মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

শিশু মুসা (আ.) কে হত্যার ফেরাউনি চক্রান্ত

ওহি যোগে নির্দেশ পেয়ে মহিলা ছুড়ে ফেলল সন্তানকে উনুনের আগুনে। দারোগারা ঘরে তল্লাশি চালাল তন্ন তন্ন করে। চুলার আগুন দেখে সেদিকে যায়নি তারা সন্দেহ করে। ফেরাউনকে জানাল, কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই এ ঘরে। পুলিশ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচলিত মা চুল্লির কাছে গিয়ে দেখে, ‘ইবরাহিমি রক্তধারার শিশু মুসা আগুনের মাঝে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে খেলছে। বুকে জড়িয়ে তিনি আল্লাহর শোকর করেন, হয়তো বিপদ দূর হলো। কিন্তু শয়তান কি এত সহজে নিরস্ত হবে। গুপ্তচর মহিলারা কয়টা টাকার লোভে গোপনে সংবাদ দিল, একটি শিশু এখনও জীবিত ওই বাড়িতে। এসে দেখবেন শিশু অন্দরমহলে কঠোর হেফাজতে। 

ইমরানের স্ত্রীর কলিজা আবারও শুকিয়ে যায়। আসমান থেকে ওহি আসে, ওহে অবলা-অসহায়। চিন্তা করো না স্বয়ং আল্লাহ তোমার সহায়। তুমি একে সিন্ধুকে ভরে ভাসিয়ে দাও নীলনদে। দেখবে তাকে তোমার কোলে ফিরিয়ে দেব কীভাবে। মওলানা রুমি বলেন, এ কাহিনীর শেষ নেই। তাই এখানে ইতি টানতে চাই। ফেরাউন চোখ বন্ধ করে ছেলেশিশু হত্যার উৎসব করেছে বনি ইসরাইলের ঘরে ঘরে। বাইবেলের বর্ণনায় এর সংখ্যা ৯০ হাজার। কোরআন মজিদ এ হৃদয়বিদারক হত্যাকা-ের বিবরণ দিয়েছে অন্তত তিন সূরায়। এরশাদ হয়েছেÑ ‘স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদের ফেরাউনের বংশধরদের হাত থেকে মুক্তি দান করেছি। তারা তোমাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালাত। তোমাদের ছেলে সন্তানদের হত্যা করত আর মেয়ে শিশুদের জীবিত রাখত। এর মধ্যে তোমাদের জন্য ছিল তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা।’ (সূরা বাকারা : ৪৯)।
এর পরের ঘটনায় সরকারি পাইক পেয়াদার ভয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশু মুসাকে নীলনদে ভাসিয়ে দেয়া, ভাসতে ভাসতে তা ফেরাউনের বিবিদের ব্যবহার্য ঘাটে যাওয়া, বিবি আসিয়া ভাসমান সিন্ধুক থেকে মুসাকে উদ্ধার করা, বুকজুড়ানো নবজাতক কোনো মহিলার দুধ পান না করা, পরে ধাত্রীর বেশে মুসা (আ.) এর মায়ের বুকে সন্তানের আশ্রয় ও প্রতিপালন প্রভৃতি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে কোরআন পাকে। আল্লাহ তায়ালা সূরা কাসাসের ৭ থেকে ১৩ আয়াতে বলেনÑ 
৭. মুসার জননীর অন্তরে আমি ইঙ্গিতে নির্দেশ করলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করতে থাক। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করে দিও এবং ভয় করবে না, দুঃখ করবে না। আমি অবশ্যই একে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং একে অন্যতম রাসুল বানাব। 
৮. অতঃপর ফেরাউনের লোকজন (বিবি আসিয়া) তাকে (সাগর থেকে) উঠিয়ে নিল। এর পরিণাম তো এই ছিল যে, সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবে। ফেরাউন, হামান ও তাদের বাহিনী ছিল অপরাধী। 
