মাতৃভাষার সুমহান মর্যাদা


ইসলামের ইতিহাসে যে যুগকে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানে স্বর্ণযুগ’ বলা হয়, তা আব্বাসীয় যুগ। আব্বাসীয় যুগে খলিফা আল মামুনের সময়েও দেখা যায় যে, তিনি মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জনের জন্য ‘বায়তুল হিকমা’ নামক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে গ্রিক, ফারসি, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ভাষায় লিখিত গ্রন্থ তাদের মাতৃভাষায় 
অনুবাদ করা হয়

যে ধর্মের নামে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তান নিয়ে একটি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়, সে ধর্মকে অবমাননা করে পূর্ব বাংলার মাতৃভাষা বাংলা কেড়ে নিতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। আর পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তাদের সে অধিকার আদায়ে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত হয় এবং জীবন দিয়ে তা রক্ষা করে। 
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যেসব অধিকার দিয়েছেন, তার মধ্যে মাতৃভাষা অন্যতম। কেননা প্রত্যেক ভাষা ও ভাষাভাষী মানুষ মহান রাব্বুল আলামিনের অন্যতম নির্দশন। তিনি প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পরপরই তাকে সব কিছু শিক্ষা দেন এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে যুগে যুগে প্রত্যেক ভাষাভাষীর কাছে তাদের নিজ নিজ ভাষায় তার প্রতিনিধি প্রেরণ করেছেন। যেন তারা স্বজাতির লোকদের ডাকতে পারেন তাদের সৃষ্টিকর্তার দিকে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা ইবরাহিমে এরশাদ হচ্ছে, ‘আমি সব রাসুলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষীর কাছে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (আমার বাণী) স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে।’ 
ফলে প্রত্যেক নবী ও রাসুল নিজ নিজ মাতৃভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এ ছাড়াও আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির স্বীয় মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে নিজ নিজ জাতির নিজস্ব ভাষায় আসমানি কিতাবগুলো নাজিল করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রধান প্রধান চারটি আসমানি কিতাবের মধ্যে হজরত মুসা (আ.) এর প্রতি ‘তাওরাত’ হিব্রু ভাষায়, হজরত ঈসা (আ.) এর প্রতি ‘ঈঞ্জিল’ সুরিয়ানি ভাষায়, হজরত দাউদ (আ.) এর ‘যাবুর’ ইউনানি ভাষায় এবং শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ‘কোরআন’ আরবি ভাষায় নাজিল করা হয়। আল্লাহ তায়ালা এ পৃথিবীতে যত নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন প্রত্যেকেই তার নিজ ভাষায় আল্লার বাণী প্রচার করেছেন। সূরা ইবরাহিমে আল্লাহ? পাক বলেছেন, ‘আমি দুনিয়ার বুকে অনেক নবী-রাসুল প্রেরণ করেছি; কিন্তু আমি এমন কোনো নবী-রাসুল প্রেরণ করিনি, যারা তাদের ভাষা জানত না।’ 
ইসলাম শুধু ভাষা চর্চাকে উৎসাহিত করেছে তা নয় বরং বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চা, শুদ্ধ উচ্চারণ, ভাষার প্রাঞ্জলতা অর্জন ইত্যাদির ওপরও গুরুত্ব¡ারোপ করেছে। বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তৎকালীন আরব বেদুইনরা ছিল সবচেয়ে শুদ্ধভাষী। তাই সম্ভ্রান্ত আরব বংশগুলো তাদের নবজাতক সন্তানদের মাতৃভাষায় পারদর্শী করার জন্য বেদুইন গোত্রগুলোর কাছে প্রেরণ করত। একই ধারাবাহিকতায় হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে জন্মের পর আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী গোত্র বনুু সাদের হালিমা সাদিয়ার কাছে প্রেরণ করা হয়। 
শিশু নবী হালিমার কাছে ৬ বছর অবস্থান করেন। এই ছয় বছর মহানবী (সা.) বিশুদ্ধভাবে মাতৃভাষা আরবিকে রপ্ত করেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর ইসলামের প্রচার ও প্রসারে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে হজরত জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আবিসিনিয়ায় প্রেরণ করেন। তখন সেখানকার রাজা ছিলেন নাজ্জাসি, তিনি ধর্মে খ্রিস্টান ছিলেন। আর সেখানকার ভাষা ছিল হাবসি। রাসুল (সা.) তাঁর প্রতিনিধিকে হাবসি ভাষা শেখার জন্য নির্দেশ দেন। তারা বাদশাহ নাজ্জাসির কাছে হাবসি ভাষায় ইসলামের মর্মবাণী উপস্থাপন করলে তিনি তাদের ভাষার পারদর্শিতা দেখে অভিভূত হয়ে যান। 
