‘সম্মানিত’ নবী ইয়াকুব (আ.)

আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ.) ইসলাম ধর্মের প্রতি মানুষকে ডেকেছেন। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ইবাদত পরিত্যাগের প্রতি ডেকেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইয়াকুব (আ.) কে বহুবিধ পরীক্ষায় ফেলেছেন। তিনি সবর করেছেন। উচ্চমর্যাদা অর্জন করেছেন। তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল প্রাণাধিক প্রিয় তনয় ইউসুফের শোকে দৃষ্টিশক্তি হারানো

আল্লাহর বিশেষ নেয়ামতে ধন্য ও ঈর্ষণীয় সম্মানে ভূষিত এক নবীর নাম ইয়াকুব (আ.)। নবী ইয়াকুব (আ.) কে আমাদের নবী আখ্যায়িত করেছেন কারিম তথা সম্মানিত হিসেবে। তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার পূর্বপুরুষ ইসহাক ও ইবরাহিমদের তালিকায়। সহিহ বোখারিতে ইবনে ওমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) ইউসুফ (আ.) সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি হলেন কারিম, ইবনুল কারিম, ইবনুল কারিম, ইবনুল কারিম অর্থাৎ এমন সম্মানিত ব্যক্তি, যিনি সম্মানিত লোকের পুত্র, সম্মানিত লোকের প্রৌত্র, সম্মানিত লোকের প্রপ্রৌত্র। তারা হলেন ইউসুফ, ইবনে ইয়াকুব, ইবনে ইসহাক, ইবনে ইবরাহিম।’ (বোখারি : ৩৩৯০)। 

