বিশ্ব ইজতিমার ইতিকথা

বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এ সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। পুরো সমাবেশের আয়োজনই করে থাকেন একঝাঁক ধর্মপ্রাণ মুসলমান স্বেচ্ছাসেবক। আর্থিক ও শারীরিক সহায়তা দিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তারা এ সমাবেশ সফল করতে সচেষ্ট থাকেন। পুরো সমাবেশস্থলটি একটি উন্মুক্ত মাঠ, যা বাঁশের খুঁটির ওপর চট লাগিয়ে ছাউনি দিয়ে প্রস্তুত করা হয় 

তাবলিগ আরবি শব্দ, বালাগ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থÑ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। 

পরিভাষায়Ñ একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলিগ বলে। যিনি তাবলিগ করেন তাকে মুবাল্লিগ বলা হয়। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’
১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর এলাকায় ইসলামি দাওয়াত তথা তাবলিগের প্রবর্তন করেন। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মেলন বা ইজতেমারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তাবলিগ জামাতের প্রচলন করেন মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ.)। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এ সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। পুরো সমাবেশের আয়োজনই করে থাকেন একঝাঁক ধর্মপ্রাণ মুসলমান স্বেচ্ছাসেবক। আর্থিক-শারীরিক সহায়তা দিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তারা এ সমাবেশ সফল করতে সচেষ্ট থাকেন। পুরো সমাবেশস্থলটি একটি উন্মুক্ত মাঠ, যা বাঁশের খুঁটির ওপর চট লাগিয়ে ছাউনি দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। শুধু বিদেশি মেহমানদের জন্য টিনের ছাউনি ও টিনের বেড়ার ব্যবস্থা করা হয়। সমাবেশস্থলটি প্রথমে খিত্তা ও পরে খুঁটি নম্বর দিয়ে ভাগ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা খিত্তা নম্বর ও খুঁটি নম্বর দিয়ে নিজেদের অবস্থান শনাক্ত করেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাওয়ারি মাঠের বিভিন্ন অংশ ভাগ করা থাকে। বিদেশি মেহমানদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা বেষ্টনীসমৃদ্ধ এলাকা থাকে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরাই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। কোনো সশস্ত্রবাহিনীর অনুপ্রবেশের অধিকার দেওয়া হয় না।
সুদীর্ঘ সাড়ে তিন যুগ ধরে টঙ্গীর তুরাগতীরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। ২০১১ সাল থেকে একসঙ্গে এত ধর্মপ্রাণ মানুষের সংকুলান না হওয়ায় দুই পর্বে ইজতেমা চলার সিদ্ধান্ত হয়। পাঁচ বছর পর ২০১৬ সাল থেকে দুই পর্ব থেকে চার পর্বে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ প্রথম বছর দুই পর্বে ৩২ জেলা, দ্বিতীয় বছর বাকি ৩২ জেলা। 
আজ থেকে প্রায় ৬ দশক আগে ১৯১০ সালে ভারতের এক জনবিরল অঞ্চল মেওয়াত থেকে হাতেগোনা কয়জন মানুষ নিয়ে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.) তাবলিগের মেহনত শুরু করেন। তাবলিগের এ মেহনত এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত আজকের তাবলিগ জামাতের সার্থক রূপকার মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.) ১৩৫১ হিজরি সনে হজ থেকে ফিরে আসার পর সাধারণ মুসলমানদের দুনিয়া ও সংসারের ঝামেলা থেকে মুক্ত করে ছোট ছোট দলবদ্ধ করে মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশে অল্প সময়ের জন্য দ্বীনি শিক্ষা দিতে থাকেন। 
কথিত আছে একদা তিনি মহানবী (সা.) কে স্বপ্নে দেখেন। তিনি তাকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের জন্য নির্দেশ দেন। মহানবীর নির্দেশ মোতাবেক তিনি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের সূচনা করেন। তারপর এ কাজকে আরও বেগবান ও গতিশীল করার জন্য উপমহাদেশের সর্বস্তরের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও বুজুর্গদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করা হয় এবং দিল্লির কাছে মেওয়াতে সর্বস্তরের মুসলমানের জন্য ইজতেমা বা সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়। 
মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.) এ কর্মপ্রয়াসকে তখন বলতেন ‘ইসলাহে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ। প্রথমত তিনি পরীক্ষামূলক ভারতের সাহারানপুর ও মেওয়াত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। জনসাধারণ্যে তিনি ছয়টি বিশেষ গুণ অর্জনের মেহনত করেন। সে বিশেষ গুণ হলোÑ কালেমা, নামাজ, ইলিম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের সেবা), সহিহ নিয়ত ও তাবলিগ। 
অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) প্রথমে বর্তমান ধারার এ তাবলিগকে নাম দেন ‘তাহরিকুস সালাত’ বা নামাজের আন্দোলন। এর পরই ক্রমেই তাবলিগের কার্যক্রম বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের গ-ি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের সর্বত্র। মাওলানা আবদুল আজিজ (রাহ.) এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে বাংলাদেশে তাবলিগ শুরু হয়। তারপর ১৯৪৬ সালে বিশ্ব ইজতেমা সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের তাবলিগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে। পরে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে। এরপর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর ভবেরপাড়া তুরাগতীরে অনুষ্ঠিত হয়। সে থেকে আজ পর্যন্ত সেখানেই ১৬০ একর জায়গায় তাবলিগের সর্ববৃহৎ ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য, তাবলিগ জামাতের সদর দপ্তর দিল্লিতে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হয়। কথিত আছে, তাবলিগ জামাতের মুরুব্বিদের বৈঠকে ইজতেমার স্থান নির্ধারণের জন্য আলোচনা হয়েছিল, সে আলোচনায় বাংলাদেশের নাম ওঠে। সেই থেকে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে আজকের বিশ্ব ইজতেমা। 
ভারতের মুম্বাই ও ভুপালে এবং হালে পাকিস্তানের রায় বেন্ডে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হলেও জনসমাগমের বিচারে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাই বড় এবং বিশ্ব দরবারে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ বলতে বাংলাদেশের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত ইজতেমাকেই বোঝায়।
কথিত আছে, মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) প্রথম যখন মানুষের কাছে ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন, তখন তেমন কোনো সাড়া মিলেনি। তাই তিনি অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আশপাশের দিনমজুর, শ্রমিক-কৃষককে ডেকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রেখে দুই বেলা খাবার দিতেন এবং তাদের নামাজ শিক্ষা দিতেন, নামাজের সূরা শিখাতেন, ধর্মীয় বিধিনিষেধ বর্ণনা করতেন। অবশেষে বিদায় বেলা তাদের প্রত্যেককে মজুরি তথা পারিশ্রমিক দিয়ে দিতেন। 
এ পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তার নামাজের আন্দোলনের সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেল। মানুষ তখন নিজেরাই অর্থব্যয় করে ইলিয়াস (রহ.) এর পদাঙ্ক অনুকরণ করে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে থাকেন। বাংলাদেশে যখন তাবলিগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিল শুধুই ইজতেমা, যা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। 
বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী। বর্তমানে দুই পর্বে ছয় দিন। কিন্তু টঙ্গীতে এর আমেজ থাকে প্রায় মাসখানেক। আর এ ইজতেমার প্রস্তুতি তো তিন-চার মাস আগ থেকেই শুরু হয়ে যায়। 
