পাঠকভাবনায় মজিদ মাহমুদ রচিত রবীন্দ্রনাথ: ভারতবর্ষ

রবীন্দ্রচেতনা অন্বেষণ মানেই যেন এক সাগর নোনা জলে বালুকা পুতুলের তলিয়ে যাওয়ার দশা। তবুও অন্বেষক প্রাণ এই অসীম মানুষটির চেতনাধারার উৎসমূলে পৌঁছতে চায়, মূলত নিজেকেই সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে। কেননা, রবীন্দ্র দর্শন ও সৃষ্টিকৌশল এমনি এক আশ্চর্য বলয় জগত সৃষ্টি করেছে যার আকর্ষণ তাঁর জীবদ্দশা থেকে শুরু করে আজ অবধি নানারূপে নানাভাবে চিন্তাশীল হৃদয়কে আকৃষ্ট করে চলেছে অবিরত। আর তাই, চিন্তক-আবর্তিত রবিদর্শন বলয়ের কেন্দ্রবিন্দু কেন, কবে, কীভাবে বিকশিত হয়েছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর আজও রবীন্দ্র-বিষয়ক গবেষণাগারে সবচেয়ে আলোচিত ও নিরীক্ষমাণ। রবীন্দ্ররচনাবলীর নির্যাসে যারা বহু নিরীক্ষায় রবীন্দ্রচেতনা উৎসকে শনাক্ত করার চেষ্টায় নিরলস সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, কেবল তারাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির বিকাশধারায় রবীন্দ্রচেতনা আত্মিকরণ করতে পেরেছেন হয়ত। এতক্ষণ যে কথাগুলো বলা হলো তার অনেকটাই সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাতে সকালবেলার সলতে পাকানোর মতো-এসব কথা বলা। যে কথার মূল সুরটি নিয়ে শিরোনামকে বিশ্লেষণ করাই বর্তমান লেখকের প্রয়াস।
বাংলাদেশের সাহিত্য শিলালিপিতে এমনি একজন সাধকের নাম মজিদ মাহমুদ; যিনি নিজেই একাধারে কবি, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সাংবাদিক এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে বহুমুখী কাজে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠ করে তুলেছেন স্বীয় সাধন প্রজ্ঞায়। রবি চেতনার উৎসসন্ধানী গবেষক ও উৎসুক পাঠকদের জন্য মজিদ মাহমুদ-এর ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’ গ্রন্থটি একটি সাবলীল, সহজ ও কার্যকর পাঠ্য। এই একটি বিষয়েই আরও বহুপাঠ রয়ে গেছে বই জগতে হয়ত। তবে, বর্তমান আলোচক উক্ত গ্রন্থ বিষয়েই আলোচনা সীমিতকরণে আবদ্ধ থাকবেন, কারণ উক্ত গ্রন্থটিই বর্তমান আলোচনার মুখ্য এবং সেক্ষেত্রে আর কারও চেয়ে বরং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকেই উদ্ধৃতি উল্লেখ হবে উদাহরণ ও যুক্তির তাৎপর্যতায়। কিছু ক্ষেত্রবিশেষে অবশ্যই, আলোচক তার সীমিত জানা বলয় থেকে অন্যান্য গ্রন্থঋণী থাকবেন নিজ বক্তব্য প্রতিষ্ঠায়।
