দারিদ্র্য এক পরীক্ষা

আল কোরআনে আল্লাহ পাক বলেনÑ ‘তেমরা জাহাদুল বালা (অর্থাৎ কম সম্পদ এবং অধিক সন্তান এমন অবস্থা) থেকে আমার কাছে পানাহ (পরিত্রাণ) চাও।’ রাসুলে করিম (সা.) এ বলে দোয়া করতেনÑ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল কুফরি ওয়াল ফাকরি।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমি কুফর, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই।’ তিনি আরও দোয়া করতেনÑ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল ফাকরি ওয়াল কিল্লাতি ওয়াযযিল্লাতি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সম্পদের স্বল্পতা এবং লাঞ্ছনা থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই।’ দারিদ্র্য থেকে পানাহ অর্থাৎ পরত্রাণ পাওয়ার জন্য বান্দাদের প্রতি প্রার্থনার নির্দেশ আল কোরআনের অসংখ্য আয়াতে আছে। নবী করিম (সা.) এর অনুরূপ অসংখ্য দোয়া আছে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায়।
দারিদ্র্যকে কেন বালা বা পরীক্ষা বলা হয়েছে, তার অবশ্য কারণ রয়েছে। অধিক দারিদ্র্যের মধ্যে নিমজ্জিত থাকলে কোনো মহৎ কাজে আত্মনিমগ্ন থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি এবাদত-বন্দেগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কঠিন দারিদ্রের চিন্তায় কখনও কখনও কোনো মহৎ কাজের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। হয়তো সেজন্যই নবী করিম (সা.) কে চরম দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এক সময় আল্লাহ মাবুদ তাঁকে হজরত খাদিজার (রা.) সম্পদ দিয়ে নিশ্চিন্ত করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে উদ্দেশ করে এরশাদ করা হয়েছেÑ ‘ওয়া ওয়াজাদাকা য়াইয়াল ফা আগ্না’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে অভাবগ্রস্ত পেয়েছিলেন, তারপর আপনাকে সম্পদশালী করে দিয়েছেন।’ অবশ্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই সম্পদ কখনও নিজের ভোগের জন্য ব্যবহার করেননি। 
বিশেষ মহৎকর্ম সিদ্ধির জন্য যে সম্পদের প্রয়োজন হয়, কখনও কখনও তার প্রমাণ হজরত আবু বকর (রা.)। তৎকালীন আরবের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি বলে গণ্য ছিলেন। তিনি তাঁর সব সম্পদ ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তৎকালীন সাধারণ মুসলমান জাতির জন্য এ সম্পদ অত্যন্ত উপকারী হয়। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) আনন্দচিত্তে বর্ণনা করেনÑ ‘মা নাফায়ানি মালুন কামালি আবি বকরি।’ অর্থাৎ ‘আবু বকরের (রা.) সম্পদের মতো আর কারও সম্পদ আমার উপকারে আসেনি।’ অর্থাৎ সম্পদ থাকা ভালো, যদি তা সৎপথে উপার্জিত এবং সৎপথে ব্যয়িত হয়।
হজরত রাসুলে পাক (সা.) অনেক দোয়ার মধ্যে মানুষের জন্য সচ্ছলতা, অর্থাৎ দারিদ্র্য মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে কামনা করতেন। হজরত আনাস (রা.) ছিলেন রাসুলে পাকের (সা.) একজন বিশ্বস্ত খাদেম। তিনি একজন দরিদ্র ব্যক্তি ছিলেন। রাসুলে পাক তাঁর জন্য এ বলে দোওয়া করতেনÑ ‘আল্লাহুম্মা আক্ছির মালাহু।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে (হজরত আনাস (রা.) কে) প্রচুর সম্পদ দাও।’
সুতরাং এটাই সত্য যে, ধনসম্পদের মালিক হওয়া অপরাধ নয়। তবে সেটাই অপরাধ, যদি ওই সম্পদ অন্যায় পথে অর্জিত হয় এবং অন্যায় পথে ব্যয়িত হয়। তেমনি দরিদ্র অবস্থায়ও থাকা উচিত নয়। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি নিয়ে আপন কর্মগুণে দারিদ্র্য মোচনের চেষ্টা করা উচিত। সম্পদ অর্জন করতে হবে ইসলামের নির্দেশিত হালাল পথে। আর এ ধরনের অর্জনের পর পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার প্রতি শোকর করা উচিত। 
দরিদ্র ব্যক্তিদের দারিদ্র্য দূরীকরণে সম্পদশালী ব্যক্তিদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। দারিদ্র্য সম্বন্ধে নানা ধরনের মতবাদ প্রচলিত। তাতে দেখা গেছে, দারিদ্র্যকে কেউ কেউ অভিশাপ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, অপরিবর্তনযোগ্য অদৃষ্ট। আবার কেউ বলেছেন, সংগ্রামের মাধ্যমে এ দারিদ্র্য পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু তারা সবাই যে যা-ই বলুন না কেন, দারিদ্র্য দূরীকরণে সম্পদশালী ব্যক্তিদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। 