৯. ফেরাউনের স্ত্রী (ফেরাউনকে) বলল, এ সন্তান আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না। সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে তারা এর পরিণাম বুঝতে পারেনি।
১০. মুসার মায়ের অন্তর অস্থির হয়ে পড়েছিল। যাতে সে আস্থাশীল হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করে দিত।
১১. সে মুসার বোনকে বলল, এর (ই সিন্ধুক) পেছনে পেছনে যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে দূর থেকে দেখছিল।
১২. আগে থেকেই আমি তাকে ধাত্রী স্তন্যপানে বিরত রেখেছিলাম। (কোনো ধাত্রীর দুধ শিশু মুসা পান করছিল না, সেখানে উপস্থিত হয়ে) মুসার বোন বলল, তোমাদের আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দেব (যাদের বুকের দুধ যে কোনো শিশু পান করে) যারা তোমাদের হয়ে একে লালন পালন করবে এবং এর মঙ্গলকামী হবে। 
১৩. অতঃপর আমি একে ফিরিয়ে দিলাম তার জননীর কাছে, যাতে তার চক্ষু জুড়ায়, সে দুঃখ না করে এবং বুঝতে পারে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।
মওলানা রুমি মুসা (আ.) কে নীলনদে ভাসিয়ে দেয়ার বর্ণিত প্রসঙ্গে বেশি অগ্রসর হননি। নবজাতক হত্যার তথ্যচিত্র এঁকে তিনি চলে গেছেন মসনবীর নিজস্ব দর্শন বিশ্লেষণে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মুসা (আ.) এর জন্ম নিরোধের ফেরাউনি চক্রান্তের ব্যর্থতার উপসংহার টেনে তিনি বলেনÑ 
আয জুনুন মী কুশত হার জা’ বুদ জনীন
আয হিয়াল আ’ন কূর চশমে দূর বীন
উন্মাদ, যেখানে পেয়েছে হত্যা করেছে নবজাতক
নানা কৌশলে অন্ধদিল চালিয়েছে হত্যার উৎসব। 
(৩খ. ব-৯৬৩)।
আযদাহা বুদ মকরে ফেরআউনে আনূদ
মকরে শাহা’নে জাহা’ন রা খোরদে বূদ
অবাধ্য ফেরাউনের ফন্দির তুলনা আস্ত আজদাহা
জগতের সব বাদশাহর কৌশল রপ্ত করেছিল যেথা।
(৩খ. ব-৯৬৪)।
লে ক আযু ফেরআউনতর আমদ পদীদ
হাম ওরা’ হাম মকরে উ রা’ দর কশীদ
কিন্তু তার চেয়ে শক্ত কৌশল নিয়ে জন্মাল মুসা নবী
তাকে ও তার ফন্দি কৌশল করে নাস্তনাবুদ সবি। 
(৩খ. ব-৯৬৫)।
আযদাহা’ বুদ ওয়া আসা’ শুদ আযদাহা
ইন বখোর্দ আ’ন রা’ বে তওফীকে খোদা’
ফেরাউন ছিল আজদাহা, মুসার লাঠি হয়ে আজদাহা
আল্লাহর সাহায্যে গিলে ফেলল সব জাদুর তিলিশমা। 
(৩খ. ব-৯৬৬)।
ফেরাউন এ সত্য ভুলে গিয়েছিল যে, যত বড় শক্তিমান, জ্ঞানবান হোক তার ওপরে আরও শক্তিশালী-মহাজ্ঞানী অবশ্যই আছে। যার শেষ সীমায় আছেন মহামহিম আল্লাহ। কাজেইÑ 
হীলেহা’ ও চা’রেহা’ গর আযদাহা’স্ত
পীশে ইল্লাল্লাহ অ’নহা’ জুমলা লা’স্ত
ফন্দি ফিকির কৌশল যদি হয় আজদাহার মতো
ইল্লাল্লাহর সামনে সবই ‘নাই’ থাকে না অস্তিত্ব। 
(৩খ. ব-৯৬৯)।
মওলানা রুমি বলেন, এখানে এসে একটি তিক্ত সত্যের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।
আ’নচে দর ফেরআউন বুদ আ’ন দর তো হাস্ত
লে কে আযদারহা’ত মাহবূসে চাহ আস্ত
ফেরাউনের মাঝে যা ছিল তা আছে তোমার মাঝে
তবে তোমার আজদাহারা আছে কুয়ায় বন্দি রূপে। 
(৩খ. ব-৯৭১)।
