ইসলামী বীমার বৈশিষ্ট্য

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উত্তরাধিকারীদের নিঃস্ব, পরমুখাপেক্ষী ও অপর লোকদের ওপর নির্ভরশীল করে রেখে যাওয়া অপেক্ষা তাদের সচ্ছল, ধনী ও সম্পদশালী রেখে যাওয়া তোমাদের পক্ষে অনেক ভালো।’ (বোখারি)।

বীমা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষেত্রবিশেষে এর গুরুত্ব ব্যাংকের চেয়েও বেশি। কেননা দুর্ঘটনার কারণে কারও ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে অথবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে গেলে বীমা ব্যবস্থা যেভাবে তার পাশে দাঁড়াতে ও সহায়তার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে ব্যাংকের সে ক্ষমতা বা সুযোগ নেই। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পরিবারের প্রধান বা মূল উপার্জনকারীর দুর্ঘটনায় পতিত হলে বা মৃত্যু হলে পরিবারে যখন দুঃখের অমানিশা নেমে আসে ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, তখন জীবন বীমাই তাদের কার্যকর সহায়তা দিতে পারে। মূলত এ উদ্দেশ্যেই বীমার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। উপরন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থার সফলতার জন্যও বীমার সহযোগিতা অপরিহার্য। আইনগত কারণেই ব্যাংকিং সেক্টর বীমার সাহায্য নিতে বাধ্য। তাছাড়া বীমা কোম্পানির সংগৃহীত তহবিল ব্যাংকিং খাতে মূলধন জোগায়। এসব কারণে ব্যাংক ও বীমা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত ও পরস্পর নির্ভরশীল।

প্রচলিত বীমায় ইসলামের আপত্তি
প্রচলিত সনাতন পদ্ধতিতে বীমা মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয় বলে ইসলামী শরিয়া বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বিপদ-আপদ ও আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও সন্তানসন্ততির জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরির ক্ষেত্রে ইসলামে কোনো আপত্তি নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উত্তরাধিকারীদের নিঃস্ব, পরমুখাপেক্ষী ও অপর লোকদের ওপর নির্ভরশীল করে রেখে যাওয়া অপেক্ষা তাদের সচ্ছল, ধনী ও সম্পদশালী রেখে যাওয়া তোমাদের পক্ষে অনেক ভালো।’ (বোখারি)। তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সংকটাপন্ন লোকের সংকট নিরসন করার উদ্যোগ নেয় আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সংকট থেকে অব্যাহতি দেবেন।’ (মুসলিম)।
আপাতদৃষ্টিতে প্রচলিত সুদভিত্তিক বীমা ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে একটি স্বেচ্ছাধীন সঞ্চয়ী ব্যবস্থা বলেই মনে হয়। কিন্তু এতে এমন কয়টি মৌলিক শরিয়াবিরোধী উপাদান রয়েছে, যার অপনোদন বা প্রতিবিধান না ঘটলে মুসলমানদের পক্ষে ঈমান-আকিদা বজায় রেখে এ বীমা পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। শরিয়াবিরোধী এ উপাদানগুলো হচ্ছেÑ ১. আল-ঘারার, ২. আল-মাইসির, ৩. আল-রিবা। 

আল-ঘারার (অজ্ঞতা/অনিশ্চয়তা)
প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় বীমা গ্রহীতা বীমা কোম্পানির (সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই) সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার পলিসি গ্রহণের চুক্তি সম্পন্ন করার পর সেই টাকা অনেকগুলো সমান কিস্তিতে প্রিমিয়াম হিসেবে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে জমা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি প্রিমিয়াম জমা দেয়ার পর বীমা গ্রহীতা দুর্ঘটনাকবলিত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে বীমা কোম্পানি পলিসির চুক্তি মোতাবেক পুরো টাকাটাই বীমা গ্রহীতা বা তার নোমিনিকে প্রদান করে থাকে। কিন্তু এ টাকা কোথা থেকে কীভাবে প্রদান করা হলো, তা বীমা গ্রহণকারীর কাছে অজানা বা অজ্ঞাত থাকে। 

