লজ্জাশীলতা শ্রেষ্ঠতম নৈতিক চরিত্র

গোনাহে লিপ্ত হওয়ার পথে ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো লজ্জাশীলতা। লজ্জাশীল ব্যক্তি লজ্জার কারণে গোনাহ থেকে বিরত থাকে, যেমন ঈমানের কারণে গোনাহ থেকে বিরত থাকে। তাই মানুষের লজ্জা হরণ করা হলে তাকে মন্দ চরিত্র ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়া থেকে বাধা দেওয়ার কিছু অবশিষ্ট থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লজ্জা করতে না পারলে তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পার।’ (বোখারি)

আল্লাহর ইবাদতের চাবিকাঠি ও মূলমন্ত্র নিহিত আছে তাঁর নামগুলো ও গুণাবলির জ্ঞান থাকার মাঝে। তাঁর নামগুলো সুন্দরতম ও গুণাবলি মহোত্তম। আল্লাহর প্রতিটি নাম ও গুণের রয়েছে আলাদা ইবাদত, যা সেই গুণের জ্ঞান লাভের ফলে অবধারিত দাবিতে পরিণত হয়ে যায়। আল্লাহ তাঁর নামগুলো ও গুণাবলি ভালোবাসেন। তাই তিনি তাঁর বান্দাদের এসব নামে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এবং আল্লাহর সুন্দর সুন্দর অনেক নাম আছে, তোমরা তাঁকে সেসব নামে প্রার্থনা করো।’ (সূরা আরাফ : ১৮০)। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হলো সে, যে তাঁর গুণাবলি দ্বারা ভূষিত হয়, যেগুলো তিনি পছন্দ করেন এবং যা আল্লাহর সঙ্গে একান্তভাবে নির্দিষ্ট নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর ইবাদত করে সে তাঁর রহমতের নিকটবর্তী হয়। যে আল্লাহর নামগুলো আত্মস্থ করবে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। 
আল্লাহর অন্যতম একটি গুণ হলো হায়া বা লজ্জাশীলতা। তিনি হায়িয়্যুন বা লজ্জাশীল। তিনি নিজেকে এ গুণে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা বা তার চেয়ে ছোট কোনো বস্তুর উপমা দিতে লজ্জাবোধ করেন না।’ (সূরা বাকারা : ২৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে এ নামে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল ও গোপনকারী, তিনি লজ্জা ও গোপনীয়তা ভালোবাসেন।’ (আবু দাউদ)।
যে আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, কিছু চায়, তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা পান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা লজ্জাশীল, দয়ালু। বান্দা তাঁর কাছে দুই হাত তুললে তিনি তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।’ (আবু দাউদ)। ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, ‘বান্দার কাছে আল্লাহর লজ্জাবোধের বিষয়টি জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন ও আঁচ করা যায় না। এ লজ্জাবোধ হলো দয়া, মহানুভবতা, করুণার লজ্জা।
মানুষের মহৎ চরিত্রগুলোর মধ্যে মূল ও সবচেয়ে বেশি উপকারী এবং মর্যাদাকর চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা। এ চরিত্র অশ্লীলতা ও কুৎসিত বিষয় পরিহার করতে উৎসাহিত করে। অন্যের অধিকার আদায়ে অবহেলা করতে বাধা দেয়। হায়া বা লজ্জা শব্দের মূল উৎস হলো হায়াত বা জীবন শব্দটি। হৃদয়ের উজ্জীবিত থাকা অনুপাতে লজ্জার মাত্রা হয়ে থাকে। হৃদয় যত জীবন্ত থাকবে লজ্জা ততই পূর্ণ ও শক্তিশালী হবে। প্রথম নবীর সময় থেকেই লজ্জা বিষয়টি এখনও প্রতিষ্ঠিত ও আবশ্যক হিসেবে বহাল আছে। প্রত্যেক নবীই তাঁর উম্মতকে লজ্জার প্রতি আহ্বান করেছেন। এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়টি কোনো সময় কোনো শরিয়তেই রহিত ও পরিবর্তিত হয়নি। কারণ এটা এমন একটি বিষয়, যার যথার্থতা সুবিদিত, যার ফজিলত স্পষ্ট। সব বিবেকই এর সৌন্দর্যে একমত। এমন বৈশিষ্ট্যম-িত একটি বিষয় রহিত বা পরিবর্তিত হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ পূর্ববর্তী নবুয়ত থেকে যে বাণীটি লাভ করেছে, তা হলো তোমার যদি লজ্জা না থাকে তবে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার।’ (বোখারি)।
