মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

শোকরিয়ার সুফল ও কৃতজ্ঞদের পুরস্কার

হে আল্লাহর বান্দারা, তোমাদের পালনকর্তা তাঁর সাধারণ ও বিশেষ অনেক নেয়ামতের কথা তোমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, যাতে তোমরা তাঁর শোকর আদায় কর। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। আল্লাহ ছাড়া কি কোনো এমন স্রষ্টা আছে, যে তোমাদের আকাশম-লী ও পৃথিবী থেকে জীবিকা দান করে? তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং কোথায় তোমরা বিপথে চালিত হচ্ছ?’ (সূরা ফাতির : ৩)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা কি দেখ না, আল্লাহ আকাশম-লী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার সবই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?’ (সূরা লোকমান : ২০)। তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন সব নেয়ামত ও অনুগ্রহ তাঁর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ হয়, যেন আমরা ইবাদত ও শোকর আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর হক সম্পন্ন করি এবং আরও বেশি পেতে তাঁর শরণাপন্ন হই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে যেসব নেয়ামত আছে, তা তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই।’ (সূরা নাহল : ৫৩)। তিনি আরও বলেন, ‘ভালো ও কল্যাণকর যা কিছু তোমার কাছে আসে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এবং অকল্যাণকর যা কিছু তোমাকে আক্রান্ত করে, তা তোমার নিজের কারণে।’ (সূরা নিসা : ৭৯)।
ভালো ও সুন্দর যা কিছুই মানুষ লাভ করে, সার্বিক দিক থেকেই তা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া; যা কিছু মন্দ ও নিকৃষ্ট তা মানুষের কারণে ঘটে। আল্লাহ সেটা লিখে দিয়েছেন; নির্ধারণ করে রেখেছেন। পালনকর্তা কারও প্রতি অণুপরিমাণ অবিচার করেন না। তিনি বলেন, ‘বরং আল্লাহ সারা বিশ্বের প্রতি অনুগ্রহশীল।’ (সূরা বাকারা : ২৫১)। মানুষ বেশকিছু অনুগ্রহের কথা জানলেও অধিকাংশ অনুগ্রহ সম্বন্ধে অজ্ঞ। হে মানুষ, আল্লাহ তোমার প্রতি এমন অনেক অনুগ্রহ করেছেন এবং তা দিয়ে তোমাকে প্রসন্ন করেছেন, যা তুমি টেরও পাও না। এমন অনেক অনিষ্ট ও বিপদ তোমার থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, যা তুমি জান না। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে, তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।’ (সূরা রাদ : ১১)। 
মানুষের ইচ্ছা ছাড়াই শরীরের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার জীবন ও দেহের উপকারার্থে নিজের দায়িত্ব পালন করছে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমাদের মধ্যেও। তোমরা কি অনুধাবন কর না।’ (সূরা জারিয়াত : ২১)। তিনি আরও বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।’ (সূরা নাহল : ১৮)। যে অনুগ্রহ ও নেয়ামতের সংখ্যা গুনতে অক্ষম, সে তো তার অধিকাংশ সম্পর্কে অজ্ঞই থাকবে। আল্লাহ এসব নেয়ামত দান করেছেন যেন সেগুলোকে আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য, পৃথিবীকে আবাদ ও সংশোধনকল্পে কাজে লাগানো হয়। আল্লাহ বলেন, ‘এবং আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে তোমাদের বের করেছেন, তোমরা তখন কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দান করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সূরা নাহল : ৭৮)।
বেশকিছু বিষয়ের সমাবেশ ঘটিয়ে নেয়ামতের শোকর আদায় করতে হয়Ñ অনুগ্রহকারীকে ভালোবেসে ও তাঁর প্রতি বিনম্র হয়ে, তোমার প্রতি অনুগ্রহ করার কারণে। পাশাপাশি অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে, প্রতিটি নেয়ামত বান্দার প্রতি সার্বিক দিয়ে আল্লাহর দয়া ও করুণা। আল্লাহর কাছ থেকে বান্দা তা পাওয়ার উপযুক্ত নয়। মুখের ভাষা দিয়ে এসব নেয়ামতের প্রশংসা করতে হবে। আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী ও প্রার্থী হয়ে তা গ্রহণ করতে হবে। নেয়ামতকে শ্রদ্ধা করতে হবে। আল্লাহর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজে নেয়ামতগুলো ব্যবহার করতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় ও পছন্দনীয় কাজে তার নেয়ামতগুলো ব্যবহার করেছে, নিজের মধ্যে দ্বীন কায়েম করার ক্ষেত্রে সেগুলোকে সহায়ক বানিয়েছে এবং মানুষের প্রতি সদাচরণ করে এগুলোর মাধ্যমে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছে, সে ব্যক্তি নেয়ামতের যথার্থ শোকর আদায় করেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী কাজে তাঁর নেয়ামতগুলো ব্যবহার করেছে এবং অন্যের অধিকার দিতে অস্বীকার করেছে, সে নেয়ামতের অকৃজ্ঞতা করেছে।
নেয়ামত বান্দাকে যেন অহংকারী ও দাম্ভিক বানিয়ে না দেয়; শয়তান যেন তাকে প্ররোচিত না করে। ফলে সে মনে করে এসব নেয়ামত পেয়ে অন্যের চেয়ে সে উত্তম হয়েছে অথবা তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব শুধু তাকেই দেয়া হয়েছে। বান্দাকে জানতে হবে আল্লাহ ভালো-মন্দ দিয়ে পরীক্ষা করেন কে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল তা জানতে। ঈমানের অর্ধেক হলো শোকর আর বাকি অর্ধেক হলো ধৈর্য। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি লক্ষ কর না আল্লাহর অনুগ্রহে নৌযানগুলো সমুদ্রে বিচরণ করে, যা দ্বারা তিনি তোমাদের তাঁর নিদর্শনার কিছু প্রদর্শন করেন? এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।’ (সূরা লোকমান : ৩১)। আয়েশা (রা.) মুয়াবিয়া (রা.) এর কাছে চিঠি লিখে বলেছেন, ‘অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুগ্রহকারীর প্রতি ন্যূনতম কর্তব্য হলো সে যেন সে অনুগ্রহকে তাঁর অবাধ্যতার পথ না বানায়।’ 
নেয়ামতের শোকরের চেয়ে উপরের স্তর হলো বিপদ ও সংকটের পরিস্থিতিতে শোকর আদায় করা। সেসব অপ্রীতিকর বিষয়ের ক্ষেত্রেও আল্লাহর প্রশংসা করা, মুসলিম ব্যক্তি যেগুলোয় আক্রান্ত হয় এবং তার সেটা প্রতিরোধ করার শক্তি থাকে না। এ স্তরের লোকরাই সবচেয়ে আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেননা তারা সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর প্রশংসাকারী। আল্লাহ আমাদের তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করো এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৫২)। সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা হলো রাব্বুল আলামিনের প্রতি ঈমান আনা। এটা মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি সব মানুষের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত রেসালতের নেয়ামতের শোকর। এরপর  অন্যান্য বিশেষ ও ক্ষুদ্রতম নেয়ামতের শোকর করতে হবে, যদিও আল্লাহর নেয়ামতে ক্ষুদ্র বলে কিছু নেই। নেয়ামতে সবচেয়ে মারাত্মক অকৃতজ্ঞতা হলো কোরআন ও সুন্নাহ অস্বীকার করা। ইসলামকে অস্বীকার করে অন্য কোনো নেয়ামতের শোকর করলে তা কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যে ঈমানকে অস্বীকার করল তার আমল ধ্বংস ও ব্যর্থ হয়ে গেল, আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।’ (সূরা মায়েদা : ৫)। কৃতজ্ঞ লোকদের জন্য আল্লাহ নেয়ামতের স্থায়িত্ব, সমৃদ্ধি ও তাতে বরকত দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্মরণ করো, তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদের সমৃদ্ধি দান করব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি কঠোর।’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)। শোকরা আদায়কারীরা দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ লাভ করে সফল হয়। তারা পৃথিবীর শাস্তি ও অনিষ্ট থেকে রেহাই পায়; আখেরাতের মহাসংকট থেকে মুক্তি পায়। শোকর নবী-রাসুল ও আল্লাহর মোমিন বান্দাদের বিশেষ আমল।

