ভিন্ন ধরনের কবিতা প্রসঙ্গে

‘কবিতা’র বইয়ের চেহারা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। সাধারণত নিউজপ্রিন্টে ছাপা হয়। আমি অন্য কাগজে এই বই ছাপতে দেখিনি। কোনো সেলাই-টেলাই নেই। ভাঁজটা বিশেষ ধরনের। সাধারণত আট পৃষ্ঠার বই, কদাচিৎ দু’একটা বই ১৬ পৃষ্ঠার। যারা এ বই পড়তে অভ্যস্ত তারা চটপট করে পৃষ্ঠা বের করেন, আমাদের মতো আনাড়িদের আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে হবে
হ্যাঁ, গল্পই প্রধান। যদিও নামে ‘কবিতা’ কিন্তু আসলে পদ্যাকারে গল্প। কবিতার সঙ্গে আত্মীয়তা শুধু ‘মিল’-এ। আর বড়জোর নিসর্গ বর্ণনায়Ñ সেখানেও একটা বিশেষ রীতি আছে, চরিত্রের বিকাশের জন্য ‘কবি’রা স্বভাবগত কারণেই নিসর্গাভিমুখী হন। মিলগুলো খুবই সাধারণ। বাংলা ছন্দের অর্থাৎ অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তÑ কোনো পদ্ধতিই সঠিকভাবে অনুসৃত হয় না। গল্পকে গদ্যসুলভ প্রবহমানতার জন্য এই রীতিকে বড়জোর ভাঙা-অক্ষরবৃত্ত বলা যেতে পারে। তবে সুরের ভঙ্গির ক্ষেত্রে স্বরবৃত্তের স্পর্শ পাওয়া যায়
কবিও বলেন, ‘কবিতা’। আর যারা শোনেন, পড়েন খুব কম লোকই, তারাও বলেন, ‘কবিতা’। তবে বিষয়বস্তু বা প্রসঙ্গেরও ভূমিকা থাকে নামকরণেÑ প্রেমের কবিতা, খুনের কবিতা, টেডি কবিতা ইত্যাদি। তরতাজা ঘটনা নিয়ে শিক্ষিতজনের শিক্ষিত কবিরা সব সময় বড় একটা লেখেন না, কিন্তু এ কবিদের বৈশিষ্ট্যই হলো সমসাময়িক ঘটনা সম্পর্কে লেখা। সেসব লেখায় ‘সত্য’ থাকবে, এমন দাবি শ্রোতারা করেন না। তবে থাকলে খুশি হন, কবিতারও কাটতি বাড়ে, পাইকাররা দুই ডজন, তিন ডজন কেনেন না, কেনেন শয়ে শয়ে। দাঁতের মাজন, মলম, তাবিজ ও গাছ-গাছালি থেকে দেশীয় মতে প্রস্তুত ওষুধপত্র বিক্রেতারাই যে পান, তাতেও নকলের ভয় থাকে। আতঙ্কিত কবি আইনের ভয় দেখান, ধর্মেরও দোহাই দেন এবং প্রথম পাতাতেই।
‘আমার এ কবিতা আমার অনুমতি ছাড়া কেহ ছাপিলে ও নকল করিলে আইন আমলে আসিবে ও তাহার জীবনে যত নেকি করিয়াছে তাহা আমার কাছে বিক্রয় হইবে ও কেয়ামত পর্যন্ত দায়ী থাকবে।’ (ক্লাসের বন্ধু ও দুঃখিনী ছেলে কবিতা)।
যিনি এই কবিতা নকল করিয়া ছাপাইবেন সরকারের আইন অনুযায়ী ২০ হাজার কবিতার পাইকারি হারে জরিমানা দিতে হইবে। আমার এই ক্ষুদ্র কবিতাখানি মাতাপিতাকে গালি শোনাইবেন না। আরও মনে রাখবেন চোরের বাড়িতে দালান ওঠে না। পাইকারি হারে ২০ হাজার কপির হিসাব যারা ‘নকল করিয়া ছাপাইবেন’ তারাই করুন, কিন্তু খুচরা দাম ৫০ পয়সা মাত্র। তবে সঙ্গে যদি আরও ‘কবিতা কেনেন, সস্তায় পাবেন’।
