অনৈতিকতা প্রতিরোধে ইসলাম

 ইসলামী আদর্শ ও জীবনবিধান যথার্থ অনুসরণের মাঝেই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিহিত। পক্ষান্তরে ইসলামী বিধানের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা ও বিরুদ্ধাচারণ সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা ও অশান্তির মূল কারণ। পার্থিব জীবনে যারা স্রষ্টার নির্দেশিত এবং প্রিয়নবী (সা.) এর প্রদর্শিত বিধানানুসারে সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করবে, তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে চিরস্থায়ী শান্তির নীড়

ইসলাম মহান রাব্বুল আলামিনের একমাত্র মনোনীত ধর্ম। মানবজীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জাগতিক, আধ্যাত্মিক, ইহলৌকিকÑ সব সমস্যার সমাধান রয়েছে ইসলামে। ইসলামী আদর্শ ও জীবনবিধান যথার্থ অনুসরণের মাঝেই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিহিত। পক্ষান্তরে ইসলামী বিধানের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা ও বিরুদ্ধাচারণ সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা ও অশান্তির মূল কারণ। পার্থিব জীবনে যারা স্রষ্টার নির্দেশিত এবং প্রিয়নবী (সা.) এর প্রদর্শিত বিধানানুসারে সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করবে, তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে চিরস্থায়ী শান্তির নীড়। যাদের জীবনধারায় ইসলামী বিধিবিধান উপেক্ষিত, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাময় ও লাঞ্ছনাকর স্থান জাহান্নাম।

বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন দুই ধরনের বিধান নির্দেশ দিয়েছেনÑ কতকগুলো পালনীয়, কতকগুলো বর্জনীয়। যেসব বিষয় পালনের নির্দেশ রয়েছে, তা যথার্থরূপে পালনের মধ্যে স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিহিত; আর যেসব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা থেকে বিরত থাকা ও পূর্ণরূপে বর্জন করা ইসলামের দাবি এবং একজন মোমিনের পরিচায়ক। ইসলাম শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামী শরিয়তবিরোধী অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। সুখী ও শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী অনুশাসন ও বিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামী বিধান অস্বীকার ও বিরোধিতাকে চরম ধৃষ্টতা ও মারাত্মক গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। অন্যায়, অত্যাচার, পাপাচার, ব্যভিচার, জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস, চুরি ও ডাকাতিসহ অসামাজিক সব কার্যকলাপ ইসলাম নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আসুন তাহলে দেখে নিই বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশেষ অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে ইসলামের বিধিবিধান।

অবৈধ যৌনাচার প্রতিরোধ 
ইসলামের বিধানে যৌনাচার, ব্যভিচারকে শাস্তিযোগ্য গণ্য করা হয়েছে। কোরআনের ভাষ্য, ‘অবৈধ যৌন সম্ভোগের নিকটবর্তী হয়ো না, এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা বনী ইসরাইল : ৩২)। জিনার শাস্তির বিধানে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘ব্যভিচারিণী এবং ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশত কশাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবান্বিত না করে।’ (সূরা নূর : ২)। অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে দুজন এতে লিপ্ত হবে তাদের শাসন করবে। যদি তারা তওবা করে স্বয়ং নিজেদের সংশোধন করে, তবেই তাদের রেহাই দেবে। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সূরা নিসা : ১৬)।

মদ্যপানে শাস্তি
মদ্যপান ইসলামী উম্মাহর জন্য হারাম। এ বিধান অমান্য করে মদ্যপান করলে তাকে শাস্তি দিতে হবে। এ অপরাধের জন্য দুই ধরনের শাস্তি রয়েছেÑ ইহকালীন ও পরকালীন। ইসলামী আইনজ্ঞরা হাদিসের আলোকে এর শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, মদ্যপানকারীর শাস্তি আশি দোররা বেত্রাঘাত। ইমাম মালেক (রহ.) ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতের সমর্থক। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আপনাকে মদ ও জুয়ার বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আপনি বলুন, সে দুটিতে মহাপাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু পার্থিব উপকারও। আর সে দুটির পাপরাশি উপকার অপেক্ষা বড়।’ (সূরা বাকারা : ২১৯)।

চুরির শাস্তি বিধান 
চুরির শাস্তির বিধান সম্পর্কে আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে পুরুষ কিংবা নারী চোর সাব্যস্ত হয়, তবে তার হাত কর্তন করো। এটা তাদের কৃতকর্মের ফল, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা মায়েদা : ৩৮)। প্রথমবার চুরির কারণে ডান হাত কাটা হবে। এর পর দ্বিতীয়বার আবার চুরি করলে বাম পা, তারপর আবার যদি চুরি করে, তাহলে তাকে বন্দি করে রাখা হবে, যতক্ষণ না তওবা না করে। চুরি করা মাল যদি মজুদ থাকে, তবে তা ফেরত দেয়া ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সূরা নিসা : ২৯)।
 
