরুষের পাশাপাশি নারী চিকিৎসকের কথাও পাওয়া যায়। ইসলামী রাষ্ট্র তাদের সসম্মানে ভাতা প্রদান করত এবং এ কাজে উৎসাহিত করত। জয়নব ছিলেন আওদ গোত্রের প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসক। এ ব্যাপারে তার খুব সুনাম-সুখ্যাতি ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন চোখের চিকিৎসা করতে তার কাছে আসত। (তাবাকাতুল আতিব্বা, ১/১২৩)। আবু বকর ইবনে জুহরের মেয়ে ও বোন উভয়জনই ছিলেন চিকিৎসা বিষয়ে পারদর্শী। বিশেষত মহিলাদের চিকিৎসায় তাদের বেশ ভালো অভিজ্ঞতা ছিল। (প্রাগুক্ত, ২/৭০)। আন্দালুসের লুশা অঞ্চলের কাজী আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহর মেয়ে উম্মুল হাসান ছিলেন একজন ভালো মানের কারি। তা ছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কেও তার প্রচুর জানাশোনা ছিল। (আল ইহাতা ফি আখবারি গারনাতা, ১/২৬৫)। 

বিমারিস্তানের শ্রেণিবিন্যাস
বিমারিস্তানগুলো এমনিতেই পরিচালিত হতো, এমন নয়। বরং সেগুলোর জন্য ছিল বিশেষ নিয়মকানুন ও শ্রেণিবিন্যাস। প্রথমত পুরুষ ও মহিলার জন্য পৃথক শাখা ছিল। প্রত্যেক শাখায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা ছিল। এরপর উভয় শাখায় বিভিন্ন রোগের রোগীদের জন্য একাধিক হলরুম ছিল। যেমনÑ জখমের চিকিৎসা হল, চক্ষু চিকিৎসা হল, জ্বরশর্দি চিকিৎসা হল ইত্যাদি। ওইসব হলের সামনে ছিল মনোমুগ্ধকর প্রশস্ত বাগান এবং পানির ঝরনা; রোগীদের মানসিক প্রশান্তি ও উৎফুল্লতা প্রদানের জন্য। (তাবাকাতুল আতিব্বা, ১/২৩০)।

চিকিৎসকদের বেতন-ভাতা
প্রত্যেক বিমারিস্তানের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত তত্ত্বাবধায়ক থাকতেন। তিনি সব কিছুর দেখভাল করতেন। আরবিতে তাকে ‘নাজির’ বলা হতো। তার বেতন সবচেয়ে বেশি হতো।
চিকিৎসকদের মাঝেও স্তরবিন্যাস ছিল। একজন থাকতেন সব বিভাগের প্রধান। আবার প্রতিটি বিভাগের জন্যও একজন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ফাতিমিয় শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্রে চিকিৎসকদের বেতনই ছিল সবচেয়ে বেশি। এমনকি কোনো কোনো চিকিৎসকের বেতন তখনকার সময়ে হাজার দিরহামও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বস্তুত চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি লোকদের অনুপ্রাণিত করার জন্য এমনটা করা হতো। (সুবহুল আ’শা, ৪/১৮৪)।

চিকিৎসা ব্যবস্থা
বিমারিস্তানে প্রধানত দুইটি ব্যবস্থা চালু ছিল। একটি হচ্ছে, বহির্গমন ব্যবস্থা। অর্থাৎ চিকিৎসক একটি বেঞ্চে বসতেন এবং আগন্তুকের সমস্যা শুনে তদনুসারে একটি কাগজে ওষুধ লিখে দিতেন। তারপর রোগী বিমারিস্তান থেকে নিজ রোগের ওষুধ সংগ্রহ করে বাড়িতে চলে যেতেন এবং চিকিৎসকের বাতলে দেয়া ফর্মুলা অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতেন। দ্বিতীয় ব্যবস্থা হচ্ছে বিমারিস্তানের ভেতর রোগীকে সেবা দান। অর্থাৎ রোগীর রোগ নির্ণয় করত তাকে নির্ধারিত বিভাগের হলরুমে পাঠিয়ে দেয়া হতো। প্রত্যেক বিভাগেই সময় ও রোগীর সংখ্যার ব্যবধানে এক বা একাধিক চিকিৎসক নিয়োজিত থাকতেন। বস্তুত চিকিৎসকরা পালাবদল করে দায়িত্ব পালন করতেন। কারও কারও ডিউটি ছিল সপ্তাহে মাত্র দুদিন। (তাবাকাতুল আতিব্বা, ২/২৪৩)। 

বিমারিস্তান ও মেডিকেল কলেজ
মুওয়াফফাক উদ্দিন আবুল আব্বাস বলেন, আমি, হাকিম মুহাজ্জাব উদ্দিন এবং হাকিম ইমরানÑ আমরা বিমারিস্তানে অবস্থানরত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান শেষ করে শায়খ রাজি উদ্দিনের সঙ্গে মিটিংয়ে বসতাম। আমরা রোগ নির্ণয়, রোগীদের ওষুধ প্রদান ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনা করতাম। পাশাপাশি নিত্যনতুন অনেক রোগ ও রোগ নিরাময় বিষয়েও আমরা পর্যালোচনা করতাম। বস্তুত বিমারিস্তানে এভাবে আমরা চিকিৎসকরা একে অপরের অভিজ্ঞতা আদানপ্রদান করতাম এবং অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করতাম। (তাবাকাতুল আতিব্বা, ২/২৪৩)।
এখানেই শেষ নয়, বরং ইতিহাস গ্রন্থাদি থেকে এও অনুমেয় হয় যে, চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে আগ্রহী আগন্তুক শিক্ষার্থীদের এসব বিমারিস্তানে প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা প্রদান করা হতো। এ জন্য আলাদা রুমেরও ব্যবস্থা থাকত। চিকিৎসকরা শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান করতেন। বই পড়াতেন এবং বাস্তবতা দেখিয়ে প্রয়োগপদ্ধতি শেখাতেন। এক্ষেত্রে আহমাদ ইবনে তুলুন নামীয় বিমারিস্তানের উপমা পেশ করা যেতে পারে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক গ্রন্থালয়ও ছিল; যেখানে বিভিন্ন শাস্ত্রের লক্ষাধিক বই সংগৃহীত ছিল। (প্রাগুক্ত)।

লেখক : লন্ডন প্রবাসী আলেম


প্রাণীর প্রতি নবীজির মমতা
‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া :
বিস্তারিত
স্রষ্টাকে খুঁজি সাগরের বিশালতায়
বিশাল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গমালায় প্রবাহিত সমুদ্র আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি।
বিস্তারিত
দুধপানের উপকারিতা
দুধের পুষ্টিগুণ বিচারে এটি মহান আল্লাহ তায়ালার বড় একটি নেয়ামত।
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ ২২ মার্চ
বাংলাদেশের আকাশে সোমবার রজব মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। বুধবার থেকে
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত