মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

খুন করে কেউ নিস্তার পাবে না

রায় শুনে গরুর মালিকের অস্থিরতায় পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিল। দাউদ (আ.) দেখলেন, জনগণের মাঝে যে ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়েছে, তা আল্লাহর নবীর প্রতি সন্দেহ জাগাবে, তাদের ঈমানকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেবে। তিনি জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখলেন, ভাইয়েরা! বন্ধুরা! একটি গোপন তথ্য আল্লাহ তায়ালা লুকিয়ে রেখেছিলেন, আমি তা ফাঁস না করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। এখন দেখছি গরুর মালিক তা ফাঁস না করে ছাড়বে না। চল সবাই আমার সঙ্গে, সে গোপন তথ্য আমি তোমাদের জানাতে চাই। অমুক প্রান্তরভূমিতে একটি বটগাছ আছে, রহস্যটি লুকিয়ে আছে সে গাছের কাছে মাটির নিচে। পত্রপল্লবে ঘন সন্নিবিষ্ট গাছ অথচ শিকড় থেকে রক্তের গন্ধ আসে।

কাহিনী হলো, দাবিদার গরুর মালিক ছিল এক মনিবের চাকর। সুযোগ বুঝে সে একদিন মনিবকে হত্যা করে তার গরুর পাল আর সহায়সম্পদ আত্মসাৎ করে লাশটি এখানে মাটিচাপা দিয়েছিল। আল্লাহ তো পরম সহনশীল। এ তথ্য তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন আপন সহনশীলতার গুণে। শেষ পর্যন্ত এ লোকের নাফরমানি আর ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই তার তথ্য আমার কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন। সে এমন নিষ্ঠুর, মনিবের লাশ গুম করার পর মনিবের পরিবারের কোনো খোঁজখবর নেয়নি। আপনারা দেখলেন, একটি গরু ছুটে গিয়ে মালিকের নাতির ঘরে ঢুকেছে। তাই কীভাবে আকাশ-পাতাল তোলপাড় করেছে। সে তো নিজেই তার পাপের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে, নচেৎ আল্লাহ তার পাপ গোপন করে রেখেছিলেন। 
আসলে পাপিষ্ঠরা তাদের পাপের কথা, অপকর্মের তথ্য আল্লাহ গোপন রাখলেও নিজেরাই ফাঁস করে দেয়। কারণ তাদের জুলুমই তাদের ফাঁদে ফেলে দেয়। কোনো জালিমকে যদি দেখ যে প্রকাশ্যে বলছে, দেখ আমার কপালে কেমন শিং গজিয়েছে। আমার সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা কার আছে। নিশ্চিত জেনে রাখ, এ শিং দোজখের আগ্নেয় গরুর। দুনিয়ায় সে নিজের অস্তিত্ব জাহির করেছে। কাজেই জুলুম করে, পাপ করে প্রকাশ্যে বলে বেড়ানোর স্পর্ধা দোজখি হওয়ার পূর্বাভাস। 
মওলানা রুমি (রহ.) পাপিষ্ঠ লোকদের এ অভ্যাস ও ধৃষ্টতার বরাতে বলেছেন, আসলে দুনিয়ায় থাকতেই তোমার হাত-পা বা আচরণ জাহির করে দেয় তোমার ভেতরে কী আছে, তার লক্ষণ। কোরআন মজিদে আছে, ‘আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন পাপিদের মুখ সিলগালা করে দেবেন এবং তাদের হাত ও পা দ্বারা তারা কী কী অর্জন করেছে তার সাক্ষ্য দেবে।’ (সূরা ইয়াসিন : ৬৫)। মওলানা রুমির পর্যবেক্ষণে হাত ও পায়ের এ সাক্ষ্য দুনিয়াতেও প্রকাশ পায়। এ কারণে পাপিদের কথাবার্তা ও আচরণে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাদের চোখে-মুখে পাপের প্রতিভাস ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, সাধারণ অবস্থায় জালেমরা ভদ্র সাজলেও যখন রাগান্বিত হয় বা রাগতস্বরে কথা বলে, তখন কথার ফাঁকে তার ভেদের কথা ফাঁস হয়ে পড়ে। 