এসব কবিতা সুর করে পড়তে হয়। কোনো কোনো কবিতা গাইতে হয়। কেননা কবি সেখানে বিশেষ সুরের উল্লেখ করেন। ‘মজমা’ জমে ওঠে কবিতায়। কোনো মজমায় একজনই পড়ছেন এমন ঘটনা বিরলÑ দুইজনই পড়েন। দুইজন বৃত্তাকার ঘেরের দুইদিক থেকে পড়তে পড়তে আসেন। এর মধ্যে যার গলাটা শ্রোতাদের প্রিয় তাকে আবার প্রচুর সুযোগ দেয়া হয়। শ্রোতারাই রাজাÑ কাজেই শ্রোতাদের পছন্দকে সম্মান করা হয়। আবৃত্তি থেকে গাওয়ার ব্যাপার পর্যন্ত সাহস করেই লিখতে পেরেছি; কিন্তু নৃত্যের অংশটি কীভাবে লিখি? প্রথমত আমি এ ব্যাপারে একেবারেই আনাড়ি এবং যারা এ নৃত্যকর্মটি করেন, তারাও এমন কিছু শাস্ত্রীয় নির্দেশ মানেন না, আমার দৃঢ় ধারণা, জানেনও না।
প্রসঙ্গকে মূর্ত করে তোলার প্রয়োজনে দুই পায়ের গতি কখনও দ্রুত হয়, কখনও ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটেন, কখনও নিতম্ব এবং বুক নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে ওঠানামা করে এবং কাঁপে সাধারণত ‘কবিতা’ মুখস্থই থাকে প্রয়োজনে এরই ফাঁকে ফাঁকে দেখে নেন মাত্র। মুগ্ধ শ্রোতারা বেশি বেশি হাততালি দিলে কিংবা বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলে, লোকচরিত্র অধ্যয়নে নিপুণ এবং পরিহাসপ্রিয় এন্টারটেনার মৃদুকণ্ঠে ধমক দেন, ‘পকেট সামলান ভাই’। কিংবা মিয়া ভাই, লুঙ্গিটা সামলাইয়া বন (বসুন)।’ অন্যজন তখনও কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মিয়া ভাইদের অপ্রস্তুত অবস্থা অত্যন্ত উদাসীনভাবে উপভোগ করেন।
অভিনয়ের দিকটি বলা হয়নি। হ্যাঁ, অভিমান প্রতিভা অবশ্যই আছে। ঘটনাটিকে বিশেষ ভাষা-ভঙ্গিতে উপস্থিত করতে গিয়ে পাত্র-পাত্রীদের চরিত্রানুগ অঙ্গভঙ্গি অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং স্বরের ওঠানামায়, মুখ-চোখের ভঙ্গিতেই ক্রোধ, প্রণয়, হিংসা অহংকার প্রকাশ পায়। সন্ধ্যাবেলার রূপ দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু মেয়েদের কলসি কাঁকের ভঙ্গিতে সন্ধ্যা না হোকÑ শেষ বিকাল অন্তত ফোটে। দারোগা-পুলিশের হাঁটার ভঙ্গি, আদালতের আরদালি-পেয়াদা, স্কুলের প-িত এসব টাইপ চরিত্র ফোটাতে এরা পারদর্শী। তো, এই হলো ‘কবিতা’। শুধু লেখাই নয়, সঠিক পরিবেশন