অনুসরণীয় মুসলিম সম্রাট আওরঙ্গজেব (রহ.)

আবুল মুযাফফর মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আলমগীর বা জগদ্বিজয়ী নামে খ্যাত সম্রাট আওরঙ্গজেব। ভারতীয় উপমহাদেশ ও এর আশপাশের রাজ্যের সম্রাট। তিনি ছিলেন তৈমুর লঙের উত্তরসূরি। তার জন্ম ১৫ জিলহজ ১০২৪ হিজরি সাল মোতাবেক ২৪ অক্টোবর ১৬১৯ ঈসাব্দে। মৃত্যু ২৪ জিলকদ ১১১৮ হিজরি মোতাবেক ২০ ফেব্রুয়ারি ১৭০৭ সালে।

ফারসিতে আওরঙ্গজেবের অর্থ আরশের সৌন্দর্য। আওরঙ্গ অর্থ আরশ আর জেব অর্থ সৌন্দর্য। আর ফারসি আলমগীর অর্থ জগদ্বিজয়ী। আলমগীর ভারতীয় মুসলিম মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম সেরা সম্রাট শাহজাহানের ছেলে। যিনি (শাহজাহান) প্রিয়তমা স্ত্রীর সমাধিস্থল হিসেবে সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন। যেখানে সমাধিস্থ করা হয় মমতাজ মহল নামে খ্যাত আবুল মুযাফফরের জননীকে। সম্রাট তার ভালোবাসায় অতি আসক্ত ছিলেন। এমনকি এজন্য তিনি রাজা হিসেবে থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে নিজ জীবদ্দশায় ভাইদের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধের পর আপন তনয় সুলতান আবুল মুযাফফরকে রাজ্যভার অর্পণ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব অন্য মোগল সম্রাটদের মতো ছিলেন না। বরং তার জীবনকথায় তিনি আলেম, ইবাদতগুজার, দুনিয়াবিমুখ, মুত্তাকি ও কবি হিসেবে সুপরিচিত। তিনি শাখাগত বিষয়াদিতে ছিলেন হানাফি মাজহাবপন্থি। সেহেতু তিনি অপরাপর মোগল সম্রাটদের মতো ছিলেন না, ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
মহান কীর্তিমালা : তিনি বেদাত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। নিজে গানবাজনায় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তা শোনা ত্যাগ করেন। পৌত্তলিক ও বেদাতি উৎসবগুলো বাতিল করেন। রহিত করেন শির নত করা এবং মাটিতে চুমু খাওয়া, যা পূর্বতন রাজ্যবর্গের জন্য করা হতো। বিপরীতে তিনি ইসলামি সম্ভাষণ-বাক্য তথা ‘আসসালামু আলাইকুম’ এর মাধ্যমে অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দেন। সম্ভবত এ কারণে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী কিছু লেখক তাকে গোঁড়া হিসেবে অপবাদ দেন। এটি সম্ভবত তাদের কাউকে কাউকে তাকে সালাফি মনে করিয়েছিল। অবশ্য এসব বিষয়ে তিনি সন্দেহাতীতভাবে সালাফি ছিলেন। যদিও তিনি ছিলেন হানাফি মাজহাবপন্থি। আর এ দেশগুলোয় তখন হানাফিরা আকিদার ক্ষেত্রে মাতুরিদিয়্যা ছিল। অনেক জীবনীকার তাকে সুফি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। বস্তুত আল্লাহই ভালো জানেন তার অবস্থা ও বিশ্বাস সম্পর্কে।
তার সম্পর্কে আমরা নিশ্চিতরূপে কিছু জানি না। জীবনালেখ্যতে তার কর্ম ও কীর্তিই বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। যেমন তার ইবাদতমুখিতা, দুনিয়াবিমুখতা ও ধার্মিকতা। এসব বিষয়ে জীবনীকাররা প্রশংসনীয় অনেক কিছু লিখেছেন। প্রশংসিত কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ কুসংস্কার ও বেদাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, রাফেজি-শিয়া রাজ্যগুলো নির্মূল এবং বেদাতি ও পৌত্তলিক উৎসবগুলো নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি। এসবের দাবি হলোÑ তিনি সম্মান, মর্যাদা, নেক দোয়া পাওয়ার উপযুক্ত। তার এ পদ্ধতি ছিল শাসনকার্য পরিচালনায় সালাফ তথা পূর্বসূরিদের কর্মপন্থার বাস্তব প্রয়োগ।