মওলানা বলেন, যে মহান সত্তা এ দুনিয়ায় তোমার কথা ও কাজে তোমার মনের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিতে পারেন, ওই জগতে তোমার গোপন তথ্য ফাঁস করা তো তার পক্ষে একেবারেই সহজ। তুমি চিন্তা করলে বুঝতে পারবে, তোমার নফস ও কুপ্রবৃত্তি তোমার মন থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ নির্গত করছে অহরহ, তার মাধ্যমে অবস্থাগত ভাষায় তুমি বলে দিচ্ছ যে, আমি হলাম দোজখি। দেখ আমার আচরণ, শোনো আমার মুখের বচন। ঠিক এ কাজটিই করেছে গরুর মালিক। 
সে একটি গরুর জন্য কীভাবে উথাল-পাতাল করল। অথচ আসামি লোকটির দাদার এক পাল গরু সে লুট করে নিয়েছিল। মনিবকে খুন করার পর আল্লাহর কাছেও অনুশোচনা করেনি; অথবা নিহত লোকটির পরিবারের খোঁজখবরও নেয়নি। মওলানা বলেন, তোমার নফসের চরিত্রও আসলে এরূপ। তুমি তার যতই খাতির-তোয়াজ কর, সে তোমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে না। তার চরিত্র খুনির মতো। কাজেই খুনি নফসে আম্মারার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ছিন্ন কর। 
মওলানা রুমি গরুর মালিকের দায়ের করা মামলার ধারাভাষ্যে ফিরে এসে বলেন, হজরত দাউদ (আ.) লোকজন সঙ্গে নিয়ে যখন প্রান্তরভূমির সেই বৃক্ষের উদ্দেশে রওনা হলেন, তখন বলে দিলেন যে, পেছন থেকে তোমরা বাদীর হাত বেঁধে নাও। তার অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণ আমি উপস্থিত করব। এখানেই তার প্রাপ্য শাস্তি কার্যকর করব। দাউদ (আ.) লোকটিকে বলেন, হে কুকুর স্বভাবের অভিশপ্ত! তুমি যে এত আস্ফালন কর, তোমার আসল পরিচয় হলো, তুমি আসামির দাদার গোলাম। তার দাদাকে হত্যা করে তুমি বড় লোক হয়েছ। সেই তথ্য আল্লাহ ফাঁস করে দিয়েছেন তোমার চরিত্রের কারণে। তোমার বউও ছিল এ জমিদারের কৃতদাসী। কাজেই এ কৃতদাসীর ঘরে জন্ম নেয়া ছেলেমেয়ে সব প্রকৃত মালিক নিহত মনিব এবং তার অবর্তমানে তার বংশধর। 
তুমিও ছিলে তার গোলাম। গোলামের উপার্জন তো মনিবই ভোগ করবে। তোমার সব সম্পদ তাকে দিয়ে দিতে হবে, এটিই ফয়সালা। শুরুতে শরিয়তের বিচারের জন্য হইচই করেছ। এই নাও শরিয়তের ফয়সালা। মনিবকে যখন হত্যা করছিলে, তখন তিনি তোমার কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। তোমার নিষ্ঠুরতা সেদিকে কর্ণপাত করেনি। প্রমাণ চাও তো মাটি খনন কর, দেখবে সেখানে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছোরা পুঁতে রাখা হয়েছে। ভয়ের চোটে তুমিই এ কাজ করেছ। পাশে সেই মজলুমের কঙ্কালও পাবে। ঘটনাক্রমে তোমার নামও লেখা আছে সেই ছোরার গায়ে। লোকেরা মাটি খনন করে দেখল আল্লাহর নবীর কথাই সত্য। উভয় প্রমাণ সেখানে উপস্থিত। তারা দাউদ (আ.) এর প্রতি তাদের অন্যায়ের জন্য মাফ চাইল। তার অলৌকিকত্বের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত আলোচনায় আনল। দাউদ (আ.) হুকুম দিলেন, এ জালেমকে, গরুর মালিকানার দাবিদারকে আল্লাহর বিধানে কিসাস কর। হত্যার বদলে তার প্রাণদ- কার্যকর কর। মওলানা রুমি বলেন,
হেলমে হক গরছে মোয়াসাহা’ কুনাদ
লে কে চোন আয হদ বেশুদ পয়দা’ কুনাদ
আল্লাহর সহনশীলতা যদিও খাতির লেহাজ করে
কিন্তু যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তা ফাঁস করে দেয়।
(৩খ. ব-২৪৮৭)।
খুন নখুসবদ দর ফতদ দর হার দেলী
মেইলে জুস্তো জুয়ে কাশফে মুশকেলী
খুন লুপ্ত হয় না, বৃথা যায় না অন্যায় রক্তঝরা
খুনি ও খুনের কারণ সন্ধানে জাগে মনে স্পৃহা। 
(৩খ. ব-২৪৮৮)।
অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীর সন্ধানের স্পৃহা স্বয়ং আল্লাহই মানুষের মনে জাগিয়ে দেন। তাই তারা অনুসন্ধানে নামে এবং কোনো অবস্থাতেই খুন করে লুকানো যায় না, খুনি কখনও নিস্তার পায় না। কোনো না কোনোভাবে তার তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। জালেম গরুর মালিকের প্রাণদ- কার্যকর করাতে একটি প্রাণের অবসান হলো, তবে শত-হাজারো প্রাণ বেঁচে গেল। সবাই জানল যে, খুনের তথ্য একদিন না একদিন ফাঁস হবেই। খুন করলে কারও নিস্তার নেই। তাতে পুরো দেশ শান্ত হয়ে গেল। মওলানা রুমি বুঝিয়ে বলছেন, তোমার নফসের উপমা গরুর কথিত মালিক। আর তোমার বিবেকের উদাহরণ দোয়ার জোরে মাল সন্ধানী গরুর হন্তারক আর দাউদ (আ.) এর উপমা স্বয়ং আল্লাহ বিচারক। তার কাছে তো মানুষের গোপন কিছু থাকে না। 
গরুর কথিত মালিক তোমার নফসে আম্মারা তার মনিব রুহকে হত্যা করেছে আর তার রুহানি সঞ্চয় ও ইবাদত-বন্দেগি লুট করেছে আর সে দেহের মনিব সেজে বসেছে। 
মুদ্দায়ীয়ে গাও নফসে তোস্ত হীন
খেশতন রা খাজা কর্দে ও মহীন
গরুর দাবিদার আসলে তোমার নফস আম্মারা
মনিবকে মেরে বড়লোক সেজেছে দেহের রাজা।
(৩খ. ব-২৫০৫)।
অ’ন কুশান্দে গাও আকলে তোস্ত রও
বর কুশান্দে গাওয়ে তন মুনকের মশো
গরু হত্যাকারী সে তো তোমার বিবেক আকল
দেহের গরু হত্যাকারীকে করো না অবজ্ঞা। 
(৩খ. ব-২৫০৬)।
আকল আসীরাস্তও হামী খা’হাদ যে হক
রূযীয়ে বী রঞ্জ ও নে’মত বর তাবাক
বিবেক বন্দি, আল্লাহর কাছে চায় সে অবিরত
বিনাশ্রমে রিজিক আর খাঞ্চায় ভরা নেয়ামত।
(৩খ. ব-২৫০৭)।
গরুর দাবিদার মালিকের পরিচয় সে তোমার নফসে আম্মারা। সে তার মনিব রুহকে হত্যা করে তার রুহানি সহায় সম্পদ জবরদখলে নিয়ে নিজেকে প্রভুর আসনে বসিয়েছে। মানুষের অস্তিত্বের ওপর শাসন চালাচ্ছে। আর যে গরু হত্যা করল তার পরিচয় তোমার বিবেক। কাজেই যে লোক তোমার দেহের গরুকে হত্যা করল তাকে তুমি অবহেলা করো না, অবজ্ঞা করো না। দেখ তোমার ভেতরে বিবেকের একটা যন্ত্রণা আছে। মূূলত বিবেক নফসে আম্মারার হাতে বন্দি হয়ে পড়ায় সারাক্ষণ আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানায়, প্রভু হে! আমাকে রিজিক দাও বিনাশ্রমে, দাও তোমার খাঞ্চায় ভরা নেয়ামত-রহমত। তবে বিনাশ্রমের সেই রুজি পেতে হলে শর্ত হলো, তাকে দেহের গরু বস্তুবাদী ধ্যানধারণা জবাই করতে হবে। কারণ দেহের গরুই সব অনর্থের মূল, মন্দের শিকড়। 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
তৃতীয় খ-, বয়েত : ২৪৪২-২৫১১)


সড়কের নিরাপত্তায় ইসলামি বিধান
রাস্তা মানবজাতির সহায়ক পথ। রাস্তার সঙ্গে মানুষের বিশাল এক গভীর
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-৯) এশার নামাজ : আমি যখন নবীজির পরিবার সম্পর্কে জানতে
বিস্তারিত
পরিবেশ বিপর্যয় রোধে ইসলাম
ভারতবর্ষের প্রাচীনতম নগরী দিল্লির বায়ুদূষণ এই মুহূর্তে রাজ্যটির তো বটেই,
বিস্তারিত
ফরজ ওয়াজিব সুন্নত মুস্তাহাব মাকরুহ
পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফ দ্বারা ইসলামের যে বিধান আমাদের
বিস্তারিত
প্রথমে গুণ্ডামি করে মসজিদটা ভাঙা
এ রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি
বিস্তারিত
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাবরি মসজিদের রায়
বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ভারতে হিন্দু-মুসলমান সংঘাত আরও
বিস্তারিত