শুভর কাছে পাখির চিঠি

একদিন সন্ধ্যেবেলা পড়ার টেবিলে শুভ। টিয়া পাখিটির দিকে তাকিয়ে ভাবে। একটু তাকিয়ে আবার বই পড়ে। আবার কিছুক্ষণ পর তাকায়। পড়তে পড়তে রাতের খাবার খেয়ে পাখিটিকেও কলা খেতে দেয় 
শুভ একটি টিয়ে পাখি পোষে। পাখিটি খালামণি বাড়ি থেকে এনেছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে। বড় মামা আমগাছের ঝোপ থেকে পেড়ে দিয়েছে। তখন টিয়ে পাখিটির গায়ে লালচে লালচে পশম ছিল। ঠোঁট যদিও কিছুটা লাল ছিল। মাথাটা নাড়াত। খালামণি শুভকে অনেক বারণ করেও মানাতে পারেনি। তবুও বাচ্চাটিকে ঝিনেদা থেকে নিয়ে আসে। যশোরের বাড়িতে।
শুভ তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। রাইফেল্স স্কুলে। সকাল হলেই আব্বুর মোটরসাইকেলে স্কুলে চলে যায়। কিন্তু সেই ভোরে উঠেই টিয়ে বাচ্চাটিকে মুখে পাউরুটি তুলে দেয়। একটু পাউরুটি আর একটু পানি। এভাবে পেটটা ভরে গেলে নিশ্চিন্তে টেবিলে যায়। একটু পড়েই রেডি হয়ে স্কুলে যায়। কিন্তু স্কুলে গেলেও মনটা তার বাসার পাখিটির কাছেই থাকে। জং-পড়া খাঁচাটি। রং করা নেয়। মায়ের বকুনি। বারবার বড় আপা শ্যামলী কত যে বকেছে। কারও কথাই শুনল না। সে টিয়ে পাখি পুষবেই। কারও নিষেধ শুনবে না।
সারা দিন ব্যালকনিতে থাকলেও। সন্ধ্যে হলেও বাসার ভেতর নিয়ে পড়ার টেবিলে রাখবে। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে উঠে দেখবে পিঁপড়ে ধরছে কি না, তেলাপোকা কামড়াছে কি না। নাকি আবার মশা ভন ভন করছে রক্ত খাওয়ার জন্য। শুভর নানা চিন্তা টিয়ে পাখিকে নিয়ে। স্কুল থেকে আসার সময় টিফিন না খেয়ে পাউরুটি কিনে নিয়ে আসে। সঙ্গে একটা কলা। টিয়াপাখিটা কলা খুব পছন্দ করত। পাউরুটি কম খেলেও কলা একটু বেশি খেত। মাঝে মাঝে শুভ দুধ-ভাত খেতে দিত। এমনি করে বড় হতে থাকে। সবুজ পশম গজাতে থাকে। পাখা বড় হতে থাকে। ঠোঁটটা লাল হতে থাকে। কেক কেক করে ডাকতে থাকে। পাখা ঝাপটাতে থাকে।
স্কুল থেকে এসেই শুভ টিয়ে পাখিটির সঙ্গে কথা বলতÑ আয় পাখি আয়। কাছে আয়। আমার কাছে আয়। মাঝে মাঝে খাঁচা থেকে বের করে হাতের ওপর রেখে আদর করত। এক হাতে রেখে অন্য হাত দিয়ে আদর করত। খুব আদর করত। আর মুখে মুখে আধো আধো করে বলতÑ তুই থাকবি তো টিয়ে পাখি! আমার প্রিয় টিয়া! তোকে আমি অনেক ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। তুই আমার প্রাণের পাখি। মা এসব শুনে শুনে বলতেনÑ এত আদর। পাখির জন্য। আমার জন্য একটুও আদর দেখাও না। ছোট ভাই সাইফ তখন বলতÑ মা, শুভ ভাইয়া একটা বোকা। ওর সঙ্গে তুমি কথা বল কেন। ও পাখি পালে। আর তখন শুভর আব্বা বলেনÑ মানুষ যেমন স্বাধীন। পাখিরাও স্বাধীন। মানুষ স্বাধীনভাবে চলতে চায়। কথা বলতে চায়। ইচ্ছেমতো খেতে চায়। আরও কত কী! আর পাখিদেরও এসব প্রয়োজন হয়। ওরা ইচ্ছেমতো আকাশে উড়তে ভালোবাসে। ওদেরও মা-বাবা আছে। তাদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে ওদের। শুভ তুমি টিয়ে পাখিটিকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন? ওকে ছেড়ে দাও। তোমার জন্য অনেক দোয়া করবে। 
এমন কথা শুনলে শুভর মন খুব খারাপ হয়ে যায়। টিয়ে পাখিটা সবেমাত্র ক’দিন হলো ডানা ঝাপটাতে পারে। এখনও কি ভালো করে উড়তে পারে! না হয়তো উড়তে পারে না। পারবে কী করে, ওর তো বয়স সবে মাত্র তিন মাস পাঁচ দিন হলো। এত সকালে টিয়া পাখি উড়তে পারবে। একটুও পারবে না। শুভর মন খারাপ হয়ে যায় এসব ভাবতেই। না আমি টিয়েটিকে ছাড়ব না। মোটেই না। আমি এটাকে পুষব। আদর করে পুষব।