সব্যসাচী মজিদ মাহমুদ রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’ গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, কর্ম ও দর্শন জগত সেচে খুব স্বল্প পরিসরে সহজে অথচ ঋদ্ধ বক্তব্যে রবীন্দ্রচেতনার উৎসবীজটি শনাক্ত করেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-চিন্তা, কর্ম ও দর্শনের জগতে এক ব্যাপক অংশ দখল করে আছে ভারতবর্ষ’ (পৃ:১৩)। রবিভাবনার সেই ভারতবর্ষকে স্পষ্ট করতে মজিদ মাহমুদ আরও পরিচ্ছন্ন করে বলেছেন, ‘মহাভারত ও রামায়ণের কবিগণ যে মহাপ্রজ্ঞা ও রূপকল্পের মাধ্যমে সমগ্র ভারতের আত্মার অনুসন্ধান করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ একক প্রচেষ্টায় তা পুনরায় সংগঠিত করে তুলতে প্রয়াস পেয়েছিলেন... তাই বলে এটি ভাবলে চলবে না যে, রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রাচীন ভারতের রূপ-রস ও দার্শনিক প্রজ্ঞা নিয়ে বিভোর ছিলেন... তাঁর ভারত ভাবনার মধ্যে সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল ও সমৃদ্ধ ভারতের একটি সুস্থ রূপকল্প ঠাঁই পেয়েছিলো’ (পৃ:ঐ)।
লেখক মজিদ মাহমুদের বক্তব্যের রেশ ধরে যখন রবি-চেতনার ভারত খুঁজতে রবীন্দ্ররচনায় অনুসন্ধান চলে তখনও একই মত পাওয়া যায়। রবীন্দ্রদৃষ্টিতে ভারতবর্ষের প্রথম আশ্চর্যতম বিকাশ ‘অরণ্য-নিঃসৃত সভ্যতা’। একদা আধুনিকতার পাল তুলে উন্নয়নের জোয়ারে ‘জাতি-রাষ্ট্র’ সভ্যতার জাহাজটি ভারতেও পৌঁছলে ইস্পাতশোভিত নগরজীবন একদিকে মানব হৃদয়বস্তুকে ক্রমেই কারখানা-মিল-যন্ত্রের দাসত্বে পরিণত করে, অন্যদিকে ব্যবসাদারের মুখোশে বাণিজ্য করতে আসা একটি বহিঃদেশীয় গোটা জাতিই বন্দুকের নলায় শাসনতন্ত্র হাতড়ে নিয়ে নিপীড়ক শাসকযন্ত্র হয়ে ওঠে; সুফলাস্তন্যের মৃত্তিকা বক্ষে জন্মেও দুর্ভাগা গণজীবন দু’বেলা বেঁচে থাকার সংগ্রামে দু’মুঠো দানা অন্বেষণে ছুটে আসে শহুরে জীবিকার্জনে।
অথচ, ভারত সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা! কিন্তু কৃষক-গণজীবন চাষ করে বণিকের আহার, হাল কষে বর্গীর জন্য কাঁচামাল এবং গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত ইত্যাদি ঋতুবন্দী সময় অক্লান্তশ্রমে পার করে কোম্পানিকুঠি ঘরে স্বীয় শ্রমের ফসল তুলে দিতে বাধ্য হয়। বিনিময় মূল্য : অন্নবস্ত্র জীবন মৌলে ভূখানাঙ্গা দিনরাত নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা। এমনি বৈষম্য আর অত্যাচারী মানসের বৃটিশশাসিত ভারত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রবিদৃষ্টি খুঁজেছে ভারত ভূখ-ের আত্মজ প্রবাহ এবং আলোচনা ও সমালোচনার উভয় ক্ষেত্রেই চাষ করতে চেয়েছিলেন একটি নব ভারতবর্ষীয় দর্শন। যার মূল সুরবীজ প্রাচীন ভারতবক্ষে রোপিতই ছিলো, যা প্রকাশিত ছিলো তপবোন গুরু-শিষ্য আদর্শ পরম্পরা শাখায়।
