মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

দেহের কারাগারে রুহের আর্তনাদ

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
দেহের কারাগারে রুহের আর্তনাদ
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রাচীন সমৃদ্ধ নগরী সাবা শাসন করত তখনকার বিখ্যাত রাজা-মহারাজারা। সাবার প্রতাপশালী রানী বিলকিসের কথা উল্লেখ আছে কোরআন মজিদে। আল্লাহর নবী, মানব-দানবের বাদশা হজরত সোলায়মান (আ.) হুদহুদ পাখির মারফত পত্রালাপ করেছিলেন রানী বিলকিসের সঙ্গে। রানী বিলকিস আসার আগে চোখের পলকে তার সিংহাসন নিয়ে এসেছিলেন সোলায়মান (আ.) এর এক সভাসদ ইসমে আজমের গুণে। এছাড়াও রানী বিলকিস সোলায়মান (আ.) এর বশ্যতা স্বীকারের চমকপ্রদ ইতিহাস আলোচিত হয়েছে সূরা নামলের ২৮-৩১ নম্বর আয়াতে)। 
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সবুজ-শ্যামল নিসর্গ নিয়ে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ নগরী সাবা। এর অবস্থান ছিল বর্তমান সৌদি আরবের দক্ষিণে ইয়ামেন সীমান্ত বরাবর, লেহিত সাগর আর ভারত মহাসাগরের সঙ্গমস্থলে। আরব সাগরে আফ্রিকার কাছাকাছি অবস্থানে এশিয়া ও আফ্রিকার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব ছিল বিশ্বজনীন। এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সাবার জনসাধারণ ছিল ব্যবসায়ী, ভোগবাদী, বিলাসপ্রিয়, কতক অলস ও লাজলজ্জাহীন। কীভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে তুলবে, আধিপত্যে-কর্তৃত্বে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, সেই চিন্তায় তারা কখনও আধ্যাত্মিকতা, নৈতিক সূচিতা ও পরকাল নিয়ে চিন্তা করত না। মানবীয় গুণ ও চরিত্র বলতে কোনো কিছুর মূল্য তাদের কাছে ছিল না। পাপের গড্ডলিকা প্রবাহে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ভালো লোক অবশ্যই ছিলেন এবং ভালো লোকরা তাদের যথারীতি উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। অন্তত ১৩ জন আল্লাহর নবী এসেছিলেন সাবার লোকদের জীবন চলার বিশুদ্ধতম পথ দেখানোর জন্য। কিন্তু আল্লাহর নবীদের, নেক বান্দাদের কোনো উপদেশই তারা কর্ণপাত করেনি। উল্টা উপদেশদাতা আল্লাহর নবী ও রাসুলদের তারা হত্যা করতে বারবার চেষ্টা করেছিল। তাদের সামগ্রিক অবস্থা হয়েছিলÑ
কসদে খোনে না’সেহা’ন মী দা’শতান্দ
তুখমে ফিসকো কা’ফেরি মী কাশতান্দ
উপদেশদাতাদের রক্ত ঝরানোর চেষ্টায় লেগে থাকত
পাপাচার, অনাচার, কুফরি, ফাসেকি, জুলুমের বীজ বুনত। (৩খ. ব-৩৭৯)। 