২১ সফর ১৪৩৯ হি. মসজিদে নববির জুমার খুতবাটির সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


যার জন্য আখেরাতে ‘সর্বোচ্চ সম্মানিত
অবশ্যই কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এমন বহু মর্যাদা ও
বিস্তারিত
ওসমান বিন আফফান (রা.)
মহানবী (সা.) এর প্রিয় জামাতা জিন্নুরাইনখ্যাত ওসমান বিন আফফান (রা.)
বিস্তারিত
সহজতম আমল জিকির
মুসলিম মাত্রই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বহুমাত্রিক আমল-ইবাদত করে থাকে।
বিস্তারিত
কৃষি উন্নয়নে মুসলমানের অবদান
আধুনিক প্রযুক্তি যত মহাকাশে পৌঁছুক, শিল্পকারখানা যত উন্নত হোক, আবাসন
বিস্তারিত
আশা-আকাক্সক্ষার নীতিমালা
আল্লাহ এ মহাবিশ্বকে অধীন করে মানুষের সীমাহীন আশা-আকাক্সক্ষার ক্ষেত্র বানিয়েছেন।
বিস্তারিত
খুঁটিবিহীন আকাশ আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি
আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির মাঝে আকাশ একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি। যার নেই
বিস্তারিত