শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান

তীব্র শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে দেশ। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষকে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ছোবল পোহাতে হয়েছে। এ বিষয়ে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম ছিল এ রকমÑ ৭০ বছরের ভেতর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড; শীতে বিপর্যস্ত দেশ; তিন দিনে মৃত্যু ২৩ জনের; তেঁতুলিয়ায় ইতিহাসের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা; সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড; দেশে শীতের তীব্রতা রেকর্ড ছাড়িয়েছে; পৌষের শীতে বাঘ কাঁপছে; রেকর্ড শীতে কাবু দেশ; পঞ্চগড়ে ৫০ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়ায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অর্ধশত বছর বা তারও বেশি সময়ে এটি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে জানানো হয়েছে।

শীতের প্রকোপে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও কাঁথা-কম্বলের অভাবে দুর্বিষহ সময় পার করছে কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ। শীতজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। গত কয়েক দিনে শীতের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে বেশকিছু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ক্রমবর্ধমান শৈত্যপ্রবাহ উত্তরের জেলাগুলোর মানুষের জন্য দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তীব্র শীতের কামড় এবং ঘন কুয়াশার কারণে দিনমজুর দরিদ্র মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত দেশের বিত্তবান মানুষ গরম কাপড় ও কম্বল নিয়ে অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়। তবে এ বছর এমন রেকর্ড শৈত্যপ্রবাহেও শীতার্ত মানুষের পাশে যেন তেমন কেউ নেই। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার প্রত্যাশায় শীতার্তরা মানবেতর দিন গুনলেও সাহায্য নিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে না। বিশেষ করে উত্তরের দুর্গম চরাঞ্চলের জেলে ও কৃষিজীবী মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে তীব্র শীতে ধুঁকছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শীত জেঁকে বসেছে। হিমশীতল কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে দেশ। কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। শীতকালে সবচেয়ে সমস্যায় পড়ে দেশের দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। শৈত্যপ্রবাহের রুক্ষতা থেকে রক্ষা পাওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থাও তাদের নেই। ফলে অসহায় ও হতদরিদ্রদের কষ্ট কেবল বেড়েই চলে। বৃদ্ধ, শিশু ও ফুটপাতের গরিব মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে মারাও যায়। হাড়কাঁপানো শীতের কবল থেকে তাদের রক্ষা করা এবং সামর্থ্যরে ভিত্তিতে সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা প্রত্যেক মোমিনের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। এটা অন্যতম একটি ইবাদতও বটে। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের দান করে, তারা বলে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। আমরা পালন কর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের ভয় রাখি।’ (সূরা দাহার : ৮, ৯, ১০)।
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্র দান করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের পোশাক পরাবেন, খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে জান্নাতের শরবত পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ (মুসলিম)।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা দুনিয়ার লোক-দেখানো দান-দক্ষিণায় ব্যস্ত। এতে দুনিয়ায় সাময়িক শান্তি অনুভূত হবে ঠিক, তবে আখেরাতে এ শান্তি জীবনের পুণ্যের খাতা শূন্য করে দেবে। বলা হবে, তোমরা দুনিয়ায় দান করেছ মানুষের বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য, বাহ বাহ পেয়েছ, আজ তোমাদের আর কোনো প্রাপ্তি নেই। আর যারা মোহ ত্যাগ করে কেবল আল্লাহর রেজামন্দি অর্জন করার জন্য দান করেছে, আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ায়, তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার সুসংবাদ রয়েছে, অতঃপর তাদের সবরের প্রতিদানে তাদের দেবেন জান্নাত ও রেশমি পোশাক। 
(সূরা দাহার : ১১)।
শীতার্ত মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ কাছ থেকে না দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই। কত মনবেতর জীবনযাপন করছে তারা।
