সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বীপ

বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মাইলের পর মাইল মাঠে লালচে-সবুজ ঘাস। দু-চোখ যতদূর যায় কেবলই ঝাউ গাছ ও নারিকেল গাছের সারি। কোথাও আবার ছোট ছোট খালের পাড়ে সুন্দরবনের মতো গাছপালা গজিয়ে হয়েছে গভীর অরণ্য। এরই মাঝে মনের সুখে অবারিত মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হাজার হাজার মহিষ ও গরু। শিল্পীর আঁকা ছবির মতো এমনই এক এলাকার নাম ‘স্বর্ণদ্বীপ’, যা এক সময় পরিচিত ছিল জাহাজ্জ্যার চর নামে। ১৯৭৮ সালে বঙ্গোপসাগর এবং মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ দীর্ঘ আয়তনের চরাঞ্চলের উন্নয়নমূলক কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। 

রোববার নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত এ স্বর্ণদ্বীপে গিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের নানা চিত্র। মূলত স্বর্ণদ্বীপটি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। সেনাবাহিনীর আধুনিক সব ধরনের প্রশিক্ষণের জন্য এ দ্বীপ অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর বাইরেও সেনাবাহিনী এখানে গড়ে তুলেছে বনায়ন ও খামার এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা। বিশাল ‘মিলিটারি ফার্ম’ ছাড়াও সমতল ভূমির এ দ্বীপে মাছ চাষের জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে অনেক পুকুর। যত দিন যাচ্ছে স্বর্ণদ্বীপ যেন ততই সত্যিকারের স্বর্ণেই রূপান্তর হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর এবং মেঘনা নদীর মোহনায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৪ কিলোমিটার প্রশস্তে এ বিস্তৃর্ণ স্বর্ণদ্বীপটি ২০১২ সালে সেনাবাহিনীকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেয় সরকার। এক সময় এ দ্বীপটি জলদস্যু, ডাকাতসহ অপরাধীদের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরবর্তী সময় সেনাবাহিনীর ক্রমাগত অপারেশনের কারণে এখন আর সেখানে কোনো অপশক্তির অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে সবুজ বনায়ন এবং সেনাবাহিনীর নানা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে স্বর্ণদ্বীপ নয়নাভিরাম এলাকায় পরিণত হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, মেঘনা নদীর মোহনায় উত্তর দিক থেকে দক্ষিণমুখী প্রশস্ত ও দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করছে সেনাবাহিনী। এখানকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এ দ্বীপে নৌপথে চলাচল বা পারাপারের জন্য সেনাবাহিনীর নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি ট্রলার তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ভারি যানবাহন পারাপারের জন্য এলসিটি ও এলসিইউ জাহাজ ব্যবহার করা হয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে নদীর ঘাট থেকে স্বর্ণদ্বীপে স্থাপিত সেনাবাহিনীর ‘ময়নামতি ক্যাম্প’ পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার রাস্তা ও চারটি স্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনী ও জলবায়ু ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় পরিকল্পিত পাঁচটি সাইক্লোন সেল্টারের মধ্যে এরই মধ্যে দুটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। অপর তিনটির কাজও এগিয়ে চলেছে। রেডিও লিংকের মাধ্যমে এ বিরান ভূমিতে টেলিফোন, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সুবিধা চালু করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ও জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে এখানে।

কথা বলে জানা যায়, ২০১২ সালে সরকার স্বর্ণদ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একর জমি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি সেনাবাহিনী আরও প্রায় ৩০০ একর জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া দ্বীপটির দুর্গম এলাকায় ‘সিড বোম্বিং’য়ের (হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বীজ ছড়ানো) মাধ্যমে কেওড়া বীজ ছড়ানো হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ১৫ হাজার উন্নতজাতের নারিকেল গাছের বাগান করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগে রোপণ করা হয়েছে ৬০ হাজার ঝাউ গাছের চারা। এখানে বিশেষভাবে গড়ে তোলা হয়েছে মহিষ, গরু ও ভেড়া পালনের জন্য মিলিটারি ফার্ম। যে ফার্মের আওতায় রয়েছে অসামরিক ২০টি বাথানে প্রায় ১৩ হাজার মহিষ, ১৬ হাজার ভেড়া ও ৮ হাজার গরু। 

এসব বাথান থেকে উৎপাদিত দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরির জন্য একটি কারখানাও স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি এখানে মিলিটারি ফার্মের আওতায় একটি হাঁসের খামার ও কবুতরের খামার তৈরি করা হয়েছে। প্রান্তিক চাষিদের সম্পৃক্ত করে স্বর্ণদীপের ৬০ একর জমিতে ধান ও রবিশস্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এরকম আরও নানা উন্নয়নমূলক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী।

এক সেনা কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণদ্বীপ নিয়ে সেনাবাহিনীর উন্নয়নমুখী ভাবনা অনেক। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকা হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে স্বর্ণদ্বীপটি। এখন পর্যন্ত এ দ্বীপে প্রায় ২৫ হাজার সেনা সদস্য প্রশিক্ষণ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। এখানে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক ও এপিসিসহ নতুন প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি বিশেষায়িত অনুশীলন পরিচালিত হয়ে থাকে, যা একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণেও স্বর্ণদ্বীপ ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সাল থেকে স্বর্ণদ্বীপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা অবস্থার উন্নতিকল্পে নানা কাজ করে যাচ্ছে। এখানে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ পরিচালনার দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে আসছে সেনাবাহিনী। রোববার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কুমিল্লার ৩৩ পদাতিক ডিভিশন ও সিলেটের ১৭ পদাতিক ডিভিশনের যৌথ শীতকালীন যুদ্ধ মহড়া ‘অপারেশন ব্যাঘ্রথাবা’ পরিচালিত হয় এ স্বর্ণদ্বীপে।


পাবনায় চরাঞ্চলে সবজি চাষে কৃষকের
পাবনায় পদ্মা নদীর মাঝে জেগে উঠা চরে এবারে সবজির বাম্পার
বিস্তারিত
জৈন্তাপুরের লাল শাপলার বিল পর্যটকদের
একটি পিচঢালা পথ চলে গেছে গ্রামের শেষ মাথায়। অনেক দূর
বিস্তারিত
জীবনযুদ্ধে থেমে নেই জয় মালা
নাম জয়মালা বেগম স্বামী মৃত হালু মিয়া। সংসারে চার মেয়ে
বিস্তারিত
সফল উদ্যোক্তা আলিয়াহ ফেরদৌসি
চেনা গণ্ডির সীমানা ভেঙে বেরিয়ে আসছেন নারীরা। কৃষিকাজ থেকে শুরু
বিস্তারিত
রংপুর তাজহাট জমিদার বাড়ি ইতিহাস-ঐতিহ্যের
রংপুর মহানগরীর  দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি। রংপুর মূল
বিস্তারিত
ডায়াবেটিক প্রতিরোধে স্টেভিয়া: চিনির চেয়ে
বিরল উদ্ভিদ স্টেভিয়া এখন বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায়
বিস্তারিত