বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্য

মানুষের জন্য মানুষÑ এর সার্থক 
বাস্তবায়ন রয়েছে ইসলামী অনুশাসনের মাঝে। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে পূর্ণ আহারকারীর ঈমানকে বলা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মোমিন নয়, যে তৃপ্তি সহকারে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী থাকে ক্ষুধার্ত।’ (শুয়াবুল ঈমান : ৫৬৬০)

প্রবল বর্ষণ ও ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল প্লাবিত। সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বন্যাপীড়িত অসহায় মানুষের আর্তনাদে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠছে। এহেন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সব সামর্থ্যবান ও বিত্তবানের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। 

শ্রেষ্ঠতম জাতির দায়িত্ব 
আল কোরআনে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠতম জাতি বলা হয়েছে। এ শ্রেষ্ঠতম জাতির সৃষ্টির রহস্য কী? এর জবাবও আল কোরআনে দেয়া হয়েছেÑ ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।’ (আলে ইমরান : ১১০)। এ পৃথিবীতে মানুষের আগমন শুধু নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়, বরং তাদের আগমন হয়েছে গোটা মানবতার কল্যাণে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে গোটা মানব জাতির প্রতি তাদের দায়-দায়িত্বের কথা। ‘উখরিজাত লিন্নাস’ বলতে শুধু মুসলমান উদ্দেশ্য নয়, বরং সমগ্র মানুষ এর অন্তর্ভুক্ত। এ দায়িত্ব অবেহেলার পরিণতি হবে জাহান্নাম। জাহান্নামিদের প্রশ্ন করা হবেÑ ‘তোমাদের কীসে জাহান্নামে নীত করেছে? তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না।’ (সূরা মুদ্দাসসির : ৪২-৪৪)। এই আয়াতে বিপদগ্রস্ত, গরিব-অসহায়দের সাহায্য, আহার্য না দেওয়া, জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

মানবসেবায় মহানবীর ভূমিকা
আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা সারা বিশ্বের জন্য দয়া ও করুণার মূর্ত প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)। 
এ দয়া কল্যাণকামিতায় শামিল হতে সব মুসমানের প্রতিও তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর দয়া করো, আসমানের বাসিন্দা তোমাদের ওপর দয়া করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯২৪)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।’ (কানজুল আমল : ৫৯৭১)। ইসলামে আল্লাহর রহমত, দয়া ও সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য মানুষের প্রতি ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।
মানুষ মানুষের জন্য
মানুষের জন্য মানুষÑ এর সার্থক বাস্তবায়ন রয়েছে ইসলামী অনুশাসনের মাঝে। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে পূর্ণ আহারকারীর ঈমানকে বলা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মোমিন নয়, যে তৃপ্তি সহকারে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী থাকে ক্ষুধার্ত।’ (শুয়াবুল ঈমান : ৫৬৬০)। রাসুল (সা.) একদিন আবু যর (রা.) কে বললেন, ‘হে আবু যর! তুমি যখন তরকারি পাকাও তখন তাতে একটু বেশি পানি দিয়ে ঝোলটা বাড়িয়ে নিও এবং তোমার প্রতিবেশীকে তা পৌঁছে দিও।’ (মুসলিম : ৬৮৫৫)। ইসলাম নিঃস্ব, অসহায়, অভাবী ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে বিপন্ন অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং তাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কষ্ট দূর করতে নির্দেশ দিয়েছে। ব্যাপকভাবে সাহায্য করার ক্ষমতা না থাকলে তরকারির কিছু ঝোল দিয়ে হলেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও কোনো মানুষ বিপদগ্রস্ত হলে মানুষ হিসেবে তার বিপদে এগিয়ে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব। কারও কষ্ট ও বেদনায়, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সত্যিকার মানুষ কখনও নির্বিকার থাকতে পারে না। ঈমানেরও দাবি হচ্ছে, সুখে-দুঃখে এক মোমিন অপর মোমিনের পাশে থাকবে। তাদের কষ্ট লাঘবে সদা তৎপর থাকবে। রাসুল (সা.) সব মুসলমানকে একটা দেহের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘পারস্পারিক ভালোবাসা, দয়া-মায়া ও স্নেহ-মমতার দিক থেকে গোটা মুসলিম সমাজ একটি দেহের সমতুল্য। যদি দেহের কোনো বিশেষ অঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও তা অনুভূত হয়Ñ সেটা জাগ্রত অবস্থায়ই হোক কিংবা জ্বরাক্রান্ত অবস্থায়।’ (মুসলিম : ৬৭৫১)। তিনি আরও বলেছেন, ‘একজন মোমিন অপর মোমিনের জন্য একটি ইমারতসদৃশ, যার এক অংশ আরেক অংশকে মজবুত করে।’ (মুসলিম : ৬৩৪৯)। অর্থাৎ সবল মোমিনদের সাহায্য-সহযোগিতায় অসহায় ও দুর্বলরা সবল হয়ে উঠবে, তাদের দুর্দশা কেটে যাবে। এটিই সত্য ধর্ম ইসলামের শিক্ষা ও প্রত্যাশা। 

