২০ বছর ধরে গাছের কোটরে বসবাস

মনে পড়ে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ চ্যানেলের সাড়া জাগানো সিরিজ ‘দ্য লেজেন্ড অব মাইক ডজ’-এর কথা? আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া থেকে নিস্তার পেতে পেসিফিক নর্থ ওয়েস্ট হোলি রেইন ফরেস্ট-এর গাছে একটি মানুষের একাকী অদ্ভুত জীবনযাপনের রোমহর্ষক ছবি!

শহর জীবনকে গুডবাই জানিয়ে গভীর জঙ্গলে পেল্লায় গাছের ডালে বাসা বেঁধেছিলেন মাইক।অনেক কষ্টে খুঁজে বের করার পর তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কি বৈভবে পূর্ণ আধুনিক সভ্যতাকে মিস করেন না?’ মাইকের সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, ‘মোটেও না। আমি সুখী।’

ঠিক একই রকম মাইকের সন্ধান আমরা পাওয়া গেছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলের রায়মাটাং এলাকায়। নাম জিগর ওরাওঁ। সত্তর ছুঁইছুঁই মানুষটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে কালচিনি ব্লকের ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন জঙ্গলের এক প্রান্তে পেল্লায় পিপল গাছের কোটরে বসবাস করছেন। আধুনিক সমাজকে ‘আলবিদা’ জানিয়ে বনবাসেই খুঁজে নিয়েছেন স্বাচ্ছন্দ্য।

কয়েক বছর আগের ঘটনা। কর্নাটকের জঙ্গলে গজ্জা জনজাতি সম্প্রদায়ের একটি দলের সন্ধান মেলে। বুনো হাতির তাণ্ডবের ভয়ে আমগাছের ডালে রাত কাটাত দলের সদস্যরা। জিগরের সেই সমস্যা নেই। উল্টে মাইকের মতোই তিনি আধুনিকতার কোলাহল থেকে অনেক দূরে হাতি, চিতাবাঘের মতো বুনোদের সঙ্গে একরকম সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়েছেন। মাইকের সঙ্গে জিগরের তফাত একটাই।

মাইক ১৯৯১ সাল থেকে পায়ে জুতো গলাননি। জিগরের পায়ে সস্তা প্লাস্টিকের চপ্পল রয়েছে। ছিপছিপে চেহারা। পাক ধরা চুল উঠে টাক উঁকি দিতে শুরু করেছে। এক গোছা লম্বা চুল অবশ্য কাঁধে নেমেছে। পরনে নিজের হাতে সেলাই করে তৈরি মোটা কাপড়ের অদ্ভুত রকমের কালো আলখাল্লা। গোঁফ, দাড়িতে হাত পড়ে অনিয়মিত। বাঁ হাতে স্টিলের বালা। মৃদুভাষী জিগর ভোর হতেই বেরিয়ে পড়েন খাবারের খোঁজে। বেশিটাই বুনো ফল। চাল জুটলে ভাত ফুটিয়ে নেন।

যে গাছের কোটরে বাড়ি তার সেটাও অদ্ভুত রকমের। তিনটি কোটর রয়েছে পরপর। ঠিক যেন তিনতলা বাড়ি। সবচেয়ে উপরের কোটরটি ‘বেডরুম’ সাজিয়েছেন জিগর। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট হবে। জঙ্গলের বাঁশ কেটে শোয়ার জন্য মাচা গড়ে নিয়েছেন। রয়েছে কম্বল, চাদর, পলিথিন। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে কোটরের মুখ পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেন বনবাসী।

এরপর নিশ্চিন্তে ঘুম। সবচেয়ে নিচের বড় কোটর ‘কিচেন’। সেখানেই থাকে বাসনপত্র, খুঁজে আনা সবজি৷ গৃহস্থের বাড়িতে যা থাকে তার অনেক কিছুই পেয়ে যাবেন এখানে। এক কোটর থেকে অন্য কোটরে যাতায়াতের জন্য গাছের ডাল বেঁধে সিড়ি বানিয়েছেন। সেখান দিয়ে লাফিয়ে চলাফেরা দেখে জিগরকে ‘অরণ্যদেব’-এর সংস্করণ মনে হতেই পারে।

তবে অরণ্যবাসী হলে কী হবে, কোটরের সংসার লোকালয়ের ঘরদোরের মতোই ঝকঝকে। পেল্লায় গাছতলা যেন নিকানো উঠোন। নিয়মিত ঝাড়ু দেন। সাজানো গোছানো চারদিক। বুনো হাতির দল আশপাশে ঘুরে বেড়ালেও এখানে পা বাড়ায় না। কেন এভাবে একা গাছে থাকেন? উত্তর নেই। প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসেন জিগর।

