মালিকানাবিহীন ভূমির বণ্টন নীতি

তাকাফুল মালয়েশিয়া

মহানবী (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম মালিকানাবিহীন অনাবাদি জমি আবাদ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেনÑ ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো জমি আবাদ করে, যার মালিক নেই, তাহলে সে ব্যক্তিই (ওই জমির) সবচেয়ে বেশি অধিকারী।’ লোকরা তখন সাধ্যানুসারে জমি আবাদ করার ও মালিক হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে লেগে গেল। এভাবে বহু লোকের মধ্যে মালিকানাবিহীন জমি বণ্টন করা হলো
মাঝে ‘তাকাফুল মালয়েশিয়া’ ভবন। এখানে আছে ‘ইসলামিক ব্যাকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ইনস্টিটিটিউট অব মালয়েশিয়া’ এবং ‘মালয়েশিয়া তাকাফুল (ইসলামি বীমা) অ্যাসোসিয়েশন’ এর অফিস। ডানে ‘পাবলিক ব্যাংক বারহাদ’ এর সদর দপ্তর এবং বামে ‘ন্যাশনাল ল্যান্ড ফাইন্যান্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ ভবন।
 

ইসলামি অর্থনীতির বিশেষ উল্লেখযোগ্য নীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের দখলে যেসব মালিকবিহীন জমি থাকে, সেসব ভূমি ওই ভূমিহীন বা স্বল্প ভূমির মালিক লোকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে, যারা এসব ভূমি আবাদ ও চাষোপযোগী করে তুলতে এবং তাতে ফসল ফলাতে ইচ্ছুক ও সক্ষম। এই ভূমিগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে আবাদ করার শর্তে তাদের দেওয়া হবে। তারা যদি এই নির্দিষ্ট মেয়াদ তথা তিন বছর মেয়াদের মধ্যে আবাদ করে, তবে এই জমি তাদের অধিকারেই থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবাদ না করলে তা সরকারের কাছে প্রত্যার্পিত হবে এবং সরকার তা অপর ভূমিহীন জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করবে। মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে এমন ভূমি বণ্টনের নিয়ম প্রচলিত ছিল। এই ভূমি বণ্টনের ব্যাপারে কিছু জরুরি শর্ত রয়েছেÑ ক. সেই জমি কোনো নাগরিকের মালিকানাভুক্ত হবে না। খ. সেই জমি সাধারণ জনমানুষের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে না। এ ধরনের কোনো জমি বিশেষ কোনো নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে মালিকানা হিসেবে দান করার সরকারের কোনো অধিকার নেই। গ. এ জমি এমন হবে না, যেখানে জনমানবের জন্য অপরিহার্য কোনো ধাতু বা সম্পদের খনি অবস্থিত। এমন হলে সেই জমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেওয়া বৈধ হবে না। এই তিন ধরনের ভূমি ছাড়া অন্য সব ধরনের ভূমি সরকার যাকে ইচ্ছে বণ্টন করে দিতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, ঘুষ কিংবা অন্য কোনো দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না।
ইসলামের আবির্ভাবকালে আরব দেশের ভূমির তিনটি অবস্থা ছিলÑ ক. অনেক ভূমি ছিল ব্যক্তিমালিকানাভুক্ত। খ. এমন অনেক ভূমি ছিল, যার কেউ মালিক ছিল না। গ. গৃহপালিত পশুর সাধারণ চারণভূমিরূপে নির্দিষ্ট ছিল অনেক ভূমি। মহানবী (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম মালিকানাবিহীন অনাবাদি জমি আবাদ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেনÑ ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো জমি আবাদ করে, যার মালিক নেই, তাহলে সে ব্যক্তিই (ওই জমির) সবচেয়ে বেশি অধিকারী।’ লোকরা তখন সাধ্যানুসারে জমি আবাদ করার ও মালিক হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে লেগে গেল। এভাবে বহু লোকের মধ্যে মালিকানাবিহীন জমি বণ্টন করা হলো।
ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক ভূমি বণ্টনের এটাই হলো মূলনীতি। অনাবাদি ভূমি আবাদ করা অথবা ভূমিহীন কৃষক বা মুহাজিরদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কাউকে ভূমি দান করা ইসলামে বৈধ। একে আরবিতে ‘ইকতা’ বলে। মহানবী (সা.) ইকতারূপে হজরত আবু বকর, হজরত উমর, হজরত আলী, হজরত বেলাল, হজরত জুবায়ের (রা.) প্রমুখ সাহাবিকে ভূমি দান করেছিলেন। এভাবে খোলাফায়ে রাশেদিনও একাধিক ব্যক্তিকে ইকতারূপে ভূমি দান করেছেন। ‘কিতাবুল খারাজ’ এ উল্লেখ রয়েছে, ‘যদি ইকতার উদ্দেশ্য সাধিত না হয় অথবা যদি অন্যায়রূপে বা অসদুদ্দেশ্যে ইকতা প্রদান করা হয়, তবে এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।’ হজরত উমর (রা.) মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত বেলাল ইবন হারিস মুযানির (রা.) ইকতার একাংশ এজন্যই ফেরত নিয়েছিলেন যে, তিনি এই ভূমি যথাযথভাবে আবাদ করতে সক্ষম হননি। অনুরূপভাবে খলিফা উমর ইবন আবদুল আযিয (রা.) আপন পরিবারের জন্য প্রাপ্ত লাখেরাজ ভূসম্পত্তি এজন্য বাতিল করেছিলেন যে, এগুলো উমাইয়া শাসকরা স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে প্রদান করেছিলেন। 
উল্লেখ্য, সরকারিভাবে যে ভূমি জনগণের মধ্যে বণ্টন করা হবে, এর দ্বারা কোনোরূপ সামন্তবাদী বা জায়গিরদারি প্রথা চালু করা যাবে না। যার পক্ষে যে পরিমাণ ভূমি চাষাবাদ, উৎপাদন করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব, তাকে ওই পরিমাণ ভূমিই দেওয়া হবে। সরকারি মালিকানা ছাড়া ক্রয়কৃত ভূমির মালিকরা যদি বেশিরভাগ আবাদি ভূমি হস্তগত করে বসে এবং গরিব কৃষকের যদি ভূমির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে দেখা দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান দু-পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারবেÑ ১. মালিকানাবিহীন, পতিত ও অনাবাদি কৃষিভূমি কৃষকের মধ্যে বিনাপয়সায় বণ্টন করে দেবেন। ২. ভূমির মালিকদের কাছে কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় ভূমি থাকলে তা তাদের দখলমুক্ত করে কৃষকের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।
মহানবী (সা.) এর ইন্তেকালের পর প্রথম পর্যায়ে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্রের সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়ে এই দু-রাষ্ট্রের বিশাল অংশ দখল করে নেয়। ইসলামি রাষ্ট্রের দখলকৃত এই বিশাল ভূমির কেউ মালিক ছিল না। হয় ওই জমির মালিক যুদ্ধে নিহত হয়েছে, না হয় তা আসলেই কারও মালিকানাভুক্ত ছিল না; বরং পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সরকার প্রদত্ত জমিজায়গা ছিল এবং তা-ই ইসলামি রাষ্ট্রের হাতে এসেছিল। ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফারা এসব জায়গা আবাদ ও ভোগদখল করার জন্য এমন লোকদের মধ্যে বণ্টন করলেন, যারা সেগুলো আবাদ ও ফসল ফলাতে সক্ষম বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। এসব ভূমি বণ্টনে শরিয়তের বিধান পুরোপুরি অনুসৃত হয়েছিল। হজরত উমর (রা.) গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) কে লিখে পাঠিয়েছিলেন, ‘যদি তা জিজিয়ার জমি না হয় এবং এমন জমিও না হয়, যেখানে জিজিয়ার জমির জন্য পানি প্রবাহিত হয়, তবে কেবল সে জমিই সরকারি পর্যায়ে জনগণের মধ্যে বণ্টন করতে পারো।’ এতে প্রমাণিত হয়, কেবল মালিকানাবিহীন জমিই সরকারি পর্যায়ে বণ্টন করা যেতে পারে। আর এইরূপ জমির পুনর্বণ্টন সরকারি পর্যায়েই হতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে জমি বণ্টনকাজ শুধু সেসব জমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা সরকারের আয়ত্তাধীন  এবং যাতে সরাসরি সরকারি নির্দেশ কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যেসব জমির নির্দিষ্ট মালিক রয়েছে, সেসব জমি সম্পর্কে সরকার বিনাকারণে কোনো নতুন নীতি গ্রহণ করতে পারে না। সরকারি পর্যায়ে জমি বণ্টনের এটাই মৌলিক বিধান। অতএব সাধারণভাবে ও কোনো সামষ্টিক কল্যাণের উদ্দেশ্য ছাড়াই খামখেয়ালিভাবে ভূমির মালিকদের উৎখাত করে দিয়ে তা নিজেদের লোকদের মধ্যে অথবা অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের বিনিময়ে পুনর্বণ্টন করা ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট জুলুম।