জাগতিক শিক্ষায়, সভ্যতায়, অর্থে-বিত্তে উন্নত হওয়া সত্ত্বেও তাদের এমন অবস্থা কেন হলো? এর কোনো সদুত্তর নেই। যেমন আজকের দুনিয়ায় মানবসভ্যতার সবচেয়ে ঘৃণ্য-নিকৃষ্ট কাজ সমকামিতাকে কেন বিভিন্ন রাষ্ট্র বৈধতা দিল তারও কোনো জবাব নেই। মওলানা রুমি (রহ.) বলছেন, কপাল খারাপ হলে কেউ ফেরাতে পারে না। কারও তকদিরের ফয়সালা উপস্থিত হলে বিশাল দুনিয়া তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। তকদিরের ফেরে সুস্বাদু মিষ্টান্নও মুখে অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক তিতায় পরিণত হয়। এর কারণ ব্যাখ্যায় মওলানা রুমি (রহ.) আরও বলেনÑ 
গোফত্ ইযা জা’আল কাযা’ দা’কাল ফাযা’
তুহজাবুল আবসারু ইয জাআল কাযা’
বলা হয়, নিয়তি উপস্থিত হলে আকাশ সংকীর্ণ হয়ে যায়
তকদিরের ফয়সালা এলে দুই চোখ আঁধারে ছেয়ে যায়। (৩খ. ব-৩৮১)। 
তকদিরের ফয়সালা যখন উপস্থিত হয়, তখন মানুষ চোখ থেকেও অন্ধ হয়ে যায়। নিজের ভালো-মন্দ কীসে, তা বুঝতে পারে না। সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় কর্মশক্তি রহিত হয়ে পড়ে। কেন এমনটি হয় তার রহস্য উদ্ঘাটন করে মওলানা বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মনে কর দক্ষ ঘোড় সওয়ার। নিজের গতিপথ সম্পর্কে অন্যকে বিব্রত করতে চাইলে ঘোড়ার পদাঘাতে প্রচ- ধূলি ওড়ায়। এমন পরিস্থিতি হলে তুমি ধূলিঝড়ে হারিয়ে যাবে। ঠিক করতে পারবে না, অশ^ারোহী কোথায় আছে। বিশ^ নিয়ন্তা মহান রাব্বুল আলামিনও এভাবেই তাঁর চরম অবাধ্যদের একসময় এমন বিভ্রান্তিতে ফেলে দেন। 
বন্যপশুরা বনে ব্যাঘ্রের আগমন টের পেলে প্রাণ হাতে নিয়ে পলায়। ভেড়ার দল যখন দূর থেকে নেকড়ের গন্ধ পায়, তখনই তড়িঘড়ি বাঁচার জন্য আত্মগোপন করে। কিন্তু মানুষ এ দুনিয়ায় কামনা-বাসনার পর্দায় এমনভাবে ঢাকা থাকে, আল্লাহর কহর ও গজবের আলামত দেখেও তাদের হুঁশ ফেরে না। শুদ্ধ সুন্দর সঠিক পথে ফিরে আসে না। ভোগ-বিলাসিতা, কামনা-বাসনার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে ফিরে আসার পথ দেখে না। এ অবস্থায় হঠাৎ আল্লাহর তকদিরের ফয়সালা এসে উপস্থিত হয় এবং কহর ও গজবের পাকড়াওয়ের মধ্যে করুণ পরিণতির সম্মুখীন হয়। মওলানা রুমি বলেনÑ 
বূয়ে শীরে খশম দীদী বা’য গর্দ
বা’ মুনাজা’ত ও হাযার আন্বায গর্দ
ক্রুব্ধ বাঘের গন্ধ পেয়েছ তো ফিরে এসো
মোনাজাত ও সংযমের সঙ্গে মিতালি কর। (৩খ. ব-৩৮৯)। 
হে মানুষ! তুমি যদি সত্যিই বুদ্ধিমান হও, আল্লাহর গজবের গন্ধ আঁচ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শুধরে নাও। ধ্বংসের পথ পরিহার কর। সংযমী জীবন, শুদ্ধ সুন্দর পথে ফিরে এসো। সবচেয়ে বড় কথা, কান্না জুড়ে দাও। আল্লাহর কাছে সকরুণ কান্নায় মোনাজাতে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দাও। 
