মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

বিরোধ ও বিভক্তি ছুড়ে ফেলুন

রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের মাঝে শুধু ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু সম্প্রীতি টেকসই ও ভালোবাসা স্থায়ী করার জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন, এর যতœ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীদের প্রেরণ করেছেন দ্বীন, সম্প্রীতি ও একতা প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা ছুড়ে ফেলার জন্য। ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।’ (সূরা শূরা : ১৩)। তাই তো মদিনা মুনাওয়ারায় যখন নবী (সা.) এর পাক চরণ পড়ে, তাঁর দাওয়াতের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল মসজিদে কুবা নির্মাণ এবং আনসার-মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এতে লোকেরা জাহেলি যুগের বৈরিতা থেকে ইসলামী যুগের মৈত্রীতে রূপান্তরিত হয়। বাস্তুচ্যুত মুসাফিররা হয়ে যায় আনসারীদের ভাই। তারা শুরু করেন একে অপরের সঙ্গে আবাস ও সম্পদ ভাগাভাগি করতে। ‘যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে তারা তাতে অন্তরে ঈর্ষাবোধ করে না। বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। বস্তুত যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)।  
রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের মাঝে শুধু ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু সম্প্রীতি টেকসই ও ভালোবাসা স্থায়ী করার জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন, এর যতœ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর ফজিলত বর্ণনা করেছেন। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি তার এক ভাইকে দেখার জন্য অন্য গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। তার চলার পথে আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে পাঠান। ফেরেশতা তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেন, এ গ্রামে আমার এক (দ্বীনি) ভাইকে দেখতে যাই। ফেরেশতা বলেন, তার ওপর কি তোমার কোনো অবদান আছে, যা তুমি ভোগ করো? লোকটি বললেন, না। তবে আমি তাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য মহব্বত করি। ফেরেশতা বললেন, ‘আমি তোমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দূত হিসেবে সুসংবাদ দিতে এসেছি। আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমনটি তুমি তোমার ভাইকে ভালোবাস আল্লাহর ওয়াস্তে।’ আর মনে মনে মিলন ও প্রীতির মজবুতি সম্ভব শুধু পরস্পরে নম্রতা, ছাড় দেয়া ও খুশি মনে সেবার মাধ্যমে। তাই তো নবী (সা.) মুআজ ও আবু মুসা আশআরি (রা.) কে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, তাড়িয়ে দিও না; স্বপ্রণোদিত হয়ে কাছে আস, বিরোধ করো না।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 
একতার অন্যতম নেয়ামত হলো তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থ থেকে একটুখানি নেমে আসা। রাসুলুল্লাহ (সা.) হুনায়ন বিজয়ের পর গনিমতের মাল বণ্টন করেন। এতে তিনি হৃদয় আকর্ষণের অভিপ্রায়ে নওমুসলিমদের অগ্রাধিকার দেন। এটি লক্ষ্য করে আনসারীদের মনে কিছুটা আঁচড় লাগল। নবী (সা.) যখন লক্ষ্য করলেন, তাদের মনে করিয়ে দিলেন হেদায়েত এবং একতার নেয়ামতের কথা। বললেন, ‘হে আনসার সম্প্রদায়! আমি কি তোমাদের পথহারা পাইনি? পরে আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদের হেদায়েত করেছেন। আমি কি তোমাদের বিচ্ছিন্ন পাইনি? তারপর আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদের বিত্তশালী করেছেন। আমি কি তোমাদের বিচ্ছিন্ন পাইনি? তারপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের সংঘবদ্ধ করেছেন?’ আনসারীরা তাঁর কথার স্বীকৃতি দিলেন। অতঃপর নবী (সা.) তাদের মন খুশি করে বললেন, ‘তোমরা কি এতে খুশি নও যে, লোকেরা সম্পদ নিয়ে চলে যাচ্ছে আর তোমরা নিজেদের আবাসে ফিরছো আল্লাহর রাসুল (সা.) কে নিয়ে? আল্লাহর কসম, তোমরা যা নিয়ে ফিরছো, তা অনেক উত্তম তারা যা নিয়ে ফিরছে তা থেকে।’ আনসারীরা বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল (সা.), আমরা সবাই সন্তুষ্ট। (বোখারি ও মুসলিম)। 
নবী (সা.) এর নীতি ছিল, যে কোনো বিরোধকে তার আঁতুড়েই শেষ করে দেয়া। বিভক্তির সলতে জ্বলে ওঠার আগেই নিভিয়ে দেয়া। যাতে একতায় কোনো বিঘœ না ঘটে। সহিহাইনে জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা এক যুদ্ধে নবী (সা.) এর সঙ্গে ছিলাম। এক মুহাজির একজন আনসারীর পশ্চাদাঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গে আনসারী চিৎকার করে বললেন, হে আনসার! মুহাজিরও ডাক দিলেন, হে মুহাজিররা! তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কী ব্যাপার! জাহিলি যুগের মতো হাঁকডাক করছো কেন?’ তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! একজন মুহাজির একজন আনসারীর পশ্চাতে আঘাত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমরা এ ধরনের হাঁকডাক ছেড়ে দাও। কেননা এ তো নিন্দনীয় কাজ।’ 
এমনকি আমরা নবী (সা.) এর মতো একজন কোমল ও দয়ার্দ্র মানুষকেও দেখি জাতির বিভক্ত প্রত্যাশী এবং জাহেলি সেøাগানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলছেন। কারণ তিনি জানতেন বিভক্তি, বিরোধ ও ফেতনার আগুন একবার জ্বলে উঠলে তা নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। সহিহাইনে আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একবার আমার ও আমার এক শ্রমিক ভাইয়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। তার মা ছিল অনারব। এক পর্যায়ে আমি তাকে তার মা তুলে গালি দিই। সে বিষয়টি রাসুল (সা.) কে জানাল। আমার সঙ্গে রাসুলের সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, ‘হে আবু জর, তুমি তার মা তুলে গালি দিয়েছ? তোমার মধ্যে তো জাহেলিয়াত রয়েছে!’ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, মানুষ কাউকে গালি দিলে তো তার মা তুলেই গালি দিয়ে থাকে। তিনি আবার বললেন, ‘হে আবু জর, তোমার মধ্যে জাহিলিয়াত রয়ে গেছে!’ এভাবেই রাসুল (সা.) মোমিনদের হৃদয় থেকে বংশগরিমা নির্মূল করেছেন। প্রত্যেকেই আদম থেকে। আর আদম মাটি থেকে। সুতরাং অনারবের ওপর আরবের কোনো প্রাধান্য নেই। কালোর ওপর সাদার কোনো অগ্রাধিকার নেই। কেবল তাকওয়া ছাড়া। ‘হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেজগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)। 
নবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, যে অপর ভাইয়ের জন্য নিজের মতোই কল্যাণ কামনা করে না তার ঈমান পূর্ণ নয়। তিনি ওয়াদা করেছেন, পরস্পর ভালোবাসায় আবদ্ধ ভাইয়েরা কেয়ামতের দিন আলোর মিনারে থাকবে এবং আল্লাহ তাদের নিজের আরশের ছায়া দেবেন, যেদিন এ ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেয়েছেন উম্মতের নিরাপত্তা ও একতা, বন্ধনের দৃঢ়তা এবং কালেমার অভিন্নতা। 