আল-মাইসির (জুয়া)
বীমার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জীবন বীমার ক্ষেত্রে আল-ঘারার বিদ্যমান থাকার কারণেই জুয়া বা আল-মাইসিরের উদ্ভব ঘটে। উদাহরণত যখন জীবন বীমার কোনো পলিসি গ্রহীতা তার বীমার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তখন চুক্তিবদ্ধ প্রিমিয়ামের আংশিক পরিশোধ করা হলো। তার নোমিনি বা মনোনীত ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অর্থের পুরোটাই পেয়ে থাকেন। 
শরিয়ার দৃষ্টিতে অর্থের টাকাদাতার ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

আল-রিবা (সুদ)
প্রচলিত বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে সুদের লেনদেন, সুদভিত্তিক বিনিয়োগ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আদান-প্রদান অব্যাহত থাকে, যা শরিয়া আইন ও অনুশাসনের পরিপন্থী বলে ফকিহরা মতামত ব্যক্ত করেছেন।
ইসলামী তাকাফুল
উপরোক্ত সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে এবং একই সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজন পূরণ ও ইসলামে গ্রহণযোগ্য একটি বিকল্প বীমা ব্যবস্থার সন্ধানে ইসলামী আইনবেত্তা ও বীমা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে চিন্তাভাবনা, গভীর গবেষণা ও পর্যালোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত তারা ইসলামী পদ্ধতির বীমা ব্যবস্থা উদ্ভাবনে সমর্থ হয়েছেন। ইসলামী শরিয়াসম্মত বীমা পরিচালনা প্রসঙ্গে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬১ সালে দামেস্কে, ১৯৬৫ সালে কায়রোয়, ১৯৭৫ সালে মরোক্কো ও লিবিয়ায় এবং ১৯৭৬ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত সম্মেলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবশেষে ১৯৮০ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে সংস্থাভুক্ত দেশগুলোয় ইসলামী বীমা চালু করার সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। উল্লেখ্য বাহরাইনে সর্বপ্রথম ইসলামী বীমার কার্যক্রম শুরু হয়। এজন্য সে দেশে পৃথক আইনও প্রণীত হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী বীমা বিস্তৃতি লাভ করে। আফ্রিকায় এর কার্যক্রম প্রথম শুরু হয় সুদানে। দূর প্রাচ্যে মালয়েশিয়া এ ব্যাপারে এগিয়ে রয়েছে। ইসলামী বীমার প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সে দেশে ‘মালয়েশিয়া তাকাফুল অ্যাক্ট-১৯৮৪’ নামে পৃথক আইন প্রণীত হয়েছে।
ইসলামী বীমা তাকাফুল নামেই বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আরবি কাফালা শব্দ থেকে এটি উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ যৌথ জামিননামা বা সমষ্টিক নিশ্চয়তা, অর্থাৎ পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ। বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাকাফুল হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সদস্য গ্রুপের যৌথ নিশ্চয়তার অঙ্গীকার, যা দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য বা সদস্যদের ক্ষতিপূরণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। গ্রুপের সদস্যরা এমন একটি যৌথ নিশ্চয়তার চুক্তিকে আবদ্ধ হন, যাতে কোনো সদস্য দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের শিকার হলে তার ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ লাভ করতে পারেন। বস্তুত এটি হচ্ছে গ্রুপের সব সদস্য তাদেরই একজনের বিপদে সাহায্য করার জন্য সবাই একযোগে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়ে আসেন। তাকাফুল ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ভ্রাতৃত্ব, সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা। ইসলামী তাকাফুল তাই একই সঙ্গে একটি সহায়তামূলক ও কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠান এবং একজন মোমিন ভাইয়ের আপৎকালে তার সাহায্যে এগিয়ে আসার গোষ্ঠীবদ্ধ উপায়।
এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় গৃহীত তাকাফুল অ্যাক্টের সংজ্ঞাটি প্রণিধানযোগ্য। এতে বলা হয়েছে, ভ্রাতৃত্ব, সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা তাকাফুল এমন এক স্কিম যেখানে প্রয়োজনের সময়ে অংশগ্রহণকারীরা পারস্পরিক আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা জোগায়। এ উদ্দেশ্যে তারা পরস্পর সম্মত হয়েই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। শরিয়ার অনুমোদন নেই, এমন কোনো উপাদান এর উদ্দেশ্য ও কর্মকা-ে সম্পৃক্ত থাকে না।