বিশ্বের আবহাওয়া ও জলবায়ু ক্রমে চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। ঋতুভেদে শীত এবং গরম দুটোই বেড়ে মানুষের সহ্যসীমা অতিক্রম করে চলেছে।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শৈত্যপ্রবাহে রেকর্ড সৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট এবং শহরে হীমাঙ্কের নিচে শৈত্য এবং তুষারপাতের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে, বিশেষ জরুরি কাজ ছাড়া সাধারণ মানুষকে বাইরে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষগুলো শীতজনিত রোগব্যাধিসহ ঝুঁঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। গ্রীষ্মম-লীয় দেশ বাংলাদেশেও এখন প্রায় একই রকম অবস্থা বিরাজ করছে।
শিল্পোন্নত দেশে উন্নত আবাসন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশের শীতার্ত দরিদ্র মানুষগুলো জীর্ণ কুটিরে বসবাস করেন। এদের পক্ষে পরিবারের সদস্যদের জন্য আরামদায়ক গৃহসজ্জা, শীতবস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করা দূরে থাক; ক্ষধা দূর করতে দুই বেলা             খাদ্যের সংস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়ে। খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে তীব্র শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে বস্ত্রহীন দরিদ্র মানুষগুলো। তাদের শীতের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে সরকারি ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সারা দেশের শীতার্ত মানুষের কাছে গরম কাপড়, কম্বলসহ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দেশের ধনী, সচ্ছল মানুষকে এগিয়ে আসা এই মুহূর্তে মানবতার দাবি। এই দাবি অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। 
আবহাওয়া বিগড়ে যাওয়া ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণের জন্য আমাদের অপরিণামদর্শী আচরণই দায়ী। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নদনদী, পাহাড় ও বনভূমি ধ্বংস করে আমরা যে উন্নয়নের দাবি করছি চূড়ান্ত বিচারে তা আমাদের জন্য প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নদীগুলো দূষণের শিকার হচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে, যে কারণে প্রকৃতি এত প্রতিকূল হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে আমরা সবসময়ই বেখবর। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে কোরআনে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কোরআনে পরিবেশ সুস্থ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরা ডেকে এনো না।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্য সমুদ্র ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সূরা রুম : ৪১)।
দেশের মানুষের গড় আয়ু যতই বাড়–ক, দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা আয়বৈষম্য কমেনি। দুর্নীতি, লুটপাটসহ নানাভাবে একশ্রেণির মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, অন্যদিকে বৈষম্য ও সরকারি পরিষেবা বঞ্চিত কোটি কোটি দরিদ্র সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষগুলোই কখনও বন্যায়, কখনও মৌসুমি ঝড়ে, নদীভাঙনে বা তীব্র শীতে প্রকৃতির হেঁয়ালি আচরণের শিকার হয়ে পড়ে। ভোটের সময় নানা রকম চটকদার সেøাগান ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিত্তশালী রাজনৈতিক নেতারা এদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। বিত্তবানদের উচিত সাধ্যমতো তাদের কাছে অন্ন, বস্ত্র পৌঁছে দেওয়া; তাদের থাকার ব্যবস্থা করা। আমরা যেন তাদের ভাইবোন মনে করি। কারণ আজ তারা দুর্যোগের শিকার, কাল আমরাও হতে পারি।
তাই আসুন আমরা নিজেদের শুধরে নেই। ছোট-বড়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই মিলে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই। চোখ খুলে দেখি নিরীহ অসহায় মা-বোনদের দিকে। একটু মানবতার পরিচয় দিই। এ পরিস্থিতিতে দুর্যোগকবলিত এলাকায় নিজ নিজ ঘনিষ্ঠজনদের উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের পাশে থেকে তাদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেওয়া আমার-আপনার ঈমানি দায়িত্ব। সবার মনে শীতার্ত মনুষের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ জেগে উঠুক।


বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য
গুরুজন হলেন আমাদের অমূল্য ধন এবং পরম শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের
বিস্তারিত
সওয়াল জওয়াব
প্রশ্ন : মহিলারা মাহরাম ব্যতিরেকে আটচল্লিশ মাইল বা এর চেয়ে
বিস্তারিত
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে পাঠাগারের গুরুত্ব
বলা হয়ে থাকে, যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত
বিস্তারিত
কুতুববাগ দরবারে ফাতেহা শরিফ শুরু
হযরত মাওলানা কুতুবুদ্দীন আহমদ খান মাতুয়াইলী (রহ.)-এর ওফাত দিবস উপলক্ষে
বিস্তারিত
ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিতে সম্পদ
‘সম্পদ’ অর্থনীতির অন্যতম উপাদান। সম্পদ ছাড়া অর্থনীতি কল্পনা করা যায়
বিস্তারিত
সওয়াল জওয়াব
প্রশ্ন : আমার একটি বিষয় জানার খুবই প্রয়োজন। যেহেতু আমি
বিস্তারিত