ফেরাউনের মাঝে যা কিছু ছিল তা তোমার মাঝেও আছে। তবে তোমার নফসের আজদাহা তোমার দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের কুয়ায় বন্দি অবস্থায় আছে। ফলে নফসের কামনাবাসনা বাস্তবে রূপ দানে তার সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। এ পর্যন্ত ফেরাউনের নাফরমানি সম্পর্কে যা কিছু বলেছি, তা ছিল তোমার অবস্থারই বিবরণ। কিন্তু আফসোস হলো, তুমি বলতে চাও যে, এগুলো সবই ফেরাউনের আচরণ। তুমি বলতে চাও যে, আল্লাহর রহমতে আমি ফেরাউনের মতো নই। অথচ ফেরাউনের মতো সম্পদ ও ক্ষমতা যদি তোমার করায়ত্তে থাকত তোমার আচরণ হয়তো ফেরাউনের চেয়ে নিকৃষ্ট হতো। 
গর যে তো গোয়ান্দ ওয়াহশাত যায়দত
ওয়ার যে দীগার আফসান বেনমায়দত
তোমার দোষ বলা হলে ক্ষেপে যাও তুমি
পরের দোষ তোমার কাছে রূপকথার পুথি। (৩খ. ব-৯৭৩)।
কেউ যদি তোমার স্বভাবের খারাপ দিকগুলো নিয়ে কথা বলে তোমার গোটা অস্তিত্বে তখন অসন্তুষ্টির ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু ওই দোষগুলো যখন অন্যের বেলায় আলোচনা করা হয়, তখন মনে কর যে, এসব রূপকথার সুন্দর পুথি। মওলানা রুমি পরোক্ষভাবে বলতে চান, আল্লাহর নবী ও ওলিরা সরাসরি কারও দোষচর্চা করতেন না। কারণ তাতে মানুষকে হেয় করা হয় এবং তাতে হেদায়েত গ্রহণের পরিবর্তে শ্রোতার মনকে বিদ্বেষে কলুষিত করে। তাই এসব আলোচনা অন্যের বেলায় প্রযোজ্য না ভেবে নিজেকে সেই নিক্তিতে মাপা উচিত। মওলানা বলতে চান, তোমার ভেতরে ফেরাউনরূপী যে নফস আছে, তা তোমার কী অনিষ্ট করে, তা কি বলব?
চে খারাবত মী কুনাদ নফসে লায়ীন
দূর মী আন্দাযাদাত সখত ইন করীন
কী শত্রুতা করে অভিশপ্ত নফস তোমার সঙ্গে
সে তোমায় ছুড়ে মারে সান্নিধ্যের মাকাম থেকে। 
(৩খ. ব-৯৭৪)।
আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যের মাকাম থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে জঘন্য ক্ষতি তো আর কিছুই হতে পারে না। নফস ফেরাউন সে কাজটিই তোমার সঙ্গে করে। তোমার নিজের এমন অবস্থার কথা বুঝতে না পারার একটি কারণ হচ্ছেÑ
আতেশাত রা’ হেইযুমে ফেরআউন নীস্ত
ওয়ার না চোন ফেরআউন উ শো’লা যনীস্ত
তোমার আগুনের নেই ফেরাউনের সেই লাকড়ি
নচেৎ জ্বলত ফেরাউনের মতো লেলিহান অগ্নি। 
(৩খ. ব-৯৭৫)।
তোমার কাছে ফেরাউনের মতো ক্ষমতা, অর্থবিত্ত, রাজত্ব নেই, তাই তোমাকে সুবোধ মনে হচ্ছে। যদি ফেরাউনের মতো সুযোগ-সুবিধা তোমাকে দেয়া হতো তাহলে দেখতে যে, তোমার নফস থেকে নাফরমানির আগুন জ্বলছে। কাজেই নিজের ফেরাউনকে দমিয়ে রাখার ব্যবস্থা নাও। 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
তৃতীয় খ-, বয়েত : ৯৫৫-৯৭৫) 


ইসলামী বীমার বৈশিষ্ট্য
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উত্তরাধিকারীদের নিঃস্ব, পরমুখাপেক্ষী ও অপর লোকদের
বিস্তারিত
দুর্নীতি প্রতিরোধে তাকওয়া
বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে
বিস্তারিত
আলী (রা.) এর কয়েকটি অমূল্য
১. হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসার
বিস্তারিত
শিক্ষক ও অভিভাবকদের আদর্শ
প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা ছিল অদৃশ্য জাতি। তাদের ছিল না কোনো
বিস্তারিত
নামাজে একাগ্রতার গুরুত্ব
ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ। নামাজের মাধ্যমে মোমিন ব্যক্তি
বিস্তারিত