ডাকাতি
ডাকাতির শাস্তি সম্পর্কে কঠোর বিধান আরোপ করে অসামাজিক কর্মকা- প্রতিরোধে ও মূলোৎপাটনে ইসলাম যেসব আইন প্রণয়ন করেছে, তা শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক নিয়ামক শক্তি। মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘যারা আল্লাহ এবং তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং রাজ্যের ভেতর ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এই যে, তাদের গুনে গুনে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা তাদের একদিকের হাত ও অপরদিকের পা কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটা দুনিয়ায় তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এবং পরকালে তাদের জন্য কঠোর শাস্তি রয়েছে।’ (সূরা মায়িদা : ৩৩)। উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতে অপরাধের মাত্রানুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতএব অপরাধ মারাত্মক পর্যায়ের হলে শাস্তিও তদনুরূপ হবে। অপরাধ হালকা হলে শাস্তিও হালকা হবে। অপরাধের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত শাস্তি প্রদান করলে তা শরিয়তবিরুদ্ধ হবে। যেমন এরশাদ হয়েছে, মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ।’ (সূরা শুরা : ৪০)। যারা মন্দ কাজ করল, তাদের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। (সূরা ইউনুস : ২৭)।

হত্যা ও সন্ত্রাস 
হত্যা ও সন্ত্রাসরোধে ইসলামী বিধান অত্যন্ত কঠোর। কোরআনের ভাষ্যÑ ‘নর হত্যা কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর গোটা মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল, আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন গোটা মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূরা মায়েদা : ৩২)। আরও এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাদের হত্যা করো না। (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৩)। হত্যার পরিণাম সম্পর্কে মহামহিম আল্লাহ বলেন, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মোমিন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার স্থান জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত। আর তিনি তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)।

ইমামের ভূমিকা
ইমাম সমাজের বরণীয় ব্যক্তি। তিনি ধর্মীয় সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তার দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরিসীম। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে ইসলামী বিধিবিধান হেফাজত ও সংরক্ষণে তার অসীম দায়িত্ব রয়েছে। সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, দুরাচার, অশ্লীলতা, নগ্নতা, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধে ইমামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিরাট জনগোষ্ঠীর কর্মকা-ের জিম্মাদার। হাদিসে এসেছে, ‘ইমাম হচ্ছেন, ‘জমিদার’ এবং মুয়াজ্জিন হচ্ছেন আমানদার। হে আল্লাহ! তুমি ইমামদের সত্য পথে দৃঢ় রাখ এবং মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা করো।’ তিনি নির্ভীকচিত্তে সত্য প্রচারে দীন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। মানুষকে দীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন। ন্যায় ও কল্যাণের পথে অনুপ্রাণিত করবেন। দ্বীনি দায়িত্ব পালনে সততা ও নিষ্ঠাবান হবেন। তিনি যদি ত্রুটিবিচ্যুতির প্রতি সজাগ না থাকেন, নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠাকে আহত করে বসেন, অর্পিত দায়িত্ব পালনে সজাগ, সচেতন ও যতœবান না হন, তাহলে বিপর্যয়, ক্ষতি, অকল্যাণ ও চরম অপমান সুনিশ্চিত ও অবধারিত। সৎকাজের প্রতি আহ্বান ও অসৎকাজ থেকে নিষেধকরণে তার অন্যতম গুরুদায়িত্ব। তাই সমাজ থেকে সবধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ দূরীকরণে ইমামের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

লেখক : শিক্ষক, বাইতুন নূর মাদরাসা ঢাকা


উত্তম চরিত্র নিয়ে যাবে জান্নাতে
রাসুল (সা.) এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে দোয়া করতেনÑ তিনি নিজে
বিস্তারিত
আসল ব্যাধির দাওয়াই
ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা। দ্বীনের ওপর চলার ক্ষেত্রে এটা বড়
বিস্তারিত
আলমেদরে সমালোচনা
আমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শক্ষিক ছলিাম। মাদ্রাসায় পড়ার পর আরও
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : সুবাসিত জীবনের পথ লেখক : মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম সম্পাদক
বিস্তারিত
পাথেয়
  ষ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ হচ্ছে স্মৃতিচারণ, মুত্তাকিদের জন্য অবশ্যই
বিস্তারিত
শীতকালের তাৎপর্য ও বিধিবিধান
শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময়
বিস্তারিত