ইসলাম মাতৃভাষার উৎকর্ষতা সাধনে যথাযথ গুরুত্বারোপ করেছে। কেননা জ্ঞানার্জন করতে হলে মানুষের অবশ্যই প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞান থাকা আবশ্যক। প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী-গুণী হতে হলে ভাষা সম্পর্কে ব্যাপক অনুশীলন করা প্রয়োজন। কোরআনুল কারিমের প্রথম অবতীর্ণ আদেশ হলো ‘ইকরা’; অর্থ জ্ঞানার্জন করো। আর আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বুদ্ধিমত্তা ও উত্তম বাক্য দ্বারা ইসলাম প্রচারের আহ্বান জানিয়ে এরশাদ করেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান করো এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে আলোচনা করো।’ এ আয়াতে ‘হিকমত’ বলতে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী দাওয়াত দেওয়া আর ‘মাওইযাতুল হাসানাহ’ দ্বারা উত্তম উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া বুঝানো হয়েছে, যা প্রয়োগ করতে হলে মাতৃভাষার জ্ঞান থাকা আবশ্যক। 
ইসলাম প্রচারকদের অনেকেই নিজ এলাকার পাশাপাশি অন্য অঞ্চলে গিয়ে তাদের মাতৃভাষায় কোরআনুল কারিম অনুবাদ করে অনুসারীদের মাঝে কোরআন-হাদিসের জ্ঞানদান করেছেন এবং ইসলামের বিধি-বিধান ও নিয়মকানুন শিক্ষা দিয়েছেন। মাতৃভাষার প্রতি দ্বীন প্রচারকদের অত্যধিক গুরুত্বারোপের কারণে মুসলিম মননে জন্ম নিয়েছে মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা যাতে সব জাতির মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে পারে সে জন্য ইসলাম মাতৃভাষার শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করছে। এর মূল ভিত্তি কোরআন। 
আল্লাহ তায়ালা সূরা তওবায় এরশাদ করছেন, ‘তাই তাদের দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীন বুঝে নেয় এবং সতর্ক করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা বাঁচতে পারে।’ ওই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, প্রত্যেক জাতি, গোত্র, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বীনের বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। যাদের জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য হবে আপন জাতি বা গোত্রকে সতর্ক করা, আর তা মাতৃভাষার মাধ্যমে সহজেই বাস্তবায়ন করা যায়।
ইসলামের ইতিহাসে যে যুগকে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানে স্বর্ণযুগ’ বলা হয়, তা আব্বাসীয় যুগ। আব্বাসীয় যুগে খলিফা আল মামুনের সময়েও দেখা যায় যে, তিনি মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জনের জন্য ‘বায়তুল হিকমা’ নামক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে গ্রিক, ফারসি, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ভাষায় লিখিত গ্রন্থ তাদের মাতৃভাষায় অনুবাদ করা হয়। যার মাধ্যমে মুসলিম প-িতরা সহজেই জ্ঞান চর্চা করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখেন। আর এভাবে যুগে যুগে ইসলাম মাতৃভাষার সর্বজনীন ব্যবহারের মাধ্যমে তার গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য জ্ঞানার্জনের সব মাধ্যম বাংলায় ভাষান্তর করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে বিশ্বে বাংলা ভাষার স্থান আরও সুসংহত হবে ইনশাআল্লাহ। 

লেখক : সিনিয়র লেকচারার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি 


মহানবী (সা.) এর প্রতি আদব
মহানবী (সা.) এর প্রতি এ আদব প্রদর্শন যেভাবে তাঁর বরকতপূর্ণ
বিস্তারিত
রমজানরে আলোয় কাটুক সারা বছর
জুহদ ও তাকওয়া র্অজনরে, সওয়াব ও নকেি কামানোর বসন্তকাল রমজানুল
বিস্তারিত
চিকিৎসাবজ্ঞিানে মুসলমি অবদান
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম মনীষীদের আবিষ্কার এবং অবদান অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে
বিস্তারিত
পশুপাখির অধিকার রক্ষায় ইসলাম
আমরা যদি পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে
বিস্তারিত
শাওয়ালের ছয় রোজা ও ‘অশুভ’ প্রসঙ্গ
মাহে রমজান ইবাদতের মাস। এ সময় মুসলমানরা দীর্ঘ এক মাস
বিস্তারিত
রমজানপরবর্তী মুসলিমের কাম্য জীবন
মুসলমান রমজানকে বিদায় জানায়, যার রজনীগুলোতে ছিল মধুরতা, দিবসগুলোতে ছিল
বিস্তারিত