জ্ঞানসাধক ইমাম জুহুরি (রহ.)

সব বিষয়ে সমান পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম জুহুরির বিশেষ রুচি ছিল হাদিসে নববির প্রতি। তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে মিলে হাদিস সাধনায় লিপ্ত হন। সহপাঠীরা হাদিস লেখা শেষ করার পর তিনি বলেন, এবার সাহাবিদের বক্তব্যও আমাদের লেখা উচিত। কিন্তু তার সঙ্গীরা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি। পরে তারাই স্বীকার করেছেন, ‘ইমাম জুহুরি সাহাবিদের হাদিস/সুনান লিখে রাখার কারণেই তিনি সফল হয়েছেন আর আমরা চরম ব্যর্থ হয়েছি

জ্ঞান মুসলমানের হারানো সম্পদ। এ সম্পদ যেখানে পাওয়া যায়, সেখান থেকে লুফে নিতে বলেছেন প্রিয়নবী (সা.)। কিন্তু আমরা ক’জনই বা জ্ঞান সম্পদের মূল্য বুঝি? জ্ঞান সাধনায় জীবন উৎসর্গ করা রাহবারে উম্মতের সংখ্যা কম নয়। আজ এমনই একজন জ্ঞানসাধকের গল্প বলব। যিনি ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত’ জ্ঞান সাধনায় মগ্ন ছিলেন। এটি ঠিক গল্প নয়, কল্পলোকের কাহিনী বা রূপকথার অবাস্তবতার রেশমুক্ত এক নির্মল সত্যজীবনের উপাখ্যান।

