মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

উভয় জগতের সুসংবাদপ্রাপ্ত যারা

এরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (মোমিনদের) জন্য সুুসংবাদ রয়েছে ইহজগতে ও পরজগতে।’ ইহজগতে সুসংবাদ অর্থ হলো শুভস্বপ্ন। যে শুভস্বপ্ন তারা নিজেরা দেখে বা তাদের দেখানো হয়। আর পরজগতে সুসংবাদ মানে বেহেশত

আলী (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর অলি এমন সম্প্রদায়, রাত জাগার কারণে যাদের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। অশ্রু নির্গত হওয়ার কারণে যাদের চোখ শুকিয়ে যায়। ক্ষুধার্ত থাকার ফলে যাদের পেট শূন্য থাকে আর দুর্বলতাবশত যাদের ওষ্ঠ শুকনো থাকে।’ তাসাউফ সাধনার যত সিলসিলা জগতে প্রচলিত, প্রত্যেকে একবাক্যে স্বীকার করেন, ইলমে মারেফাত নবী করিম (সা.) থেকে আলীর (রা.) সূত্রে সারা দুনিয়ার পির-আউলিয়াদের মাঝে বিস্তৃত হয়েছে। অনুরোধ করব, আলী (রা.) থেকে বর্ণিত উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে নিজের অবস্থাকে একবার মিলিয়ে দেখুন। 

