বাবার বন্ধুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার

গত নবান্নের এক বিকালে গ্রামে যাচ্ছিলাম। গ্রামের শেষ দিগন্তে লাল সূর্যের বিদায়ি প্রস্থান। বিদায়ী দিবসের করুণ দৃশ্যপট। ধেয়ে আসা ধূসর আঁধার কালো আবরণ ফেলছে বাতাসের গায়ে। গুটি গুটি পায়ে অন্ধকার গ্রাস করছে আমাকে। আমি হেঁটে চলছি মেঠোপথ ধরে। আন্দাজ করলামÑ হাঁপাতে হাঁপাতে কেউ আমার পেছন আসছে। একটু দাঁড়িয়ে কাছে আসতে দেখি আওয়াল চাচা। বাবার দূর সম্পর্কের ভাই এবং বন্ধু। বয়সে বাবার বড়। দু-হাতে বাজারের ব্যাগ। জোর করে ব্যাগ দুটি নিয়ে কুশল বিনিময় করলাম। হাঁটতে হাঁটতে গল্প ধরেন চাচা। গল্পের ফিতা দীর্ঘ হয়। 
পুরোনো দিনের গল্প। বাবার স্মৃতি। বন্ধুদের স্মৃতি। বাবার প্রশংসা শুনে ভীষণ ভালো লাগছিল। এখনও নাকি বাবা তাকে সময় দেন। হেল্প করেন। বললেন, আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছেন, চিপস কিনে দিয়েছেন, খেলনা দিয়েছেন এবং আমি তার কোলে অনেকবার প্রশ্রাব করেছি। আমি ভণিতা করে করে গল্প শুনতে থাকি। কী রোমাঞ্চকর সে গল্পের প্লট! 
তার বাড়ি বরাবর এসে আমার ব্যাগ থেকে কিছু আপেল আর মাল্টা খুলে চাচার হাতে দিই। না নিয়ে পারলেন না। আমি বিদায় নেওয়ার সময় অন্ধকারকে উপেক্ষা করে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমার হৃদয় তার প্রার্থনার কথা শুনতে পেয়েছে স্পষ্ট। 
মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল বাবা। বাবাÑ নির্ভয় নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। জীবনের বিশ^াসী ভরসাস্থল। নির্ভেজাল ভালোবাসা পাওয়ার সুখকর নিকেতন। বাবা বটবৃক্ষের মতো শীতল ছায়াদাতা। পৃথিবীর জনপদে শান্তিতে নিরাপদে অক্লেশে ঘুরে বেড়ায় বাবার ছেলেরা। বাবার ভালোবাসার ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। বাবার তুলনা শুধু বাবা। 
সভ্য সন্তানরা বাবাকে ভালোবেসে সযতনে বুকে আগলে রাখতে চায় বেঁচে থাকার সময়টায়। বিশ^াসী এ ছায়াকে করতে চায় দীর্ঘায়ু। কিন্তু খোদায়ি বিধানের অমোঘ নিয়মে প্রিয় বাবা একদিন চলে যায় ‘ফেরা যায় না’ এমন দেশে। পৃথিবীর সন্তানদের চিরস্থায়ী ঠিকানায়। বাবার বিরহ বুকে নিয়ে খুঁজে ফেরে বাবাকে। বাবার জন্য করতে চায় অনেক কিছু। তাকে স্মরণে এনে হৃদয়ে প্রবোধ লাভ করতে চায়। জান্নাতে বাবার উচ্চ মাকাম হাসিলে বিলাতে চায় সাধ্যমতো অর্থকড়ি। বাবার ভালোবাসায় খোদার দরবারে বাড়িয়ে দেয় বিনীত দুটি হাত। 
ইসলাম বলে, পিতাকে ভালোবাসো এবং সম্মান জানাও। সে মরে গেলেও তার জন্য ভালো কিছু করো। বাবার অনুপস্থিতে বাবার বন্ধুকে ভালোবাসো এবং সম্মান জানাও। নবী (সা.) এর যুগে এক সাহাবি বাবা মারা যাওয়ার পর নবী (সা.) এর কাছে এসে জানতে চেয়েছিলেন; বাবার ওপর তার কোনো দায়িত্ব আছে কি না? তখন আল্লাহর রাসুল তাকে বাবার বন্ধুদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের শিক্ষা দিলেন। বাবার বন্ধুদের সম্মান করতে শেখালেন। বাবার বন্ধু বাবার হৃদয়ের মানুষ। এক জীবনে ভালোবাসার সঙ্গী। তাদের সম্মান জানানো মানে বাবাকে সম্মান জানানো। তাদের ভালোবাসার মধ্যেই বাবার ভালোবাসা আকীর্ণ। হাদিসে এসছে, আবু উসাইদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসুল (সা.) এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় বনি সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! মা-বাবার মৃত্যুর পরও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার দায়িত্ব আমার ওপর রয়েছে কি? তা কীভাবে করতে হবে? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তাদের জন্য দোয়া করা। তাদের গোনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করা, তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদের বন্ধুবান্ধবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।’ (আবু দাউদ সূত্রে রিয়াদুস সাহেলহিন : ৩৪৪)। 