শৈশবের সোনালি ভোরে জ্ঞান সাধনার হাতেখড়ি হয় তার। জীবনসন্ধ্যায় তিনি হয়ে ওঠেন জগৎখ্যাত জ্ঞানী। তিনি আর কেউ নন, আমাদের ইমাম জুহুরি। শিহাব আজ-জুহুরি নামেই সবাই তাকে চিনি। রাসুল (সা.) এর নামে তার নাম। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) এর নামে তার উপনাম। মুহাম্মদ ও আবু বকর বা আবু বকর মুহাম্মদ। দাদার নাম মুসলিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব। এ শিহাবের নামেই জগৎ তাকে চেনে। জুহাইর গোত্রে জন্ম। তাই সবাই বলে শিহাব আজ-জুহুরি। (তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/১০৮)।
ইমাম জুহুরি (রহ.) ছোটবেলা থেকেই জ্ঞাননগরী মদিনায় জ্ঞান সাধকদের জ্ঞানালয়ে আসা-যাওয়া করতেন। একবার যা শুনতেন দ্বিতীয়বার আর তা শোনার প্রয়োজন হতো না। একবার যা পড়তেন, দ্বিতীয়বার আর পড়ার প্রয়োজন হতো না। এতই প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। (তাহজিবুত তাহজিব : ৯/৪৪৮)। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে একটি উদাহরণ টানতে পারি, যা থেকে ইমাম জুহুরির স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যেতে পারে। জীবনীকাররা লিখেছেন, ‘তিনি মাত্র আড়াই মাসে পবিত্র কোরআন হেফজ করেছেন। আর পুরো জীবনে হাজার হাজার হাদিস থেকে মাত্র একটি হাদিসের ব্যাপারে মনে সন্দেহ জাগে। পরে পা-ুলিপি খুলে দেখেন তিনি যেমনটি বলেছেন, হাদিস খানা ঠিক তেমনই লেখা আছে।’ (সিয়ারু আলা মিন নুবলা : ৫/৩৩)। 
শিহাব জুহুরি (রহ.) এর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে আরেকটা ঘটনা বলি। খলিফা হিশাম বিন মালিক তার কোনো এক ছেলেকে পাঠিয়েছেন জুহুরির কাছে। জুহুরি তাকে ৪০০ হাদিস লিখে দিয়েছেন। এক মাস পর খলিফা জুহুরির কাছে এসে বলেন, ‘হে জ্ঞান সাধক! আমার ছেলেকে যে কপিটি লিখে দিয়েছিলেন, তা আমি হারিয়ে ফেলেছি। দয়া করে ওই হাদিসগুলোই আবার আমাকে লেখে দিন।’ ইমাম জুহুরি পুনরায় আরেকটি কপি লেখে দিলেন। খলিফা বাড়ি এসে আগের কপিটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, একটি অক্ষরও এদিক-সেদিক হয়নি। বলাই বাহল্য যে, খলিফা এটি করেছিলেন জুহুরির মুখস্থ শক্তি ও হাদিসের যথার্থ পরীক্ষার জন্য। আর এতেই ইমাম জুহুরির স্মৃতি সম্পর্কে পিলে চমকানোর মতো তথ্য জেনে গেল বিশ^বাসী। (তাবেঈদের জীবনকথা : ১/১৫৩)।
জ্ঞানের প্রতি তার আলাদা কোনো পক্ষপাত ছিল না। হেন বিষয় নেই যা সম্পর্কে তিনি পাঠ নেননি। যখন যা পেয়েছেন তুলে নিয়েছেন অঞ্জলি ভরে। তাই তো তার যুগের সেরা জ্ঞানীরা তাকে স্বীকার করে নিয়েছেন তার অগাধ পা-িত্যের কারণে। আর পরবর্তীরা তো তার প্রতি মুহতাজ না হয়ে জ্ঞানী খেতাবই পেতে পারেননি। তার সম্পর্কে মা’মার (রহ.) বলেন, ‘তিনি যে শাস্ত্রেই মন লাগিয়েছেন তার খুঁটিনাটি বিদ্যা অর্জন করে তবে ক্ষ্যান্ত হয়েছেন।’ ইমাম লায়ছ (রহ.) বলেন, ‘আমি ইমাম জুহুরির চেয়ে বড় কোনো প-িত মানুষ আর দেখিনি। তিনি যখন কোরআনের ওপর আলোচনা করেন, মনে হবে তার চেয়ে বড় কোনো মুফাসসির বোধ হয় এ পৃথিবীতে ছিল না, আর আসবে না। আবার যখন এলমে হাদিসের ওপর কথা বলেন, তখন মনে হয়, হাদিস শাস্ত্রে তার চেয়ে বেশি জানেন এমন কেউ নেই। একইভাবে তিনি যখন নসবনামা, কবিতা, সাহিত্যসহ যে কোনো বিষয়ে কথা বলেন মনে হয়, এ বিষয়েই তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করে আসছেন। আসলে তার মতো বহুমুখী জ্ঞানী মুসলিম উম্মাহর জন্য দ্বিতীয় কেউ নেই।’ (তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/১০৮)।
সব বিষয়ে সমান পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম জুহুরির বিশেষ ঝোঁক ছিল হাদিসে নববির প্রতি। তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে মিলে হাদিস সাধনায় লিপ্ত হন। সহপাঠীরা হাদিস লেখা শেষ করার পর তিনি বলেন, এবার সাহাবিদের বক্তব্যও আমাদের লেখা উচিত। কিন্তু তার সঙ্গীরা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি। পরে তারাই স্বীকার করেছেন, ‘ইমাম জুহুরি সাহাবিদের হাদিস/সুনান লিখে রাখার কারণেই তিনি সফল হয়েছেন আর আমরা চরম ব্যর্থ হয়েছি। আর তার খালেস প্রচেষ্টার বদলেই পৃথিবীর মানুষ সাহাবিদের সুনান সম্পর্কে জানতে পারছে।’ (তাহজিবুল আসমা : ১/৯১)। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করেছেন, ‘যদি জুহুরির মতো সাধক না হতো, তবে মদিনার অনেক জ্ঞান আমরা হারিয়ে ফেলতাম।’ হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেন, ‘অতীতের সুনান সম্পর্কে শিহাব জুহুরির চেয়ে বেশি জানে এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে আমি অবগত নই।’ (তাহজিবুত তাহজিব : ৯/৪৪৮)।