আধুনিকতার নামে উদ্বাস্তু জীবনে যখন ইস্পাতি চুন-সুরকির জয়যাত্রা, সার্টিফিকেট লোভী শিক্ষায় ভারতবাসীর যখন স্বীয় দেশে পরবাসী জীবন, তখনি রবিঠাকুর চেতনায় ধারণ করতে চেয়েছেন আদি ভারতের শিক্ষাদর্শনকে এবং জীবনের উৎকর্ষকে মেলে ধরতে চেয়েছেন তপোবন নিবাসী তাপসের শান্ত সংগীতে, অরণ্যনিঃসৃত ভারতীয় সভ্যতায়। তাঁর ‘শিক্ষা’ গ্রন্থের ‘তপোবন’ প্রবন্ধে নিজ চেতনাকে স্পষ্ট করেছেন, ‘আধুনিক সভ্যতালক্ষ্মী যে পদ্মের উপর বাস করেন সেটি ইঁট-কাঠে তৈরি, সেটি শহর... এই সভ্যতার সকলের চেয়ে যা-কিছু শ্রেষ্ঠ পদার্থ তা নগরের সামগ্রী... কিন্তু ভারতবর্ষের এই একটি আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেছে, এখানকার সভ্যতার মূল প্রগ্রবণ শহরে নয় বনে... সেখানে গাছপালা নদীসরোবর মানুষের সঙ্গে মিলে থাকবার যথেষ্ট অবকাশ পেয়েছিল... মানুষও ছিল, ফাঁকাও ছিল; ঠেলাঠেলি ছিল না। অথচ এই ফাঁকায় ভারতবর্ষের চিত্তকে জড়প্রায় করে দেয়নি, বরঞ্চ তার চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করে দিয়েছিল। এরকম ঘটনা জগতে আর কোথাও ঘটেছে বলে দেখা যায় না... প্রাচীন ভারতবর্ষে দেখতে পাই অরণ্যের নির্জনতা মানুষের বুদ্ধিকে অভিভূত করেনি, বরঞ্চ তাকে এমন একটি শক্তি দান করেছিল যে সেই অরণ্যবাস-নিঃসৃত সভ্যতার ধারা সমস্ত ভারতবর্ষকে অভিষিক্ত করে দিয়েছে, এবং আজ পর্যন্ত তার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়নি’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: শিক্ষা/ তপোবন)।
আত্মগঠনে উদারনৈতিক চিত্তবিকাশের জন্য আদি ভারতীয় তপোবন শিক্ষা আদর্শের সুবর্ণদিকগুলো যেমন ধরে রাখা প্রয়োজন, তেমনি বিদেশি বিদ্যাসমগ্রও নিজ দেশ গড়ার কাজে হিতৈষি হলে সে সকল বিদ্যাও আয়ত্ব করা জরুরি। রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষ চিন্তার মূল সুরটি হলো: ভারত কারো একার দেশ নয়, না কোনো ধর্মীয় পুরোহিতের শ্লোকবন্দী।
লেখক মজিদ মাহমুদ এক অসাধারণ রবি চেতনালব্ধ প্রবন্ধকার হিসেবে এ গ্রন্থে নিদর্শন রেখেছেন। রবি প্রজ্ঞার মূল সুরটিকেই ছেঁকে এনে আলোচনার স্তরে স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকচিত্তে। যার ফলে রবীন্দ্রচিন্তার রাষ্ট্র-জাতি ও ভারতীয় মানস গঠনতত্ব এবং নাগরিক শিক্ষা ও দায়িত্ববোধ চেতনার পরম্পরার মতো ধাপে ধাপে এগিয়ে এসেছে এ গ্রন্থে।
ভারতবর্ষ একটি উদার উদোর, যে গর্ভে সকলেই প্রবেশ করে আপন সত্তায় বিকশিত হতে পারে। যার ফলে এর অতীত ভূখ-ে কোনো নির্দিষ্ট ‘নেশন’ ধ্বজা ওড়েনি, বরং প্রসারিত হয়েছে বিচিত্র নৃ-গোষ্ঠি, ধর্মাচার ও সাংস্কৃতিক পালাপার্বণ। যার ফলে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সভ্যতায় আর্য ও অনার্য ধর্ম, দেবতা, জাত-পাত-বিভেদের লড়াই থাকলেও একটি মানসিক মেলবন্ধনের ভেতর দিয়ে সমাজকে গঠন করতে পেরেছিলো এবং মসনদ লড়াই সংক্রান্ত রক্তযুদ্ধ, হত্যা-বিদ্বেষের ভেতরেও যে সম্প্রীতির সমাজ নিদর্শন ভারতসভ্যতা দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো প্রাক আধুনিক যুগ পর্যন্ত-কিন্তু উন্নতির নামে বৃটিশ আগমনের তা-বী ধ্বনি সে সমাজ-নিদর্শনের সমস্ত হাড়গোড় ভঙ্গুর করে ফেলে। ইংরেজ শাসনের যাঁতাকলে মালিক-শ্রমিক, শিক্ষিত-মূর্খ হেয়জ্ঞানের টনিক মিশেলে রূপান্তরিত হতে হতে ‘নেশন ’চেতনাগারের প্রডাক্ট হয়ে বেরিয়ে আসে নব্য আধুনিক শিক্ষিত নেটিভদল। আর এরাই প্রকৃত ইংরেজ চেলা। যারা ভারত উপমহাদেশীয় উদারনৈতিক সম্প্রীতির সমাজ জীবনরীতি ভুলে সংকীর্ণবাদীতায় ভুগছিলো, তাদেরকেই দেখা গেছে বৃটিশ ষড়যন্ত্রের মূল হাতিয়ার হতে।
রবীন্দ্রবাক্যানুযায়ী, ‘ইউরোপের অন্ধ অনুকরণের দ্বারা ভারতীয় সভ্যতার খাঁটিত্ব আমরা ভুলতে বসেছি’। এই মনিষীবাক্য পরবর্তী ভবিতব্য আমরা সবাই জেনেছি, ভারত খ-ন আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নেশন চেতনা আজ ভারতবর্ষের মানচিত্ররূপ কোথায় কদ্দূর বদলে দিয়েছে কীভাবে।
আধুনিক হওয়ার নেশায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার বিদ্যাবন্যায় ভারত গর্ভ কীভাবে অলস ও শ্রমহীন পরিত্যাজ্য ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো তার উদাহরণে রবীন্দ্রনাথ কিম্বা মজিদ মাহমুদ নয়, এবার দেখা যাক ভারত জাতিপিতা মহাত্মা গান্ধীর জীবনীচারণ থেকে।
গান্ধী নিজেও কলমী শিক্ষার ভয়াবহতা কী তা উপলব্ধ হয়েছিলেন অমৃতসর কংগ্রেসে যুক্ত হওয়ার পরে, ১৯১৫ সালে সত্যাগ্রহ আশ্রম খোলার সময়। তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিতে বলেছেন, ‘আমি ধরিয়া লইয়াছিলাম, যে পথে দেশের ক্ষুধা মিটিবে সেই পথেই স্বরাজ আসিবে... আমরা সকলেই কলম চালাইতে বা ব্যবসা চালাইতে জানিতাম, কেহই কারিগর ছিলাম না... যতদিন হাতে সূতা না কাটিতেছি, ততদিন আমাদের পরাধীনতা যাইবে না-আমরা ইহা দেখিলাম। মিলের এজেন্ট-গিরি করিয়া আমরা দেশসেবা করিতেছি-বলা যায় না’ (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী/ আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ: খাদির জন্ম)।
এই কলমচালক সৃষ্টির অথর্ব শিক্ষার প্রতি রবিঠাকুর ছিলেন তুমুল বিরোধী মানস। মজিদ মাহমুদও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনাকে বিস্তৃত আলোচনায় তুলে এনেছেন এমনি ভাবে, যার নিগূঢ়ে শনাক্ত করেছেন ভারতীয় তপোবন প্রভাব কিন্তু বিশ্লেষণে শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছেন আত্মগঠনের দিকে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা ব্যাখ্যায় মজিদ মাহমুদ বলেছেন, ‘ভারতভাবনা থেকে তাঁর শিক্ষাভাবনাকে আলাদা করা যায় না। এই মনীষীর প্রায় সারাজীবন নিরবচ্ছিন্নভাবে কেটেছে শিক্ষাভাবনায়। তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়তনের মধ্যে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তিনি কখনো সফলভাবে