অর্থনীতিতে হজের প্রভাব

হাজীদের অর্থের একটি বিরাট অংশ খরচ হয় বিমানের টিকিটে, যা বাংলাদেশ বিমানের জন্য একটি বিশাল প্রাপ্তি। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থাটি ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশ বিমান’ লাভের মুখ দেখে হজ ফ্লাইটে। ২০১২ সালে হজযাত্রী পরিবহন করে মোট রাজস্ব আয় করে ৬৫০ কোটি টাকা
 

হজ দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত। হজ ফরজ হয় শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে। বাংলাদেশ থেকে হজে গমনকারীদের ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে খরচ হয়। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে এ বছর হজ করবেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হাজী। (দৈনিক কালের কণ্ঠ : ০৬-০৬-২০১৭)। প্রত্যেকের গড়ে ৪ লাখ টাকা করে খরচ হলে বাংলাদেশের হাজীরাই এ বছর খরচ করবেন ৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকা (প্রায়)। প্রশ্ন হলো, এ ৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকা যাচ্ছে কোথায়? তা কি সরাসরি সৌদি সরকারের পকেটে চলে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের লাখ লাখ হজযাত্রী হজের প্রোডাকশন-রিডাকশন নিয়ে ভাবেন না। জীবনের উপার্জিত সম্পদ ব্যয় করে হলেও একবার পবিত্র কাবার আঙিনায় পাগলের মতো ঘুরে আল্লহর প্রতি নিজের ভালোবাসা নিবেদন করতে পারলেই নিজেদের ধন্য মনে করেন। কিন্তু ইসলামের মর্মবাণী বুঝতে অক্ষম দুনিয়াদার এক শ্রেণীর মানুষ মনে করেন, হজ মানেই সৌদি আরবকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দিয়ে তাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখে তাদের প্রতি ‘করুণা’ করা হয়। ভাবখানা এমন, বাংলাদেশ থেকে কেউ হজে না গেলে সৌদি আরব না খেয়ে মারা যাবে। আর এ টাকায় বাংলাদেশ জাপান-সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে চলে যাবে। তাদের দৃষ্টিতে হজ একেবারেই ননপ্রোডাক্টিভ। তাদের কেউ কেউ অন্যদের হজে না গিয়ে হজের টাকা গরিবদের মাঝে বিতরণ করে দিতে বলছেন। অথচ তারা নিজেরা হজও করছেন না, হজের টাকা অন্যদের দানও করছেন না। কিন্তু ইবাদত বা আত্মিক কোনো চাওয়া-পাওয়া না থাকলেও আমাদের দেশের অনেক বড়লোকই যে প্রতি বছর ভারত, সিঙ্গাপুর কিংবা থাইল্যান্ডের পর্যটন, ট্রিপ বা শপিংয়ে গিয়ে খরচ করে আসছেন হাজার হাজার কোটি টাকা, তাতে তাদের কোনো সমস্যা নেই। যত মাথাব্যথা শুধু হজ নিয়ে। 
প্রশ্ন হলো, হজ নিয়ে কি সৌদি আরব সত্যি বাণিজ্য করছে? হ্যাঁ, হজের কারণে সৌদি আরবের অর্থনীতিতে ইতিবাচক একটা প্রভাব পড়ে। কিন্তু তা তাদের অর্থনীতির মূল উৎস নয়। হজে আয় হওয়া টাকার অধিকাংশই খরচ হয় হাজীদের পেছনে, কিছু অর্থ খরচ হয় ধর্মীয় খাতে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কি এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই? আসলে হজে যে টাকা খরচ হয় তার সিংহভাগই আমাদের দেশে থেকে যায়। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে তা ইতিবাচক হাওয়া বইয়ে দেয়। হজে বাংলাদেশের ‘রিডাকশনের’ চেয়ে  ‘প্রোডাকশন’টাই বরং অনেক বেশি। হজের পাসপোর্ট করতে প্রত্যেক হাজীকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দিতে হয় ন্যূনতম ৩ হাজার ৪৬০ টাকা, সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা। প্রায় ২০ শতাংশ হাজী আর্জেন্ট পাসপোর্ট করেন। তাদের প্রত্যেককে দিতে হয় ৬ হাজার টাকা করে। এখানে সরকারের আয় ১৫ কোটি ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ টাকা। বাকি ৮০ শতাংশ হাজীকে কমপক্ষে (প্রতিজনে ৩ হাজার ৪৬০ টাকা করে) ৩৫ কোটি ২০ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪ টাকা। লক্ষাধিক হাজীর কাছ থেকে পাসপোর্ট বাবদ সরকারের আয় ৫০ কোটি ৪৭ লাখ ২১ হাজার ৬৬৪ টাকা।