এ দায়িত্ব আর কর্তব্যের মধ্যে প্রথম হচ্ছে দান। ধনী ব্যক্তি তার জমানো অর্থ থেকে দরিদ্র, অসচ্ছল ব্যক্তিকে সন্তুষ্টচিত্তে দান করবে। এটাই ইসলামের বিধান। এ ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দানে দাতার সম্পদ কমে না, বরং আরও বেড়ে যায় বলে আল কোরআনের একাধিক সূরায় উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে সম্পদশালী ব্যক্তির সম্পদের একাংশের মাধ্যমে দরিদ্র ব্যক্তির দারিদ্র্য লাঘবের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। একাধিক হাদিসেও এ ধরনের উল্লেখ আছে। বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি বিধবা ও দুঃখীদের তত্ত্বাবধান করে এবং তাদের দুঃখ মোচনের চেষ্টা করে, সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে এবং হজের জন্য পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে থাকে।’
দরিদ্রকে দান করার মাধ্যমে আপন সম্পদ বৃদ্ধি ছাড়াও অসংখ্য পরিমাণে পারলৌকিক লভ্যতার কথা ইসলাম ধর্মে বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ দরিদ্রজনের দারিদ্র্য মোচনে সহায়তা করা। 
দরিদ্রজনের দারিদ্র্য মোচনের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের সাম্য সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আর্থিক বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্র জনগণের মধ্যে সচ্ছলতা সৃষ্টিতে উৎসাহ দিয়েছে ইসলাম। তাই স্বেচ্ছাদান ছাড়াও কিছু বাধ্যতামূলক দানের জন্যও কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে জাকাত ও ফিতরা অন্যতম। ধনসম্পদশালী ব্যক্তিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের ধনসম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ জাকাত হিসেবে দরিদ্রকে প্রদান করার জন্য। 
এতে সামান্য অংশ দানের ফলে দাতার সম্পদ তেমন কমবে না, কিন্তু দান গ্রহণকারী ব্যক্তির দারিদ্র্য অনেকখানি লাঘব হবে। এ জাকাত না দেওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিকে একদিকে যেমন তার পরিণতি সম্পর্কে কঠোরভাবে হুশিয়ারি করা হয়েছে, অপরদিকে তেমনি প্রদানকারীকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে কোরআন ও হাদিস পাকে। বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের জাকাত দেয়, আল্লাহ তার অবশিষ্ট বৈধ সম্পদের জিম্মাদার হয়ে যান। তাছাড়া তার সম্পদের পরিমাণের আরও বৃদ্ধি ঘটে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়।’ এতকিছুর উদ্দেশ্য হচ্ছে, অভাবগ্রস্ত মানুষকে অভাব মোচনে সহায়তা করা। 
দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের আরেকটি বিধান ফিতরা। রোজার শেষে সবার সঙ্গে মিশে ঈদ উদ্যাপনের সামর্থ্য অর্জনে দরিদ্র জনগণের এটি একটি সন্তুষ্টিজনক আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি। সচ্ছল রোজাদার মুসলমানদের জন্য ফিতরা প্রদানকে পরোক্ষভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফিতরা দেওয়া না হলে রোজার সওয়াব পূর্ণ হয় না। এ কথায় রোজাদার মুসলমান ফিতরা প্রদানে উৎসাহিত হয়ে থাকে। এটি দরিদ্র ব্যক্তিদের দারিদ্র্যের দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক। 
ইসলাম ছাড়া মানবপ্রবর্তিত বিভিন্ন মতবাদ এবং ধারণায় দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্যর কষ্টে অনেকে অশ্রুপাত করা হয়েছে। কিন্তু সেসব মতবাদে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একমাত্র ইসলামী বিধানই পারে দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে শান্তির সহজ পথ প্রদর্শন করতে, যে পথে কোনো সংঘাত নেই, কোনো অশান্তি নেই। 


খবরটি পঠিত হয়েছে ৫১২০ বার

ভ- তাপস থেকে সাবধান
ভ- তাপস থেকে সাবধান মওলানা রুমির মসনবি শরিফ ড. মুহাম্মদ
বিস্তারিত
তকদিরে অবিশ্বাস কুফরি অনেকে মনে
অনুসারেই যখন সবকিছু ঘটবে, তখন কর্মের  কী প্রয়োজন? যে ব্যক্তি
বিস্তারিত
দরুদ পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা উম্মতে
বিস্তারিত
ইহরাম
সুফি কোষ ইহরাম ইহরাম আরবি শব্দ; ইহরামের আভিধানিক অর্থ হলো,
বিস্তারিত
আকসার মুক্তির ফরিয়াদ
ফিলিস্তিন জবরদখলকারী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের নৃশংসতার আরেকটি উদাহরণ ছিল গত
বিস্তারিত
মুসলমানের জামাত আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব
মনুষ্য সমাজের জ্ঞানীমাত্রই একমত যে, একতাই কল্যাণ ও সঠিক পথ।
বিস্তারিত