১৭ রজব ১৪৩৮ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


খবরটি পঠিত হয়েছে ৩৭৪০ বার

আল্লাহর ওহি থেকে মুখ ফিরিয়ে
বর্তমান মুসলিম জাতির অন্দরে দৃষ্টিপাতকারী মাত্রই দেখতে পান কী তাদের
বিস্তারিত
শ্রমিকের প্রাপ্য নিশ্চিত করে ইসলাম
আজকের শ্রমিকদের অবস্থা প্রাচীনকালের দাসদের সামাজিক মর্যাদার চেয়েও হীন হয়ে
বিস্তারিত
অসুস্থতাও একটি নেয়ামত
দুনিয়ায় আল্লাহ প্রদত্ত অসংখ্য নেয়ামতরাজির মাঝে আমরা ভাসমান। রাতের অন্ধকার,
বিস্তারিত
আলোর পরশ
আল কোরআন হজরত আবু মাসঊদ আনসারী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
বিস্তারিত
দাসী থেকে নবীজির স্ত্রী সাফিয়্যা
আপনাদের কি মনে আছে ওই ঘটনার কথা। এক যুদ্ধে মুসলমান
বিস্তারিত
আলোর পরশ
আল কোরআন আমি তাকে বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছি এবং সদাসঙ্গী পুত্রবর্গ দিয়েছি
বিস্তারিত