পরিসমাপ্তি করেননি। এই ধরনের শিক্ষার মধ্যে কোথায় যেন একটি গলদ রয়ে গিয়েছিল- যা কবির কল্পনাগ্রাহী সৃষ্টিশীল মনে কোনো আবেদন তৈরি করতে পারেনি। ফলে তিনি নিজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এমন একটি বিদ্যায়তন-যার প্রকৃতি হবে মানবপ্রকৃতি ও বিশ্বপ্রকৃতির মতো সহজ সাধারণ’ (পৃ: ৫৫)। এখানে মজিদ মাহমুদ রবীন্দ্রনাথের ‘কাদম্বরী’ থেকে তপোবন শিক্ষার প্রভাব ও সৌন্দর্য মেলে ধরেছেন রবিবাক্যে, ‘... সেখানে গোরু-চরানো, গোদোহন, সমধি-কুশ-আহরণ, অতিথিপরিচর্যা, যজ্ঞবেদীরচনা আশ্রম বালক বালিকাদের দিনকৃত্য’।
তপোবন শিক্ষার প্রধান উত্তোরণ মাধ্যম হলো, সেখানে শ্রম, সমবায় ও জ্ঞান- এই ত্রিশিক্ষা চর্চার মেলবন্ধন ছিলো। মজিদ মাহমুদের ভাষানুযায়ী, ‘বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সহ-অবস্থানের এই শিক্ষাই ছিল তপোবনের শিক্ষা... আর সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি তৈরি করেছিলেন শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন আশ্রম বিশ্ববিদ্যালয়... পশ্চিমা শিক্ষার সঙ্গে একটি মারাত্মক লোভের সংযোগ ঘটেছে বলে রবীন্দ্রনাথ সর্বদা এ শিক্ষাকে সন্দেহ করতেন। লোভ থাকলে সত্যকে যথার্থ উপলব্ধি করা যায় না... ইউরোপের শিক্ষার হুবহু নকলে রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল না। আবার তপোবনের শিক্ষা নিয়েও তিনি খুব নিঃসংশয় ছিলেন, সে কথা বলা যায় না’ (পৃ: ৫৫, ৫৬, ৬২)। আর তাই, ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষাভাবনায় ভারতবর্ষের আদি তপোবনের আদর্শ এবং ইউরোপের আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন... রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল-এর বিশ্বজনীনতা। কারণ, তাঁর প্রত্যয় জন্মেছিল যে, ভারতবর্ষের মূল শিক্ষা ছিল বিশ্বকে নিজের বলে জানা... যে ইউরোপের শিক্ষার মতো ন্যাশনালিজমের দোহাই দিয়ে সবকিছুকে আলাদা করে রাখতে শেখেনি’ (পৃ: ৬২, ৬৪)।
রবীন্দ্রদৃষ্টিতে ভারতবর্ষের প্রথম আশ্চর্যতম বিকাশ ‘অরণ্য-নিঃসৃত সভ্যতা’। এই অরণ্য-নিঃসৃত সভ্যতার তপোবনে দাঁড়িয়ে প্রাচীন থেকে রবীন্দ্রকাল অবধি যে ভারতবর্ষ তাঁকে ক্রমে ক্রমে বিশ্বমানব আদর্শে বিস্তৃত করে তুলেছিলো সে ভারতবর্ষের মানচিত্র কিম্বা মানস কোনোটাই রবীন্দ্রনাথ নিজেও দেখতে পাননি বলে শান্তিনিকেতন আশ্রমকেই আশ্রয় করেছিলেন, ‘...