ওহির বাস্তবতা

ফেরেশতা আল্লাহর যে পয়গাম নিয়ে আসেন, পরিভাষায় সেটাকে আমরা ‘ওহি’ শব্দে ব্যক্ত করি। প্রশ্ন করা হয়, এই ওহি আবার কী? তো যারা মুসলমান নয় এবং ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে, সেই তারা ওহির ওপরও আপত্তি করে। তাদের ধারণা হলো, ওহি মূলত একটি রোগ! 

কয়েকজন প্রাচ্যবিদ গবেষক তাদের লেখায় ওহি সম্পর্কে এমন সংশয়ের কথা ব্যক্ত করেছেন। ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সময় নবী (সা.) এর যে বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হতো বলে হাদিসে বিবৃত হয়েছে, যেমনÑ চেহারা লালবর্ণ ধারণ করা, শরীর থেকে ঘাম ঝরা এবং কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাদের ধারণা মতে, এসব নাকি মৃগী রোগের আলামত!
আমাদের স্পষ্ট কথা হলো, এক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদ লেখকরা গবেষণার রীতিনীতির তোয়াক্কা করেননি এবং আমানত বা বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতে পারেননি। বস্তুত ওহিসংক্রান্ত যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেসব একত্রিত না করে এবং সে বিষয়ক সমূহ তথ্য সংগ্রহ না করেই তারা এমন আপত্তি করে দিয়েছেন। জ্ঞান ও গবেষণার রীতি অনুসারে এমন কর্মপন্থা পুরোপুরিভাবে অভিযুক্ত। তদুপরি প্রশ্ন যেহেতু উত্থাপিত হয়ে গেছে, এজন্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং তথ্যনির্ভর উত্তর কীÑ তা আমাদের জেনে রাখা দরকার।
ভূমিকাস্বরূপ কয়েকটি কথা : এক. নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হন, তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর। তার মানে ৪০ বছর বয়সে হঠাৎ করেই তিনি মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন? ৪০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে তিনি কখনও এমন রোগে আক্রান্ত হলেন না! এমনটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে একেবারে অস্বাভাবিক।
দুই. তাছাড়া নবী (সা.) তাঁর জীবনে, বিশেষত ওহি গ্রহণের দীর্ঘ ২৩ বছরে এ জাতীয় কোনো শারীরিক অথবা মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন বলে কোনো তথ্য ও বর্ণনা পাওয়া যায় না এবং কেউ দেখাতেও পারবে না। তার মানে শুধু ওহি গ্রহণের সময় তিনি শুধু এই মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়তেন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণভাবে তা মিথ্যা প্রমাণিত করে।
তিন. জানা কথা যে, মৃগী রোগের কারণে রোগী ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। নবী (সা.) জীবনের ২৩টি বছর ওহি গ্রহণ করতে থাকলেন, অথচ কখনও কোনো ধরনের স্মৃতিশক্তিগত বা মানসিক কোনো সমস্যায় ভুগেছেন বলে কেউ দেখাতে পারবে না। উপরন্তু আমরা যদি তাঁর জীবনচরিত অনুসন্ধান করি, তবে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই যে, অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনগ্রসর একটি জাতিকে তিনি বিশ্বাস, অনুশীলন ও মানসিকতার বিবেচনায় ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ, সুসভ্য ও আদর্শ জাতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বস্তুত এক্ষেত্রে তাঁর কোনো উপমা মানব ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
চার. নবী (সা.) এর পারিবারিক জীবন থেকে নিয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনÑ এসবের সবিস্তার আলোচনা সিরাত ও ইতিহাস গ্রন্থাদিতে বিধৃত হয়েছে। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন কেউ তা ঘাঁটাঘাঁটি করলে নবীর মাঝে শারীরিক বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা পাবে তো দূরের কথা, উল্টো চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক থিউরি সেখান থেকে সংগ্রহ করতে যাবে।
পাঁচ. চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, একজনের মৃগী রোগ হলে তার বংশপরম্পরায় এই রোগ লেগে থাকে। নবী (সা.) এর সন্তানাদি, দৌহিত্ররা এবং তৎপরবর্তী প্রজন্মের কেউ মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন বলে কেউ দেখাতে পারবে না।