সরকারিভাবে যে জমি জনগণের মধ্যে বণ্টন করা হবে, তার দ্বারা কোনোরূপ সামন্তবাদ বা জায়গিরদারি প্রথা রচনা করা চলবে না। যার পক্ষে যত পরিমাণ জমি ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সামলানো, চাষাবাদ ও ফসল ফলানো সম্ভব হবে বলে বিবেচিত হবে, তাকে ততখানি জমিই দেওয়া হবে। অধিক পরিমাণ জমি কাউকেই দেওয়া যাবে না। হজরত বেলাল ইবনুল হারিস (রা.) কে মহানবী (সা.) প্রচুর জমি নিজে আবাদ করার জন্য দিয়েছিলেন। হজরত উমর ফারুক (রা.) খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর তাঁকে ডেকে বললেন, মহানবী (সা.) আপনাকে অনেক জমি দিয়েছেন। তার পরিমাণ এত বেশি যে, আপনি তা পুরোমাত্রায় চাষাবাদ করতে পারছেন না। অতঃপর বললেন, আপনি বিবেচনা করে দেখুন। যে পরিমাণ জমি আপনি নিজে চাষাবাদ করতে সক্ষম হবেন, সে পরিমাণই আপনি নিজের কাছে রাখুন। আর যা সামলাতে পারবেন না কিংবা যে পরিমাণ জমির ব্যবস্থাপনা করা আপনার সাধ্যাতীত, তা আমাদের (রাষ্ট্রের) কাছে ফেরত দিন, আমরা তা অন্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেব। হজরত বেলাল (রা.) জমি ফেরত দিতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাধ্যাতীত পরিমাণ জমি হজরত উমর (রা.) ফেরত নিলেন এবং মুসলমানদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করলেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রা.) লিখেছেন, ‘যেসব জমি আবাদি নয়, যার কোনো মালিক নেই, তা বণ্টন না করে অব্যবহৃত ফেলে রাখা রাষ্ট্রের পক্ষে কিছুতেই উচিত হতে পারে না। কেননা আবাদ করার ফলে যেমন প্রয়োজনীয় খাদ্য ফসল লাভ করা যেতে পারে, তেমনি সরকারের আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। এ পর্যায়ে হজরত উমর ইবনে আবদুল আযিয (রা.) এর একটি আদেশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর গভর্নরদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের হাতে যেসব সরকারি জমিজায়গা রয়েছে, তা অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে পারস্পরিক চাষের নিয়ম অনুযায়ী জনগণকে চাষ করতে দাও। 
এতেও যদি তার চাষাবাদ না হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশের বিনিময়ে (তিন ভাগের এক ভাগ পাবে সরকার এবং দু-ভাগ পাবে চাষি) তা চাষ করতে দাও। আর এই শর্তে যদি কেউ জমি চাষ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে দশ ভাগের এক ভাগ ফসল পাওয়ার বিনিময়ে চাষ করতে দিতে পার। এতেও যদি জমি চাষ না হয়, তাহলে কোনরূপ বিনিময় না নিয়ে এমনিই চাষ করতে দাও। এভাবেও কেউ চাষ করতে না চাইলে তার চাষাবাদ করার জন্য বাইতুল মাল থেকে অর্থ ব্যয় কর এবং কোনো জমিই তোমরা অব্যবহৃত থাকতে দেবে না। 


মালিকানা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা :
কোরআন মজিদের সর্বাধিক দীর্ঘ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতিকে হেদায়েত
বিস্তারিত
সওয়াল জওয়াব
কবরের ওপর ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে  প্রশ্ন : ২২ বছর আগে আমাদের
বিস্তারিত
ব্যবসায় অসাধুতার বিরুদ্ধে ইসলাম
অসৎ উদ্দেশ্যে খাদ্য মজুতদারির নিন্দনীয়তা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)
বিস্তারিত
হৃদয়ে নুরের প্রদীপ জ্বালো
  দুষ্ট সাপ যখন ছোবল হানে, তখন দংশিত বিষক্রিয়ায় প্রাণ হারায়।
বিস্তারিত
হেদায়েত লাভে মুর্শিদের সোহবত
শুধু পুঁজি থাকলেই যেমন ব্যবসায়ী হওয়া যায় না, তেমনি ব্যবসা
বিস্তারিত
গোপন কোনো কিছুই রয় না
আমরা অনেক সময় লোকদেখানোর জন্য অনেক মন্তব্য করে থাকি। কিংবা
বিস্তারিত