যতটুকু জানা যায়, ইজতেমা নিয়ন্ত্রণকারী তাবলিগ জামাতের কোনো সংবিধান নেই। অলিখিত সংবিধানও নেই। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলন। তাবলিগ জামাতের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। এটিকে বলা হয় মজলিশে শূরা। এ কমিটির কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বহু ব্যক্তি এ কমিটির মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাবলিগে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রেখেছেন, তারাই এ কমিটির আলোচনায় কথাবার্তা বলেন। 
তবে কে কত বেশি অবদান রেখেছেন, তা নির্ধারণের কোনো মাপকাঠি নেই। তাবলিগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, নেতৃত্বের কোন্দল নেই। যিনি একবার কেন্দ্রীয় শূরায় আমির নির্বাচিত হন, তিনি আমৃত্যু সে পদ অলংকৃত করেন। তাবলিগ অনুসারীরা তাদের আমিরকে সম্বোধন করেন ‘হজরত জি’ বলে। ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশ তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা হেডকোয়ার্টার। 
বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গীতে দুই মাইল লম্বা যে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়, তার জন্য কোনো চাঁদা অনুদান কারও কাছ থেকে চাওয়া হয় না। স্বেচ্ছাসেবীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ সম্মিলনের ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। তাবলিগে অংশগ্রহণকারী প্রকৌশলীরা প্যান্ডেলের একটি নকশা তৈরি করে দেন। বিভিন্ন কলকারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি থেকে আসা লোকজন রড, সিআই সিট, শামিয়ানার চট ইত্যাদি নিয়ে আসেন। ইজতেমা শেষ হওয়ার পর তারা নিজ নিজ জিনিসপত্র খুলে নিয়ে যান। 
তাবলিগ আন্দোলন ও বিশ্ব ইজতেমার কোনো প্রেস রিলিজ, প্রকাশনা, প্রচার শাখা নেই। বিশ্ব ইজতেমা কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হবে, তা উল্লেখ করে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করা হয় না। কোনো লিফলেট-পোস্টার ছাপানো হয় না, তবু লাখ লাখ মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগে বিশ্ব ইজতেমায় সমবেত হন।  ইজতেমা ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে কে বক্তব্য রাখছেন, তার নাম ঘোষণা করা হয় না। এক্ষেত্রে তাবলিগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ‘কে বলছেন সেদিকে তাকিও না, কী বলেছেন সেদিকে লক্ষ করো’ নীতিকেই ফলো করে থাকে। বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগ তৈরি করে। আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। বিশেষ করে তিন দিনব্যাপী (উভয় পর্বে) ইজতেমার শেষ দিনের মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য যেভাবে মানুষ পাগলের মতো ছুটে যায়, তা সত্যিই ইসলামি আবেগ ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্ব ইজতেমার শেষ দিন কার্যত টঙ্গী-কেন্দ্রিক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর প্রভাব এতটুকু গড়ায় যে, দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা কমপক্ষে আখেরি মোনাজাতের দিন হাজিরা দিতে যান। বিশ্ব ইজতেমার ব্যাপারে মিডিয়াগুলোও নিস্পৃহ থাকতে পারে না। দেশের গণমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠানটি দেশের প্রধান খবর হিসেবে গুরুত্বসহকারে প্রচার করে।

লেখক : মুঈনে মুফতি, জামিআ সাবিলুর রাশাদ গাজীপুর


আল্লাহর দেওয়া মানবজাতির বহুমাত্রিক
ইবনে আসাকির (রহ.) আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস
বিস্তারিত
ইউশা ইবনে নুন (আ.) এর
ইউশা ইবনে নুন (আ.) ছিলেন সেই নবী, যার ইব্রাহিম (আ.)
বিস্তারিত
ইসলামি নিদর্শন চালু করে
কামাল আতাতুর্ক তুরস্ক থেকে ইসলামি সব নিদর্শন মুছে ফেলেছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক
বিস্তারিত
নামাজ শুরু করার পর ভেঙে
প্রশ্ন : আমার বাড়ি যশোরে, বাড়িতে সাধারণত রাতেই রওনা দিই।
বিস্তারিত
আল কোরআন ও বিজ্ঞান
সব সংস্কৃতিতে সাহিত্য ও কবিতা মানুষের ভাব প্রকাশ ও সৃজনশীলতার
বিস্তারিত
যৌতুকপ্রথার ভয়াবহতা ও প্রতিকার
আজকাল পত্রপত্রিকা বা ফেইসবুক ঘাঁটলে যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে,
বিস্তারিত