সৎকাজে ইহ ও পরকালীন মুক্তি

সৎকাজ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারই আদেশ-নিষেধ মান্য করে জীবনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা। মহান আল্লাহ যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন সেসব করা এবং যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করাই হলো ‘আমলে সালিহা’ বা সৎকাজ। আল্লাহ তায়ালা ঈমান অবলম্বন করতে, নামাজ কায়েম করতে, রমজান মাসে রোজা রাখতে, জাকাত আদায় এবং হজ পালন করতে আদেশ করেছেন। তিনি মা-বাবার সঙ্গে সদাচারণ, প্রতিবেশীর হক আদায়, আত্মীয়তা বজায় রাখা, সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার, দান-খয়রাত করা, বিপদে ধৈর্যধারণ, নেয়ামতের শুকরিয়া করা ইত্যাদি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিভিন্ন প্রসঙ্গ ও ঘটনা পরম্পরায় কোরআনে প্রায় অর্ধশত আয়াত অবতারণ করে সৎকাজ সম্পাদনে মহামহিম আল্লাহ তার বান্দাদের কোথাও নির্দেশ, কোথাও উৎসাহ ও কোথাও উদ্বুদ্ধ করেছেন। তবে যেখানে সৎকাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে ঈমানের কথাও বলেছেন। মোমিনদের সম্বোধন করে নাজিলকৃত কোরআনের প্রায় সব আয়াতই ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু ওয়াআমিলুস সালিহাত’ অর্থাৎ ‘যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে’ দিয়ে শুরু হয়েছে। এ থেকে প্রতিভাত হয়, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনলেই মোমিন হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং সৎকাজ সম্পাদনের মাধ্যমে তাকে তার স্বাক্ষর রাখতে হবে। ঈমান মনের গভীরে গোপন লালিত বিশ্বাস এবং সৎকাজ দেহের সঙ্গে সম্পৃক্ত, প্রকাশ্যে সংঘটিত কর্মানুষ্ঠান, একটি অপরটির পরিপূরক। ঈমানহীন সৎকাজ মূল্যহীন, আর সৎকাজহীন ঈমান প্রাণহীন।
মহান রাব্বুল আলামিন সৎকাজ সম্পাদন এবং অসৎকাজ বর্জন করতে এভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষাগ্রহণ করো।’ (সূরা নাহল : ৯০)। 
ওই আয়াতে আল্লাহ তিনটি কাজের আদেশ দিয়েছেন। যেমনÑ সুবিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি অনুগ্রহ করা এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনটি কাজ করতেও নিষেধ করেছেন। যেমনÑ নির্লজ্জ কাজ, যে কোনো মন্দ কাজ এবং জুলুম বা নির্যাতন। এসব আদিষ্ট ও নিষিদ্ধ কাজগুলোর মধ্যে যাবতীয় সৎকাজ এবং অসৎকাজ এসে গেছে।
আয়াতে বর্ণিত শব্দ কয়টি এতটাই ব্যাপক অর্থবোধক যে, এর মধ্যে যেন সমগ্র ইসলামি শিক্ষাকে ভরে দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই পূর্ববর্তী মনীষীদের আমল থেকে আজ অবধি জুমা ও দুই ঈদের খুতবার শেষ দিকে এ আয়াতটি পাঠ করা হয়। আয়াতে উল্লিখিত শব্দ ‘আদল’ বা সুবিচার হচ্ছে মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে সুবিচার করা। এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তায়ালার হককে নিজের ভোগ-বিলাসের ওপর এবং তার সন্তুষ্টিকে নিজের কামনা-বাসনার ওপর অগ্রাধিকার দেয়া। আল্লাহর বিধানাবলি পালন করা এবং নিষিদ্ধ ও হারাম বিষয়াদি থেকে বেঁচে থাকা। 
দ্বিতীয়ত, ‘আদল’ হচ্ছে মানুষের নিজের সঙ্গে সুবিচার করা। তা এই যে দৈহিক ও আত্মিক ধ্বংসের কারণাদি থেকে নিজেকে বাঁচানো, নিজের এমন কামনা-বাসনা পূর্ণ না করা, যা পরিণামে ক্ষতিকর হয় এবং সবর ও অল্পে তুষ্টি অবলম্বন করা ইত্যাদি।
তৃতীয়ত, ‘আদল’ হচ্ছে নিজের এবং সব সৃষ্টিজীবের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও সহানুভূতিমূলক ব্যবহার করা। ছোট-বড় ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা না করা। সবার জন্য নিজের বিবেকের কাছে সুবিচার দাবি করা এবং কোনো মানুষকে কথা বা কাজ দ্বারা প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কোনোরূপ কষ্ট না দেওয়া।