এ কারণে আরব সাহিত্যিক শাইখ আলী তানতাবি (রহ.) তার ক্ষেত্রে ‘খোলাফায়ে রাশিদিনের অবশিষ্টাংশ’ উপাধি প্রয়োগের দাবি করেছেন। নিজের রচিত ‘রিজালুম মিনাত-তারিখ’ (ইতিহাসের মনীষীরা) গ্রন্থে তিনি তার অমূল্য জীবনী সংযুক্ত করেছেন।
আওরঙ্গজেবের জীবনী শেষ করেছেন তিনি এ কথা বলেÑ সম্রাট এমন দুটি বিষয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা পূর্ববর্তী কোনো মুসলিম শাসক সক্ষম হননি :
প্রথম : তিনি পাঠদান কর্মসম্পাদন বা কিছু সংকলন ইত্যাদি কাজ দাবি করা ছাড়া কোনো আলেম বা প-িতকে উপঢৌকন বা সম্মানি দিতেন না। এমন যাতে না হয় যে, তিনি সম্পদ পেলেন আর অলস হয়ে গেলেন। এতে দুটি মন্দ কাজের সন্নিবেশ হবেÑ অধিকার ব্যতীত সম্পদ গ্রহণ এবং জ্ঞান গোপন করা।
দ্বিতীয় : তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি শরিয়তের বিধিবিধানগুলো এক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন, যাকে আইন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তারই নির্দেশ, তত্ত্বাবধান ও সুনজরে ফাতওয়া সংকলনগ্রন্থ প্রণীত হয়। তার নামে যার নাম দেওয়া হয় ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’। এটি ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ নামে সুবিখ্যাত। ফিকহে ইসলামিতে বিধিবিধানসংক্রান্ত সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিন্যাসের দিক থেকে সবচেয়ে অনবদ্য গ্রন্থ। (রিজালুম মিনাত-তারিখ, পৃ. ২৩৬)।
সম্রাটের নিকটতম সময়ে যিনি তার জীবনী রচনা করেছেন, তিনি হলেন আবুল ফযল মুহাম্মদ খলীল ইবনে আলী আল-মুরাদী (রহ.) (মৃত্যু : ১২০৬ হি.)। তিনি আওরঙ্গজেবকে সুফিসাধক হিসেবে বিশেষিত করে তার জীবনীতে লিখেছেনÑ ‘(সম্রাট আওরঙ্গজেব) আমাদের যুগে হিন্দুস্থানের সম্রাট, আমিরুল মোমিনিন ও ইমাম তথা মোমিনদের নেতা ও আমির, মুসলিমদের এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তম্ভ, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, বিশিষ্ট আলেম ও আল্লামা, আরেফবিল্লাহ বা আল্লাহর পরিচয় লাভকারী সুফি এবং দ্বীনের সাহায্যে অটল বাদশাহ। নিজ দেশে তিনি কাফেরদের নির্মূল করেন। তাদের করেন পরাস্ত। তাদের গির্জাগুলো গুঁড়িয়ে দেন। তাদের অংশীদারদের করেন দুর্বল। ইসলামের সাহায্য করেন এবং হিন্দুস্থানে ইসলামের মিনার উঁচু করেন। আল্লাহর কালামকে করেন একমাত্র বুলন্দ। হিন্দুস্থানের কাফেরদের থেকে তিনি জিজিয়া গ্রহণ করেন। শক্তি ও সংখ্যাধিক্য হেতু যা এর আগে কোনো বাদশাহ গ্রহণ করতে সক্ষম হননি। অব্যাহতভাবে তিনি সুবিশাল সব রাজ্য বিজয় করে যান। যখনই তিনি কোনো শহর বিজয় করতে চাইতেন, তা করেই ছাড়তেন। এমনকি আল্লাহ তাকে সম্মানের জগতে স্থানান্তর পর্যন্ত তিনি ছিলেন জিহাদে। যাবতীয় সময় ব্যয় করেছেন দ্বীনের কল্যাণ ও মহান পালনকর্তার খেদমতে। যেমন সিয়াম, কিয়াম ও সাধনায়Ñ যার কোনোটিও অনেক মানুষের জন্য কঠিন। এটা আসলে আল্লাহর অনুগ্রহ; যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। সম্রাট আলমগীর নিজের সময়গুলো ভাগ করে নিতেন। নির্দিষ্ট সময় ছিল ইবাদত, পাঠদান, সামরিক দপ্তর, ফরিয়াদকারী, দিনে-রাতে আগত রাজ্যের সংবাদ ও চিঠি পাঠ ইত্যাকার প্রত্যেক কাজের জন্য। একটি কাজের সঙ্গে অন্য কাজের সময় কখনও একাকার হতো না। এককথায় তিনি ছিলেন সময়ের সৌন্দর্য-তিলক, সাম্রাজ্য পরিচালনায় তুলনারহিত। তার সাম্রাজ্য ও উত্তম জীবনী নিয়ে ফারসিতে অনেক দীর্ঘ বই সংকলিত হয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তিরা চাইলে সেসব পড়ে দেখতে পারেন।’ (সিলকুদ-দুরার ফি আইয়ানিল কারনিছ-ছানি আশার : ৪/১১৩)।
