মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

মুসা (আ.) বনাম ফেরাউনের জাদুকর

নির্জন বনে ইবাদতে নিমগ্ন দরবেশের হাত কাটা যায় চুরির অভিযোগে। দরবেশ তকদিরের ফয়সালা সানন্দে মাথা পেতে নিয়ে পরীক্ষায় চমৎকারভাবে উত্তীর্ণ হন। এর আগে আলোচিত এ কাহিনির উপসংহারে মওলানা রুমি বলেন, দরবেশের কাছে ইলহাম আসে, হে দরবেশ! তুমি সত্য। আধ্যাত্মিকতায় তুমি কামালিয়াত হাসিল করেছ। তার প্রমাণ, তুমি মৃত্যুভয়কে জয় করেছ। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার আগ্রহ ব্যক্তির কামালিয়তের প্রমাণ। এখানেই শাহাদতের মাহাত্ম্য নিহিত। মওলানা রুমি প্রমাণ হিসেবে মুসা (আ.) এর সঙ্গে ফেরাউনের জাদুর প্রতিযোগিতা আর জাদুকররা হেরে গিয়ে মুসা (আ.) এর প্রতি ঈমান আনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। 

সা’হেরা’ন রা’ নেই কে ফেরআউনে লয়ীন
কর্দ তাহদীদে সেয়াসত বর যমীন
জাদুকরদের অভিশপ্ত ফেরাউন কি
দেয়নি কঠোর শাস্তি দেওয়ার হুমকি? 
কিন্তু ফেরাউনের শাস্তির হুমকির তারা পরোয়া করেনি; বরং হাত-পা কাটা যাওয়া আর শূলীতে ঝোলার শাস্তি তারা বরণ করে নিয়েছিল। প্রশ্ন হলোÑ সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও তাদের কেন প্রাণ দিতে হলো। হাত-পা কর্তিত হয়ে শূলীতে চড়ে কেন প্রাণ বিসর্জন দিল। তাহলে সত্যের পক্ষে থাকার সার্থকতা কোথায়? এই জটিল জিজ্ঞাসার বিশ্লেষণ মওলানা রুমি কীভাবে করেছেন, তা জানার জন্য ঐতিহাসিক ঘটনাটি সামনে আনা প্রয়োজন। যারা ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী, তাদের জন্য মসনবির সামান্য ইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ লোকদের জন্য কোরআন মজিদে বর্ণিত কাহিনি বিশদভাবে জানলে এর সত্য তাৎপর্য বোধগম্য করা সহজ হবে। 
মুসা (আ.) তার শ্বশুর হজরত শোয়াইব (আ.) এর বাড়ি মাদায়েন থেকে মিশরে আসার পথে তুয়া উপত্যকায় নবুয়ত লাভ করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে আদেশ দেন, তুমি ফেরাউনকে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দাও এবং বনি ইসরাইল বংশের লোকদের মুক্ত   করো। আদেশ পেয়ে তিনি সম্রাট ফেরাউনের               কাছে গিয়ে বলেন, 
১০৪) হে ফেরাউন! আমি বিশ্বপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার প্রতি প্রেরিত হয়েছি। 
১০৫) এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহর সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত কোনো কথা বলব না। তা হলো, তিনি এক তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে এসেছি। আমার পরিষ্কার দাবি, তুমি বনি ইসরাইলকে আমার সঙ্গে যেতে দাও। তাদের তুমি দাস বানিয়ে রেখো না। তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাচ্ছ। তাদের আমি পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে যেতে চাই। 