চাই। অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নিম্ন রুচির (?) সাধারণ মানুষ এসব কেনেন। একেকটা কবিতার বই গ্রামের এদিকের বস্তিতে ঢুকলে সেদিকের বাড়ি না ঘুরে আর আসতে পারে না। মাঠের কাজের মৌসুম সন্ধ্যায় ক্লান্তি দূর করার জন্য এই ‘টনিক‘ মন্দ নয়। বড় বড় জোতদারের বাড়ির কাচারি ঘরের বাতায় এই কবিতার বই গোঁজা থাকে। কারখানায়, ফার্মের নৈশপ্রহরীদের পকেটেও অধিক পঠনে জীর্ণ ‘কবিতা’র বই দেখা যায়। জাল বুনতে বুনতে পাটের দড়ি পাকাতে পাকাতে অঝোর বৃষ্টিধারার সঙ্গে এ গল্প জমে ওঠে। কাচারি ঘরের পেছনে বৃষ্টির ছাঁট অগ্রাহ্য করে দীনেশ সেনের কুলবালারা এ গল্পই শোনেন।
হ্যাঁ, গল্পই প্রধান। যদিও নামে ‘কবিতা’ কিন্তু আসলে পদ্যাকারে গল্প। কবিতার সঙ্গে আত্মীয়তা শুধু ‘মিল’-এ। আর বড়জোর নিসর্গ বর্ণনায়Ñ সেখানেও একটা বিশেষ রীতি আছে, চরিত্রের বিকাশের জন্য ‘কবি’রা স্বভাবগত কারণেই নিসর্গাভিমুখী হন। মিলগুলো খুবই সাধারণ। বাংলা ছন্দের অর্থাৎ অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তÑ কোনো পদ্ধতিই সঠিকভাবে অনুসৃত হয় না। গল্পকে গদ্যসুলভ প্রবহমানতার জন্য এই রীতিকে বড়জোর ভাঙা-অক্ষরবৃত্ত বলা যেতে পারে। তবে সুরের ভঙ্গির ক্ষেত্রে স্বরবৃত্তের স্পর্শ পাওয়া যায়। 
তবে গল্প আছে এবং এ গল্প জীবন থেকে নেয়া। কল্পনার দৈন্য আছে, কাহিনী নির্মাণে মুনশিয়ানারও অভাব আছে, চরিত্র চিত্রণে টাইপের প্রতি প্রধান প্রবণতাÑ তবু, এ গল্প এদেশেরই গল্প। বড় তত্ত্বকথার বুজরুকি নেইÑ অবিশ্বাস্য, অবাস্তব কাহিনী এবং এ কাহিনী ‘পুঁথি’রই আধুনিক সংস্করণ (এখানে সবিনয়ে নিজের একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেখানে এসব ‘কবিতা’র গল্প সম্পর্কে বলার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কিছু লিখতে পারিনি। প্রাসঙ্গিক হলেও পারিনি)।
‘কবিতা’র বইয়ের চেহারা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। সাধারণত নিউজপ্রিন্টে ছাপা হয়। আমি অন্য কাগজে এই বই ছাপতে দেখিনি। কোনো সেলাই-টেলাই নেই। ভাঁজটা বিশেষ ধরনের। সাধারণত আট পৃষ্ঠার বই, কদাচিৎ দু’একটা বই ১৬ পৃষ্ঠার। যারা এ বই পড়তে অভ্যস্ত তারা চটপট করে পৃষ্ঠা বের করেন, আমাদের মতো আনাড়িদের আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে হবে।