ওহিসংক্রান্ত হাদিস : আমরা যদি ওহিসংক্রান্ত সব হাদিস সামনে রেখে ওহি নাজিল হওয়ার সময়কার নবী (সা.) এর সার্বিক অবস্থা এবং মৃগী রোগের লক্ষণ নিয়ে পর্যালোচনা করি, তবে সহজেই উভয়ের মধ্যকার ব্যবধান উপলব্ধি করতে পারব। যেমনÑ
ক. মৃগী রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে বলা হয়েছে, খিঁচুনি শুরু হওয়া এবং চিৎকার করা। ওহি নাজিল হওয়ার সময় নবী (সা.) এর অবস্থা ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সবসময় শান্ত ও নীরব থাকতেন। জীবনে একবারের জন্যও ওহি নাজিলের সময় তাঁর খিঁচুনি শুরু হয়নি কিংবা তিনি চিৎকার করেননি। এর কোনো হদিস তাঁর গোটা জীবনে নেই।
খ. আরেকটি লক্ষণ বলা হয়েছে, কিছু সময়ের জন্য সঠিকভাবে চিন্তা করতে না পারা এবং কী ঘটেছে সে ব্যাপারে কিছু মনেই করতে না পারা। অথচ নবী (সা.) ওহি নাজিল হওয়া শেষ হলেই বলে দিতেন যে, এই মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ঐশীবাণী অবতীর্ণ হলো। ওহিসংক্রান্ত এক দীর্ঘ হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘জিবরাঈল চলে যাওয়ার পর তিনি যা পৌঁছে দিয়ে যেতেন, সেসব আমার মনে থাকত।’ (বোখারি : ২)। তাহলে ওহির সঙ্গে মৃগী রোগের তুলনার প্রশ্নই অবান্তর।
প্রথমে ওহি নাজিলের সময় তা স্মরণ রাখার আশায় নবী (সা.) নিজের জিহ্বা নাড়াতে থাকতেন। পরে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে তাঁকে নির্ভয় দিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্য আপনি দ্রুত ওহি আবৃত্তি করবেন না।’ (সূরা কিয়ামাহ : ১৬)। এরপর নবী (সা.) সেই পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে দিলেন এবং ওহি নাজিল শেষ হওয়ার পর তা সাহাবিদের শুনিয়ে দিতেন। এসব বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মৃগী রোগের সঙ্গে ওহির ন্যূনতম সাদৃশ্য নেই।
গ. আরেকটি লক্ষণ বলা হয়েছে যে, জিহ্বা কামড় দিয়ে রাখা এবং অজান্তে প্রস্রাব কিংবা পায়খানা বেরিয়ে আসা? মানে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় না থাকা। অথচ ওহি নাজিলের সময় নবী (সা.) মানসিকভাবে একেবারে স্বাভাবিক থাকতেন। যেমন দেখুন! একবার নবী (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় তাঁর ওপর ওহি নাজিল হতে শুরু হলো। তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হলো এবং তিনি নীরব দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছু সময় পর ওহি নাজিল হওয়া শেষ হলে দাঁড়ানো অবস্থায় খুতবার মাঝেই বলে দিলেন যে, এই মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা কী নাজিল করেছেন। আরেকটি উদাহরণ দেখুন! একদিন নবী (সা.) খাবার গ্রহণ করছিলেন। সে সময় ওহি নাজিল হতে শুরু হলো। তাঁর হাতে ছিল গোশতের একটি টুকরো। ওহি নাজিল হওয়া শেষ হলে তখনও তাঁর হাতে এই টুকরোটি বহাল তবিয়তে ছিল। মোটকথা, ওহি নাজিলের সময়ও নবী (সা.) এর নিজের ওপর কন্ট্রোল থাকত, মৃগী রোগীর মতো তিনি ভারসাম্যহীন এবং কন্ট্রোল-ছাড়া হয়ে যেতেন না।
হ্যাঁ, এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, ঐশীবাণীর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব, মহান দায়িত্ব ও ভারের কারণে নবী (সা.) এর চেহারা লাল বর্ণ হয়ে যেত এবং শরীর থেকে তীব্র শীতকালেও ঘাম ঝরতে থাকত। এগুলো তো আর মৃগী রোগের কোনো লক্ষণ নয়। 


শিশু মুসা (আ.) কে হত্যার
ওহি যোগে নির্দেশ পেয়ে মহিলা ছুড়ে ফেলল সন্তানকে উনুনের আগুনে।
বিস্তারিত
পানাহারের আদব-কায়দা
মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চাহিদা হলো পানাহার করা।
বিস্তারিত
তাকওয়া ইবাদতরে মূল
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম এবং রাসুল (সা.) এর তরিকা
বিস্তারিত
দেশত্যাগ ও অভিবাসীদের আশ্রয়
হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশে বের হন,
বিস্তারিত
আল্লাহ সবরকারীদের সাহায্য করেন
সবর বা ধৈর্য একটি মহাশক্তি। ধৈর্য হলো শব্দহীন নীরব প্রতিবাদ।
বিস্তারিত
সামাজিক অবক্ষয় এবং আমাদের করণীয়
মানুষ যখন বিভিন্ন প্রতিকূলের কারণে নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন কি
বিস্তারিত