কারণ আল্লাহর গজবের নেকড়ে ধেয়ে এলে কারও নিস্তার নেই। মওলানা বুঝিয়ে বলেন, চারণভূমিতে ওইসব ভেড়ার ওপর নেকড়ে আক্রমণ করতে পারে, যেগুলো রাখালের নিয়ন্ত্রণ মানে না। রাখাল যখন ডাকে, তখন এসব বেয়াড়া ভেড়া অবস্থাগত ভাষায় রাখালের চোখে দুঃখ ও দুশ্চিন্তার ধূলি নিক্ষেপ করে। বলে, সরে যাও, বাহাদুরি দেখিও না। আমরা অনেক সেয়ানা, তোমার চেয়ে বড় রাখাল। তোমার কথা মানব কেন, আমরা তোমার চেয়ে কম কীসে। আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের এরা বলে, ঠিক আছে গজব এলে আসুক, তাতে তোমাদের কী। আমরা লাকড়ি হয়ে পুড়ব, তবুও লজ্জার কাছে মাথা নোয়াব না। আরবরা বলে, ‘লজ্জার চেয়েও আগুন অনেক উত্তম।’ 
মওলানা বলেন, সাবাবাসীকে জাহেলি যুগের সেই আত্মম্ভরিতা পেয়ে বসেছিল। যুগে যুগে এ আত্মম্ভরিতা কাফের-মোশরেক ভ্রান্তদের আল্লাহর পথে আসতে বাধা দেয়। এ আত্মম্ভরিতাই মূর্তিপূজা ও মিথ্যা ধর্মচর্চার পেছনে তাদের পথহারা করে। এমনকি যারা আল্লাহর পথিক, তাদের ওপর এরা জোর-জুলুমের স্টিমরোলার চালায়। তবে এসব লোক ইউসুফের জন্য কূপ খনন করে ঠিকই; কিন্তু অন্যের জন্য খনন করা কুয়ায় নিজেরাই পতিত হয়। 
মওলানা রুমির বক্তব্য ও ব্যাখ্যা এখানে এসে সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক রূপ পরিগ্রহ করে। হয়তো কেউ বলতে পারে, কই আমি তো কোনো মজলুম মানুষের জন্য কূপ খনন করিনি। ইতিহাসের জালেম-অত্যাচারীদের পাপাচারে আমার জামা তো রঙিন হয়নি। মওলানা তাদের উদ্দেশে বলেন, যে ইউসুফের কথা বলছিÑ 
কীস্ত অ’ন ইউসুফ দিলে হক জুয়ে তো
চোন আসীরে বস্তে আন্দার কূয়ে তো
কে সে ইউসুফ? সে তো তোমার সত্যাশ্রয়ী অন্তর
তার হাত-পায়ে কড়া তোমার দেহের ভেতর। (৩খ. ব-৩৯৮)। 
জিব্রাঈলী রা’ বর উস্তুন বাস্তেয়ী
পররো বা’লেশ রা’ ব সদ জা’ খাস্তেয়ী
তুমি এক জিবরাঈলকে এনে বেঁধেছ দেহের খুঁটির সঙ্গে।
তার ডানা শত জায়গায় করেছ বিক্ষত আঘাতে আঘাতে। (৩খ. ব-৩৯৯)। 
তোমার অন্তর্জগতে জিবরাঈলরূপী যে রুহ বিরাজিত তাকে তুমি দেহের খুঁঁটিতে বেঁধে রেখেছ। তার ডানায় পালকে শত জায়গায় তুমি আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করেছ। রুহরূপী জিবরাঈলের ওপর তোমার নির্যাতনের ধরন কেমন চিন্তা করে দেখ।
পীশে উ গুসা’লে বিরয়া’ন আ’ওয়ারী
গাহ কাশী উ রা’ বে কাহদা’ন আ’ওয়ারী
তার সম্মুখে গো-বাছুরের বিরিয়ানি পরিবেশন কর
কখনও টেনে টেনে খোঁয়াড়ের স্তূপে হাজির কর। (৩খ. ব-৪০০)। 
তুমি রুহের সম্মুখে কখনও গো-বাছুর রোস্ট করে আন। অর্থাৎ দুনিয়ার ভোগ সম্ভোগের বস্তু রুহের সম্মুখে হাজির কর। রুহকে রুহের প্রকৃত খাদ্য না দিয়ে অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে বাধ্য কর। গবাদিপশুর খাদ্যসম্ভার খোঁয়াড় কিংবা গোয়াল ঘরের খড়ের স্তূপ। তুমি রুহকে সেই স্তূপের দিকে অর্থাৎ নফসের কামনা-বাসনার দিকে টানতে থাক। অথচ এগুলো হচ্ছে দেহের চাহিদা ও খাদ্য। রুহের খাদ্য তো আলাদা। তুমি রুহকে বলতে থাক যেÑ 