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বাহ বলেন, নানা ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে ইউসুফ (আ.) ও তার মা-বাবা কেনান তথা আজকের ফিলিস্তিন থেকে মিশরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ইউসুফ (আ.) এর ইন্তেকালের পর তার বংশধর বনি ইসরাইলের জনসংখ্যা বেড়ে যায়। একসময় ফেরাউন মিশরের ক্ষমতা গ্রহণ করে বনি ইসরাইলকে দাসত্বে শৃঙ্খলিত করে। তাদের ওপর নানা ধরনের করারোপ, অপমান-লাঞ্ছনার জীবন এবং হীন তুচ্ছ কাজে ফেরাউন ও তার বংশ কিবতিদের সেবাদাসগিরি করতে বাধ্য করে। ফেরাউনের ক্ষমতার দাপট চরম পর্যায়ে পৌঁছলে সে নিজেকে খোদা বলে দাবি করে। এমন প্রতাপশালী বাদশাহর সম্মুখে মুসা যে বক্তব্য পেশ করলেন, তা ছিল রীতিমতো ধৃষ্টতা। ফেরাউন ভেবেচিন্তে বললÑ মুসা, তোমার দাবির সত্যতার পক্ষে 
১০৬) তুমি যদি কোনো নিদর্শন এনে থাক, দেখাও দেখি। তুমি যদি সত্যবাদী হও। মুসার হাতে তখন লাঠিখানা ছিল। বললেন, আমার হাতে এটি কী? ফেরাউন বলল, লাঠি। 
১০৭) অতঃপর মুসা তার লাঠি নিক্ষেপ করল এবং তৎক্ষণাৎ তা সাক্ষাৎ অজগরে পরিণত হলো। মুসা হাত থেকে লাঠি মাটিতে রাখলেন। তৎক্ষণাৎ তা নরসর্পে পরিণত হলো। এক বিরাট অজগর। ভাবতেই পারেনি যে, লাঠি সাপ হয়ে যাবে। সাপ বিশাল হাঁ করে ভয়াবহ ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল ফেরাউনের দিকে। এখনই বুঝি ফেরাউনের তখতসহ রাজপ্রসাদ গিলে খাবে। আতঙ্কে ফেরাউন সিংহাসন থেকে ছিটকে পড়ল। পালিয়ে গেল মলমূত্র ত্যাগ করে, জামাকাপড়ের অবস্থা বেহাল। সাপ এখন লোকদের দিকে ফিরল, যারা ছিল ফেরাউনের চাকরবাকর। চারদিকে হৈহুল্লোড় চিৎকার। একদল তো আতঙ্কে সেখানেই মারা পড়ল। আরেক দল পলাতে লাগল। পলায়নপর ফেরাউন নতশিরে বলল, মুসা! সাপ থামাও। আমি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব এবং বনি ইসরাইলকে তোমার সঙ্গে পাঠিয়ে দেব। মুসা (আ.) সাপখানা ধরতেই তা লাঠি হয়ে গেল। পরিস্থিতি শান্ত হলে ফেরাউন জানতে চাইল, মুসা, তোমার কাছে কি অন্য কোনো নিদর্শন আছে, যা তোমার সত্যতার পক্ষে সাক্ষী হতে পারে? মুসা বললেন, আমার আরেকটি নিদর্শন আছে। এই বলে তিনি তার হাতখানা বগলের নিচে রাখলেন। পরক্ষণে বের করলেন। আল্লাহ পাক সে কথাই সংক্ষেপে বলেছেনÑ
১০৮) এবং সে তার হাত বের করল আর তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হলো। অর্থাৎ ফেরাউন ও অন্যদের সামনে একেবারে শুভ্র সমুজ্জ্বল আলোকিত একখানা হাত। সে হাতের জ্যোতিতে সূর্যের আলোও নিষ্প্রভ হয়ে গেল। মুসা (আ.) হাতখানা তার জামার ভেতরে বা বগল তলে রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তা আগের মতে স্বাভাবিক হাতে পরিণত হলো। 
ফেরাউন ভয়ের চোটে মুসার প্রতি ঈমান আনার কথা বললেও এর অর্থ তো মুসার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা। বনি ইসরাইলকে দাসত্ব হতে মুক্তি দিলে তো দেশ অচল হয়ে যাবে। দাস, শ্রমিকশ্রেণি কাজ না করলে কিবতিদের জীবনযাত্রা অচল। কিবতিদের কর্তৃত্বের অবসান হবে। ফেরাউন সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একবার চিন্তা করল, মুসাকে হত্যা করে আপদ দূর করবে। ফেরাউনকে তার সভাসদরা সান্ত¡না দিলÑ
১০৯) ফেরাউনকে সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলল, এ তো একজন সুদক্ষ জাদুকর। তাকে হত্যা করা উচিত হবে না। কারণ জনগণের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তারা সন্দেহ করবে যে, মুসা সত্য ছিল। তাই তাকে হত্যা করা হয়েছে। বরং লোকটি তো জাদুকর। তাকে জাদু দিয়েই জব্দ করতে হবে। তাতে তার মিথ্যাচার জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে এবং সে যে মস্তবড় জাদুকর, তা প্রমাণিত হবে। মতামতটি ফেরাউনের মনঃপূত হলো। ফেরাউন জ্বালাময়ী ভাষণ দিলÑ হ্যাঁ, এক মস্ত জাদুকর এসেছে দেশে।