এসব ভাবতে থাকে সে। চোখ গড়িয়ে পানি পড়ে যায় ওর। দু-হাত দিয়ে চোখ মুছতেই একটা ভাবনা আসে। আসলেই তাই। পাখিটি তো কষ্ট পায়। অনেক কষ্ট। ও তো খাচার ভেতরে উড়তে পারে না। ইচ্ছেমতো হাঁটতে পারে না। ডানা ঝাপটাতে পারে না। আবার নিজে নিজে খেতে পারে না। আমি তো মুখ দিয়ে ওকে ঠোঁটে খাবার পুরে দিই। যাক সে, আমি না পাখিটাকে ছেড়ে দেব। না না আমার খুব কষ্ট হবে। এসব কথা ভাবে শুভ। এমন করে ভেবে ভেবে অনেক দিন কেটে যায়।
একদিন সন্ধ্যেবেলা পড়ার টেবিলে শুভ। টিয়া পাখিটির দিকে তাকিয়ে ভাবে। একটু তাকিয়ে আবার বই পড়ে। আবার কিছুক্ষণ পর তাকায়। পড়তে পড়তে রাতের খাবার খেয়ে পাখিটিকেও কলা খেতে দেয়। হাত দিয়ে কেটে কেটে। টিয়ে পাখিটা আনন্দে শুভর দিকে তাকিয়ে প্যাক-প্যাক করে ডাকতে থাকে। তারপর শুভ ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু এ রাতেই শুভ দেখে আজব স্বপ্ন। দেখতে পায়। টিয়া পাখিটি শুভকে বললÑ শুভ ভাইয়া। আমি জানি। তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো। আমার জন্য অনেক কষ্ট কর। অনেক কষ্ট। আমার জন্য পাউরুটি কিনে আন। কলা কিনে আন। বেশ, আমি তাতে খুব খুশি হই। কিন্তু দেখ, শুভ ভাইয়া। আমার মনে খুব কষ্ট। অনেক কষ্ট। বাবা-মা ছাড়া আমি অনেক দূরে। সেই ছোটবেলায় তুমি আমাকে নিয়ে এসেছ। ঝিনেদা থেকে। যশোরে।
আমার মা-বাবাসহ আমার বোন ছিল। তোমার বড় চাচা আম গাছের ফোকর থেকে ধরে এনেছে। আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। আমার দুঃখের কথা, কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারিনি। আজ তোমাকে বলছি। আমাকে ছেড়ে দাও ভাইয়া, আমি উড়তে চাই। বাবা-মার কাছে যেতে চাই। দেখ, আবার আমি আসব। মাঝে মাঝে তোমাকে দেখতে আসব, কথা দিচ্ছি। তিন সত্যি শুভ ভাইয়া। শুভ আমার কথা রাখ।
এমন স্বপ্ন দেখতেই শুভর ঘুম ভেঙে যায়। তারপর শুভ লাফ মেরে ওঠে। ওর শরীর থেকে ঘাম বেরোয়। ভাবে, কী স্বপ্ন দেখলাম। এ কী আজব স্বপ্ন। হা হা হা করে হাঁপাতে হাঁপাতে টেবিল থেকে পানির গ্লাসটি নিয়ে পানি খায়। তারপর টিয়া পাখিটিকে আবার দেখতে যায়। জানলার কোনায়। চেয়ে দেখল পাখিটি ঘুমাচ্ছে। শুভ তখন মনে মনে ভাবে, না টিয়া, তোমাকে আর কষ্ট দেব না। সত্যি আজ সকালে ছেড়ে দেব।
তুমি মুক্তমনে উড়বে। স্বাধীন হয়ে উড়বে। তারপর শুভ ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে ওঠে। টিয়া পাখির খাঁচাটি হাতে নেয়। ওকে খাবার খাওয়ায়। ব্যালকনির কাছে নিয়ে যায়। উপরে টানিয়ে রেখে। খাঁচার মুখটা আগলা করে দেয়। মনে অনেক কষ্ট নিয়ে ফিরে আসে রুমে। কিছুক্ষণ পর আবার চেয়ে দেখেÑ কই টিয়া পাখিটি যায়নি। চুপচাপ বসে আছে।
যাচ্ছে না কেন? প্রিয় টিয়া পাখিটি। কী হলো তার? অবাক চোখে শুভ এবার পাখিটি হাতে নেয়। আর বলেÑ যা যা যা, উড়ে যা। আবার তুই আসিস আমাদের ঘরে। সেই তোকে আর খাঁচায় রাখব না। তোকে চেয়ে চেয়ে দেখব। আদর করে খেতে দেব। এই বলেই উড়িয়ে দেয় সোনার পাখি টিয়াটিকে। শুভর চোখে জল ভরে যায়। চেয়ে থাকে। উড়ে যায় টিয়া পাখি। উড়ে যায়। বহুদূরে বহুদূরে। নীলের মাঝে।


ভাইয়ের ভালোবাসা
রুহানকে ভাইয়ের ভালোবাসা বোঝানোর জন্যই মামার এই কৌশল। এ কথা
বিস্তারিত
শরৎ সাজ
শরৎ সাজ পাই খুঁজে আজ শিউলি ফোটা ভোরে পল্লী গাঁয়ের মাঠে
বিস্তারিত
মশারাজ্যে
প্যাঁপো লাফাতে লাফাতে বলল, ‘আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, আপনি বিদেশি
বিস্তারিত
আবার শরৎ এলো
নদীর ধারে শাদা ফুলের দোলা,
বিস্তারিত
জাতীয় কবি
ছোট্টবেলায় বাবা মারা যান অসহায় হন ‘দুখু’ সংসারে তার হাল ধরা
বিস্তারিত
বিদ্রোহী নজরুল
চুরুলিয়ার সেই ছেলে তুমি  কবিতার নজরুল, রণাঙ্গনের বীর সৈনিক প্রাণেরই বুলবুল। কেঁদেছো তুমি দুখীর
বিস্তারিত