এ মহান তাবেঈ থেকে ২ হাজার ২৫০টি হাদিসে নববির নূরখ- সংগ্রহ করা হয়েছে। ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, ‘শিহাব জুহুরি থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২ হাজার ২৫০।’ তিনি হাদিসের পাঠ নিয়েছেন খ্যাতনামা সাহাবিদের থেকে। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, আবদুল্লাহ ইবনে জাফর, আনাস ইবনে মালিক, মাসউদ ইবনে মাখরামা, সাহল ইবনে সা’দ, সায়িব ইবনে ইয়াজিদ এবং আবুত তুফায়ল (রা.) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার থেকে যারা হাদিস ও ফিকহের পাঠ নিয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেনÑ ইমামে আজম আবু হানিফা, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ, আতা ইবনে আবি রাবাহ, আমর ইবনে দিনার, ইমাম আওজায়ি, ইসহাক ইবনে ইয়াহইয়া কালবি (রহ.) প্রমুখ। (তাহজিব : ৯/৪৪৮)। 
জ্ঞান সাধনার পাশাপাশি শিহাব জুহুরি (রহ.) আরেকটি কারণে বিখ্যাত হয়েছিলেন সমসাময়িকদের মধ্যে। তিনি অকাতরে দান করতেন। তার কাছে যারাই আসত তাদের না খাওয়ানো ছাড়া বিদায় করতেন না। শত শত ছাত্র পালা করে পড়তে আসত। তাদের জন্য পালা করে খাবার পাকানো হতো। এ কারণে তিনি জীবনভর দারিদ্র্য ও ঋণে জর্জরিত ছিলেন। তার ছাত্র লাইছ একইভাবে জ্ঞানের মতো দানশীলতার ব্যাপারেও বলেন, ‘আমি যত মানুষ দেখেছি, শিহাব জুহুরির মতো দানবীর আর কাউকে দেখিনি। কখনও যদি তিনি মানুষকে কিছু দিতে না পারতেন তার চেহারায় বেদনা ফুটে ওঠত। বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করতেন, যেমন পাওনাদারকে যথা সময়ে পাওনা পরিশোধ না করলে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। সাহায্যপ্রার্থীকে বলতেন, ‘ভাই! দুঃখ করো না। তোমার জন্য শিগগিরই ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।’ এভাবে সান্ত¡না দিয়ে মানুষকে বিদায় করতেন। (ইসরুত তাবিয়ি : ১২৮)।
শিহাব জুহুরি সম্পর্কে মজার ঘটনা অনেক। আপাতত একটি বলে বিদায় নেব। এ মহান জ্ঞানসাধক সংসার ও স্ত্রী-ছেলের প্রতি উদাসীন হবেন স্বাভাবিক কথা। আর এর জন্য স্ত্রীর ‘মধুর ঝাড়ি’ খাওয়াও অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। এমনটাই হতো তার সঙ্গে। তার স্ত্রী প্রায় বলতেন, ‘আল্লাহর কসম! এসব বইয়ের জঞ্জালের চেয়ে কোনো সতীন যদি কপালে জুটত তাও ভালো ছিল।’ (ওয়াফাতুল আয়ান : ১/৪৫১)। সতীন কপালে জোটা কি আসলেই ভালো কিছু? মনে হয় না। তবে তিনি যেহেতু কসম করে বলেছেন তাই তার কথাকেই সত্য ধরে নিলাম।
১২৪ হিজরিতে এ মহান মনীষী রফিকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানান। শাম ও ফিলিস্তিনির সীমান্তবর্তী ‘শাগাব’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। তিনি অসিয়ত করেন তাকে যেন ঠিক রাস্তার পাশে দাফন করা হয়। যাতে করে পথচারীরা কবর দেখে একটু দাঁড়ায় এবং দোয়া করে। আর দোয়ায় কবরস্থ ব্যক্তির কথা স্মরণ করে। (ইকদুল ফরিদ : ৬/২৫১)। 
এ দিক থেকে আমাদের জাতীয় কবির সঙ্গে তার অনেকটা মিল আছে বলা যায়।


খবরটি পঠিত হয়েছে ৫৬৪০ বার

মদিনা জিয়ারতের আদব
অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে মদিনায় প্রবেশ করবেন। মদিনায় প্রবেশ
বিস্তারিত
তোমার ভেতরে বিরাজে আবেহায়াত
বনের ধারে পাহাড়ের ঝরনাবাহিত একটি কুয়া। পিপাসার্ত পশুপাখিরা সেই কুয়ায়
বিস্তারিত
মিনা
‘মিনা’ শব্দটি আরবি। মিনা অর্থ হলো জবেহ বা জবাই করার
বিস্তারিত
ঐতিহ্যের হজে বৃহত্তর উদ্দেশ্য
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আযরাক উপত্যকা অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন বললেন, এটি
বিস্তারিত
আসুন, অসহায়ের পাশে দাঁড়াই
আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার ইবাদত করার জন্য।
বিস্তারিত
হজের সফরে মৃত্যুও সৌভাগ্যের
হজ একটি পবিত্র ইবাদতের নাম। আল্লাহপ্রেমের চূড়ান্ত উন্মাদনার প্রতিফলন ঘটে
বিস্তারিত