আল্লাহর অলি কারা, তার পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে।’ (সূরা ইউনুস : ৬৩)। আল্লামা মাইবেদি বলেন, এ আয়াতকে আগের আয়াতের জের গণ্য করা যায়। তখন অর্থ হবেÑ আল্লাহর অলি ও বন্ধুজন তারা, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করে। এ অর্থ গ্রহণ করলে ইয়াত্তাকুনের ওপর ওয়াকফ করতে হবে। তখন বক্তব্য এখানেই শেষ বলে ধরে নিতে হবে। আর যদি চান আগের আয়াতের ‘লা ইয়াহজানুন’ (চিন্তিত হবে না) এর ওপর কথা শেষ করতে পারেন। তখন ‘যারা ঈমান এনেছে’ বলে নতুন বক্তব্য শুরু হবে। এমনটি হলে নতুন বাক্যের খবর বা বিধেয় ধরতে হবে ‘তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ’ বাক্যটি। 
এরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (মোমিনদের) জন্য সুুসংবাদ রয়েছে ইহজগতে ও পরজগতে।’ ইহজগতে সুসংবাদ অর্থ হলো শুভস্বপ্ন। যে শুভস্বপ্ন তারা নিজেরা দেখে বা তাদের দেখানো হয়। আর পরজগতে সুসংবাদ মানে বেহেশত। আবু দরদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.) কে আল্লাহ তায়ালার বাণী ‘তাদের জন্য আছে সুসংবাদ দুনিয়া ও আখেরাতে’ সম্পর্কে জানতে চাইলাম, আখেরাতের সুসংবাদ কী হতে পারে, তা আমরা মোটামুটি বুঝি। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে যে সুসংবাদের কথা বলা হয়েছে তার স্বরূপ কী? নবীজি বললেন, তা হলো শুভস্বপ্ন, যা মানুষ দেখে বা তাকে দেখানো হয়। আর আখেরাতের বেলায় তা হলো জান্নাত।
উবাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এর অর্থ সেই শুভস্বপ্ন, যা মোমিন নিজের জন্য দেখে অথবা তাকে দেখানো হয়। এ স্বপ্ন হলো আল্লাহর কালাম, যার সাহায্যে নিদ্রায় তার প্রভু তার সঙ্গে কথা বলেন। 
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, আমার পরে নবুয়তের কোনো ধারাবাহিকতা অবশিষ্ট থাকবে না; তবে মুবাশশিরাত (সুসংবাদগুলো) অব্যাহত থাকবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! মুবাশশিরাত কী? তিনি বললেন, শুভস্বপ্ন, যা মানুষ দেখে বা তাকে দেখানো হয়। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, শুভস্বপ্ন হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। অতএব কেউ যদি এমন স্বপ্ন দেখে, যা তার অপছন্দ, সে যেন বাম দিকে তিনবার হালকা থুতু ছিটায়। আর আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে পানা চায়। তাহলে সে স্বপ্ন তার জন্য কোনো ক্ষতি বয়ে আনবে না। সেই স্বপ্নের কথা কারও কাছে বলবে না। আর যদি ভালো কোনো স্বপ্ন দেখে, তাহলে এমন লোকের কাছে স্বপ্নের কথাটি বলবে, যাকে সে ভালোবাসে। 
নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, স্বপ্ন তিনি প্রকার। এক প্রকার স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, যা শুভস্বপ্ন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বুশরা বা সুসংবাদ। আরেক প্রকার স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। তৃতীয় প্রকার স্বপ্ন মনের কল্পনাপ্রসূত। নবীজি (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে যে স্বপ্ন বর্ণনায় অধিক সত্যবাদী, সে কথাবার্তায়ও অধিক সত্যবাদী। আর মোমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। এই হাদিসের দুটি অর্থ বলা হয়েছে। একটি হলোÑ নবীজির ছেচল্লিশটি মুজেজা ছিল। নবীজির স্বপ্ন ছিল এগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ তিনি যা কিছু স্বপ্নে দেখতেন জাগ্রত হয়ে তা বাস্তবে যথাযথ পেয়ে যেতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসুলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন।’ (সূরা ফাতাহ : ২৭)। 
আরেকটি অর্থ হচ্ছেÑ নবীজির বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন তার কাছে ওহি অবতরণ শুরু হয়। তবে ওহি নিয়ে জিবরাইল (আ.) আসার আগে ছয় মাস তিনি স্বপ্নযোগে ওহি লাভ করেন। নবুয়ত ও ওহি নাজিলের সময়কাল ছিল তেইশ বছর। যদি চল্লিশ বছরের আগের ছয় মাসকে তেইশ বছরের সঙ্গে আনুপাতিক হিসাব করা হয়, তাহলে অনুপাত হয় আধা বছর। অর্থাৎ তেইশ বছর সমান ছেচল্লিশটি আধা বছর। এ হিসাবে নবী করিম (সা.) এর স্বপ্নযোগে ওহি লাভের ব্যাপারটি ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ গণ্য করা যায়। শুভস্বপ্নকে নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ বলে উল্লেখ করার তাৎপর্য এটিই। (এ কথার অর্থ হলোÑ নবী করিম (সা.) এর ওফাতের পর নবুয়তের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ গায়েবিভাবে কিছু জানতে চায়, তার জন্য পথ খোলা রয়েছে শুভস্বপ্ন। হাদিসে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ফজর নামাজের পর সাহাবিদের ডেকে ডেকে গেল রাতে কে কী স্বপ্ন দেখেছেন, জানতে চাইতেন। বোঝা যায়, শুভস্বপ্ন মনের স্বচ্ছতা ও চিন্তার বিশুদ্ধতার প্রমাণ। যে ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থায় মন ও চিন্তাকে কলুষমুক্ত রাখে আশা করা যায়, রাতের নিদ্রায় তার ভালোস্বপ্ন নসিব হবে)।
দুনিয়ার জীবনে তাদের জন্য বুশরা বা সুসংবাদ হলো, মৃত্যুর সময় তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতারা আসবেন। আর আল্লাহর দুশমনদের কাছে আসবেন দুঃসংবাদ ও রুক্ষতা নিয়ে। আর আখেরাতের বেলায় সুসংবাদ হলো, মোমিনের জান বের হওয়ার পর ফেরেশতারা তা নিয়ে আল্লাহর কাছে চলে যাবে, নববধূকে সাজিয়ে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়ার মতো। তখন তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ দেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা এ মর্মে বলেন, ‘ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটায় শিরক থেকে মুক্ত ও পবিত্র থাকা অবস্থায়, তাদের ফেরেশতারা বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম (শান্তি)! তোমরা যা করতে তার প্রতিফল হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সূরা নাহল : ৩২)। 
ইবনে কায়সান বলেন, এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের দুনিয়ায় কিতাব ও রাসুল মারফত দেওয়া এই সুসংবাদ যে, তারা আল্লাহর বন্ধু। আর তাদের কবরে ও তাদের আমলনামায়ও এই সুসংবাদ দেয়া হয় যে, তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে আবদুুল্লাহ আল জুজেকি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু আহমদ আল হাফেজকে স্বপ্নেœ দেখলাম যে, তিনি একটি বাহনে আরোহণ করে আছেন। তার গায়ে একটি শাল আর মাথায় পাগড়ি। তখন আমি তাকে সালাম করে বললাম! হে শাসক! আমরা এখনও আপনার কথা স্মরণ করি এবং আপনার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করি। তখন তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে বললেন, আমরা আপনাকে স্মরণ করি এবং আপনার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবনে সুংসংবাদ। সুন্দর প্রশংসা, সুন্দর প্রশংসা। আর তিনি তার হাতের দিকে ইঙ্গিত করলেন। 
সহি হাদিসে বর্র্ণিত, আবু জার (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ কোনো ব্যক্তি তার নিজের জন্য আমল করে; অথচ মানুষ তাকে ভালোবাসে (কেমন ব্যাপার)! নবীজি বলেন, এটি হচ্ছ মোমিনদের জন্য আল্লাহর দেওয়া সুসংবাদের নগদ প্রাপ্তি। (সূত্র : তাফসিরে মাইবেদি, সূরা ইউনুসের ৬২তম আয়াত)।


মক্কা-মদিনায় যুক্ত হলেন কয়েকজন নতুন
গেল শনিবার (১২ অক্টোবর) পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাবান দুই মসজিদ তথা
বিস্তারিত
আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো
আজ সমাজে ভিক্ষুক থেকে শুরু করে কোটিপতি সর্বশ্রেণি হতাশার কালো
বিস্তারিত
মহিলা সাহাবি হামনা বিনতে জাহাশ
যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম হামনা বিনতে জাহাশ বিন রিয়াব আল-আসাদিয়্যাহ। বংশীয় সূত্রে
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহকে ছাড়া যাদের তারা ডাকে,
বিস্তারিত
মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ইসলাম
গত ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য
বিস্তারিত
জুলুমবাজ ও হত্যাকারীর পরিণতি
বর্তমানে চারদিকে একটি দৃশ্য ফুটে উঠছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।
বিস্তারিত