অনুদান হবে নিঃস্বার্থ
ইসলামে বিপন্ন মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। দুর্গত ও বিপন্ন মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, খাদ্য, আবাসন, বস্ত্র, চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করে মানবসেবায় নিয়োজিত থাকাও আল্লার ইবাদাত বলে স্বীকৃত। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কবুল হজ হলো খাদ্য খাওয়ানো এবং সুন্দর কথা বলা বা ভালো আচরণ করা।’ (কানজুল আমল : ১১৮৮১)। অতএব যারা হজে যেতে পারিনি, তারা বাংলাদেশে বসেও অসহায় ও বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে কিছু ত্রাণ পৌঁছে কবুল হজের সাওয়াব পেতে পারি। তবে এ সহায্য ও দান হবে নিঃশর্তভাবে মানবিক কর্তব্যবোধ পালনের উদ্দেশ্যে। অসহায় মানুষকে সাহায্য করার দ্বারা দানশীলতা ফলাও করা বা রাজনৈতিক প্রচারণা যেন উদ্দেশ্য না হয়। এমনভাবে অনুদানের ব্যবস্থা করা যাবে না, যাতে গ্রহীতাকে মানসিক কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। আবার গ্রহীতা যেন কোনোভাবেই হেয়প্রতিপন্ন না হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে বলা হয়েছে। ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় ধনৈশ্বর্য ব্যয় করে কথা বলে বেড়ায় না এবং ক্লেশও দেয় না, তাদের পুরস্কার তাদের রবের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৬২)। এখানে দলমত নির্বিশেষে সব বিপন্ন মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধু নাম-যশের মানসিকতা নিয়ে দান করলে তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে না, দান করতে হবে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের দুর্গতি ও তাদের অসহায়ত্ব লাঘব করার পরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়ে। 

লেখক : পশ্চিম আফ্রিকার মালি প্রবাসী আলেম


প্রথম পর্বের মোনাজাত
রোববার বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ
বিস্তারিত
ধৈর্যের প্রতিভূ আইয়ুব (আ.)
ধৈর্যের প্রতিভূ এবং আল্লাহর ওপর আস্থায় অনন্য উপমা প্রদর্শনকারীদের আলোচনা
বিস্তারিত
জিনদের মধ্যেও কি নবী এসেছিলেন
জিন জাতির মধ্য থেকে নবী ও রাসুল এসছেন কি না, এ
বিস্তারিত
দাওয়াত ও তাবলিগ উম্মাহর ঐক্য
দাওয়াত ও তাবলিগ। শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর রেখে
বিস্তারিত
পৃথিবীতে কারও অমরত্ব নেই
হে গাফেল, নিয়তি আমাদের ঘিরে আছে। আমরা আছি একটি সফরে,
বিস্তারিত
শীতকালে যে সাত আমলের সুবর্ণ
শীত মোমিনদের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। শীত এলে ইবনে মাসউদ (রা.)
বিস্তারিত