শান্তিনিকেতনের বাইরে যেখানেই থাকুন শান্তিনিকেতকেই রবীন্দ্রনাথ ফিরে ফিরে এসেছেন, এ-ই ছিল তাঁর ঘর, এখানেই স্থিতি। আর সেই স্থিতি ভরে উঠেছিল বহুবিচিত্র সৃষ্টিকর্মে। এখানে তিনি গান গেয়েছেন, নাটক করেছেন, গল্প লিখে সেই গল্প পড়িয়ে শুনিয়েছেন সবাইকে, ছাত্রদের বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন রীতিমত ক্লাস বসিয়ে, গিয়েছেন মন্দিরে প্রার্থনা করতে, ভাষণ দিতে, বৃক্ষরোপন করেছেন নিজে, করেছেন হলকর্ষণ, এ ছাড়া গল্পসল্প, লেখা আর ছবি আঁকায় কেটেছে কত প্রহর’ (রবীন্দ্রনাথ এক অসমন্বিত দ্বন্ধ / মানসী দাশগুপ্ত)। বোলপুরের মত রূঢ়প্রকৃতির কোলে বিশ্বভারতীয় চেতনা ও মানব সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান হিসেবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় আজও প্রমাণ করে চলেছে তিনি বিদ্যালয়ের চেয়ে বিদ্যাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন মানবিক সুকুমার বিকাশে। যে বিকাশ শিক্ষাধারা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন প্রাচীন ভারতবর্ষের অরণ্য-নিঃসৃত সভ্যতার তপোবন থেকেই।
‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’ গ্রন্থের লেখক এ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষীয় চেতনাকে মেলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথেরই বিভিন্ন লেখনীর উদ্ধৃতিকে অবলম্বন করে। বিখ্যাত ‘মাহফুজা মঙ্গল’, ‘বল উপাখ্যান’ ও আরও কাব্যগ্রন্থ প্রণেতা-এক কবি মজিদ মাহমুদ নিজেও একজন সব্যসাচী বিধায় খুব অল্পের ভেতর দিয়ে এক অসাধারণ রবি-চেতনালব্ধ প্রবন্ধকার হিসেবে নিদর্শন রেখেছেন তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’ গ্রন্থে।
২০১১ সালের ৭ মে মূর্ধন্য প্রকাশন (ঢাকা) থেকে সার্ধশত রবিজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ে মোট ১৫১টি বই গ্রন্থমালা আকারে প্রকাশ পায় কবি মনজুরে মাওলা’র সম্পাদনায়। ঐ গ্রন্থমালারই একটি অন্যতম গ্রন্থ মজিদ মাহমুদ রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’। যার দ্বিতীয় (২০১২) মুদ্রণটি পাঠ-সুযোগ ঘটায় একান্ত নিজস্ব সীমিত পরিধি থেকেই ভাবনাসমষ্টিকে শব্দদানায় পাঠ-প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় নিমজ্জিত বর্তমান আলোচক। যদিও একদিকে রবি-অসীমতার বাণী; আরেক দিকে মজিদ মাহমুদ-বিশালতার সুর; এরি মাঝে আর এক ক্ষুদ্রের অনুপ্রবেশ কতখানি ছন্দতালে মেলবন্ধন সৃষ্টি করতে পারে সে বিষয় প্রশ্নাতীত। তবুও, যেহেতু বর্তমান আলোচক একজন রবীন্দ্রভক্ত পাঠক, রবীন্দ্রনাথের গান নিয়েই যার প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যার চৌকাঠ পেরোনো এবং বর্তমানে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষক হিসেবেও শিক্ষার্থীকে রবীন্দ্রচিন্তা বিষয়েই পাঠ দিয়ে থাকেন, সেহেতু দুই কালের দুই দিগন্ত ভাবনার মেলবন্ধন ঐতিহাসিক যুক্তির নিক্তি-বিচার্য হলেও অন্তত একজন রবীন্দ্র-চিন্তা চর্চাকারীর পক্ষ থেকে একটি তাগিদই উস্কে দেয়, তা হলো নিজের রবীন্দ্রনাথটি কেমন-তা জানা জরুরি।