কে বখোর ইনাস্ত মা’রা’ লূস ও পূত
নীস্ত উ রা’ জুয লেকা’উল্লাহ কূত
বল যে, খাও এগুলো আমার খাবারদাবার
অথচ আল্লাহর সান্নিধ্য ছাড়া নাই তার আহার। (৩খ. ব-৪০১)। 
দেহের খোরাক আর রুহের খোরাক আলাদা। দেহের খোরাক ভোগ-বিলাসিতার সামগ্রী ও নফসানি কামনা-বাসনা। রুহের সামনে এসব পেশ করা মানে রুহের ওপর অত্যাচার করা। কেননা রুহের খোরাক হলো আল্লাহর জিকির, আল্লাহর চিন্তায় মশগুল থাকা এবং তার কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া ও মোনাজাত করা। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘আলা বিজিকরিল্লাহি তাৎমাইন্নুল কুলুব।’ ‘সাবধান! আল্লাহর জিকির ও স্মরণের দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা রাদ : ২৮)। 
এ অবস্থায় রুহ অহর্নিশ তোমার বিরুদ্ধে নালিশ করে। বলে হে আল্লাহ! এ বুড়ো নেকড়ে, এ লোকটির হাত থেকে আমাকে বাঁচাও, উদ্ধার করো। আল্লাহ তখন রুহকে বলেন, একটু সবর করো, সবরে মেওয়া ফলে। তোমার ফরিয়াদ সময়মতো কবুল হবে। রুহ বারবার বলে, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। কারণ আমি তোমার দর্শন ও মিলন প্রত্যাশী। এ লোক তোমার সান্নিধ্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে। রাব্বুল আলামিন! আমি যে তোমার আহমদ মোস্তফা (সা.) এর মতো ইহুদিদের হাতে বন্দি হয়ে আছি। অথবা সামুদ জাতির কবলে দুর্দশাগ্রস্ত হজরত সালেহ (আ.) এর মতো দেহের ভেতরে আমার করুণ দশা। আমি তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য পাগলপারা।  (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৩খ. বয়েত-৩৭৭-৪০৭)


পাশ্চাত্যে মওলানা রুমি (রহ.)
মওলানা রুমি মুসলিম-অমুসলিম সবার কাছেই বিপুল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। কারও কারও
বিস্তারিত
ইসলামে মানবাধিকার
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ ঘোষণা করে মানবাধিকার সনদ। এ
বিস্তারিত
ইসলামী ব্যাংকিং ও নৈতিকতা
ব্যাংকিং কার্যক্রমে নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করাই হলো নৈতিক ব্যাংকিং  (ethical banking)। এটি
বিস্তারিত
শরিয়তের দৃষ্টিতে জরিমানা আদায়
১. আর্থিক জরিমানা শরিয়তে জায়েজ নেই এমন প্রত্যক্ষ কোনো দলিল
বিস্তারিত
সম্পদ কুক্ষিগত করা অন্যায়
‘ওহে সেসব লোক,  যারা ঈমান এনেছ! তোমরা একে অপরের সম্পদ
বিস্তারিত
খুন করে কেউ নিস্তার পাবে
রায় শুনে গরুর মালিকের অস্থিরতায় পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিল। দাউদ
বিস্তারিত