ইসলামী বীমার বৈশিষ্ট্য
ইসলামী শরিয়া বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান সুদি বীমা ব্যবস্থাকে ইসলামীকরণের জন্য যেসব পরিবর্তনের সুপারিশ করেছেন, সেগুলো এককথায় যুগান্তকারী ও বীমা গ্রহীতার স্বার্থ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে খুবই বলিষ্ঠ ও কার্যকর। এসব পরিবর্তন ও সংযোজনই ইসলামী তাকাফুল ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত। যেমনÑ
ক. কোম্পানি তার তহবিল শরিয়াসম্মত উপায়ে বিনিয়োগ করবে। ইসলামে নিষিদ্ধ ও সুদের সংশ্রব রয়েছে, এমন কোনো ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য বা কার্যক্রমে কোনো অর্থ বিনিয়োগ বা লেনদেন করা যাবে না। তাকাফুল পরিকল্পনা ও কর্মকা-ের বিধিবিধানের উৎস হবে শরিয়া।
খ. প্রচলিত বীমা ব্যবসায় সৃষ্ট তহবিল বীমা কোম্পানির মালিকানায় থাকে। কিন্তু ইসলামী বীমা কোম্পানিতে পলিসি গ্রহীতাদের অর্থে সৃষ্ট তহবিল তাদেরই মালিকানায় থাকে। বীমা গ্রহীতাদের কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মতোই বিবেচনা করা হয়, যেন তারা কোম্পানির মুনাফা বা নিট উদ্বৃত্তের অংশীদার হতে পারেন।
গ. বীমা প্রতিষ্ঠানটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই একটি শরিয়া সুপারভাইজারি বোর্ড থাকবে। এ বোর্ড শরিয়ার আলোকে প্রতিটি কাজ তদারক এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করবেন।
ঘ. ইসলামী তাকাফুল ব্যবস্থায় নোমিনি বা মনোনীত ব্যক্তি ট্রাস্টি বা অছি হিসেবে কাজ করবে। প্রাপ্ত অর্থ শরিয়াসম্মত ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া তারই দায়িত্ব বাঞ্ছনীয়।

লেখক : মুরাকিব, শরিয়া কাউন্সিল
পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড


যার জন্য আখেরাতে ‘সর্বোচ্চ সম্মানিত
অবশ্যই কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এমন বহু মর্যাদা ও
বিস্তারিত
ওসমান বিন আফফান (রা.)
মহানবী (সা.) এর প্রিয় জামাতা জিন্নুরাইনখ্যাত ওসমান বিন আফফান (রা.)
বিস্তারিত
সহজতম আমল জিকির
মুসলিম মাত্রই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বহুমাত্রিক আমল-ইবাদত করে থাকে।
বিস্তারিত
কৃষি উন্নয়নে মুসলমানের অবদান
আধুনিক প্রযুক্তি যত মহাকাশে পৌঁছুক, শিল্পকারখানা যত উন্নত হোক, আবাসন
বিস্তারিত
আশা-আকাক্সক্ষার নীতিমালা
আল্লাহ এ মহাবিশ্বকে অধীন করে মানুষের সীমাহীন আশা-আকাক্সক্ষার ক্ষেত্র বানিয়েছেন।
বিস্তারিত
খুঁটিবিহীন আকাশ আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি
আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির মাঝে আকাশ একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি। যার নেই
বিস্তারিত