হাজীদের অর্থের একটি বিরাট অংশ খরচ হয় বিমানের টিকিটে, যা বাংলাদেশ বিমানের জন্য একটি বিশাল প্রাপ্তি। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থাটি ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশ বিমান’ লাভের মুখ দেখে হজ ফ্লাইটে। ২০১২ সালে হজযাত্রী পরিবহন করে মোট রাজস্ব আয় করে ৬৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয় ৫৫০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিমানের লাভ হয় ১০০ কোটি টাকা। (দৈনিক ডেসটিনি : ০৯-১২-২০১২)। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই হজ প্যাকেজ থেকে বাংলাদেশ বিমানের লাভ হয়েছে ২০ কোটি টাকা। (দৈনিক জনকণ্ঠ : ২৮-১১-২০১৪)। অন্যান্য বছরের মতো ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মুনাফা অর্জন করেছে ২৭৬ কোটি টাকা। (প্রথম আলো : ০৫-০২-২০১৭)। এই ২৭৬ কোটি টাকার সিংহভাগই এসেছে হজ ফ্লাইট থেকে। বাংলাদেশের মানুষ যদি হজে না যেত তাহলে বোধহয় ‘বাংলাদেশ বিমানের’ অভিধানে ‘লাভ’ বলে কোনো শব্দের অস্তিত্বই থাকত না। বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের সচেতনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অপচয় রোধ করলে শুধু হজ থেকেই লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে।
মুয়াল্লেম ফি বাবদ হজ অধিদফতরকে প্রত্যেক হাজীর জমা দিতে হয় ৩০ হাজার ৭৫২ টাকা। এখান থেকে মুয়াল্লেম ফির সৌদি আরবের অংশ জমা দেয়ার পরও হাজীপ্রতি সরকারের থেকে যায় ৮ হাজার ২৪২ টাকা। এখান থেকে সরকারের লাভ ১০৪ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯১৬ টাকা। এই হাজার হাজার কোটি টাকা জমা দিতে হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। ফলে সরগরম হয় ব্যাংকপাড়া। বাংলাদেশে হজ এজেন্সির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০। প্রত্যেকটি এজেন্সিকে জামানত বাবদ সরকারের কাছে এফডিআর করে রাখতে হয় ২৫ লাখ টাকা। এজেন্সিগুলোর অফিসিয়াল কাজে সারা বছরই প্রয়োজন হয় জনবলের। গড়ে প্রতিটি এজেন্সির অফিসে ন্যূনতম ৮ জন লোকের প্রয়োজন হয়। এজেন্সিগুলোর অফিসিয়াল কাজেই প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঢাকার হজ অফিস, হাজী ক্যাম্প এবং সৌদি আরবের জেদ্দার হজ মিশনে কর্মসংস্থান হচ্ছে সহস্রাধিক লোকের। ধর্ম মন্ত্রণালয় গেল বছর জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ মিশনে নিয়মিত কর্মরত লোকজনের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তিনটি টিমে অতিরিক্ত ২৩৫ জন লোক নেয়। (বাংলানিউজ : ২৫-০৮-২০১৫)। এই ১ হাজার ৩০০ এজেন্সি সেবা দেয়ার পাশাপাশি আয়ও করে। প্রতিটি এজেন্সি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় করে বছরে।
অর্থনীতিতে ভারসাম্য তৈরিতে হজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সম্পদের হাতবদলই অর্থনীতিতে লাভ। বড়লোকের টাকা গরিবের হাতে না এলে অর্থনীতির চাকা গতিশীল হয় না। সম্পদ হাতবদলের একটা বড় উপলক্ষ হলো হজ। হজে অনেক জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয়। হজের জিনিসপত্র কিনতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, যা বাজারে গতিশীলতা তৈরি করে। বিশেষ করে এহরামের কাপড়। প্রতি সেট এহরামের কাপড় ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এহরামের কাপড় ছাড়াও কাঁধের ব্যাগ, এহরাম বাঁধার বেল্ট, পাসপোর্ট ব্যাগ, টুপি, প্লাস্টিক জায়নামাজ, পাথর রাখার ব্যাগ, গাইড বই, মিসওয়াক, হিজাব, ছাতা ইত্যাদি কিনতে হয়। জিনিসগুলো বাবদ গড়ে প্রতিজন হাজীর খরচ আড়াই হাজার টাকা হলেও এ বাবদ খরচ হয় ৩১ কোটি ৭৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ জিনিসগুলো কেনা হয় বাংলাদেশ থেকে। বিমানের লাভ হয়। পাসপোর্টে যে টাকা খরচ হয় তার সবটাই সরকারের। হজে গিয়ে তারা যা কেনাকাটা করেন তা-ও তো চলে আসে দেশেই। সহজে খরচ হওয়া প্রায় সবটুকুই বাংলাদেশকেন্দ্রিক। তাই বলা যায়, হজে খরচ হওয়া অর্থের সিংহভাগই থেকে যায় আমাদের দেশেই। সে অর্থ কোনো না কোনোভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।


খবরটি পঠিত হয়েছে ৪৩৪০ বার

বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্য
মানুষের জন্য মানুষÑ এর সার্থক  বাস্তবায়ন রয়েছে ইসলামী অনুশাসনের মাঝে।
বিস্তারিত
মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি
হজরত আদম (আ.)  তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান
বিস্তারিত
কাতারকে হজের অনুমতি দেয়া হলো
কোনো ইলেকট্রনিক অনুমতিপত্র ছাড়াই কাতারি হাজীদের বিমানে ও সড়কপথে
বিস্তারিত
‘গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিন’
গাজা উপত্যকার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বিস্তারিত
রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীনতা
  মিয়ানমারের  একটি বড় অংশ মনে করে, রোহিঙ্গারা কখনোই তাদের
বিস্তারিত
কোরবানির ইতিহাস ও পুরস্কার
কোরবানি আল্লাহ তায়ালার একটি বিধান। আদম (আ.) থেকে সব নবীর
বিস্তারিত