সুখে-দুঃখে আল্লাহর ইবাদত

মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

প্রতিটি মানুষের ইহকালীন জীবন দুই অবস্থাকে ঘিরে আবর্তিত। হয়তো আল্লাহ তাকে নেয়ামত ও আনন্দের পোশাক পরান কিংবা তার থেকে তা খুলে নেন। গ্রাস করে তাকে দুঃখ, দুর্দশা ও দুর্ভোগ। আদমসন্তানের কারও জীবনই ইহকালে এ দুই অবস্থা থেকে মুক্ত নয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সূরা আম্বিয়া : ৩৭)। সুতরাং একদিন আমাদের অনুকূলে, একদিন প্রতিকূলে। একদিন আমাদের খুশির, একদিন বিষাদের। 
এটা মূল বিষয় নয় যে, সুখ-দুঃখের এ পালাবদল অবধারিত ও অপরিত্রাণযোগ্য, বরং মূল বিবেচ্য হলো কীভাবে এ দুই অবস্থা সামলাবেন। কীভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে এ থেকে উপকৃত হবেন। আনন্দ-বেদনায় উভয় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আপন রবের নৈকট্য ও সন্তোষ অর্জন করবেন এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ আহরণ করবেন। মানুষ তার সহজাত প্রবণতায় আনন্দ-বেদনার উভয় অবস্থায় কী করে, তা আমাদের রব আমাদের জন্য বলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর অবশ্যই যদি আমি মানুষকে আমার রহমতের আস্বাদ গ্রহণ করতে দিই, অতঃপর তা তার থেকে ছিনিয়ে নেই, তাহলে সে হতাশ ও কৃতঘœ হয়। আর যদি তার ওপর আপতিত দুঃখ-কষ্টের পর তাকে সুখ ভোগ করতে দিই, তবে সে বলতে থাকে, আমার অমঙ্গল দূর হয়ে গেছে। আর সে আনন্দে আত্মহারা হয়, অহংকারে উদ্ধত হয়ে পড়ে।’ (সূরা হুদ : ৯-১০)। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করে। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সুদীর্ঘ দোয়া করতে থাকে।’ (সূরা ফুসসিলাত : ৫১)। 
বনি আদম একজন মানুষ হিসেবে সুখে-প্রাপ্তিতে উল্লাসে ফেটে পড়ে। মনে করে আল্লাহ তাকে এ দিয়ে বিশেষিত করেছেন তারই মর্যাদার ভিত্তিতে। এমনকি সে হীন, গর্ব ও অহমের পর্যায়ে চলে যায়। ভুলে যায় এ কেবল আল্লাহরই দান। আল্লাহ চাইলে চোখের পলকে তা ছিনিয়ে নিতেও পারেন। ‘যখন মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার পালনকর্তাকে ডাকে, অতঃপর তিনি যখন তাকে নেয়ামত দান করেন, তখন সে কষ্টের কথা বিস্মৃত হয়ে যায়, যার জন্য আগে ডেকেছিল এবং আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করে, যাতে অপরকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে।’ (সূরা জুমার : ৮)। পক্ষান্তরে আল্লাহ যখন তাকে অসুবিধা দিয়ে পরীক্ষা করেন, তার ওপর থেকে সুবিধা ও দয়ার চাদর টেনে নেন। আমরা তাকে পাই উত্তেজিত, অসন্তুষ্ট ও হতাশ। এমনকি সে আল্লাহকে অভিযুক্তও করে তকদিরের ব্যাপারে। প্রশ্নও তোলে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে। আল্লাহ যেমন বলেন, ‘যদি তাকে অমঙ্গল স্পর্শ করে, তবে সে সম্পূর্ণ রূপে নিরাশ হয়ে পড়ে।’ (সূরা ফুসসিলাত : ৪৯)। আরও বলেন, ‘আর যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে : আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।’ (সূরা ফজর : ১৬)। 
এ তো পরীক্ষা, কি না পরীক্ষা! অথচ অধিকাংশ মানুষই বোঝে না! মানুষ এমনই করে। এমনই স্বভাব মানুষের। তবে মানুষের একটি দল ব্যতিক্রম, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘তবে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে।’ (সূরা হুদ : ১১)। এরাই তো সত্যিকার মোমিন। যারা আল্লাহর সঙ্গে সততার পরিচয় দিয়েছে। সুখে-দুঃখে করেছে শুকরিয়া ও সবর। আল্লাহ তাদের তওফিক দিয়েছেন শ্রেয়তর কথা, কাজ ও আখলাকের। তারা অনুধাবন করেছে যে, তাদের ওপর আল্লাহর সাগ্রহ দাসত্ব পাওনা যেমন সুখে-আনন্দে, তেমন দুঃখ ও বিষাদেও। তারা উভয় অবস্থায় আল্লাহর দাসত্বের চেষ্টা-কসরত করেছে। ফলে তারা সুখী হয়েছে নিজেদের জীবনে। প্রীত হয়েছে নিজেদের জীবনপ্রণালিতে। আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছে উভয় অবস্থায়। তাই আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের সন্তুষ্ট করেছেন। আর এ পর্যায়ের দাসত্বের তওফিক হয় কেবল মোমিনেরই। যেমন মুসলিমে নবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘মোমিনের অবস্থা কতই না চমৎকার! তার সব অবস্থায়য়ই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মোমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দের উপলক্ষ পায়, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ফলে তা হয় তার জন্য কল্যাণবাহী। আর যখন সে কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন সবর করে এবং ধৈর্যে অটল থাকে। ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।’ তাই প্রকৃত মোমিনই মানুষের মধ্যে রবের সন্তোষ লাভে অধিক সৌভাগ্যবান। তারাই তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এ জীবন ও তার সুখ উপভোগে পূর্ণতার অধিকারী। মানবজীবনে অবিচ্ছেদ্য ভালো-মন্দ উভয় অবস্থা সামলানোর ক্ষেত্রে বেশি বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। 
বান্দার ওপর আল্লাহর দাসত্ব পাওনা যেমন সুখে ও আনন্দে, তেমনি তা পাওনা দুখে ও বিষাদে। এ দুই দাসত্বই সৌভাগ্যের ভিত ও চালিকা শক্তি। যে উভয়টিই পূর্ণতা দেয় ও সম্পাদন করে, তার চেয়ে আর ভাগ্যবান হয় না। হয় না তার চেয়ে প্রশস্ত বক্ষ এবং পূর্ণতর তৃপ্ত ও পরিতৃপ্ত কেউ। 
বান্দার ওপর আল্লাহর নেয়ামত অসংখ্য ও বহুমুখী। তবে সবই দুই ধরনের কোনোটিতে অন্তর্ভুক্ত। পরিমাণে সবচেয়ে বড় ও মূল্যবান হলো ধর্মীয় ও অপার্থিব নেয়ামত, ঈমানি আত্মিক দান, আধ্যাত্মিক ও আখলাকি উপহার। এর মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠতর হলো তওহিদ ও ঈমানের নেয়ামত। ইলম, প্রজ্ঞা ও দ্বীন বিষয়ে ব্যুৎপত্তির নেয়ামত। একতা, সম্প্রীতি ও কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার নেয়ামত। দ্বিতীয় প্রকার বস্তু ও অর্থগত পার্থিব নেয়ামত, যা বান্দাকে ধর্মীয় নেয়ামত লাভে সহায়ক হয়। যাতে সে অর্জন করে বৈধ ও পবিত্র উপভোগের আনন্দ। যেমন শারীরিক সুস্থতা, মাতৃভূমির নিরাপত্তা, শাসকের ন্যায়পরায়ণতা এবং স্ত্রী-সন্তান-সম্পদের নেয়ামত। উভয় প্রকারই উদ্ভাবন, সূচনা ও ধারাবাহিকতার দিক থেকে আল্লাহর নেয়ামত। ‘তোমাদের কাছে যেসব নেয়ামত আছে, তা আল্লাহরই পক্ষ থেকে।’ (সূরা নাহল : ৫৩)। ‘যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে গুনে শেষ করতে পারবে না।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৪)। প্রকৃত মোমিন আল্লাহর অবিরত নেয়ামতের সামনে শোকর ও প্রশংসার ইবাদত-দাসত্বে নিরত হয়। স্বীকার করে এ তাঁর এবং তাঁরই দান। এ কেবল তাঁরই অনুগ্রহ, বান্দাদের ওপর তাঁরই কৃপা। অতপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে ভাষায় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। আর এসব নেয়ামত সে কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করে। যে এর ব্যত্যয় ঘটায়, সে অকৃতজ্ঞ। তার নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়া হয়। 

১৬ মহররম ১৪৩৯ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব 


ইসলামী বীমার বৈশিষ্ট্য
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উত্তরাধিকারীদের নিঃস্ব, পরমুখাপেক্ষী ও অপর লোকদের
বিস্তারিত
দুর্নীতি প্রতিরোধে তাকওয়া
বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে
বিস্তারিত
আলী (রা.) এর কয়েকটি অমূল্য
১. হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসার
বিস্তারিত
শিক্ষক ও অভিভাবকদের আদর্শ
প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা ছিল অদৃশ্য জাতি। তাদের ছিল না কোনো
বিস্তারিত
নামাজে একাগ্রতার গুরুত্ব
ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ। নামাজের মাধ্যমে মোমিন ব্যক্তি
বিস্তারিত