লজ্জাশীলতা এমন মহৎ চরিত্র, যা জাহেলি যুগেও অবশিষ্ট ছিল। হিরাক্লিয়াস যখন নবী সম্পর্কে আবু সুফিয়ান (রা.) কে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন তিনি কুফর অবস্থায় থেকেও বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীরা আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলার অভিযোগ বর্ণনা করবে, এ লজ্জা যদি না থাকত তবে নবী সম্পর্কে আমি মিথ্যা বলতাম, যখন হিরাক্লিয়াস আমাকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু আমার ব্যাপারে লোকেরা মিথ্যা বলা অভিযোগ বর্ণনা করবে, এ লজ্জাবোধ করে আমি সত্য বলেছিলাম।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
লজ্জাশীলতার মাধ্যমে সৌভাগ্য লাভ হয়, সৌভাগ্যের উপায় অর্জন হয়। লজ্জা পুরোটাই কল্যাণকর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লজ্জাশীলতা পুরোটাই কল্যাণের বিষয়।’ (মুসলিম)। লজ্জাশীল ব্যক্তির পরিণতি কল্যাণময়। এতে কখনও তাকে অনুতাপ করতে হয় না। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘লজ্জা শুধু কল্যাণই বয়ে আনে।’ (মুসলিম)। ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, ‘লজ্জা হৃদয়ের জন্য জীবিত থাকার উপাদান। তা সব কল্যাণের মূল। লজ্জা চলে যাওয়া মানে সব কল্যাণ চলে যাওয়া।
লজ্জার অন্যতম কল্যাণের দিকটি হলো এতে অন্তর ভালো, প্রশংসনীয় স্বভাব-চরিত্রে অভ্যস্ত হয় এবং মন্দ স্বভাব থেকে বিরত থাকে। ব্যক্তির লজ্জা প্রবল হলে তা তার সম্মান রক্ষা করে, তার মন্দ বিষয়গুলো দূর করে এবং তার সুন্দর দিকগুলো প্রকাশ করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, ঈমান বলা হয় কথা, বিশ্বাস ও কাজকে। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা আছে। লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 
ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন, ‘লজ্জা ঈমানের অংশ, আর মোমিন জান্নাতে যাবে। কারও থেকে লজ্জা হরণ করা হলে ঈমান হরণের মাধ্যমেই তা করা হয়।’ নবীজি এক লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সে লজ্জাশীলতার কারণে তার ভাইকে তিরস্কার করছিল আর বলছিল, ‘এহ! তুমি লজ্জা করো! যেন সে বলছে এতে তোমার ক্ষতি হচ্ছে।’ তখন রাসুসুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তাকে ছাড়, কেননা লজ্জা ঈমানের অংশ।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহ হৃদয়ের লজ্জা হরণ করে নিলে তার চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই। আবদুুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘লজ্জা ও ঈমানকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, একটাকে তুলে নিলে অন্যটিও চলে যায়।’
