বিশ্বাসের যথার্থতা ও প্রয়োজনীয়তা

মানবসভ্যতা ও পারস্পরিক সহ-অবস্থান কোনো মানুষ বা একক সম্প্রদায়ের ইচ্ছামাফিক চলতে পারে না। পৃথিবীর সব মানুষ মিলিত হয়ে নিজেরা ঐকমত্যে উপনীত হয়ে একই নিয়মে চলবে, এটা শুধুই কল্পনা। তাই স্রষ্টার নির্ধারিত জীবনবিধান ছাড়া অন্য কারও বিধান বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে না। মানবসভ্যতার শৃঙ্খলা, শান্তি, সংহতি ও কল্যাণ সাধনে আল্লাহর নিরূপিত পরিপূর্ণ বিধান অপরিহার্য। সে হিসেবে কোরআন ছাড়া অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যা স্বার্থান্বেষী মানুষ দ্বারা বিকৃত হয়নি। তা ছাড়া অনেক অলীক বিধানও পৃথিবীতে বিদ্যমান, যা প্রকৃত শান্তি আনয়ন করে না। কোরআন সর্বশেষ ও আধুনিকতম পূর্ণাঙ্গ মূল জীবন বিধান। সুতরাং নিজেদের হিত সাধনে সঠিক পথে চলার জন্য স্রষ্টার চূড়ান্ত বিধান হিসেবে একমাত্র কোরআনকেই মেনে চলতে হবে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, যেমনÑ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের সব কর্মকা-ে। 