বিশেষ সম্মানিত বলে আল্লাহ বারবার তাকে অনুগ্রহধন্য করার কথা বলেছেন কোরআনে। যেমন ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথপ্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নুহকে পথপ্রদর্শন করেছি, তার সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকে। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সূরা আনআম : ৮৪)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তিনি যখন তাদের এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করত, তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করলেন, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং প্রত্যেককে নবী করলাম। আমি তাদের দান করলাম আমার অনুগ্রহ এবং তাদের দিলাম সমুচ্চ সুখ্যাতি।’ (সূরা মরিয়ম : ৪৯-৫০)।
বংশ পরিচয় : তার নাম ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম। বাবা ইসহাক (আ.)। দাদা মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)। মা রুফকা বিনতে বাতুইল বিন নাসুর বিন আজর। অর্থাৎ ইয়াকুব (আ.) এর মা রুফকা ছিলেন বাবা ইসহাক (আ.) এর চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। ইসহাক (আ.) এর দুই যমজ ছেলে ঈস ও ইয়াকুবের মধ্যে ছোট ছেলে ইয়াকুব নবী হন। ইয়াকুব (আ.) এর আরেক নাম ছিল ‘ইসরাইল’, যার অর্থ আল্লাহর দাস। নবীদের মধ্যে কেবল ইয়াকুব (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.) এর দুটি করে নাম ছিল। আমাদের নবীর আরেক নাম ছিল ‘আহমাদ’। (তিরমিজি : ২৯৫৪)। ইয়াকুব (আ.) এর দিকে সম্বন্ধ করেই বলা হয় বনি ইসরাইল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাওরাত নাজিল হওয়ার আগে ইয়াকুব (আ.) যেগুলো নিজেদের জন্য হারাম করে নিয়েছিলেন, সেগুলো ব্যতীত সব আহার্য বস্তুই বনি ইসরাইলদের জন্য হালাল ছিল। তুমি বলে দাও, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তাওরাত নিয়ে এসো এবং তা পাঠ করো।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৩২)। 
কোরআনে আল্লাহ তার প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী। তাকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের ওপর স্পষ্ট জুলুমকারী।’ (সূরা সাফফাত : ১১২-১১৩)।
ইতিহাসবিদরা বলেছেন, ইয়াকুব (আ.) কেনানিদের দেশ ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ইসহাক (আ.) এর হাতেই লালিত-পালিত হন। মা রুফকা তাকে হাররান এলাকায় তার মামা ‘লাবানে’র কাছে যেতে নির্দেশ দেন। তার কাছে গিয়ে থাকতে বলেন। তার ভাই ঈস থেকে বাঁচার জন্য। যে তাকে হুমকি দিয়েছিল। ইয়াকুব (আ.) সফর করে মামার কাছে চলে যান। 
বৈবাহিক অবস্থা 
মামার ছিল দুই মেয়ে। বড় মেয়ে লাইয়া ও ছোট মেয়ের নাম রাহিল। তিনি ছিলেন দুজনের মধ্যে বেশি রূপবতী। দুজনের একজনকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তার মৃত্যুর পর অপর মেয়েকে বিয়ে দেন তার সঙ্গে। এটিই প্রমাণিত সত্য যে, তিনি দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করেননি। যদিও সে যুগে তা বৈধ ছিল। পরবর্তী সময় তাওরাতের শরিয়তে তা নিষিদ্ধ করা হয়। রাহিলের গর্ভে ইয়াকুব সফর করে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন আল্লাহর নবী ইউসুফ (আ.) ও তার সহোদর বিনিয়ামিন। লাইয়ার গর্ভে জন্ম নেন তার বাকি ১০ ভাই। এদের সবার কথাই বলা হয়েছে সূরা ইউসুফে। 
প্রিয়তম ছেলে ইউসুফের বিয়োগ 
ইউসুফ (আ.) এদের সবাইকে দেখেন তাকে সিজদা করতে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন ইউসুফ পিতাকে বলল, পিতা, আমি স্বপ্নে দেখেছি ১১টি নক্ষত্রকে, সূর্যকে এবং চন্দ্রকে। আমি তাদের আমার উদ্দেশে সিজদা করতে দেখেছি।’ (সূরা ইউসুফ : ৪)। ইয়াকুব (আ.) ছেলে ইউসুফকে নিষেধ করেছিলেন এ স্বপ্ন ভাইদের না জানাতে। ‘তিনি বললেন, বৎস, তোমার ভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না, তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (প্রাগুক্ত, আয়াত : ৫)। নিজ ভাই বিনিয়ামিন ছাড়া বাকি ১০ সৎভাই মিলে ষড়যন্ত্র করে তাকে হিংসাবশত কুয়ায় নিক্ষেপ করে। ঘটনাটি সূরা ইউসুফে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা বলল, অবশ্যই ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটা সংহত শক্তি বিশেষ। নিশ্চয়ই আমাদের পিতা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে রয়েছেন। হত্যা করো ইউসুফকে কিংবা ফেলে আস তাকে অন্য কোনো স্থানে। এতে শুধু তোমাদের প্রতিই তোমাদের পিতার মনোযোগ নিবিষ্ট হবে এবং এরপর তোমরা যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকবে। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো না, বরং ফেলে দাও তাকে অন্ধকূপে, যাতে কোনো পথিক তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়, যদি তোমাদের কিছু করতেই হয়।’ (সূরা ইউসুফ : ৮-১০)। 
এভাবেই ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের ষড়যন্ত্রে প্রাণাধিক প্রিয় ছেলে ইউসুফকে হারান। এ শোকে  কাঁদতে কাঁদতে তিনি অন্ধ হয়ে যান। ইউসুফকে হারানোর পর দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও তীব্র বিরহবেদনার যবনিকায় আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। মিশর থেকে ছেলের ব্যবহৃত জামা পাঠান। তিনি সেটি চোখে ছোঁয়াতেই অলৌকিকভাবে চোখের আলো ফিরে আসে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে সে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেনÑ ‘অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা পৌঁছল, সে জামাটি তার মুখে রাখল। অমনি তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। বললেন, আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানি তোমরা তা জান না?’ (সূরা ইউসুফ : ৯৬)। 
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তার প্রাণাধিক প্রিয় ছেলের সঙ্গে মিশরে মিলন ঘটে। ইউসুফ পিতার কাছ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর দূরে ছিলেন।
নবুয়ত : নবী ইয়াকুব (আ.) ইসলাম ধর্মের প্রতি মানুষকে ডেকেছেন। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ইবাদত পরিত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইয়াকুব (আ.) কে বহুবিধ পরীক্ষায় ফেলেছেন। তিনি সবর করেছেন। উচ্চমর্যাদা অর্জন করেছেন। তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল প্রাণাধিক প্রিয় তনয় ইউসুফের শোকে দৃষ্টিশক্তি হারানো। 
মৃত্যু ও দাফন 
ছেলে ইউসুফের সঙ্গে মিলনের পর ১৭ মতান্তরে ২০ বছরের অধিককাল জীবন অতিবাহিত করেন। অতঃপর ১৪৭ বছর বয়সে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ইয়াকুব (আ.) ছেলে ইউসুফকে অসিয়ত করে যান, তাকে যেন পিতা ইসহাক ও দাদা ইবরাহিমের পাশে দাফন করা হয়। ফলে তা-ই করা হয়। তার লাশ ফিলিস্তিনে নেওয়া হয়। ফিলিস্তিনের খলিল মহল্লার জাবুরুনের গুহায় তাকে দাফন করা হয়। 
কোরআনে ইয়াকুব (আ.) 
তার সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ১০টি সূরায় ৫৭টি আয়াত বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো যথাক্রমে সূরা বাকারা : ২/১৩২-১৩৩; ১৩৬, ১৪০; আলে ইমরান : ৩/৮৪; নিসা : ৪/১৬৩; মায়েদা : ৫/৮৪-৮৫; হুদ : ১১/৭১; ইউসুফ : ১২/৪-৯=৬; ১১-১৪=৪; ১৫-১৮=৪; ৩৮; ৬৩-৬৮=৬; ৭৮-৮৭=১০; ৯৩-১০০=৮ মোট ৩৯; মরিয়ম : ১৯/৬, ৪৯-৫০; আম্বিয়া : ২১/৭২-৭৩; আনকাবুত : ২৯/২৭; সোয়াদ : ৩৮/৪৫-৪৭=৩।
সন্তানদের প্রতি ইয়াকুব (আ.) এর অসিয়ত 
কোরআনে উল্লেখ হয়েছে, ইয়াকুব (আ.) তার সন্তানদের অসিয়ত করেন, যা করেছিলেন তার পিতা ইবরাহিম। তা হলো দ্বীনে ইসলামের অনুসরণ এবং আমৃত্যু তার ওপর অটল থাকা। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘এরই অসিয়ত করেছে ইবরাহিম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবওÑ হে আমার সন্তানরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৩২)। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পর তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরা তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদত করব। তিনি একক উপাস্য।’ (সূরা বাকারা : ১৩৩)।


মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ইসলাম
গত ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য
বিস্তারিত
জুলুমবাজ ও হত্যাকারীর পরিণতি
বর্তমানে চারদিকে একটি দৃশ্য ফুটে উঠছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।
বিস্তারিত
কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার
আমরা মানুষ, পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা,
বিস্তারিত
পোশাকের শালীনতা
পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। পোশাকে মানুষের রুচি, ব্যক্তিত্ব, ঐতিহ্য,
বিস্তারিত
কে এই নোবেল বিজয়ী আবি
তিনি নিজেও ওরোমো মুসলিম ছিলেন। তার বাবা ছিলেন মুসলিম আর
বিস্তারিত
মুসলিম নোবেল বিজয়ীরা
  ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রথম মুসলমান
বিস্তারিত