প্রচ্ছদে সাধারণত কোনো ছবি থাকে না। বর্ডারগুলো অলংকৃত। উপরের দিকে ‘এলাহি ভরসা’, তারপরের পঙ্্ক্তির প্রথমেই বাংলাদেশ, মাঝখানে অলংকরণ অথবা ফাঁকা, পরে জিন্দাবাদ। ১৩ পয়েন্ট, ১৮ পয়েন্ট, এমনকি ৩৬ পয়েন্ট টাইপে বইয়ের নাম লেখা থাকে। কোনো বইয়ের নাম একটু বড়। যেমন : ‘শ্বশুর জামাই মারে, কুকুর আসামি ধরে, জজ সাহেব বিচার করে, ২ জন দিল ফাঁসের ঘরে, ৪ জন দিল দীপান্তরে, বউ, শাশুড়ি দুইজন মারে, লতাহার বিষাদ সিন্ধু’ এই গ্রন্থের প্রচ্ছদে দুইটি ছবি আছে। জজ সাহেব মুখোমুখি বসা, মোটামতো একজন কাঠগড়ায়, কালো গাউনের একজন মাত্র উকিল, এজলাস বোঝাই লোকজন। এই চিত্রের নিচে একটা কুকুরের ছবি।
‘ক্লাসের বন্ধু ও দুঃখিনী ছেলের কবিতা’ গ্রন্থ স্রেফ একটি গোলাপ ফুল। ‘কবর হইতে মেয়েলোক চুরি’ বইতে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলির ছবির মতো একটা ছবি। ‘টেডি বেগমের নতুন টেডির নতুন কবিতা’য় কাঠের ব্লকÑ চারটি সাপ চারদিকে, মাঝখানে আতঙ্কিত এক মহিলা। ‘আনারকলি দুঃখের কাহিনী বা বিদ্যার আলো’ কবিতার বইয়ে প্রচ্ছদে সাদামাটা একটা গোলাপ ফুল। ‘ছালেহা সুন্দরীর কবিতা’য় সরস্বতী ছবি।
কোন কোন দোকানে এ কবিতা পাওয়া যাবে, অনেক সময় তারও উল্লেখ থাকে। যেমনÑ ‘মেয়ের সাথে মেয়ের বিবাহ’ বইটি পাবেন ‘১নং লঞ্চঘাট, খুলনা’। ছালেহা সুন্দরীর কবিতা ‘চৌমুহনী বড় পোলের পূর্বদিকে রশিদ মিয়ার মনিহারি দোকান (এ) পাইকারি ও খুচরা দামে পাইবেন।’
কয়েকটি বিজ্ঞাপন :
‘ইহা ছাড়া যাবতীয় নভেল, নাটক, গানের বই, ধর্মীয় গ্রন্থ এবং স্কুল-কলেজের ও মাদরাসার যাবতীয় পাঠ্যবই ও কিতাব, বহু রকম কবিতা ও চাঁদশাহী ফকিরের কবজও খুচরা ও পাইকারি দরে পাইবেন।’
মুদ্রণ প্রমাদÑ একটু নয়; প্রচুরই আছে, প্রেসের নাম ‘সোনালি’।
অনেক সময়ই ‘একটু-আধটু স্পেস’ থেকে যায়। আট পৃষ্ঠার বা ১৬ পৃষ্ঠার যাই হোক, সব সময়ই তো কবি গুনে গুনে লেখন নাÑ সেসব ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন থাকে। আরেকটি বিজ্ঞাপন কবিতার মধ্যেই।
(স্টেশনে) কবি নূরেজ্জামান বলে ওষুধের খবর, লাঙ্গল মার্কা, সাইকেল মার্কা জগতে প্রচার। গুপ্ত লোকের প্রলোভনে আর না পড়িও। সাইকেল মার্কা লাঙ্গল মার্কা খেতে না ভুলিও। লাঙ্গল মার্কা বড়ি খাইলে চির থাকে না পেটেতে (স্টেশনে ডিআইবির হাতে), আরেকটি বিজ্ঞাপন (গদ্য)। ‘প্রকাশ থাকে যে কবি নূরেজ্জামানের নিকট গ্রান্ট করা চির কৃমি এবং মেহ, প্রমেহ, পাপড়ি, অশ্ব ভগন্দর, চর্মরোগ। ঠিকানা চৌমুহনী রেল গেটে খোঁজ করুন?’