মুত্তাকির বিশ্বাসের ধরন বর্ণনা করতে কোরআনে ‘ঈমান ও গায়েব’ শব্দ দুইটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ইমান’ এর আভিধানিক অর্থ হলোÑ কারও কথাকে তার বিশ্বস্ততার নিরিখে মনেপ্রাণে মান্য করা। এজন্যই অনুভূতিগ্রাহ্য ও দৃশ্যমান কোনো বস্তুতে কারও কথায় বিশ্বাস স্থাপন করাকে ঈমান বলা যায় না। রাসুল (সা.) প্রদত্ত কোনো তথ্য শুধু তার ওপর বিশ্বাসবশত মেনে নেওয়াকে ইসলামের পরিভাষায় ঈমান বলে। ‘গায়েব’ এর আভিধানিক অর্থ হলোÑ সেসব বস্তু, যা বাহ্যিকভাবে মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে এবং যা পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায় না। কোরআনে অদৃশ্য বা গায়েব বলতে বোঝানো হয়েছে, রাসুল (সা.) যেসব বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন, যার জ্ঞান মানুষ নিজে লাভ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। যার মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব, সত্তা ও গুণাবলি এবং ভাগ্য-সম্পর্কিত বিষয়গুলো, স্বর্গ-নরকের অবস্থা, কেয়ামতে অনুষ্ঠিতব্য ঘটনাগুলো, ফেরেশতা, সব আসমানি গ্রন্থ, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলের বিস্তারিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রাসুল (সা.) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন ওইসব বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থগুলোর প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরদের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং মান্য করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা, আর তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ (সূরা বাকারা : ২৮৫)। অদৃশ্যে বিশ্বাস বা ঈমান বিল গায়েবের অর্থ হলোÑ রাসুল (সা.) যে সৎপথ ও শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, তা মনেপ্রাণে মেনে নেওয়া। তবে তা অকাট্যভাবে রাসুল (সা.) এর শিক্ষা হিসেবে প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু শুধু জানার নাম ঈমান নয়, মান্য করাই ঈমান। 
অন্তরে বিশ্বাসের অন্যতম প্রকাশ হলো ইকামতে সালাত বা নামাজ প্রতিষ্ঠা। নামাজে অভ্যস্ত হওয়া, তা শরিয়তের নির্দেশমতো আদায় করা এবং সব নিয়ম-পদ্ধতি যথাযথভাবে পালন করার নাম নামাজ প্রতিষ্ঠা। স্রষ্টার আনুগত্য ও তাঁর সঙ্গে সংযোগ রক্ষার অন্যতম ব্যবহারিক মাধ্যম হচ্ছে নামাজ। যার ফলে আল্লাহর অদৃশ্য উপস্থিতি মুত্তাকির অন্তরে জাগরূক থাকে। নিজেদের কল্যাণে রাব্বুল আলামিনের সর্বজনীন বিধান বাস্তবায়ন সহজতর হয় এবং অমঙ্গল থেকে নিজেদের সংরক্ষিত রাখতে পারে।
আভিধানিকভাবে কোনো বস্তুতে বিশ্বাস স্থাপন ঈমান এবং কারও অনুগত ও তাঁবেদার হওয়ার নাম ইসলাম। ঈমানের স্থান অন্তর, ইসলামের স্থানও অন্তরÑ সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। কিন্তু শরিয়তে ঈমান ব্যতীত ইসলাম এবং ইসলাম ব্যতীত ঈমান কখনও গ্রহণীয় নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এর প্রতি ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এ বিশ্বাসের মৌলিক স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে কর্মের দ্বারা আনুগত্য ও তাঁবেদারি প্রকাশিত না হয়। ঈমান অন্তর থেকে আরম্ভ হয়ে প্রকাশ্য আমলে এসে পূর্ণতা লাভ করে এবং ইসলাম প্রকাশ্যে আমল থেকে আরম্ভ হয়ে অন্তরে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। তাই যথার্থ ঈমানের পূর্ণ বাস্তবায়নের অপর নাম ইসলাম।
মুত্তাকিদের পরবর্তী গুণ বর্ণনায় মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ কোরআন এবং পূর্ববর্তী রাসুলদের প্রতি অবতীর্ণ গ্রন্থগুলোতে বিশ্বাস স্থাপনের অপরিহার্যতার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বাসের সঙ্গে তা কর্মে বাস্তবায়নই মুখ্য বিষয়। কোরআনের ওপর বিশ্বাস ও তার প্রয়োজনীয়তা প্রথমে আলোচিত হয়েছে। এখানে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলোÑ সেগুলো সত্য ও সঠিক এবং সেসব যুগে এসব গ্রন্থের ওপর আমল করা ছিল ওয়াজিব। আর কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর যেহেতু পূর্ববর্তী গ্রন্থের নির্দেশ ও নিয়ম এবং পূর্ববর্তী শরিয়তগুলো বাতিল হয়েছে, তাই এখন আমল একমাত্র কোরআনের আদেশ অনুযায়ী হবে। কারণ মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আল্লাহ তায়ালার একই দ্বীন যুগে যুগে প্রয়োজন অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়ে ইসলাম সর্বাঙ্গীণ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। যে ইসলামের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্র আর ভোগবাদী ধনতন্ত্রের অসারতা এরই মধ্যে বাস্তবিকভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে।
মুত্তাকিদের অন্যতম গুণ হচ্ছে মৃত্যু-পূর্ববর্তী জীবন বা আখেরাতের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস। যে ঈমান একটি বৈপ্লবিক বিশ্বাস এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়েই ওহি তথা কোরআনের অনুসারীরা প্রথমে নৈতিকতা ও কর্মে এবং পরবর্তী ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃথিবীর সব জাতির মোকাবিলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়েছে। পার্থিব ভোগ-বিলাসকেই যারা মুখ্য মনে করে এবং ইসলামের বিষয়াদিতে যাদের আস্থা নেই এবং হালাল-হারামের পরোয়া করে না, একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে সব মূল্যবোধ যারা বিসর্জন দেয়, তাদের যে কোনো দুষ্কর্ম থেকে বিরত রাখার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আইন প্রয়োগে কোনো দুরাচারীর চরিত্র শুদ্ধি ঘটানো সম্ভব হয় না। গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে তার কোনো বাধা থাকে না। প্রকারান্তরে পরকালের প্রতি ঈমান এমন এক কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বিধি, যা মানুষকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যে কোনো অবস্থায় যে কোনো গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। তার মনে প্রোথিত থাকে সেসব সময় একজন সদাজাগ্রত মহাসত্তার সম্মুখে রয়েছে। তার দৃষ্টিকে আড়াল করার সাধ্য মানুষের নেই। উপরোক্ত বিশ্বাসের মাধ্যমেই প্রাথমিক যুগে অগণিত মহোত্তম চরিত্রের লোক সৃষ্টি হয়েছিল। যাদের চেহারা, চালচলন এবং আচরণ দেখেই অন্যান্য লোক ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হতো। বর্তমানেও আমাদের মাঝে তদ্রƒপ পরিশুদ্ধতা আনতে হবে পার্থিব ও পরকালীন বৃহত্তর কল্যাণে।
বিশ্বাসের যথার্থতাই মানুষকে তার সফলতার পথে নিয়ে যায়। বিশ্বাস অনুযায়ী কর্মফল সে ভোগ করে থাকে। বিপথগামীরা পার্থিব জীবনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও তা সাময়িক। সুতরাং আমরা মৃত্যুকে যখন ঠেকাতে পারি না, তখন ক্ষণস্থায়ী অবৈধ ভোগবিলাসের চেয়ে আল্লাহ প্রদত্ত সঠিক পথে চলাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি?

লেখক : শিক্ষক, বাইতুন নূর মাদ্রাসা ঢাকা


ঊর্ধ্বলোকের সূর্যের সন্ধানী হও
  এক লোকের বউটা ছিল দুষ্টু প্রকৃতির, লোভী ও পেটুক। তবুও
বিস্তারিত
পাথেয়
প্রত্যেকের সঙ্গে ফেরেশতা ও  শয়তান থাকে যুবাইর বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত,
বিস্তারিত
কয়েকটি অবহেলিত সুন্নত
  রাসুল (সা.) এর সুন্নত থেকে মানুষ যতই বিস্মৃত হয়ে পড়ছে;
বিস্তারিত
কোরআনের পুরোনো কপি
  প্রশ্ন : আমাদের মসজিদে কোরআনের পুরোনো অনেক কপি আছে। যেগুলো
বিস্তারিত
হিংসা-বিদ্বেষ সমাজের জন্য অমঙ্গলজনক
হিংসা-বিদ্বেষ সমাজের জন্য অমঙ্গলজনক মাহফুজ আল মাদানী হিংসা বা ঈর্ষার দুটি দিক
বিস্তারিত
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো
  মানবহৃদয়ের সবচেয়ে জঘন্য রোগ হতাশা, যা অনুভূতিকে মেরে ফেলে। নিরাশা,
বিস্তারিত