মজিদ মাহমুদ রচিত গ্রন্থটি সেই জানার তাগিদকেই উস্কে দিয়েছে বলা যেতে পারে। আরও একটি সুক্ষ্মদর্শী-ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাও বর্তমান আলোচককে লিখতে বাধ্য করেছে তা হলো, হাল আমলে ক’জন শান্তিনিকেতন পাশ করা শিক্ষার্থীকে দেখা গেছিলো কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করতে এসে তাদেরই শিক্ষাজীবনে পড়া নোটগুলোকেই পুঁজি করে বিদ্যা দান করতে, এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে সেই নোটগুলিকেই মুখস্ত শর্তে বিতরণ করার প্রয়াসে। অবিশ্বাস্য হলেও সে দেখা সত্য! বর্তমান আলোচকও সেই একজন দর্শক-যে সেদিন শিক্ষার্থী কাতারে ছিল। তখন আপন পিতার তত্ত্বাবধানে রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রায় সত্তরভাগ পাঠ করে ফেলা সেই একজন শিক্ষার্থীর মনে যে সকল ভাবনা উদিত হওয়া অস্বাভাবিক নয় তা হলো-যে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের চাইতে বিদ্যাকেই সম্মান দিয়েছিলেন, যে রবীন্দ্রনাথ তপোবনের ন্যায় শিক্ষার্থীদের চিত্তে গতিশীলতা ঘটানোই সর্বকালের গুরুর প্রধান সাধনা জানতেন বলে শান্তিনিকেতন তৈরি করেন, যে রবীন্দ্রনাথ নোটবুক কিম্বা সিলেবাস সর্বস্ব খাঁচাবন্দি ও সার্টিফিকেট লোভনীয় শিক্ষাকে অদূরে রেখে মানবপ্রকৃতি ও বিশ্বপ্রকৃতির সহজ সাধারণ বিদ্যায়তন গড়তে চেয়েছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথের সেই আশ্রম কি আদৌ তেমনি দীক্ষা লক্ষ্যে আছে আজো?-এমনি কৌতূহল ও জানতে চাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায়কর নয়? প্রিয় লেখক বর্গে পৌঁছে যাওয়া ব্যক্তিত্ব মজিদ মাহমুদ সেখানেই উস্কে দিয়েছেন-সেই সে জন একদা শিক্ষার্থীকে, পাঠক ভাবনাবীজকে যেন অঙ্কুরোদয়ে প্রকাশিতব্য ক্ষুদ্র পল্লব উন্মিলনে ছড়িয়ে দিয়েছেন না বলা বাণীর পতিত ক্ষেত্রে। আর সে ক্ষেত্রটি উর্বর করে তাঁরই গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’। তাই নেহাতই পাঠ প্রতিক্রিয়া না হয়ে, লেখকের ওপর ভর করে পাঠকও যেন নিজের কিছু দেখা আর জানা মিলিয়ে নিতে পারে সে লক্ষ্যেই এই ক্ষুদের কলম ধরার সাহস কিম্বা আসক্তি বলা যেতে পারে। লেখকের কৃতিত্ব সেখানেই, যেখানে পাঠকভাবনাও হতে পারে উত্থিত, উন্মিলিত এবং জাগ্রত।
সব্যসাচী মজিদ মাহমুদ গ্রন্থটিতে আটটি পর্বচ্ছেদে ক্ষুদ্র পরিসরে কিন্তু ঋদ্ধ বক্তব্যে আলোচনাকে সমৃদ্ধির পথে টেনেছেন মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-চিন্তা, কর্ম ও দর্শন জগতে ভারতবর্ষ ও ভারতীয় চেতনা কীভাবে কতটুকু প্রভাব ফেলেছিলো তারই ব্যাখ্যায়। পর্বগুলো হলো :
১ রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের ইতিহাসভাবনা
২. রবীন্দ্রনাথের ভারত-অনুসন্ধান
৩. রবীন্দ্রভাবনায় ইংরেজ-শাসনে ভারতবর্ষ