অনেক পরে জানান, বাবা অশ্বিনী ওরাওঁ এবং মা কামিনীদেবী রায়মাটাং চা বাগানের শ্রমিক ছিলেন। বাগানের নিচে লাইনে শ্রমিক আবাসনে থাকতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর শ্রমিকের কাজ পেয়েছিলেন। বিয়েও করেন।

এরপর মা মারা যান। বাতের যন্ত্রণায় কাবু হলে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে জিগর ‘মানসিক শান্তি’-র খোঁজে গভীর জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। কখনও ক্লান্ত হয়ে গাছের ডালে ঘুমিয়ে পড়তেন। ঘরে ফেরা হত না। জঙ্গলের ফল খেয়ে দিন কাটত। এভাবে কয়েক বছর চলে।

কিন্তু ঠিক কোন সময় সমাজ জীবন ছেড়ে বনবাসী হয়েছেন মনে নেই তার। বলেন, “কী হবে বস্তিতে গিয়ে। ওখানে হিংসায় ভরা জীবন। এখানেই ভাল আছি।” ভয় করে না? প্রায় চুলহীন মাথায় হাত বুলিয়ে জানান, আগে ভয় করত। তখন রাতে গুটিয়ে থাকতাম। এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।

গাছের কোটরে শুয়ে হাতির পাল ঘুরে বেড়াতে দেখতে বেশ ভাল লাগে। জিগরের কথা জানেন বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কর্তারা। তাকে সমাজ জীবনে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছে কয়েকবার। লাভ হয়নি। এমনকী পড়শিদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে ভোলেননি উত্তরবঙ্গের ‘মাইক’।

কোটর বাড়ির কিছুটা দূরে চুয়াপাড়া চা বাগান। পাশে এসএসবি ক্যাম্প। সেখানকার জওয়ানরা জিগরকে ভাল জানেন। কখনও ক্যাম্পে, আবার কখনও আশপাশের বস্তিতে ঘুরে চাল, ডাল জুটিয়ে নেয় সে৷ যাতায়াতের সময় এলাকার অনেকেই খোঁজ নিতে ভোলে না।জিগরকে তারা জানেন ‘গাছ বাবা’ নামে। অনেক জনশ্রুতিও চালু হয়েছে। অবশ্য সে সবে কান দেন না গাছ বাবা।

তিনি বলেন, “আমি বাইরের দুনিয়ার খবর রাখি না।” তবে লোকালয়ে যে যান না এমন নয়। সেটাও বিশেষ প্রয়োজনে। তখন চেনাজানাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়। এতটুকুই। জিগরের এমন দশার খবর পেয়ে একবার স্থানীয় পঞ্চায়েতের তরফে রায়মাটাং বনবস্তির কাছে ইন্দিরা আবাস প্রকল্পে ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ঘরে একদিনের জন্য পা রাখেননি। কেন? গাছ বাবার সংক্ষিপ্ত উত্তর, “ওসব ভাল লাগে না।”

 

সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন


হাসি ও গম্ভীর মুখের পার্থক্য
আমরা কথায় কথায় কাউকে না কাউকে ছাগল বলে ফেলি। ছাগল
বিস্তারিত
স্কুলে শিক্ষক একজন, শিক্ষার্থীও এক!
ভারতের কলকাতার ঝাঁ চকচকে গুরুগ্রাম (গুরগাঁও) থেকে মাত্র ৬০ কিমি
বিস্তারিত
হাতে হেঁটে ১০ কিমি. পাড়ি!
প্রবল ইচ্ছাশক্তির কঠিন পরীক্ষা দিয়েছেন সোলায়মান মাগোমেদয়। রাশিয়ার দাগেনস্টানের ৫৩
বিস্তারিত
৬৬ বছর পর নখ কাটলেন
হাতের নখ কাটাতে ভারতের পুনে থেকে নিউ ইয়র্কে উড়ে গেলেন
বিস্তারিত
দুই মাথাওয়ালা বাছুর দুধ পান
দুই মাথাওয়ালা এই বাছুরের জন্ম হয়েছে ব্রাজিলের গোইয়া প্রদেশের কাইয়াপোনিয়া
বিস্তারিত
১৮৫ কেজি ওজনের উড়ন্ত মাছ!
গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি। মাছও উড়তে পারে। এতদিন নাম
বিস্তারিত