১১০) এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করতে চায়। সে তার জাদুর বলে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে তাড়াতে চায়। ফেরাউন ও কিবতিদের মিশর থেকে তাড়ানোই তার উদ্দেশ্য। সে একটা বিপ্লব ঘটাতে চায়। কারণ তোমাদের জীবন-জীবিকা তো বনি ইসরাইলের সেবাকর্ম আর প্রদেয় করের ওপর নির্ভরশীল। বনি ইসরাইলকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, তোমাদের জীবন-জীবিকা ও আয়ের পথ বন্ধ করে দেওয়া। এখন তোমরা কী পরামর্শ দাও? 
১১১) তারা বলল, তাকে ও তার ভাইকে কিঞ্চিৎ অবকাশ দিন এবং বিভিন্ন শহরে জাদুকর সংগ্রাহকদের পাঠিয়ে দিন। 
১১২) আদেশ দিন, যেন তারা আপনার কাছে প্রতিটি সুদক্ষ জাদুকর উপস্থিত করে। মিশরের বিভিন্ন শহরে জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ওঝারা ছিল। জাদু দেখানোই ছিল তাদের পেশা। রাজকীয় ফরমান পেয়ে চারদিক থেকে তারা সমবেত হলো।
১১৩) জাদুকররা ফেরাউনের কাছে এসে বলল, আমরা যদি বিজয়ী হই, তবে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে তো?
১১৪) সে বলল, হ্যাঁ এবং তোমরা অবশ্যই আমার সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। বেতনভাতা পুরস্কার তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা, তোমরা আমার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হবে। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী চাও। নির্ধারিত দিনক্ষণে জাতীয় উৎসবের দিন জাদুকররা মুসার উদ্দেশ্যে বললÑ 
১১৫) তারা বলল, হে মুসা! তুমি কি আগে নিক্ষেপ করবে, না আমরাই নিক্ষেপ করব? 
১১৬) মুসা (আ.) বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল, তাদের আতঙ্কিত করল এবং তারা এক বড় রকমের জাদু দেখাল। 
কোরআন মজিদে সূরা আরাফে বর্ণিত এই জাদুর খেলার বর্ণনা বড় মনোজ্ঞ। সামনের কিস্তিতে তা তুলে ধরার আশা রইল। 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, তৃতীয় খ-, বয়েত : ১৭২১; ব্যাখ্যা তাফসিরে মাইবেদি অবলম্বনে) 


বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য
গুরুজন হলেন আমাদের অমূল্য ধন এবং পরম শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের
বিস্তারিত
সওয়াল জওয়াব
প্রশ্ন : মহিলারা মাহরাম ব্যতিরেকে আটচল্লিশ মাইল বা এর চেয়ে
বিস্তারিত
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে পাঠাগারের গুরুত্ব
বলা হয়ে থাকে, যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত
বিস্তারিত
কুতুববাগ দরবারে ফাতেহা শরিফ শুরু
হযরত মাওলানা কুতুবুদ্দীন আহমদ খান মাতুয়াইলী (রহ.)-এর ওফাত দিবস উপলক্ষে
বিস্তারিত
ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিতে সম্পদ
‘সম্পদ’ অর্থনীতির অন্যতম উপাদান। সম্পদ ছাড়া অর্থনীতি কল্পনা করা যায়
বিস্তারিত
সওয়াল জওয়াব
প্রশ্ন : আমার একটি বিষয় জানার খুবই প্রয়োজন। যেহেতু আমি
বিস্তারিত