আয়াতে উল্লেখিত শব্দ ‘ইহসান’ (সদাচরণ) এর মূল অর্থ সুন্দর করা, ভালোভাবে করা বা অলংকরণ। আর তা দুই ধরনেরÑ এক. কর্ম, চরিত্র, অভ্যাস ও ইবাদতকে সুন্দর ও ভালো করা। দুই. কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও উত্তম আচরণ করা। প্রসিদ্ধ ‘হাদিসে জিবরিলে’ স্বয়ং রাসুল (সা.) ‘ইহসান’ এর যে অর্থ বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে ‘ইবাদতে ইহসান’। এর সারমর্ম এই যে, আল্লাহর ইবাদত এভাবে করা দরকার যেন তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ। যদি আল্লাহর উপস্থিতি অনুভবের স্তর অর্জন করতে না পার, তবে এতটুকু বিশ্বাস তো প্রত্যেক ইবাদতকারীর থাকা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা তার কাজ দেখছেন। কেননা, আল্লাহর জ্ঞান ও দৃষ্টির বাইরে কোনো কিছুই থাকতে পারে না। এটি ইসলামি বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এরপর আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করতে বলা হয়েছে। অর্থ দিয়ে সাহায্য, অসুস্থ হলে সেবা করা, দেখতে যাওয়া, বিপদাপদে সান্ত¡না ও সহানুভূতি প্রকাশ করা তাদের প্রাপ্য হকের অন্তর্ভুক্ত। মহান রাব্বুল আলামিন অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন নিষেধ করেছেন।
সুতরাং যারা ঈমান ও সৎকাজ নিয়ে পরকালে উপস্থিত হবে, তাদের ক্ষমা করা হবে, তাদের মন্দ কাজগুলো মিটিয়ে দেওয়া হবে। আর বিনিময়ে হিসেবে কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও মহা প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ (সূরা মায়েদা : ০৯)। ঈমানদার ব্যক্তি সৎকর্মমের বিনিময়ে শুধু পরকালেই পুরস্কৃত হবেন তাই নয়, দুনিয়ায়ও আনন্দময় পবিত্র জীবন লাভ করবেন। 
আল্লাহ বলেন, ‘যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সূরা নাহল : ৯৭)। ওই আয়াতে ‘পবিত্র জীবন’ বলতে ‘আনন্দময় পবিত্র জীবন’ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যে ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়ায় যথাযথভাবে সৎকাজ করবে সে আনন্দময় পবিত্র জীবন লাভ করবে। এটা এরূপ নয় যে, সে কখনও অনাহার-উপবাস বা অসুখ-বিসুখের সম্মুখীন হবে না। বরং এর অর্থ হলো, মোমিন ব্যক্তি কোনো সময় আর্থিক অভাব-অনটন কিংবা কষ্টে পতিত হলেও দুটি বিষয় তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেয় না। এক. অল্পে তুষ্টি ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের অভ্যাস যা দারিদ্র্যের মাঝেও কেটে যায়। দুই. তার এ বিশ্বাস থাকে যে, অভাব-অনটন ও অসুস্থতার বিনিময়ে পরকালে সুমহান চিরস্থায়ী নেয়ামত পাওয়া যাবে। কাফের ও পাপাচারী ব্যক্তিদের অবস্থা এর বিপরীত। সে অভাব-অনটন ও অসুস্থতার সম্মুখীন হলে তার জন্য সান্ত¡নার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সে কা-জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আত্মহত্যা করে ফেলে। পক্ষান্তরে সে যদি সচ্ছল জীবনের অধিকারীও হয়, তবে লোভের আতিশয্য তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। সে লাখপতি হয়ে গেলেও কোটিপতি হওয়ার চিন্তায় জীবনকে বিড়ম্বনাময় করে তোলে। 
ঈমানদার সৎকর্মশীল লোকদের পরস্পরের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের দয়াময় আল্লাহ ভালোবাসা দেবেন।’ (সূরা মরিয়ম : ৯৬)। অর্থাৎ ঈমান ও সৎকর্ম দৃঢ়পদ ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। উদ্দেশ্য হলো, ঈমান ও সৎকর্ম পূর্ণ রূপপরিগ্রহ করলে এবং বাইরের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হলে ঈমানদার সৎকর্ম সৎকর্মশীলদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি তৈরি হয়। অন্যান্য মানুষ ও সৃষ্টিজীবের মনেও আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।

লেখক: শিক্ষক, বাইতুন নূর মাদ্রাসা, ঢাকা


ইসলামি মিডিয়া : সমস্যা ও
আল্লাহ তায়ালা আমাদের যাদের অর্থ দিয়েছেন, প্রভাব-প্রতিপত্তি দিয়েছেন, তাদের উচিত
বিস্তারিত
মাদক-জুয়ার ভয়াল থাবা রোধ করতে হবে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় স্বয়ং
বিস্তারিত
নগ্ন ছবির নেশা থেকে বাঁচার
এক ভাই আমাকে প্রশ্ন করলেন, আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করি। অনিচ্ছা
বিস্তারিত
ওয়ামস জাপানের উদ্যোগে টোকিওতে প্রবাসী
জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়ামস জাপানের উদ্যোগে গত ১৩-১৬
বিস্তারিত
আল্লাহর দেওয়া মানবজাতির বহুমাত্রিক
ইবনে আসাকির (রহ.) আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস
বিস্তারিত
ইউশা ইবনে নুন (আ.) এর
ইউশা ইবনে নুন (আ.) ছিলেন সেই নবী, যার ইব্রাহিম (আ.)
বিস্তারিত