মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

সৎকর্ম কবুল হওয়ার উপায়

ইবাদতের পরে ইস্তেগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনা করা ও ত্রুটি স্বীকার করা আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দার আচরণ। আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত।’ (সূরা জারিয়াত : ১৭-১৮)

 

সমগ্র সৃষ্টি ও বিধানের লক্ষ্য হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর জন্য সব ইবাদত নির্ধারণ করা। এর মাধ্যমেই পৃথিবী গড়ে ওঠবে এবং মানবজাতি সুখী হবে। আল্লাহ বলেন, ‘ঈমান বজায় রেখে কোনো পুরুষ বা নারী সৎকর্ম করলে আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব এবং তাদের কৃতকর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান দেব।’ (সূরা নাহল : ৯৭)। আল্লাহ শুধু উত্তমটাই গ্রহণ করেন। সৎকর্ম কবুল করেন। আমল কবুলের মূল হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর সন্তুষ্টির চেষ্টা করা। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আখেরাত কামনা করে এবং ঈমান বজায় রেখে সেজন্য চেষ্টা করে তাদের চেষ্টা সার্থক হবে।’ (সূরা ইসরা : ১৯)। 
আখেরাতে কাফেরের আমল গ্রহণযোগ্য হবে না, সে যে আমলই করুক। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব।’ (সূরা ফুরকান : ২৩)। কাফেরের ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়ায় তাকে জীবিকা দেয়া হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুনিয়ায় কাফের আল্লাহর জন্য ভালো কাজ করলে তাকে জীবিকা দেয়া হবে, তবে আখেরাতে গেলে সেজন্য তার কোনো প্রতিদান থাকবে না।’ (মুসলিম)। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, ইবনে জুদআন জাহেলি যুগে আত্মীয়তা বজায় রাখত, দরিদ্রকে আহার করাত, এটা তার জন্য উপকারী হবে?’ তিনি বলেন, ‘তা তার কাজে আসবে না, সে একদিনও বলেনি, হে প্রতিপালক বিচার দিবসে আমার পাপ ক্ষমা করো।’ (মুসলিম)। 
যে ব্যক্তি বাইরে ইসলাম প্রকাশ করে আর ভেতরে তার বিপরীতটা গোপন করে তার প্রকাশ্য বিষয় তার কোনো কাজে আসবে না। তার আমল কবুল হবে না। আল্লাহ মোনাফেকদের অবস্থা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বলুন, তোমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যতই খরচ করো তোমাদের কিছুই গ্রহণ করা হবে না। তোমরা তো পাপাচারী দল। তাদের দান গ্রহণযোগ্য হওয়ার পথে বাধা শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি তাদের অবিশ্বাস।’ (সূরা তওবা : ৫৩-৫৪)। 
নিয়ত ও আমলের ওপর ইবাদতের ভিত্তি স্থাপিত। সেটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হলো সদিচ্ছা পোষণ করা ও সুন্দরভাবে আমল করা। একনিষ্ঠতার দ্বারা ইচ্ছা শুদ্ধ হবে আর আনুগত্যের মাধ্যমে আমল সঠিক হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যে তার রবের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (সূরা কাহফ : ১১০)।
ইসলাম ধর্ম দুইটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত : শুধুই আল্লাহর ইবাদত করা, এতে কোনো অংশীদার নেই এবং নবীর নিয়ে আসা শরিয়ত মোতাবেক আল্লাহর ইবাদত করা। এ দুইটিই হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদতের মূল মর্ম। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একনিষ্ঠতা ও আনুগত্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের পরীক্ষা করতে। তিনি বলেন, ‘তিনি মহান যাঁর হাতেই সব রাজত্ব, তিনি সর্বশক্তিমান। যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন তোমাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম আমলকারী।’ (সূরা মুলক : ১-২)। 