৪. রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের সভ্যতা ভাবনা
৫. রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের শিক্ষাভাবনা
৬. ‘গোরা’ উপন্যাস ও রবীন্দ্রনাথের ভারতভাবনা
৭. রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষের সমবায়ভাবনা
৮. রবীন্দ্র-কবিতায় ভারতভাবনা

একাধারে একগুচ্ছ ভারতভাবনা সংক্ষেপে কিন্তু ঋদ্ধ আলোচনা সম্পন্ন ‘রবীন্দ্রনাথ : ভারতবর্ষ’ বইটি একটি আঁতুরপাঠ গ্রন্থ হতে পারে নবপাঠক ও গবেষকের কাছে, রবীন্দ্রনাথের দর্শন জগতের উৎসকে স্পষ্ট করার জন্য। সে কারণে মজিদ মাহমুদ এর ‘রবীন্দ্রননাথ: ভারতবর্ষ’ গ্রন্থটি রবীন্দ্রপাঠের শিক্ষার্থী, সমাজ-রাষ্ট্র ও রবীন্দ্রদর্শন বিষয়ক গবেষকদের জন্য একটি সহায়ক গ্রন্থ। এ গ্রন্থটি রবীন্দ্ররচনাবলীর বিবিধ নির্যাসে সুগঠিত।
তবে রবিপাঠক হিসেবে সুক্ষ্ম সমালোচনায় বলা যেতে পারে-রবীন্দ্রচেতনায় প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রভাব আলোচনায় ‘অচলায়তন’, ‘তাসেরদেশ’ ইত্যাদি আরও কিছু রচনার আলোকপাত সুযোগ ছিলো রাষ্ট্র, মানবকর্ম, গুরু ও মানবাত্মার বিকাশ চেতনা বিশ্লেষণে, যা রবি-সৃষ্টিতে আধুনিকতার সংমিশ্রণে প্রাচীন ভারতীয় তপোবন চেতনাধারারই বিচিত্র প্রকাশ। কিন্তু পাশাপাশি এও বলা যায়, যেহেতু এটি একটি গ্রন্থমালায় গাঁথানো বই, সে কারণে পরিধি-সঙ্কুলান একটি বিচার্য বিষয় থাকতে পারে প্রকাশকের কাছে। হয়ত সে সকল হেতু ঐ জাতীয় রবিসৃষ্টিসমূহ আলোচনায় আসেনি। আশা করি, এ বিষয়ের ওপর আরও বিস্তৃত লিখে সব্যসাচী মজিদ মাহমুদ পাঠক আকাক্সক্ষাকে নিবৃত করবেন পরবর্তীতে।
 

 


খবরটি পঠিত হয়েছে ১৫৪২০ বার

জহির রায়হানের জন্মবার্ষিকী শনিবার
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক জহির রায়হানের ৮২তম জন্মবার্ষিকী শনিবার (১৯
বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকী বৃহস্পতিবার
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানের একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী
বিস্তারিত
হুমায়ূন আহমেদের একাত্তর ও শহীদ
জাতীয় জীবনের দুর্যোগের পটভূমিকায় পারিবারিক বিপর্যয়ের চিত্র পিতৃহারা হুমায়ূন রচনা
বিস্তারিত
সারা দেশে কবি নজরুলের ১১৮তম
যথাযোগ্য মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালবাসায় আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশে
বিস্তারিত
শওকত ওসমানের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কথাশিল্পী ও শক্তিশালী লেখক শওকত ওসমানের উনত্রিশতম
বিস্তারিত
‘সাহিত্যের বিচারে রবীন্দ্রনাথকে কোনভাবেই বাদ
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, সাহিত্যের বিচারে রবীন্দ্রনাথকে
বিস্তারিত