আরও একটি বিজ্ঞাপন (কবিতায়) : ‘ছোবান মিয়া সওদাগর, কিসমত বিড়ি হয় তৈয়ার, খেতে তৃপ্তি দিলে ফুর্তি পাবেন বন্ধুরা সবাই। কিসমত বিড়ি খেলে পরে, ঘরের গিন্নি আদর করে, ন্যাশনাল ব্যাংকের দক্ষিণ (?) ধারে ও শুনেন ফ্যাক্টরি মিয়ার।’
এই বিজ্ঞাপনের ভূমিকা বাণিজ্য রীতিতে কী পর্যায়ের আমি জানি না, তবে এ কবিতা যে মহিলা শুনবেন, তার ধূমপান অভ্যস্ত-স্বামীকে অন্তত একটি হলেও কিসমত বিড়ির প্যাকেট কিনতে হবে, না হলে দাম্পত্য কলহের আশঙ্কা থাকবে। নিতান্তই কৌতূহলবশে একসময় এসব কবিতা কিনেছি। খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকাÑ এসব জায়গায় একসময় বেশ ঘুরেছি। আমার সংগ্রহটিও শ’য়ের অধিক ছিল। কিন্তু ’৭১-এ এসব খোয়া যায়। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নির্ভরশীল দলিলগুলো আর পাওয়া যায় না, এ শোক সহজে যাবে না।
আমাদের সমাজের একটা বিরাট অংশকে এসব কবি সঙ্গ দান করেন, সীমিত ক্ষমতায় সমকালীন ঘটনাবলিকে নিজেদের বুদ্ধি বিবেচনা অনুযায়ী পরিবেশন করেন। অথচ আমাদের শিক্ষিত সমাজ এদের সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও আগ্রহী নয়। বিষয়টি কৌতুকেরই নয়Ñ ভাববারও। অন্তত সমাজবিজ্ঞান যারা পড়েন, অথবা সমাজ সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা যাদের পেশা, এসব অখ্যাত (?) কবিরা তাদের মনোযোগ পান না, এটা রীতিমতো বিস্ময়ের। এদের রুচির সঙ্গে সাধারণ রুচির মানুষের প্রচ- আত্মীয়তা আছে। তাদের প্রবণতা, আকাক্সক্ষা ও সৌন্দর্যবোধকে এ কবিরা সম্মানিত করেন। জনশিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা এরা পালন করেন। অপরাধী যত ক্ষমতাশীল এবং বুদ্ধিমানই হোক, এদের হাতে আর নিস্তার নেই, সত্যের জয়, মিথ্যার পরাজয়, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে- এসব তারা দেখাবেনই। এতে গল্পের হয়তো ক্ষতি হয়, কিন্তু তারা-যারা অক্ষর চেনেন না, লজিক পড়েননি, যারা সৎ, সরল এবং একটু স্থূলরুচিরÑ তারা আনন্দ পান। সংসারের নিত্য অভাবের মধ্যে এই কল্পজগতে বিচরণ করার সুযোগের জন্য তারা কবির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন।
এইসব ‘কবি’দের জন্য সাহিত্য সভায় নিচের দিকের আসন নির্ধারিত থাকে না। পত্রপত্রিকায় এদের রচনার বিজ্ঞাপন ছাপা হয় না, হৃদয়বান সমালোচক সমালোচনা করেন না বা পুস্তক-পরিচিতি লেখেন না। বেতারে বা টিভিতে এরা প্রোগ্রাম করেন না। অর্থাৎ একালের প্রচার মাধ্যমগুলোর সঙ্গে এদের কোনো পরিচয়ই নেই। যদি পরিচয় থাকত? মনে পড়ে, ‘গম্ভীরা’ যখন প্রথমবারের মতো বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস মুক্তমঞ্চে প্রচার করেছিলেন, সেইসব মহান শিল্পী কী ক্ষোভই না প্রকাশ করেছিলেন এবং কী তীব্র ব্যাঙ্গ উচ্ছল