ফুদাইল ইবনে ইয়াদ (রহ.) বলেন, ‘আমল যদি আন্তরিক হয়; কিন্তু সঠিক না হয়, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর যদি তা সঠিক হয়; কিন্তু আন্তরিক না হয়, তা-ও গ্রহণযোগ্য হবে না। যতক্ষণ আন্তরিক ও সঠিক উভয়টি না হবে, ততক্ষণ তা কবুল হবে না। আন্তরিক হবে যখন তা আল্লাহর জন্য হবে। সঠিক হবে যখন তা সুন্নত অনুযায়ী হবে। এখলাসের মর্ম হলো বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর আনুগত্য করবে। আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ বানিয়ে আল্লাহর ইবাদত করো।’ (সূরা জুমার : ২)। মুসলমান যেসব ইবাদত করে সবই রাব্বুল আলামিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে তাকে আদেশ করা হয়েছে। মানুষের কাছে এজন্য সে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করবে না। নিয়তের কারণে ক্ষুদ্র কাজ মহান হয়ে যায় এবং বৃহৎ কাজ তুচ্ছ হয়ে যায়। ইবনে আবি কাসির (রহ.) বলেন, তোমরা নিয়ত শিখ, কারণ তা আমলের চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল।’ এখলাস ও মানুষের কাছে প্রশংসার লোভ একত্র হতে পারে না। নবী করিম (সা.) এর অনুসরণ করা ইবাদত কবুলের শর্ত। তিনি বলেন, ‘কেউ এমন কোনো আমল করলে যাতে আমার নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আমলের ক্ষেত্রে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় থাকা আমল কবুলের কারণ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ পরহেজগার ব্যক্তিদের থেকেই গ্রহণ করেন।’ (সূরা মায়েদা : ২৭)। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মত হলো, আমলের ক্ষেত্রে যে আল্লাহকে ভয় করে তার থেকে আমল কবুল করা হয়। কারণ সে আমল করে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং আল্লাহর আদেশ মোতাবেক।’
একের পর এক ইবাদত অব্যাহত রাখতে পারা ইবাদত কবুলের আলামত। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘ভালো কাজের প্রতিদানের মধ্যে একটি হলো পরেও ভালো কাজ করতে থাকা। আর মন্দ কাজের শাস্তি হলো পরেও মন্দ কাজ করা।’ আমলের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও ইবাতদের স্থায়িত্ব আল্লাহর তৌফিক লাভ ও কল্যাণের প্রমাণবাহী। আমলের ক্ষেত্রে স্থায়ী থাকা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পথনির্দেশ। তিনি কোনো আমল করলে তা স্থায়ী রাখতেন এবং বলতেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা বেশি স্থায়ী, যদিও তা অল্প হয়।’ (বোখারি ও মুসলিম)। মোমিন যতই আমল করুক সে তার আমলকে ক্ষুদ্র মনে করবে। সে জানে আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আমল দিয়ে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না।
ইবাদতের পরে ইস্তেগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনা করা ও ত্রুটি স্বীকার করা আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দার আচরণ। আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত।’ (সূরা জারিয়াত : ১৭-১৮)। নামাজের সালাম দেয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইস্তেগফার পাঠ করতেন।
আমল কবুলের অন্যতম উপায় হলো আল্লাহর কাছে কবুলের প্রার্থনা করা। নবী করিম (সা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ, মুহাম্মদ, মুহাম্মদের পরিবার ও মুহাম্মদের উম্মত থেকে কবুল করুন।’ (মুসলিম)। শোকর আদায় করা আমল কবুলের অন্যতম উপায়। আমল যাতে ব্যর্থ না হয়, সেজন্য মোনাফেকি, কুফরি, নাস্তিকতা, দুনিয়ার খ্যাতির লোভ, রিয়া, অহংকার, গোনাহ ইত্যাদি জঘন্য কাজ থেকে সাবধান থাকতে হবে। 

১৭ জিলহজ ১৪৩৮ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার 
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


শিশু মুসা (আ.) কে হত্যার
ওহি যোগে নির্দেশ পেয়ে মহিলা ছুড়ে ফেলল সন্তানকে উনুনের আগুনে।
বিস্তারিত
পানাহারের আদব-কায়দা
মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চাহিদা হলো পানাহার করা।
বিস্তারিত
তাকওয়া ইবাদতরে মূল
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম এবং রাসুল (সা.) এর তরিকা
বিস্তারিত
দেশত্যাগ ও অভিবাসীদের আশ্রয়
হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশে বের হন,
বিস্তারিত
আল্লাহ সবরকারীদের সাহায্য করেন
সবর বা ধৈর্য একটি মহাশক্তি। ধৈর্য হলো শব্দহীন নীরব প্রতিবাদ।
বিস্তারিত
সামাজিক অবক্ষয় এবং আমাদের করণীয়
মানুষ যখন বিভিন্ন প্রতিকূলের কারণে নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন কি
বিস্তারিত