লজ্জা করা এমন একটি আনুগত্য, যা আরও অনেক আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। তা লজ্জাশীল ব্যক্তিকে খোদাভীরুতার পথে নিয়ে ছাড়ে। লজ্জাশীলতার ক্ষেত্রে যে ত্রুটি করে তার বিষয়টি এর উল্টো। গোনাহে লিপ্ত হওয়ার পথে ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো লজ্জাশীলতা। লজ্জাশীল ব্যক্তি লজ্জার কারণে গোনাহ থেকে বিরত থাকে, যেমন ঈমানের কারণে গোনাহ থেকে বিরত থাকে। তাই মানুষের লজ্জা হরণ করা হলে তাকে মন্দ চরিত্র ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়া থেকে বাধা দেওয়ার কিছু অবশিষ্ট থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লজ্জা করতে না পারলে তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পার।’ (বোখারি)। ইবনে আবদুুল বার (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ কর্তৃক হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে, এমন লজ্জা যার নেই তার কাছে ছোট-বড় সব গোনাহ সমান। লজ্জা কম থাকলে এ সাবধানবাণী ও হুঁশিয়ারির কথা চলে আসবে।’
পাপ বান্দার লজ্জাশীলতাকে দুর্বল করে দেয়, এমনকি অনেক সময় একেবারে তা নিঃশেষও হয়ে যায়। ফলে মানুষ তার ব্যাপার ও অবস্থা জেনে গেলেও সে তাতে প্রভাবিত হয় না, বরং সে নিজেই তার অপকর্ম ও মন্দ কাজের কথা বলে বেড়ায়।
লজ্জাশীলতার মধ্যে ব্যক্তির সৌন্দর্য ও শোভা রয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘অশ্লীলতা থাকলে তা বস্তুকে কেবল কলুষিতই করে, আর লজ্জা থাকলে তা বস্তুকে কেবল শোভাম-িত করে।’ (তিরমিজি)। লজ্জা মানুষের মনের গৌরব ও তা রক্ষার কারণ। ফলে সে শত প্রয়োজন হলেও মানুষের কাছে হাত পাতে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘একটি বা দুটি খাবার পেয়ে যে চলে আসে সে মিসকিন নয়, আসল মিসকিন তো সে ব্যক্তি, যার ধন নেই এবং লজ্জা পায়, কিংবা সে মানুষের কাছে মোটেই হাত পাতে না।’ (বোখারি ও মুসলিম)। লজ্জা শিষ্টাচারের প্রতি ধাবিত করে। নবী করিম (সা.) এমন একটি বৃক্ষের কথা বলতে বলেছিলেন, যা মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘আমার মনে হলো সেটি খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও ওমর (রা.) কে দেখলাম তারা কিছু বলছেন না, তাই আমি তা বলতে পছন্দ করিনি। অন্য বর্ণনায় আছে, আমি বলতে লজ্জা পেয়েছি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
প্রশংসিত লজ্জা তা-ই, যা ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে আর মন্দ কাজে বাধা দেয়। যে লজ্জার ফলে দায়িত্বে অবহেলা হয়, বা মন্দ কাজে বাধা দেয় না, ভালো কাজে উৎসাহিত করে না, সে লজ্জা নিন্দনীয়, পরিত্যজ্য। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে কাম্য নয়।

৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির 
জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


হৃদয়ে নুরের প্রদীপ জ্বালো
  দুষ্ট সাপ যখন ছোবল হানে, তখন দংশিত বিষক্রিয়ায় প্রাণ হারায়।
বিস্তারিত
হেদায়েত লাভে মুর্শিদের সোহবত
শুধু পুঁজি থাকলেই যেমন ব্যবসায়ী হওয়া যায় না, তেমনি ব্যবসা
বিস্তারিত
গোপন কোনো কিছুই রয় না
আমরা অনেক সময় লোকদেখানোর জন্য অনেক মন্তব্য করে থাকি। কিংবা
বিস্তারিত
মজলুমের সাহায্য ও জালিমের প্রতিরোধ
হজরত নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সব
বিস্তারিত
অর্থসম্পদের ভালো-মন্দ
সম্পদে বিপদ ও পরীক্ষাও আছে, কোরআন যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে
বিস্তারিত
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি উপন্যাস
প্রকাশিত হলো বাংলাদেশি লেখকের আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘আল ইসার’।
বিস্তারিত