বাবার বন্ধুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহ তার দিকে মুখ তুলে তাকান। তার সওয়াবের ঝুলিতে সওয়াবের আতর সুবাস দেন। প্রাপ্তির ফুলে ঝুলি পূর্ণ করেন। সফলতার আশিস দেন ব্যক্তির সব জীবনে। বাবার বন্ধুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। সৎকাজ। ভালো ব্যবহারে পৌঁছা যায় বাবার বন্ধুর হৃদয় মিনারে। হজরত নবী করিম (সা.) থেকে ইবনে ওমর বর্ণনা করে বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সৎকাজগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় সৎকাজ হলোÑ কোনো ব্যক্তির তার বার বন্ধুদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।’ (মুসলিম)। 
বাবার বন্ধুদের ভালোবাসার শিক্ষা ইসলাম শিকড় থেকেই দিয়েছে। মানবতার নবী মোহাম্মদ (সা.) তার শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে হাতেকলমে শিক্ষা দিয়েছেন শুদ্ধতা, ভব্যতা আর পবিত্রতা। গর্বের ধর্ম ইসলাম বাবার বন্ধুকে সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মের পার্থক্য করেননি। বাবার বন্ধুর সম্মানকে অবারিত করেছেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ সাহাবিরা বাবার বন্ধুকে সম্মান জানিয়েছেন। চাই সে মুসলমান হোক কিংবা কাফের। তারা এ শিক্ষাটা নিয়েছেন সভ্যতার অতন্দ্র প্রহরী নবী মুহাম্মদ (সা.) থেকে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে দিনার আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেন, এক বেদুইন তার সঙ্গে মক্কার পথে মিলিত হন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তাকে সালাম করলেন। এবং যে গাধার পিঠে তিনি সওয়ার ছিলেন তাকেও তাতে তুলে নিলেন। তিনি নিজের মাথার পাগড়িটা তাকে দিয়ে দিলেন। ইবনে দিনার বলেন, আমরা তাকে বললাম, আল্লাহ আপনাকে কল্যাণ দান করুক। বেদুইনরা তো অল্প কিছু পেলেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বললেন, ‘এই ব্যক্তির বাবা ওমরের বন্ধু ছিলেন। আমি রাসুলকে বলতে শুনেছি, ‘সৎকাজগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় সৎকাজ হলো বাবার বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।’ (মুসলিম সূত্রে রিয়াজুস সালেহিন : ৩৪২)। 


হৃদয়ে নুরের প্রদীপ জ্বালো
  দুষ্ট সাপ যখন ছোবল হানে, তখন দংশিত বিষক্রিয়ায় প্রাণ হারায়।
বিস্তারিত
হেদায়েত লাভে মুর্শিদের সোহবত
শুধু পুঁজি থাকলেই যেমন ব্যবসায়ী হওয়া যায় না, তেমনি ব্যবসা
বিস্তারিত
গোপন কোনো কিছুই রয় না
আমরা অনেক সময় লোকদেখানোর জন্য অনেক মন্তব্য করে থাকি। কিংবা
বিস্তারিত
মজলুমের সাহায্য ও জালিমের প্রতিরোধ
হজরত নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সব
বিস্তারিত
অর্থসম্পদের ভালো-মন্দ
সম্পদে বিপদ ও পরীক্ষাও আছে, কোরআন যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে
বিস্তারিত
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি উপন্যাস
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘আল ইসার’।
বিস্তারিত