গ্রন্থকার উপরোক্ত বক্তব্যের পর আরও লেখেন, ‘তিনি ১০৬৮ সাল থেকে রাজ্য পরিচালনায় নিযুক্ত হন। হিন্দুস্থানবাসীর জন্য আল্লাহ কল্যাণের ইচ্ছা করেন। তিনি জুলুম ও অত্যাচার উঠিয়ে দেন। হিন্দুস্থানের দিগন্তে তার ঊষা উদিত হয়। তৈমুরের গম্বুজে পূর্ণিমার চাঁদ উদ্ভাসিত হয়। তার মর্যাদার নক্ষত্র ঘূর্ণায়মান। তার সৌভাগ্যের সেতারা সুপ্রসারিত। তিনি অধিকাংশ প্রসিদ্ধ হিন্দু রাজাকে বন্দি করেন। তাদের রাজ্যগুলো তার আনুগত্যের অধীনে আসে। তার কাছে সম্পদরাশি স্তূপীকৃত হতে থাকে। বিভিন্ন দেশ ও প্রজারা তার আনুগত্য করে। তিনি সর্বদা জিহাদে সচেষ্ট থাকতেন। রাজ্য ও রাজত্ব থেকে (জিহাদের উদ্দেশ্যে) বের হওয়ার পর আপন নিবাসে আর ফিরে যাননি। একটি দেশ বিজয়ের পরই আরেকটি বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। সংখ্যাধিক্যের দরুন তার সৈন্য ছিল গণনাতীত। তার মহত্ত্ব ও শক্তি ছিল বর্ণনাতীত। রাজত্ব বানিয়েছেন তিনি একমাত্র আল্লাহর জন্যই। তিনি হিন্দুস্থানে ইলম-জ্ঞানের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আলেম ও জ্ঞানীদের সম্মান এতটা বৃদ্ধি করেন যে, বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের সমাবেশ ঘটতে থাকে।’
সারকথা : সচ্চরিত্র, আল্লাহভীতি ও ইবাদতনিষ্ঠায় তার যুগে মুসলিম সম্রাটদের কোনো উপমা ছিল না। তিনি বিভিন্ন রাজ্যের হানাফি আলেমদের তার নামে এমন ফতোয়া গ্রন্থ সংকলনের নির্দেশ দেন, যাতে শরিয়তের প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্পর্কিত তাদের মাজহাবের প্রায় সবই সন্নিবেশিত হবে। নির্দেশমাফিক বহু খ-ে তা রচিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’। এটি প্রসিদ্ধি লাভ করে হিজাজ, মিশর, শাম ও রোমক দেশগুলোয়। এর উপকারিতা ব্যাপকতর রূপ নেয় এবং এটি মুফতিদের উদ্ধৃতিগ্রন্থ হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তিনি ১১১৮ ঈসাব্দে জিলকদ মাসে হারাম শরিফের রুকনে ইয়ামানিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মরদেহ বাপ-দাদার দেশে স্থানান্তর করা হয়। তিনি মোট ৫০ বছর রাজত্ব পরিচালনা করেন। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।’ (প্রাগুক্ত)


হৃদয়ে নুরের প্রদীপ জ্বালো
  দুষ্ট সাপ যখন ছোবল হানে, তখন দংশিত বিষক্রিয়ায় প্রাণ হারায়।
বিস্তারিত
হেদায়েত লাভে মুর্শিদের সোহবত
শুধু পুঁজি থাকলেই যেমন ব্যবসায়ী হওয়া যায় না, তেমনি ব্যবসা
বিস্তারিত
গোপন কোনো কিছুই রয় না
আমরা অনেক সময় লোকদেখানোর জন্য অনেক মন্তব্য করে থাকি। কিংবা
বিস্তারিত
মজলুমের সাহায্য ও জালিমের প্রতিরোধ
হজরত নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সব
বিস্তারিত
অর্থসম্পদের ভালো-মন্দ
সম্পদে বিপদ ও পরীক্ষাও আছে, কোরআন যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে
বিস্তারিত
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি উপন্যাস
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘আল ইসার’।
বিস্তারিত