হয়ে উঠেছিল পবিত্র জিহ্বাগুলো এবং রাতারাতি সমগ্র দেশ একবাক্যে মেনে নিয়েছিল, হ্যাঁ, গম্ভীরা একটা বড় শিল্প মাধ্যম বটে। লোভ, স্বার্থবুদ্ধি এবং উচ্চাকাক্সক্ষার উঁচু দেয়াল ভেদ করে বিবেকের নির্মল শিখাটির প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা প্রদর্শন বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে সব সময় যে সম্ভব নয়, এই করুণ অভিজ্ঞতা দেশবাসীর আছে। কিন্তু জনগণের শিল্পীরা যারা বড়জোর মেডেল-টেডেল পান জনগণের কাছ থেকেইÑ সেই সত্য অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারেন। সমাজের এমন কিছু কথা আছে, যা অন্যভাবে বুদ্ধি নিয়ে এবং স্বার্থবুদ্ধির প্রেরণায় লেখেন না, এরা মগজের ভাঁজ দিয়েও দেখেন নাÑ এরা হৃদয় দিয়ে দেখেন, হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। ফলে এরা সমাজহিতের প্রেরণায় মাঝেমধ্যে যেসব দুঃসাহসী কথাবার্তা বলেন, সেসব জনগণের হৃদয়ের কথাই, জনগণের সমস্যার কথাই, ফলে তাদের বক্তব্য গুরুত্ব পায়, মনোযোগ দাবি করে। তাছাড়া এরা তো মূলত ভাষাশিল্পী। খাঁটি শিল্পীকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ কত ভালোবাসেন, এক আবদুল আলীমই তার বড় প্রমাণ।
গোত্র বিচারে এই ‘কবিতা’ কোন ঘরানার? কোনো লিখিত আলোচনা আমার চোখে পড়েনি, লোক-সাহিত্য উৎসাহী জনৈক তরুণ গবেষক আমাকে বললেন, এর নাম ‘ভাঁট’ কবিতা খুব সম্ভব সংস্কৃত ‘ভাঁড়’ শব্দ থেকে এসেছে। তিনি নিশ্চিত নন এবং তরুণ গবেষকের বিনয়ী সত্যান্বেষণও হতে পারে। স্ট্রিট লিটারেচার হিসেবে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড একসময় এ ধরনের কবিতা সংগ্রহ করেছিল। যোগ্য ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই এদিকে মনোযোগ দেবেন, এই আশা নিয়েই ‘এই পর্যন্ত রাখি হেথা। আমি অধম কী লিখিব। আর ভুলত্রুটি মাফ করিবেন। আমি গোনাহগার, দশ ভাইয়ের দোয়ার বরকতে যদি করে পার। ইতি সমস্ত।’ (ক্লাসের বন্ধু দুঃখিনী ছেলের কবিতা)। 


খবরটি পঠিত হয়েছে ৩৮০০ বার

আবদুল কাদির বিমূর্ত এক বিস্মরণ
  আবদুল কাদির জীবনভর সাহিত্য সংলগ্ন থেকেছেন, প্রগতিপন্থার পথে থেকেছেন। তার
বিস্তারিত
গ্রন্থ আলোচনা
গল্পগুলো আমাদেরই এবারেরর একুশে গ্রন্থমেলায় দেশ পাবলিকেশন্স থেকে বের হয়েছে কাদের
বিস্তারিত
কবিতা
আদ্যনাথ ঘোষ প্রত্যাশা গরমিলে হিজিবিজি লিখি আসে না শব্দ- আসে না সুর,
বিস্তারিত
ধ্রুবতারার নতুন সংখ্যা
সাহিত্য বিবর্তন এবং বিনির্মাণে ছোটকাগজের গুরুত্ব অপরিহার্য। ছোটকাগজ ৩০’র দশক
বিস্তারিত
বসন্ত হে
মুখ ফিরিয়ে আরোগ্য ছিলে। চেয়েছিলে গীতবেদনা ফুটুক; রঙিন রক্তে, ফলে। যুবকেরা
বিস্তারিত
বঙ্গ রাখাল
মুষ্ঠের পাখিগুলো কণ্ঠস্বর হারিয়ে নীলিমার সমুদ্রে ছাউনী খোঁজে প্রচ- ঘৃণায়
বিস্তারিত